দিগ্বিজয়ী বাবর (Digbijoyee Babar)ঐতিহাসিক উপন্যাস

 




দিগ্বিজয়ী
বাবর

                                            নিবেদন

বাবর ভারতবর্ষের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের বিস্ময়কর চরিত্র বাবর ছিলেন ধৈর্য, সাহস, ত্যাগের মহিমায় মহিমামণ্ডিত এক বিস্ময়কর বিরল প্রতিভার অধিকারী বাবরের জন্ম ইং ১৪৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী মাত্র এগার বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হোন; তবে নিজের প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের বলে তিনি সকল বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার সুউচ্চ পর্বত ডিঙিয়ে দেশের পরে দেশ জয় করে ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ইংরাজি ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল দিল্লী থেকে ৮৫.৭ কিলোমিটা দূরে অবস্থিত পানীপত নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীকে পরাস্ত করে তিনি ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত নির্মাণ করেন এবং ২৭ এপ্রিলে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন

মাত্র চার বছর তিনি ভারতের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন এই চার বছরেই তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন ১৫৩০ সালের ২৬ ডিসেম্বরে তিনি এন্তেকাল করেন তাঁর এন্তেকালের পরে তিন শত বছরের চেয়েও অধিককাল ভারতবর্ষে তাঁর উত্তরসূরীরাঁ রাজত্ব করেছেন 

ছেলেবেলা বাবরের বিষয়ে প্রদর্শিত একটি তথ্যচিত্র দেখে বাবরের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম তথ্যচিত্রটিতে বাবর পানীপতের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনার বিরুদ্ধে মাত্র বার হাজার সেনা নিয়ে কীভাবে বিজয় সাব্যস্ত করেছিলেন সেই দৃশ্য প্রদর্শনের সাথে রোগশয্যায় শায়িত প্রাণাধিক পুত্র হুমায়ূনকে নিজের আয়ু দান করার এক বিস্ময়কর বিরল দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছিলো তথ্যচিত্রটি দেখে তখন সেই দৃশ্য দু'টির রহস্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হইনি, তাই তখন থেকে বাবরের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ কৌতূহল অনুভব করে আসছিলাম

১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে করসেবকরা বাবরের সেনাপতি মীর বাকি নির্মিত বাবরী মসজিদ ধ্বংস করে উক্ত ঘটনার ফলে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় উক্ত সংঘর্ষে ভারতবর্ষের সমান্তরালভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রভূত ধন-জন ক্ষতি হয় সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে পড়ে তখন মর্মাহত হয়ে পড়েছিলাম ফলে বাবরের চরিত্র সম্পর্কে অধিক জানার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে উঠেছিলাম তার ফলশ্রুতিতেই বাবর নামক উপন্যাসটি লিখার সিদ্ধান্ত নিই উপন্যাসটি লিখতে সোভিয়েত সংঘের রাদুগা প্রকাশন দ্বারা প্রকাশিত সুধীর কুমার মাথুরের হিন্দীতে লিখা বাবর নামক উপন্যাসটির বিশেষভাবে সহায় নেওয়া হয়েছে সেজন্য আমি প্রকাশন গোষ্ঠী এবং লেখকের নিকট বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ উপন্যাসটি আমি প্রথমে অসমীয়া ভাষায় লিখেছিলাম অসমীয়া পাণ্ডুলিপিটি পড়ে বরপেটা জেলার সহযোগী মিশন সমন্বয়ক মান্যবর সাদুল্যা খান সাহেব ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করেদিগ্বীজয়ী বাবর শীর্ষক একটি টোকা লিখে দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করার জন্য তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল

বাংলা ভাষায় উপন্যাসটি অনুবাদ করার জন্য বন্ধুবর নুরুল হক (গরেমারি পাথার), ভ্রাতৃপ্রতীম নূর হোসেইন বিশ্ববন্ধু দেওয়ান এবং ভাগ্নে বদর উদ্দিন আহমেদ আমাকে উৎসাহিত করার জন্য তাঁদের প্রতি আমার স্নেহাশীষ রইল উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি পড়ে ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে দেওয়ার জন্য ভ্রাতৃপ্রতীম বাহাদুর আলীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম আমি প্রকৃতার্থে অসমীয়া ভাষায় লেখা-পড়া শিখেছিসেজন্য বাংলা ভাষার জ্ঞান আমার খুবই সীমিত তাই উপন্যাসটি অনুবাদ করার সময়ে এবংড় ব্যবহার নিয়ে খুবই সমস্যায়  পড়তে হয়েছে ক্ষেত্রে হয়তো অনেক ভুল-ত্রুটি রয়ে গেছে ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট চরিত্রকে উপন্যাসের রূপ দেওয়াটা ধৃষ্টতা যদিও আমার আবেগ অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রেখে সদাশয় পাঠক আমার সেই ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন বলে আশা রইল

সদাশয় পাঠক উপন্যাসটিতে রয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন করে উপন্যাসটি গ্রহণ করলে এবং পাঠকের হৃদয়ে যৎকিঞ্চিত ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হলে আমার শ্রম সার্থক হবে

                                                                                                                                                                                                                                                                     বিনীত

  আবুল হোসেইন

                                    সাকিন- যতিগাঁও       

                                    ডাকঘর- জাহোরপাম

                               জেলা- বরপেটা, আসাম (ভারত)

                                  তাং- ২৬ জানুয়ারী/২০২২

                                                                                                                                                                                                       

দিগ্বিজয়ী বাবর                           

দ্বিপ্রহর প্রচন্ড রোদ সূর্য্যের উত্তাপের ফলে বায়ুর গতি স্তব্ধপ্রায় নিঝুম মেরে ছিলো রৌদ্রস্নাত বৃক্ষে পল্লব অসহ্য গরম থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য পিঠে ঠোঁট গুজে পক্ষীকুল ঝিমুচ্ছিল চতুর্দিকে বিরাজ করছিল অসহ্যকর ক্লান্তির পরিবেশ      

রমজান মাস মুসলমানদের রোজা (উপবাসব্রত) পালনের মাস রোজাদার মুসলমানরা অসহ্য গরমে শ্রান্ত-ক্লান্ত ভোক-পিপাসায় কাতর অবসন্নভাবে বিছানায় গা এলিয়ে সবাই অধীরভাবে সূর্যাস্তের জন্য অপেক্ষা করছিলআন্দিজানের কোলাহল মুখর রাজপ্রাসাদ নীরব-নিস্তব্ধ প্রাসাদের বাসিন্দারা শ্রান্ত-ক্লান্ত কেউ কেউ গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন; কেউ কেউ আবার অবসন্নভাবে বিছানায় গা এলিয়ে সময় কাটাতে ব্যস্ত

শাহজাদা বাবর অবসন্নভাবে বিছানায় গা এলিয়ে ছিলেন; তাঁর চোখে ঘুম নেই নৈঃশব্দের অলস স্পর্শে তাঁর অনুভূতিতে কবিতার ছন্দ জাগিয়ে তুলছিল ফলে তিনি কবিতা রচনার কল্পনায় বিভোর হয়ে ছিলেন হৃদয়ে ছন্দায়িত আবেগ, কবিতার ছন্দে লিপিবদ্ধ করতে তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন; কিন্তু অনেক সময় চেষ্টা করেও তিনি একটি পংক্তিও লেখতে সক্ষম হলেন না অবশেষে হতাশ হয়ে তিনি ফারগানা বিদ্রোহীদের বিষয়ে লেখার জন্য মনোনিবেশ করলেন

বাবর গভীরভাবে লেখায় ব্যস্ত ছিলেন এমন সময় প্রচন্ড গতিতে একটি ঘোড়া ছোটে এসে হঠাৎ প্রাসাদের সন্মুখে থেমে গেল

    বাবর লেখায় এতই ব্যস্ত ছিলেন যে, ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পরে সেই শব্দ তাঁর কাণে পৌঁছল নৈঃশব্দের মাঝে হঠাৎ শব্দের সঞ্চার হওয়ায় তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন তিনি মনের মাঝে গোনা-গাঁথা করতে লাগলেন যে, কে আসতে পারে এই ভরা দুপুরে!

কিন্তু বাবর অধিক সময় চিন্তা করার সুযোগ পেলেন না হঠাৎ সমবেত কন্ঠের কোলাহল মুখর ক্রন্দনের শব্দ তাঁর কর্ণগোচর হলো

ক্রন্দনের শব্দে অশুভ বার্তার ইংগিত প্রচ্ছন্ন ছিলো ফলে তিনি সচকিত এবং উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন কি হলো? কে ক্রন্দন করছে এই ভরা দুপুরে? কেন ক্রন্দন করছে? এরকম অনেক প্রশ্ন তাঁর মনের মাঝে উদয় হলো

কোলাহলের শব্দ এহসান দৌলত বেগমের কক্ষ থেকে ভেসে আসছে বলে অনুমান হলো বাবরের

কোলাহলের শব্দ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি হচ্ছিল কাগজ-কলম ফেলে বাবর দৌঁড়ে এহসান দৌলত বেগমের কক্ষে এলেন

    কক্ষের দুয়ার সম্পূর্ণরূপে খোলা ছিলো মহিলাদের মাথায় ওড়না ছিল না সবাই এলোমেলো হয়ে উন্মাদের মতো কপাল চাপরিয়ে রোদন করছিল এবং মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতেছিলো শোকপ্রকাশক শব্দ

এহসান দৌলত বেগমের হাতে একটি চিঠি

এহসান দৌলত বেগম বাবরের মাতামহী উৎকণ্ঠিতভাবে তিনি একটি চিঠি পড়ছিলেন তাঁর চোখে ভরা পুকুরের মতো জল টলমল করছিলো চোখের জলের কারণে তাঁ জন্য চিঠি পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল দুই এক ফোঁটা করে অশ্রু চিঠির মাঝেও গড়িয়ে পড়ছিলো

রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছে তিনি চিঠিটা মনযোগ সহকারে পড়ছিলেন

চিঠিটাই যে উৎকন্ঠার কারণ সে কথা উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হল না চিঠিটাই নিশ্চয় কোনো অশুভবার্তা বহন করে এনেছে, যার জন্য এই সমবেত বিলাপ! বাবর মনে মনে ভাবলেন

বাবর উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন উদ্বেগ-কাতর কণ্ঠে তিনি এহসান দৌলত বেগমকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হলো, নানীজান? চিঠিতে কি লেখা আছে? কোত্থেকে এসেছে চিঠি?

এহাসান দৌলত বেগম মুখ দিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করলেন না কম্পিত হাতে অলসভাবে তিনি চিঠিটা বাবরের দিকে বাড়িয়ে দিলেন

চিলের মতো ছোঁ মেরে বাবর চিঠিটা মাতামহীর হাত থেকে নিজের হাতে নিলেন

চিঠির বর্ণমালা দেখে বাবর চিঠিটা তাঁর মাতা কুলতুগ নিগার বেগমের বলে চিনতে পারলেন

    উদ্গ্রীবভাবে বাবর চিঠির ওপড়ে দৃষ্টি ফেরাতে লাগলেন মাতামহীর অশ্রু চিঠির ওপড় গড়িয়ে পড়ে চিঠির কিছু কিছু অংশ ইতিমধ্যে কিছু অস্পষ্ট হয়ে পড়ছিল যদিও চিঠিটা পড়তে তাঁর বিশেষ অসুবিধা হল না

চিঠিটা পড়ে বাবরের অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠল চোখে-মুখে ফুটে উঠল তীব্র ব্যথার অভিব্যক্তি

চিঠিটায় লিখা ছিলো বাবরের পিতৃ মির্জা ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ

প্রতিদিনের মতো ওমর শেখ সেহেরি খেয়ে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন সভাসদবৃন্দ পূর্ব থেকেই উৎকন্ঠিতভাবে তাঁর অপেক্ষায় দরবার কক্ষে অপেক্ষমাণ ছিলেন

ওমর শেখ দরবার কক্ষে উপস্থিত হয়ে সভাসদদের উদ্দেশ্য করে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- দূত কোত্থেকে এসেছে?

ইসফারা থেকে, জাহাপনা উজির--আজম বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন

ইসফারার সংবাদ কি? ওমর শেখের কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা

জাহাপনা, আমি অভয় চাচ্ছি উজির--আজম বিষণ্ণ হতাশ কণ্ঠে আমতা-আমতা করে অভয় চাইলেন

এর অর্থ ইসফারাতেও শত্রুর দখল প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে! ওমর শেখ শংকিত কণ্ঠে অস্পষ্টভাবে কথাটা বলেই উজির--আজম-এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- মার্গিলানের সংবাদ কি?

উজির--আজম হতাশ কণ্ঠে বললেন- মার্গিলানের সংবাদের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি, জাহাপনা সংবাদবাহক এখন পর্যন্ত এসে পৌঁছোয়নি

উত্তেজনায় ওমর শেখের রক্তের গতি তীব্র হয়ে উঠল তিনি যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বললেন- মার্গিলানেও আমাদের পরাজয় হবে নাকি? আন্দিজানও তাহলে সংকটমুক্ত নয় সংবাদ বাহক এখন পর্যন্ত আসেনি কেন? কোনো বিপদে পড়ছে, না বন্দী হয়েছে? স্বয়ং মার্গিলানবাসীরা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি তো?

জাহাপনা, যদি দ্বিতীয় একজন দূত পাঠানোর অনুমতি দেন তো......উজির--আজম নির্বোধ বিষণ্ন চোখে ওমর শেখের দিকে তাকিয়ে বাক্যটি সম্পূর্ণ না করে মাথা নত করে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন

ওমর শেখ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- এর পরে সেই দূতের জন্যও অপেক্ষা করতে হবে না-কি? আর কত অপেক্ষা করব? অপেক্ষা করে করে আমার ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করেছে

ওমর শেখকে উত্তেজিত দেখে উজির--আজমের হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হলো ক্ষমা নিবেদনের ভংগীতে তিনি কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন

ওমর শেখের উৎকন্ঠার কারণ হলো, সমরকন্দের বাদশাহ আহম্মদ সুলতান আখসি আক্রমণের জন্য কুবাসায় নদীর সেপাড়ে অবস্থিত কুবা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে ফলে, যে কোনো মুহূর্তে আখসির উপরে আক্রমণ সংঘটিত হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছে

ওমর শেখ সভাসদবৃন্দের উদ্দেশ্যে বললেন- আখসির উপরে আক্রমণ সংঘটিত হওয়াটা নিশ্চিত ফলে আমরা আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করার সাথে সাথে কিছু জরুরিকালীন ব্যবস্থাও গ্রহণ করা প্রয়োজন দূর্গের ভেতর ছয় মাস চলার উপযোগী রসদ-পত্র মজুত করার ব্যবস্থা করা হোক আমাদের দূর্গটি উঁচো পাহাড়ের উপরে অবস্থিত সেখানে জলের সুব্যবস্থা নেই সেজন্য সেখানে জলের সুব্যবস্থা করতে হবে এভাবে বলেই তিনি সভাসদবৃন্দের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন ত্রিশ বছরের কর্মঠ যুবক কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন- কাশিম বেগ....

কাশিম বেগ স্প্রিঙের মতো ছিটকে দ্রুত দাঁড়িয়ে বললেন- জাহাপনা

ওমর শেখ আদেশের সুরে বললেন- তুমি পাথর দিয়ে জলের চৌবাচ্চা নির্মাণ করে ভিস্তিয়ালার দ্বারা চৌবাচ্চাটা জল দিয়ে পূর্ণ করার ব্যবস্থা কর এই দায়িত্ব আমি সম্পূর্ণরূপে তোমার ওপর ন্যস্ত করলাম এভাবে বলেই তিনি অন্যান্য পাত্র-মিত্রের ওপরেও বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব অর্পণ করলেন

ওমর শেখের রাগান্বিত মূর্তি দেখে সভাসদবৃন্দ সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল বাদশাহের হুকুম পালনের জন্য সবাই তৎক্ষণাৎ দরবার কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেল

কয়েকজন দেহরক্ষী নিয়ে ওমর শেখ সির দরিয়ার পাড়ে অবস্থিত কবুতর পাখির সংগ্রহালয়ের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে এলেন

সংগ্রহালয় থেকে একটি কবুতর হাতে নিয়ে তিনি কাঠের সিরি বেয়ে ছাদের ওপরে উঠে এলেন কবুতরের গা-মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি স্নেহাৰ্দ্ধ কণ্ঠে বললেন- যাও, অতি সত্বর মার্গিলান এবং কোকানের সংবাদ নিয়ে ফিরে আসগে'

এভাবে বলেই তিনি কবুতরটি উড়িয়ে দিলেন মুক্তির আনন্দে কবুতরটি দুই পাক ঘূরে মার্গিলান অভিমুখে উড়ে গেলেন

কবুতরটি উড়িয়ে দেওয়ার সময়েই ঘটল ঘটনাটি-

কবুতরটি উড়িয়ে দেওয়ার সময় সামান্য ঝাঁকানির সৃষ্টি হয়েছিলো সেই ঝাঁকানির ফলেই ছাদটি হঠাৎ মড়মড় শব্দ করে ভেঙে পড়ল এবং বাদশাহ ওমর শেখ ভাঙা ইট-পাটকেল, কাঠের টুকরার সাথে ছাদ থেকে নিচের দিকে পড়ে গেলেন

সংগ্রহালয়টা নদীর পাড়ে অবস্থিত ছিল ফলে তিনি ভাঙা ইট-পাটকেল, কাঠের টুকরার সাথে নদীতে পড়ে গেলেন প্রচন্ড জলের স্রোত নিমিষে তাঁকে নিজের বুকে টেনে নিলেন ফলে তাঁর সলিল সমাধি হলো এরকমই ছিলো চিঠির মূল বক্তব্য

পিতৃর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে বাবর মর্মান্তিক আঘাত পেলেন যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হল তাঁর মাথায় বিষাদ বেদনায় তাঁর মুখমন্ডল মলিন হয়ে গেল পত্রবাহক কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন

অবিশ্রান্তভাবে ত্রিশ ক্রোশ ঘোড়া ছুটিয়ে এসে কাশিম বেগ শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন দেয়ালের আশ্রয় নিয়ে তিনি কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিলেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাঁর সর্বশরীর ধূলির সরোবরে পরিণত হয়েছিলো

বাবরের বিষাদ গম্ভীর অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তিনি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- হুজুর আলী আহাদ, আল্লাহ আপনাকে শোক সহ্য করার শক্তি দিন এখন আল্লাহই আমাদের একমাত্র ভরসা- একমাত্র সহায় তিন দিক থেকে শত্রু সেনা বাজ পাখির মতো আমাদের ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে আসছে এই মুহূর্তে আসন্ন বিপদের মোকাবিলা করার জন্য আপনার বিশ্বস্ত সভাসদদের দূর্গে একত্রিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, আলী আহাদ

এহসান দৌলত বেগমও এই মর্মান্তিক খবর পেয়ে উৎকণ্ঠিত মর্মাহত হয়ে পড়ছিলেন ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সংযত করে নিলেন তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুভব করতে পেড়েছিলেন যে, বর্তমান এক সংকটময় দুঃসময় উপস্থিত রোদন করে সময় নষ্ট করার সময় এটা নয়

তিনি কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- বেগ সাহেব, আপনার বিশ্বস্ততার জন্য আপনাকে শুভচ্ছা জ্ঞাপন করছি এখন এখানে থাকাটা উচিত হবে না আমরা সবাই এই সংকটময় মুহূর্তে দূর্গের ভেতরে আশ্রয় গ্রহণ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে

এহসান দৌলত বেগম-এর পরামর্শ অনুসারে কাশিম বেগ বাবরকে নিয়ে দূর্গের ভেতরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি চালালেন কিন্তু কাশিম বেগ প্রস্তুত হওয়ার আগেই বাবার কাউকে কিছু না বলেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন

কক্ষের বাইরে এসেই তিনি আস্তাবল- এসে একটি অশ্ব বের করে ঝাঁপ মেরে অশ্বের পিঠে চড়ে বসলেন অশ্বের পিঠে বসে তিনি ক্লান্ত নির্বোধ দৃষ্টি প্রসারিত করে চতুর্দিক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন

ফল-ফুল ভরা বৃক্ষ, ইঁট পাথর দিয়ে নির্মিত জলের কুণ্ড দেখে তিনি মর্মাহত হয়ে পড়লেন

এগুলি তাঁর পিতৃ ওমর শ্বেখ নির্মাণ করিয়েছিলেন তিনি আর কোনোদিন এগুলির পাশে আসবেন না

নাসপতি গাছের দিকে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হলো গাছটি ওমর শেখ নিজ হাতে রোপন করেছিলেন গাছটিতে ডাল ভরে ফল-ফুল লেগেছে

ফলের ভারে গাছটি নুয়ে পড়ছে কিছুদিনের ভেতরেই ফলগুলি পাকবে, কিন্তু গাছটি রোপন করা লোকটি আজ এই সংসারে নেই! আর কোনোদিন তিনি এই ফলগুলির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন না কথাগুলি ভাবতেই বাবর-এর বুকে প্রচন্ড শোকে আঘাত করলো

পরক্ষণেই বুকের বেদনাগুলি দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয়ে এলো

কোনোমতে নিজেকে সংযত করে তিনি শোকদগ্ধ হৃদয়ে ঘোড়া ছোটালেন

বাবর এসে পাকা রাস্তায় উঠলেন ঘোড়ার ক্ষুরের চাপে পাকা রাস্তায় প্রাণের সঞ্চার হলো খট্ খটালপ্ শব্দে রাস্তা মুখর হয়ে উঠলো

বাবর-এর মানসপটে আবার পিতৃর স্মৃতি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এই রাস্তা দিয়ে আব্বা কতদিন ঘোড়া ছুটিয়ে গেছেন ঘোড়ার ক্ষুরের খট্ খটালপ্ ধ্বনির শব্দ তরংগে তখনও রাস্তাটা এরকমই মুখর হয়ে উঠতো কিন্তু কোনোদিন তিনি আর এই রাস্তায় ঘোড়া ছুটাতে আসবেন না বিষাদ বেদনায় বাবরের চোখ দু'টি ভরা পুকুরের মতো জলে টলমল করতে লাগলো চোখের জল মুছে মুছে তিনি দূর্গের দিকে অগ্রসর হলেন

বাবর দূর্গের মুখ্যদ্বারে পৌঁছোনোর আগেই পাঁচজন অশ্বারোহী সৈনিক তাঁর দিকে এগিয়ে আসা তিনি লক্ষ্য করলেন

দলের আগে আগে আসছিলো ছোট চোখ এবং মংগোলীয় ঠনের শেরিম তাগায়

শেরিম তাগায় বাবরের পাশে এসে বাবরের চোখে জল প্রত্যক্ষ করেৎকণ্ঠিতভাবে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলো ঘোড়া দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ মেরে নেমে পড়লেন তাঁর চোখে জল ছিল না যদিও এক প্রচ্ছন্ন বিষাদ বেদনা প্রকট হয়ে ছিলো তাঁর মুখমণ্ডলে

শেরিম তাগায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেদনার্ত কণ্ঠে বললেন- আমরা যে আমাদের নিরাপদ আশ্রয় থেকে এতিম হয়ে গেলাম এই কথা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে, শাহজাদা উঃ, কী নির্দয় এই পৃথিবী!

কাশিম বেগ ইতিমধ্যে সেখানে এসে পৌঁছেছিলেন শেরিম তাগায়র কথা শুনে তিনি বিস্মিত কণ্ঠে বললেন- আপনি এই দুঃসংবাদ কোথা থেকে শুনলেন? আমি জানা মতে, এই দুঃসংবাদ নিয়ে আমার আগে কেউ আসেনি

প্রকৃতপক্ষে কাশিম বেগের ধারণা সত্য নয় তিনি আসার আগেই ফাতিমা সুলতানার নির্দেশে আহম্মদ তনয়াল নামের একজন বেগ সংবাদটা নিয়ে আন্দিজান এসে পৌঁছেছে

বাদশাহ মির্জা ওমর শেখের তিন বেগম কুতলুগ নিগার বেগম, ফাতিমা সুলতানা এবং কারাকোজ বেগম

    কুতলুগ নিগার বেগমের দুই সন্তান খানজাদা বেগম এবং মির্জা জহিরুদ্দিন বাবর ফাতিমা সুলতানার একমাত্র পুত্র মির্জা জাহাঙ্গীর কারাকোজ বেগমের কোন সন্তান নেই তিনজন বেগমই ওমর শেখের মৃত্যুর সময় আখসিতে ওমর শেখের সাথেই ছিলেন

মির্জা জহিরুদ্দিন বাবর বয়সে মির্জা জাহাঙ্গীরেব চেয়ে বড় সেই হিসেবে মির্জা বাবরই ছিলেন সিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকারী

কিন্তু ফাতিমা সুলতানা মনে-প্রাণে মির্জা জাহাঙ্গীর বাদশাহ হওয়াটা কামনা করছিলেন সেজন্য মির্জা ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে তিনি মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেন এবং অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য আহম্মদ তনয়ালের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়েন

আহম্মদ তনয়াল নিষ্ঠুর এবং লোভী হিসাবে সবার কাছে পরিচিত ছিলো সেজন্য তাঁর দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ওমর শেখ তাঁকে দ্বিতীয় শ্রেণীর বেগের মর্যদা প্রদান করে রেখেছিলেন ফলে আহম্মদ তনয়াল পেটে পেটে বাদশাহ ওমর শেখের উপরে অসন্তুষ্ট ছিলো

ফাতিমা সুলতানা আহম্মদ তনয়ালের এই অসন্তুষ্টির বিষয়ে জ্ঞাত ছিলেন সেজন্য তিনি অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য আহম্মদ তনয়ালের সাহায্য নেওয়ার কথা ভেবে তনয়ালকে ডেকে এনে তাঁর অভিপ্রায়ের কথা বুঝিয়ে বলে এবং মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাঁকে উপযুক্ত পুরস্কার দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন

তনয়াল ভাবলো, উপযুক্ত পুরস্কারের অর্থ হলো, তিনি তাঁর কার্যে সফল হতে পারলে উজির--আজমের পদ পাওয়াটা নিশ্চিত

নাবালক বাদশাহের উজির--আজম হওয়া মানে প্রায় বাদশাহ হওয়ার মতোই কথা হবে সেজন্য তিনি ফাতিমা সুলতানার পরামর্শ অনুসারে একজন মাত্র সৈনিক সাথে নিয়ে কাউকে না জানিয়ে আখসি থেকে আন্দিজান রওনা হয়ে কাশিম বেগের আগেই আন্দিজান এসে পৌঁছেছিলো

ইয়াকুব বেগ আন্দিজানের বেগদের মাঝে সবচেয়ে লোভী এবং ক্ষমতাশলী বুদ্ধিতে বৃহস্পতি এবং কূটনীতিতে সিদ্ধহস্ত সেজন্য আহম্মদ তনয়াল মির্জা বাবরকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ইয়াকুব বেগের সহায় নেওয়ার কথা ভাবল এবং ভাবামতেই ইয়াকুব বেগের কাছে সকল বৃত্তান্ত ভেঙে বলে তাঁর সহায় প্রার্থনা করলো

ইয়াকুব বেগ সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে কূটকৌশলের আশ্রয় গ্ৰহণ করার কথা ভাবলো সে ভাবলো, বাবরকে কৌশল করে আন্দিজান থেকে সরাতে পারলেই অতি সহজে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে সেজন্য সে বাবরকে আন্দিজান থেকে সরাতে একটি কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবলো কৌশলটা সফল করার জন্য সে শেরিম তাগায়কে দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলো

শেরিম তাগায় বাবরের মামা সে তাৎক্ষণিকভাবে ভয় পাওয়া প্রকৃতির লোক ছিলো তার এই দুর্বলতার বিষয়ে সবাই ভালোভাবে অবগত ছিলো ইয়াকুব বেগও জানতেন কথাটি সেজন্য ইয়াকুব বেগ শেরিম তাগায়কে ডেকে এনে বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ দিয়ে বললো, যে আন্দিজানের বেগবৃন্দ বাবরকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে যারজন্য বাবর দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করলে তাঁর জীবন বিপদাপন্ন হতে পারে

খবরটা শুনে, ইয়াকুব বেগ ভাবামতেই শেরিম তাগায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে এবং ভাগ্নেকে আসন্ন সংকট থেকে মুক্ত করার জন্য বাবরের কাছে দৌড়ে এসেছে

শেরিম তাগায়ও ওমর শেখের দরবারে উচ্চপদ থেকে বঞ্চিত ছিলো বাবরকে আসন্ন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারলে বাবরের দরবারে উচ্চপদ লাভ করাটা নিশ্চিত ভেবে সে নিজের মহত্ত্ব প্রকাশ করে বাবরের প্রিয়ভাজন হওয়ার কথা ভাবলো ভাবামতেই সে ইয়াকুব বেগের কাছ থেকে শুনা কাহিনীর আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রতিপত্তি মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য এক কল্পিত কাহিনীর আশ্রয় নিলো

সে রহস্যময় কল্পিত কাহিনী বলে গেলো- আল্লাহর মর্জি কে বুঝতে পারে! এক অভিনব উপায়ে আমি খবরটা পেয়ে গেলাম আমার একটি কবুতর, উড়তে উড়তে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে পড়লো কিছু সময় পরে উড়ে যাওয়া কবুতরটা আবার আমার হাতে এসে বসলোদেখলাম কবুতরটার ঠেঙে এক টুকরো কাগজ বাঁধা বিস্ময়াভিভূত হয়ে আমি কাগজ টুকরো খুলে পড়ে দেখলাম কাগজ টুকরোয় লেখা কথাগুলো পড়ে আমি হতবুদ্ধি এবং স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম কাগজ টুকরোতে লিখা ছিলো এক অতি মর্মান্তিক এবং আফসোসজনক সংবাদ! বাদশাহের মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদ কে লিখেছে জানি না, হয়তো কোনো ফিরিস্তার কাজ হবে সেটা! শেরিম তাগায় কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে বাবরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য বাবরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো কিন্তু বাবরের ভাবলেশ শূন্য নির্বিকার মুখমন্ডল প্রত্যক্ষ করে সে নিরাশ হলো অল্প সময় পরে সে নিজেকে সংযত করে বাবরের কাঁধে হাত রেখে কানের কাছে মুখ এনে ইয়াকুব বেগের কাছে শুনা কাহিনীটি আবার রহস্যময় ভঙ্গীতে ব্যক্ত করলো- শাহজাদা, আপনি দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করবেন না সেখানে আপনার জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে আপনাকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করার জন্য বেগবৃন্দ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়ছে সেজন্য দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করলে আপনার বিপদ হতে পারে!

কথাটা কাশিম বেগও শুনলেন তিনি কিছু পরিমাণে শংকিতও হলেন কথাটা শুনে তবে, পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি বাবরকে অভয় প্রদানের জন্য বললেন-শাহজাদা, দুর্যোগ আসার আগেই আমরা কাছিমের মতো হাতপা লুকিয়ে বসে থাকাটা কাপুরুষোচিত কাজ হবে আপনি যতদূর সম্ভব তারাতারি বেগদের একত্রিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত হবে এই মুহূর্তে

শেরিম তাগায় ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাবরের সাথে কথা বলছিলো কিন্তু মাটিতে দাঁড়িয়ে কাশিম বেগের সাথে কথা বলাটা উচিত হবে না ভেবে সে লাফ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে দৃঢ়কণ্ঠে বললো- বেগ সাহেব, দূর্গের ভেতরে কি হচ্ছে, আপনি এখান থেকে কিছুই বুঝতে পারবেন না আমি জানি দূর্গের ভেতরের খবর এভাবে বলে সে বাবরকে উদ্দেশ্য করে বললো- শাহজাদা, আপনি বেগ সাহেবের কথায় কর্ণপাত করবেন না আমাদের জন্য আরও দুঃসংবাদ রয়েছে আপনার বিশ্বাসী সেনানায়করা খোজন্দ এবং মার্গিলানও শত্রুর হাতে ন্যস্ত করছে

মার্গিলানও!অস্বস্তিকর ব্যথার অনভূতিতে বাবরের মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন করে ফেললো তিনি কম্পিত হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- কখন?

বাবরকে উৎকণ্ঠিত দেখে শেরিম তাগায় উৎসাহিত হয়ে উঠলো বললো- এইমাত্র খবর এসেছে ফরিঙের মতো শত্রু সেনারা দেশ ছেয়ে ফেলেছে কুবার দিকেও শত্রু সেনা এগিয়ে আসছে কুবার পরেই তাদের লক্ষ্য হবে আন্দিজান শেরিম তাগায় কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে তিরস্কারের সুরে বললো- আপনি আন্দিজানের সাথে শাহজাদা বাবরকেও শত্রুর হস্তগত করতে চাইছেন নাকি? আমি জীবিত থাকতে এই কাজ করা সম্ভব হবে না আপনা পক্ষে এই কথা আপনি নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন

শেরিম তাগায়র কথার সুর এবং ভঙ্গী দেখে কাশিম বেগের মুখমণ্ডলে সন্দেহের কালো ছাঁয়া পড়লো সে তো এরকম কোনো খবরই অবগত হোন নি এখন পর্যন্ত! শেরিম তাগায় বলা কথাগুলো কতদূর সত্যি! বাবরকে আতংকিত করার জন্য উড়ো সংবাদ প্রচার করেনি তো শেরিম তাগায়?

সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য কাশিম বেগ শেরিম তাগায়কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন-আপনি এসব সংবাদ কোথায় পেলেন?

কাশিম বেগের অন্তরেও উৎকন্ঠা সঞ্চারিত হওয়া দেখে শেরিম তাগায় দুগুণে উৎসাহিত হয়ে উঠলো কিন্তু কাশিম বেগের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা উচিত হবে না ভেবে সে ভ্রূ কুঞ্চিত করে কাশিম বেগের দিকে অবজ্ঞা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বাবরের কাছে এসে অশ্ববল্গা টেনে ধরে বললো- আমি আপনার মামা, শাহজাদা আপনার ক্ষতি মানে আমারও ক্ষতি আপনাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনি আমাকে অনুমতি দিন, শাহজাদা

                    

শেরিম তাগায় কী করতে চাইছে, এই বিষয়ে বাবরের কিছুই বোধগম্য হলো না তবুও, দুর্যোগের সময়ে শোকাকুল হৃদয় নিয়ে দূর্গের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকার চেয়ে বাইরের মুক্ত প্রান্তরে থাকাটা উত্তম হবে বলে তাঁর উপলব্ধি হলো সেজন্য শেরিম তাগায়র কথার বিরোধিতা না করে তিনি নির্বিকারভাবে বললেন- আচ্ছা, দূর্গের বাইরে থেকেই আমি সেনানায়কদের বিশ্বস্ততার বিষয়ে অনুসন্ধান করবো চলুন, আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছেন?

কাশিম বেগ বাবরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে বললেন- শাহজাদা, আপনার মা কিন্তু আপনাক অন্য কিছু করতে বলে পাঠিয়েছেন

শেরিম তাগায় বিরক্ত হলো সে জলন্ত দৃষ্টিতে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে তিরস্কারের সুরে বললো- কুতলুগ নিগার বেগম সেনাধ্যক্ষ নয়, বেগ সাহেব! এই দুর্যোগের সময়ে একজন মেয়ে মানুষের কথা শুনে শাহজাদাকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে চাইছেন নাকি? আমি বেঁচে থাকতে এটা সম্ভব হবে না ভাবে বলেই শেরিম তাগায় বাবরের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলো

কাশিম বেগও কম ! তিনি বাবরের কাছে এসে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন- আপনার মাতৃ বাদশাহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাধা করেই আন্দিজান অভিমুখে রওনা হবে কালকেই এসে আন্দিজান পৌঁছেবেন হয়তো! আপনার নানীজানও আপনি দূর্গে থাকাটাকে কামনা করছেন আপনি দূর্গে না থেকে অন্য কোথাও থাকলে প্রয়োজনের সময়ে আপনাকে কোথায় খুঁজতে যাবে, শাহজাদা?

বাবর সচকিত হয়ে উঠলেন তিনি শেরিম তাগয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন-তাহলে আপনি এখন আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন?

    শেরিম তাগা বাবরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো- এখন আমরা আলতাউর দিকে যাব পরে সেখান থেকে উশ এবং উশ থেকে উজগন্তের দিকে যাব

কাশিম বেগের কাছে এই রাস্তার কথা গোপন করার ইচ্ছা ছিল না বাবরেরসেজন্য তিনি কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আমরা উশের রাস্তায় কোথাও মিলিত হবো আপনি আম্মীজানকে এই কথা জানিয়ে দিবেন

আচ্ছা, এখন আমি প্রথমে দূর্গে গিয়ে সেনা নায়কদের সাথে মিলিত হবো তারপরে অন্য কথা চিন্তা করব কাশিম বেগ নিজের মনোভাব ব্যক্ত করলেন

বাবর কাশিম বেগকে পরামর্শ দিলেন- আপনি এই দুর্যোগের বিষয়ে প্রথমে ওস্তাদ খাজা আবদুল্যার সাথে আলোচনা করাটা অধিক সমীচিন হবে আপনি দূর্গে গিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করে তাঁর পরামর্শ অনুসারে পরবর্তী কার্যপন্থা গ্রহণ করবেন

কাশিম বেগকে এরূপ উপদেশ দিয়ে বাবর পঞ্চাশজন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে শেরিম তাগায়র সাথে উশের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন

যথা আজ্ঞা বলে কাশিম বেগ দূর্গের মুখ্যদ্বারের দিকে ঘোড়া ছোটালেন

                                                                                            *   *   *

ইয়াকুব বেগের মুখে বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ শুনে শেরিম তাগায় দূর্গের বাইরে বেরিয়ে আসার পরে শেরিম তাগায়র গতিবিধির উপরে চোখ রাখার জন্য ইয়াকুব বেগ স্বাস্থ্যবান সুগঠিত একজন সেপাই নিয়োগ করেছিলো সেপাইটি দূর্গের মুখ্যদ্বারের ওপরে অবস্থান নিয়ে শেরিম তাগায়র প্রতিটা গতিবিধির উপর অতি গুরুত্ব সহকারে চোখ রাখছিলো শেরিম তাগায় বাবরের সাথে মিলিত হওয়া থেকে শুরু করে বাবরকে নিয়ে শেরিম তাগায় দূর্গের বাইরে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা গতিবিধি সে নিরীক্ষণ করে যাচ্ছিল

শেরিম তাগায়র সাথে বাবর দূর্গের বাইরে চলে যাওয়ার পরে কাশিম বেগকে দূর্গের দিকে এগিয়ে আসা দেখে সেপাইটি দ্রুত দূর্গ শিখর থেকে নেমে ইয়াকুব বেগকে খবরটা দেওয়ার জন্য দৌড়ে এলো

ইয়াকুব বেগ এবং আহম্মদ তনয়াল উৎকন্ঠিতভাবে সেপাইটির জন্য অপেক্ষা করছিলো তাদের চোখে-মুখে বিরাজ করছিলো উৎকন্ঠা এবং দৃষ্টিতে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছিলো হিংস্ৰ কূটিল উদ্বেগ কাতরতা আসন্ন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য সাপের মতো বক্রিল পথে বয়ে চলছিলো তাদের চিন্তার স্রোত

আহম্মদ তনয়ালের হাতে বনজ পল্লবে নির্মিত একটিকিমীজ(ঘোড়ার দুধের সরবত)-এর পিয়ালা সে পিয়ালা থেকে এক চুমুক কিমীজ খেয়ে বামহাতের পৃষ্ঠ দিয়ে মুখ মুছে বলল- আজকের রোজা ভঙ্গের জন্য আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন অবিশ্রান্তভাবে ত্রিশ ক্রোশ(তিন মাইলে এক ক্রোশ)ঘোড়া ছুটিয়ে এসে অণ্ঠকন্ঠ শুকিয়ে একেবারে চৌচির হয়ে গিয়েছিলো কোনোমতে আমি ঘোড়ার পিঠে বসে আসতে পেরেছি

ইয়াকুব বেগ পাশে বসে তনয়ালের কার্যকলাপ লক্ষ্য করছিলো সে নির্লজের মতো হেসে বলল- আপনার আজকের রোজা ভঙ্গের গোনাহ(পাপ) নিশ্চয় আল্লাহ মার্জনা করবেন আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু আপনি আজ একটি মহৎ কাজের বোজা বহন করে এসেছেন আপনার সৌভাগ্য যদি আপনার সাথে প্রতাড়না না করে এবং মির্জা জাহাঙ্গীর যদি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে আপনিই হবেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি ভাগ্য প্রসন্ন হলে আপনি উজির--আজমও হয়ে যেতে পারেন

আহম্মদ তনয়াল নিজেও তার এই ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করে আনন্দে বিভোর হয়েছিলো সে অর্থপূর্ণ হাসি হেসে বলল- এই কার্যে সফল হতে হলে আপনার মতো মহৎ ব্যক্তির সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন হবে আমা

ইয়াকুব বেগ নিজেও এই কথা জানে কিন্তু তার একটাই মাত্র দুঃশ্চিন্তা, সে যে তনয়ালকে এই সংকটময় মুহূর্তে সহায় করছে, উজির- আজম হয়ে তনয়াল এই কথা ভুলে যাবে না তো! সেজন্য সে মুখে কোনো কথা না বলে শুধু অর্থপূর্ণভাবে মিমিটিয়ে হাসলো

ইয়াকুব বেগের সন্মুখভাগের দুটি দাঁত ভগ্ন সেজন্য মনের দুঃশ্চিন্তা ভগ্ন দাঁতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে তার হাসি হাস্যস্পদ করে তুললো

ইয়াকুব বেগের এই মনোভাবের কথা তানয়ালের চোখেও ধরা পড়লো সেজন্য সে সজাগ হয়ে উঠলো ইয়াকুব বেগকে আশ্বস্ত করার জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ভঙ্গীতে সে বললো- বেগ সাহেব, আপনি এবং আমি উভয়ে মোগল এখন ফারগানায়বরলস (তুর্কি ভাষী একটি গোষ্ঠী)দের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করার সময় সমাগত এখন মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আমাদের পালা পড়েছে মোগলদের মাঝে আপনাকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই আল্লাহর কৃপায় যদি আমি উজির--আজম হতে পারি, তাহলে আপনি- হবেন আমার ওস্তাদ এবং একমাত্র বন্ধু

ইয়াকুব বেগ আত্মসন্তুষ্টিতে নিজের দাড়িতে হাত ফিরিয়ে বললো- আল্লাহই যেন এরূপই করেন

আহম্মদ তনয়াল এবং ইয়াকুব বেগ এরূপ মিষ্টি স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতেই সেপাইটি দৌড়ে এসে দুয়ার মুখে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করে বললো- মিষ্টান্ন খাওয়ান, হুজুর! শাহজাদা বাবর দূর্গের ভেতরে না এসে ফিরে গেছেন

শেরিম তাগায়-এর সাথে নাকি? তনয়াল উৎকন্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলো

সেপাইটি সন্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললো- হ্যাঁ, হুজুর

আহম্মদ তনয়ালের জন্য খবরটি নিশ্চিতভাবে একটি সুসংবাদ ছিলো আনন্দের আতিশয্যে উল্লসিত হয়ে সে লাফ মেরে উঠলো- ইয়া আল্লাহ, হাজার হাজার শুকরিয়া এরূপ বলেই সে আচকানের পকেট থেকে রূপোর একটি মুদ্রা বের করে সেপাইটির উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বললো- নাও, তোমার সুসংবাদের পুরস্কার

সেপাইটি মাটি থেকে মূদ্রাটি তুলে জেপে পূরে অভিবাদন জানালো

    তনয়াল সেপাইটিকে উদ্দেশ্য করে বললো- যাও, এর পরের গতিবিধির উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখগে'

যথা আজ্ঞা বলে সেপাইটি কক্ষ থেকে বেরিয়ে চলে গেলো যাওয়ার সময় সে দুয়ারটি বন্ধ করে গেলো তনয়ালের নির্দেশে

ইয়াকুব বেগের যোজনা অনুসারে কাজ এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইয়াকুব বেগকে প্রশংসা করে তনয়াল বলল-আপনার পরামর্শ মতো যোজনা সফল হওয়াতে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি বর্তমান এর থেকে উত্তম অন্য কিছুই আশা করতে পারি না আমি

ইয়াকুব বেগ তনয়ালের প্রশংসায় উজ্জীবিত হয়ে উঠলো সে নিজের দূরদর্শিতা এবং মহত্ত্ব প্রকাশ করার জন্য বললো- শেরিম তাগায় এখন নিজের ভাগ্নেকে বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য অনেক দূরে নিয়ে চলে যাবে, এটা ধ্রুবসত্য সে এখন বাবরের বিশ্বাসভাজন হওয়ার জন্য মাথার ঘাম জমিতে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না বাবরকে একবারে আলতাউ পাড় করে নিয়ে যাবে হয়তো আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া

আহম্মদ তনয়াল উল্লাস উচ্ছ্বাসে আত্মহারা হয়ে পড়লো কূটিল হাসির রেখা খেলে গেল তাঁর মুখমন্ডলে উৎফুল্লিত কন্ঠে বললো সে- আমরা এখন বাবর পালিয়ে যাওয়া কথাটাকে তিলটাকে তালটা করে প্রজা সাধারণের মাঝে প্রচার করতে হবে তারা উপলব্ধি করুক, আসন্ন বিপদের ভয়ে বাবর সন্ত্রস্ত হয়ে কীভাবে তাদের দুর্যোগের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে গেছে বাবর নিজের নিরাপত্তার জন্য তাদের বাঘের মুখে ঠেলে দিয়ে কীভাবে পালিয়ে যেতে পারল সেই কথা তারা অনুভব করুক এই খবরটা প্রচার হলে বাবরের উপরে প্রজাসাধারণের আস্থা থাকবে না এবং তখন মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করতে কোনো অসুবিধা হবে না

ইয়াকুব বেগ দাড়িতে হাত ফিরিয়ে বলল- উড়ো খবর প্রচারের জন্য সব থেকে সুবিধাজনক স্থান হলো জনবহুল বাজার আমার হাতের মুঠোয় এই কাজের জন্য কয়েকজন উপযুক্ত ব্যবসায়ী রয়েছে তারা এই কাজ নিশ্চয় সুকলমে সমাধা করতে পারবে

তনয়াল শংকিত কণ্ঠে বললো- কিন্তু আমরা যে উড়ো খবর প্রচার করছি এই কথা ঘুনাক্ষরেও যেন প্রকাশ না হয়

ইয়াকুব বেগ তনয়ালকে আশ্বাস দেওয়ার জন্য দৃঢ়কণ্ঠে বললো- আপনি বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, বেগ সাহেব কীভাবে কি করতে হবে তা আমি ভালোভাবেই জানি

যোজনা অনুসারে ইয়াকুব বেগ উড়া খবর প্রচারের জন্য কয়েকজন লোক নিয়োগ করলো তারা ব্যস্ততাপূর্ণ বাজারে প্রকৃত ঘটনা বিকৃত করে মিথ্যা ভিত্তিহীন কিছু খবর প্রচার করে দিলো বনের আগুনের মতো সেই সব খবর জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পড়লো

আন্দিজানে এমনিতেও একটার পরে একটা উড়া সংবাদে হুলস্থূল সৃষ্টি করে আসছিলো নিরন্তরভাবে এগিয়ে আসা শত্রুসেনার ভয়ে জনসাধারণ আগে থেকেই সন্ত্রস্ত ছিলো এবং দুঃশ্চিন্তার কালো মেঘে মানুষের হৃদয় ছেয়ে ফেলেছিলো যেখানেই ভয় সেখানেই উড়ো খবরের বাজার অধিক উত্তপ্ত হয় ইয়াকুব বেগ ভাবা মতেই উড়ো খবর প্রচার হয়ে আন্দিজানের জনজীবন সন্ত্রস্ত এবং বিপর্যস্ত করে তুললো বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ ইতিমধ্যে আন্দিজানে প্রচার হয়ে গিয়েছিলো ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্রের ফলে উক্ত সংবাদ বিকৃত রূপ ধারণ করলো ওমর শেখ শত্রুর ভয়ে নদীতে জাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রকৃত ঘটনাটা ইতিমধ্যে এরূপ বিকৃত রূপ ধারণ করেছিলো এর মাঝে ইয়াকুব বেগ-এর লোকেরা শাহজাদা বাবর শত্রু সেনার ভয়ে আন্দিজানবাসীকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে বলে প্রচার করে দিলো ফলে আন্দিজানের জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম হলো

উড়ো খবর প্রচার হওয়ার সাথে সাথে জনবহুল বাজারের একটার পরে একটা দোকান বন্ধ হতে লাগলো উড়ো খবর কোথা থেকে কে প্রচার করছে, কেউ জানে না কিন্তু একজনের মুখ থেকে আরেকজন শুনছিলো এবং একজনে আরেকজনের কাছে শুনা কথা একটু বাড়িয়ে বর্ণনা করছিলো মুখে মুখে প্রচারিত খবর এক সময় এমন বিকৃত রূপ ধারণ করলো যে, শেষ মুহূর্তে মানুষ বলতে লাগলো, শত্রু সেনারা আখসি দখল করেছে এবং বাদশাহকে নদীর পার থেকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ফলে বাদশাহর মৃত্যু হয়েছে শত্রু সেনার ভয়ে বাবর প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে

কথাগুলো সহরের দারোগা উজ্জন হোসেন-এর কর্ণগোচর হলো কথাগুলো শুনে দারোগা সাহেব বিচলিত হয়ে উঠলো সময়ের খবর সময়ে পাওয়ার জন্য সে অবশেষে গুপ্তচর নিয়োগ করতে বাধ্য হলো

উড়ো খবরের ফলে সেনা নায়কদের মধ্যেও অস্থিরতা দেখা দিলো কাশিম বেগের মুখে বাদশাহের মৃত্যু সংবাদ শুনে তারা স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত হয়ে উঠেছিলো উত্তরাধিকারীর পরিবর্তনের ফলে যুদ্ধের চিন্তা ছেড়ে তারা অন্য চিন্তা করতে বাধ্য হলো বাবর শত্রুর ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে তাঁদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা কয়েক গুণ বেড়ে গেলো

এদিকে গুপ্তচরেরা সহর দারোগা উজ্জন হোসেনকে সময়ের খবর সময়ে দিয়ে যেতে লাগলো একটার পর একটা উড়ো খবর শুনে সে ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলো উত্তেজনায় তার মাথা কুমারের চাকের মতো ঘুরতে লাগলো নিরুদ্ধ আক্রোশে ছটফট করতে লাগলো সে প্রচার হওয়া খবরগুলো ভিত্তিহীন, মিথ্যা উড়ো খবর বলে সে উপলব্ধি করতে পারলো যদিও মানুষকে প্রকৃত ঘটনা বুঝাতে না পেরে অসহায় এবং উৎকন্ঠিতভাবে সময় অতিবাহিত করতে লাগলো অবশেষে সে অতিষ্ঠ হয়ে পরিস্থিতির উপরে আলোচনা করার জন্য সেনা নায়ক এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিদের ডেকে পাঠাতে বাধ্য হলো

উজ্জন হোসেনের আহ্বানক্রমে সেনানায়ক এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ দূর্গের ভেতরে সমবেত হলো উজ্জন হোসেন সমবেত সেনানায়ক এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে পরিস্থিতির উপরে আলোকপাত করলো- মহাশয়বৃন্দ, আমাদের ওপড় ভাগ্য খুবই অপ্রসন্ন দূর্গের বাইরে চলছে শত্রুদের তাণ্ডব এবং দূর্গের ভেতরে চলছে দৌড়দৌড়ি কী কথা, কী বার্তা আমরা তার কোনো হদিশই পাচ্ছি না সেজন্য আমরা কোনো পরিস্থিতির জন্যই নিজেদের প্রস্তুত করতে সক্ষম হচ্ছি না আমাদের এই বিশৃংখল পরিস্থিতি দেখেই সম্ভবতঃ শাহজাদা বাবর ক্ষুব্ধ হয়ে দূর্গের ভেতরে না এসে বাইরে বাইরে অন্যত্র চলে গেছে পরিস্থিতি যেন ক্রমান্বয়ে আমাদের আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে

আমাদের এখন পালিয়ে যাওয়া উচিত হবে নাকি, দারোগা সাহেব? খাজা আবদুল্ল্যা ব্যংগভরা কন্ঠে বললেন

খাজা আবদুল্ল্যা অশীতপর বৃদ্ধ তাঁর চুলগুলো বকের পাখের মতো সাদা বিজ্ঞ হিসাবে তিনি সমগ্র আন্দিজানে সুপ্রসিদ্ধ আন্দিজানের বেগদেরও তিনি প্রভাবশালী ওস্তাদ এমনকি মির্জা বাবরেরও তিনি ওস্তাদ সেজন্য আন্দিজানের বাদশাহ, প্রজা সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা ভক্তির সাথে সমীহ করে চলে যারজন্য উজ্জন হোসেন তাঁর ব্যংগভরা কণ্ঠে মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো যদিও অভদ্রোচিত উত্তর দিতে সাহস পেলো না সকল অপমান সে নীরবে সহ্য করে মনে মনে দাঁড়িয়ে রইলো

কাশিম বেগও সভায় উপস্থিত ছিলেন তিনি পরামর্শ দিলেন- শাহজাদা বাবর অবিহনে এই পরিস্থিতিতে আমরা কোনো রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা সমীচিন হবে না তিনি বেশিদূর না যেতেই আমরা তাঁকে ফিরিয়ে আনাটা উচিত হবে তিনি ফিরে এলেই আমাদের মাঝে সৃষ্টি হওয়া ভয়, শংকা দূর হয়ে যাবে

আমরা শাহজাদা বাবরকে ভালোভাবেই জানি খাজা আবদুল্ল্যা সমবতে সুধীবৃন্দের উদ্দেশ্যে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো ভীরু তিনি কখনও কথা আমি নিঃসন্দেহে দৃঢ়ভাবে বলতে পারি আমাদের বিশ্বস্ততা এবং আজ্ঞাবহতা প্রমাণ করতেই হয়তো তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এদিকে তাঁর এই অন্তর্দ্ধানের সুযোগ নিয়ে একদল দুষ্ট লোক সাধারণ জনতাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কিছু ভিত্তিহীন উড়ো খবর প্রচার করতে প্রবৃত্ত হয়েছে আপনারা শুনে আচরিত হবেন যে, সেই দুষ্টচক্র আমরা বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রচার করছিলো নিশ্চয় এর অন্তরালে গুরুতর রহস্য এবং ষড়যন্ত্র নিহিত রয়েছে

সত্য সব পরিস্থিতিতেই সত্য সাধারণ জনতা যে সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম ছিল না, খাজা আবদুল্ল্যা নিজের বিচার বিবেচনা এবং দূরদর্শিতা দিয়ে সেই সত্যটাকে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেই সত্যটাকেই তিনি জনতার সন্মুখে প্রকাশ করে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন

আমার ধারণা হচ্ছে, মৌলানা সাহেবের অনুমানই সঠিক উজ্জন হোসেন খাজা আবদুল্ল্যাকে সমর্থন করে বললো- তিনি নিশ্চয় পরিস্থিতির ভাবগতি পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন এভাবে বলেই তিনি সমবেত সুধীবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানালেন- আসুন, আমরা মৌলানা সাহেব-এর পরামর্শ মতোই কাজ করতে প্রবৃত্ত হই

আমার কথা স্পষ্ট এবং সোজাসুজি খাজা আবদুল্ল্যা শান্ত ধীর কন্ঠে বললেন- আমরা এখন দ্বেষ, অভিমান, বিভেদ ভোলে একত্রিত হয়ে শাহজাদা বাবরের হাত শক্তিশালী করাটা খুবই প্রয়োজন এই কাজের মধ্যে আমাদের মঙ্গল নিহিত রয়েছে শাহজাদা বাবরের হাত শক্তিশালী করতে পাড়লে আমরা শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারব যদি আমরা শাহজাদা বাবরকে সহযোগিতা করি তাহলে কোনো দুষ্ট শক্তি আমাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না যদি আমরা ভুল বুঝাবুঝির বশবর্তী হয়ে বাবরের দিকে পিঠ দিই, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা অনিশ্চিয়তার করাল গ্রাসে পতিত হব এবং তখন নিজের পা-য় নিজেরা কুড়োল মারার মতো কথা হবে

খাজা আবদুল্ল্যার পরামর্শ উজ্জন হোসেনের তেমন মনোমত হল না যদিও একটি কথা ভেবে সে ভয়বিহ্বল হয়ে উঠলো এবং খাজা আবদুল্ল্যাকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিলো খাজা আবদুল্ল্যার কথা মতোই যদি পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় এবং শাহজাদা বাবরই যদি ফারগানার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে সহর দারোগা হিসাবে তাঁর আজকের এই কিংকর্তব্যবিমুঢ়তার পরিণতি কী হতে পারে সে কথা ভেবে সে সজাগ হয়ে উঠলো লোকেরা নিশ্চয় তাঁর আজকের এই আচরণের বিষয়ে বাবরকে অবগত করবে এবং তখন সে এই অপরিণামদর্শিতার জন্য সহর দারোগার পদ থেকে বঞ্চিত হতে পারে

সেজন্য উজ্জন হোসেন বাবরের বিশ্বাসভাজন হওয়ার জন্য খাজা আবদুল্ল্যার পরামর্শকে সন্মান জানিয়ে বললো- মৌলানা সাহেব, আপনার পরামর্শ অনুসারে আমি শাহজাদা বাবরকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আপনার অনুমতি পেলে আমি নিজেই বাবরকে ফিরিয়ে আনতে যাব আমাদের সেনানায়কদের বিশ্বস্ততার বিষয়ে আমি শাহজাদা বাবরকে অবগত করব এবং দূর্গে ফিরে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাব আমি কথা দিচ্ছি, যেকোনো উপায়ে তাঁকে দূর্গে ফিরিয়ে আনব

খাজা আবদুল্ল্যা উজ্জন হোসেনের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- আপনার সংকল্প নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য, দারোগা  সাহেব তবে আপনি শাহজাদাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যাওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ সহর দারোগা হিসাবে এর চেয়ে গুরু দায়িত্ব এখন আপনার উপরে ন্যস্ত সহরের শান্তি রক্ষার ভার যেহেতু আপনার উপরে, সেজন্য আপনি দৌড়াদৌড়ি বন্ধ করে সহরে শান্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন বদমাশদের চিনাক্ত করে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করুন এই সব করতে পারলেই আপনি বাবরের অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন

উজ্জন হোসেনের কানে কথাগুলো শেলের মতো বিদ্ধ হলো যদিও পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সে মাথা নত করে খাজা আবদুল্ল্যার কথাগুলো শুনতে বাধ্য হলো

*   *   *

গ্রীষ্ম কাল আকাশ-বাতাস সূর্যের প্রচণ্ড কিরণে উত্তপ্ত করে তুলছিলো শেরিম তাগায়র সাথে একদল অশ্বারোহী নিয়ে বাবর উজগন্তের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁদের ঘোড়ার ক্ষুরের চাপে রাস্তার ধূলাকণা কুয়াশার মতো বাতাসে উড়ছিলো উত্তপ্ত ধূলাকণাগুলো অশ্বারোহীদের মুখমন্ডল আগুনের শিখার মতো দগ্ধ করছিলো

অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাবরের শরীর থেকে অবিশ্রান্তভাবে ঘাম ঝরছিলো অসহ্য পিপাসায় তাঁর অণ্ঠকণ্ঠ শুকিয়ে মরুভূমির মতো খড়খড়ে হয়ে উঠেছিলো

গতকাল সময় বাবর আন্দিজানের রাজপ্রাসাদ- বসে আয়াসে সময় অতিবাহিত করছিলেন, কিন্তু কোথা থেকে আচম্বিতে ঝাপটা ঝঞ্ঝা এসে সব আরাম আয়াস, বিলাস কল্পনা নিষ্ঠুর হাতের থাবা মেলে উড়িয়ে নিয়ে গেলো এই মুহূর্তে যেন গতকালের সবকিছু অতীত হয়ে গেছে বদল হয়ে গেছে তাঁর জীবনের দৃশ্যপট শস্যশ্যামলা ধরণীর সুশীতল নির্মল সমীর, আয়নার মতো স্বচ্ছ জল, বিলাস কল্পনা সবকিছু রাতের স্বপ্নের মতো মিলিয়ে গেছে নিয়তির নিষ্ঠুর হাতের স্পর্শে উত্তপ্ত ধূলি ধূসর রাস্তা এবং বিক্ষিপ্ত ভাবনাই বাবরের উপলব্ধিতে শেলের মতো আঘাত করতে লাগলো

বাবরের উপলব্ধি হলো, যেন পরীর দেশের কাহিনীর মাঝে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝঞ্জা এসে তাঁকে কিশোরসূলভ আনন্দময় জীবন থেকে  বিচ্ছন্ন করে নিরালম্বভাবে তৃণকূটার মতো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে উড়ন্ত ধূলাকণা যেন সেই প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার ধূলাকণা পিতৃকে নদীর জলে ফেলে দেওয়া শক্তিও যেন এই ঝঞ্ঝারই শক্তি তাঁর সাথে আসা পঞ্চাশজন অশ্বারোহীর ছায়া যেন সেই ঝঞ্ঝারই প্রতিচ্ছবি ঝঞ্জা নিষ্ঠুর হাতে যেন সবাইকে মর্দিত দলিত রে চলেছে

ক্ষুধা পিপাসার প্রাবল্যে বাবরের মাথা চক্কর কাটতে লাগলো তার অনুমান হলো, যেন কোনো অপদেবতা তাঁকে পথভ্রষ্ট করে বিপদ সংকুল পথের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে

তাঁরা উজগন্তগামী পথের নামাজগাহ পর্যন্ত আসার পরে বরফ আবৃত পাহাড়ের শিখর দৃষ্টিগোচর হতে লাগলো চোখেমুখে স্পর্শ করতে লাগল শীতল বাতাসের মৃদু স্পর্শ অত্যধিক গরমের পরে শীতল মৃদু স্পর্শে সবাই স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলো

বাবর শুকনো খড়খড়ে ওষ্ঠ খুলে শেরিম তাগায়কে গতি বাড়ানোর জন্য আহ্বান জানালেন- সবাই গতি বাড়ান, তারাতারি করুন

শেরিম তাগায় পেছনে পড়ে থাকা সেনাদের গতি বাড়ানোর জন্যে দাবড়ি দিতে পেছন দিকে ঘুরে চাইলেন ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু দূরে একজন সংবাদবাহক অশ্বারোহী দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁদের দিকে আসা তার চোখে পড়লো শেরিম তাগায় বাবরকে ডেকে বললো- শাহজাদা, একটু অপেক্ষা করুন কে একজন ঘোড়া ছুটিয়ে আমাদের দিকে আসতেছে

বাবরসহ সব কয়জন অশ্বারোহী ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন তাঁরা পেছন দিকে ঘুরে তাকানোর সাথে সাথে অল্পদূরে একজন সংবাদবাহককে ঘোড়া ছুটিয়ে তাঁদের দিকে আসতে দেখলেন তাঁরা উৎকণ্ঠিতভাবে সংবাদবাহকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন

একটু পরেই সংবাদবাহক তাঁদের কাছে এসে উপস্থিত হলো সংবাদবাহক ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে অভিবাদন জানিয়ে খাজা আবদুল্ল্যা প্রেরণ করা চিঠিটা সসভ্রমে বাবরের হাতে দিলো

গোলভাবে মুড়ানো চিঠিটা হাতে নিয়ে বাবর রেশমির ফিতা খুলে নুয়ান কুশল দাশের দিকে বাড়িয়ে বললেন- পড়ুন

নুয়ান কুশল দাশ বাবরের নির্দেশে সবাই যাতে শুনতে পারে তেমন উচ্চস্বরে চিঠিটা পড়তে লাগলো এবং সবাই উৎকণ্ঠিতভাবে চিঠির বক্তব্য শুনতে লাগলো

    চিঠির বিষয় বস্তু ছিলো এরকম- চিঠিটায় প্রথমে আন্দিজানের বেগদের বিশ্বস্ততার বিষয়ে লিখা ছিলো এর উপরেও সাবধানতাপূর্বক ইংগিত দেওয়া ছিলো যে, সহরে ভিত্তিহীন কিছু উড়ো খবর প্রচার হচ্ছে যেমন- মির্জা বাবর সংকট দেখে পালিয়ে গেছে বাদশাহ ওমর শেখকে শত্রু সেনারা নদীর জলে ঠেলে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে একদল দুষ্টচক্র প্রজাসাধারণকে বাবরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করতেছে বাবরের অনুপস্থিতির জন্য বিশ্বস্ত বেগবর্গ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছে সেজন্য বাবর অতিসত্বর আন্দিজানে ফিরে যেতে হবে

চিঠির বক্তব্য শুনে শেরিম তাগায় উল্লাস-উচ্ছ্বাসে ঝাঁপ মেরে উঠলো সে উল্লসিত কণ্ঠে বললো- আমি আপনাকে এই কূটচক্রীদের কবল থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছি, শাহজাদা দূর্গ বর্তমান সেই কূটচক্রীদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে সেজন্য আপনি কোনোমতেই সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না যদি প্রকৃতপক্ষে বেগবৃন্দ আপনার অনুগত তাহলে তাঁদের এখানে ডেকে পাঠান তাঁরা এখানে এসে আপনার প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ দিক

মির্জা বাবর শত্রুর ভয়ে পালিয়ে গেছে! এই খবর সমগ্র আন্দিজানে কানে কানে প্রচার হয়ে গেছে একটি সহর থেকে আরেকটি সহরে-একটি গ্রাম থেকে অন্য একটি গ্রামে? তাঁকে ভীরু কাপুরুষ ভেবে প্রজাসাধারণ ঘৃণায় নাক কোঁচাচ্ছে? এই সব কথা ভেবে বাবরের কান-মাথা গরম হয়ে উঠলো নিরুদ্ধ আক্রোশ উত্তেজনায় তিনি ম্যালেরিয়া রোগীর মতো ঠকঠক্ করে কাঁপতে লাগলেন

বাবর আক্রোশ উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন- না না, আমার পালিয়ে যাওয়ার মোটেই ইচ্ছে নেই আমি শত্রুর ভয়ে পালিয়ে যাব না আমি তাদের হঠকারিতার সমুচিত উত্তর দিব এভাবে বলেই বাবর ঝাঁপ মেরে ঘোড়ার পৃষ্ঠে চড়ে আন্দিজানের দিকে ঘোড়া ছোটালেন

বাবরকে আন্দিজান অভিমুখে ঘোড়া ছুটানো দেখে শেরিম তাগায় ব্যস্ত হয়ে উঠলো সে দ্রুত বাবরের কাছে এসে হতাশ ও উত্তেজিত কণ্ঠে বললো- আমায় বিশ্বাস করুন, শাহজাদাএটা শত্ৰুৰ চাতুরালির বাইরে অন্য কিচ্ছু নয় তারা আপনাকে জালে ফেলতে কৌশল করতেছে আপনি আন্দিজান গেলেই তারা আপনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনি এই পরিস্থিতিতে কোনোমতেই আন্দিজান যাওয়াটা ঠিক হবে না, শাহজাদা

আমি নিজে সব কথার খবর নেব বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- আমি তাদের দেখিয়ে দিব যে, মির্জা বাবর ভীরু নয় শত্রুর সাথে মোকাবিলা করতে তিনি ভয় পান না চলুন, সবাই আন্দিজান ফিরে চলুন

বাবর ঘোড়ার লাগাম ঢিল দিয়ে সজোরে ঘোড়ার পিঠে কশাঘাত করলেন প্রচন্ড বেগে ঘোড়া আন্দিাজন অভিমুখে ধাবিত হলো বাতাসের ঝাঁপটা এসে বাবরের বুকে আঘাত করতে লাগলো ফলে কিছুক্ষণ আগের সেই অস্বস্তি থেকেও যেন তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন প্রগাঢ় প্রশান্তিতে তাঁর হৃদয় ভরে গেলো তাঁর উপলব্ধি হলো, যেন সেই আতংকজনক ঝঞ্জা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রাস্তা থেকে অদৃশ্য হয়ে পড়ছে

সূর্যাস্তের সাথে সাথে বাবর আন্দিজান দূর্গে এসে পৌঁছোলেন সাধারণতঃ যেসব রাস্তায় অন্যদিন সন্ধ্যেয় প্রচুর জন সমাগম হয়- কলরব, গুঞ্জন, সোরগোলে প্রতিটা অলিগলি মুখর হয়ে থাকে, সেই সব রাস্তা, প্রতিটা অলিগলি জনশূন্য নিজান পড়ে আছে প্রতিটা অলিগলি সহরটা যেন নীরবে কবরের ভেতরে শোয়ে রয়েছে অস্বস্তিকর সীমাহীন নীরবতা বিরাজ করতেছে প্রতিটা রাস্তা, অলিগলিতে দোকানপাট বন্ধ চতুর্দিকে বিরাজ করছে অস্বস্তিকর শূন্যতা প্রেতপুরীর মতো নীরব নিস্তব্ধ এবং ভয়ঙ্কর সত্তা যেন সহরটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে

সহরে পৌঁছোনোর সাথে সাথে শেরিম তাগায় বাবরের সুরক্ষার জন্য চিন্তিত হয়ে উঠলো বাবর সবার আগে আগে যাচ্ছিলেন তাঁর সুরক্ষার জন্য শেরিম তাগায় ব্যস্ত হয়ে উঠলো বাবরকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য সে সেনাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইংগিত করলোসেনারা ইংগিত পেয়ে এগিয়ে এসে বাবরকে ঘিরে ধরলো বাবরের উপলব্ধি হলো, যেন তাঁকে আবার বন্দি করা হচ্ছে ঝঞ্ঝা যেন তাঁকে আবার চেপে ধরছে সেনাদের ব্যুহের মাঝে আবদ্ধ হয়ে তিনি আবার অস্বস্তিতে ভোগতে লাগলেন

বাবর অসহ্য বিরক্তিতে ঘোড়ার পেটে সজোরে গোড়ালি দিয়ে গোতা মেরে সুরক্ষা ব্যূহ ভেদ কবে বের হয়ে এলেন

বাবরের এই কার্যের জন্য শেরিম তাগায় সজাগ হয়ে উঠলো সে দ্রুত এগিয়ে এসে বাবরের সাথে সাথে এগোতে লাগলো তার মনের ভাব, অন্তত লোকে দেখুক, সে কীভাবে নিজের ভাগ্নেকে ষড়যন্ত্রকারীর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করার জন্য যত্ন করতেছে 

শেরিম তাগায়র এই কার্যের জন্য বাবর বিরক্ত হলেন যদিও তিনি মুখ খুলে কোনো কথা বললেন না তিনি বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে শেরিম তাগায়-এর দিকে তাকিয়ে বিরক্তি ভাব প্রকাশ করলেন শুধু শেরিম তাগায় বাবরের দৃষ্টির অর্থ বুঝেও না বুঝার ভান করে তাঁর সাথে সাথে এগিয়ে আসতে লাগলো

নুয়ান কুশল দাশ নামক সেনাটি শেরিম তাগায়র এই কার্যে বিরক্ত হয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে শেরিম তাগায়র ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে বললো- বেগ সাহেব, শাহজাদা বাবরকে সবার আগে আগে যেতে দিন জনতাকে শাহজাদাকে দেখার সুযোগ করে দিন জনতা নিশ্চয় শাহজাদাকে দেখার জন্য খিরকির ফাঁক দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে তারা দেখুক, ষড়যন্ত্রকারীরা প্রচার করা উড়ো খবর ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা

কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা যদি কোনো ফাঁক দিয়ে শাহজাদার উপরে তীর নিক্ষেপ করে? শেরিম তাগায় উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল

তবুও প্রয়োজন নেই নুয়ান কুশল দাস দৃঢ়কণ্ঠে বলল- শাহজাদারও সবার আগে আগে যাওয়ার ইচ্ছা আল্লাহই নিশ্চয় তাঁকে রক্ষা করবেন

নুয়ান কুশল দাসের দৃঢ়তা এবং শাহজাদা বাবরের মুখমন্ডলে বিরক্তির ছায়া প্রত্যক্ষ করে শেরিম তাগায় হতবুদ্ধি হয়ে পিছিয়ে এলো

    অশ্বারোহী দলের আগে আগে এসে বাবর অক্ষতভাবে দূর্গের আর্ক(সহরের মাঝভাগে নির্মাণ করা দূর্গ, যেটা শাসকদের বাসস্থানের মতো) পর্যন্ত পৌঁছোলেন

খাজা আবদুল্ল্যা, কাশিম বেগ সমন্বিতে অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ আর্কের অভ্যন্তরে বাবরের আগমন অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলেন বাবর আর্কের দুয়ারমুখে পৌঁছোনোর সাথে সাথে তাঁরা সবাই বাবরকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আর্কের বাইরে বেরিয়ে এলেন বাবর তাঁদের পাশে এসে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে খাজা আবদুল্ল্যাকে অভিবাদন জানালেন

খাজা আবদুল্ল্যা হর্ষোৎফুল্লিত হয়ে বাবরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন- বেটাকে সহায় করা উচিত বেটাকে সান্ত্বনা দেওয়া প্রয়োজন(খাজা আবদুল্ল্যা বাবরকে বেটা বলে সম্বোধন করতেন) উপস্থিত সবাই সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য তন্ময় হয়ে উপভোগ করতে  লাগলেন

আনন্দের আতিশয্যে আবদুল্ল্যার চোখে ভরা পুকুরের মতো জল ছলছল করতে লাগলো তিনি কোনোমতে চোখের জল সম্বরণ করে শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- আমরা দুঃখিত, শাহজাদা আমাদের মহামান্য বাদশাহ এই সংসারে নেই আমরা বর্তমান এতিম (পিতৃ মাতৃহীন) আপনিই আপনার মরহুম আব্বাজানের অভাব পূরণ করতে হবে আমরা সবাই আপনার তত্ত্বাবধানে থেকে নিজেদের ধন্য মানব

সেনা নায়কদের মাঝ থেকে কেউ একজন এগিয়ে এসে গুরু-গম্ভীর কন্ঠে বললো- আমরা সবাই আপনার সেবায় আত্মনিয়োগ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ, শাহজাদা শুধু আপনার আদেশের অপেক্ষায় আমরা অধীরভাবে অপেক্ষারত

বাবরের হৃদয় আকাশ যেন স্নিগ্ধ গোলাপী আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো ভাদ্র মাসের বর্ষাগধুর আকাশের স্থানে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো শরতের কারুকার্য খচিত স্বর্ণিল আকাশ কৃতজ্ঞতায় তাঁর কন্ঠ গদ্গদ্ হয়ে উঠলো তিনি কোনোমতে উচ্চারণ করলেন- ধন্যবাদ

সবাই আর্কের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হলেন ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে ইয়াকুব বেগ এসে তাঁদের সাথে মিলিত হলো বাবর ফিরে আসার খবর পেয়ে সে উৎকন্ঠিত হয়ে উঠেছে এবং তার উপরে যাতে কোনো রকমের বিরূপ সন্দেহ পোষণ করা না হয়, সেজন্যই সে বদান্যতা প্রকাশের জন্য বাবরকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দৌড়ে এসেছে

আন্দিজান যখন সমগ্র ফারগানার রাজধানী ছিলো, তখন ঠান্ডা কুঠরি(এখনকার শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কোঠার মতো বিশেষভাবে তৈরি কোঠা)তে দরবার বসছিলোরাজধানী আন্দিজান থেকে আখসিতে স্থানান্তর করার পর থেকে আন্দিজানের সেই কারুকার্যখচিত প্রাসাদের ভব্যতা গুরুত্ব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে যারজন্য দরবার কক্ষটি একপ্রকার পরিত্যক্ত অবহেলিত অবস্থায় পতিত হয়ে

ছিলো

সেজন্য শাহজাদা বাবরকে আন্দিজান ফিরিয়ে আনার জন্য লোক পাঠিয়ে তাঁকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার প্রস্তুতি হিসাবে খাজা আবদুল্ল্যা দরবার কক্ষটি সুবিন্যস্তভাবে সাজিয়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর নির্দেশ অনুসারে ইতিমধ্যে কক্ষটি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো যেখানে রাজসিংহাসন সংস্থাপিত ছিলো সেখানে মেঝের উপরে নরম গদিযুক্ত তুর্কিস্থানী কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিলো ফলে দরবার কক্ষটি ভব্য এবং সুন্দর হয়ে উঠেছিলো

বাবর দরবার কক্ষে প্রবেশ করে কক্ষের ভব্যতা এবং সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়লেন ফুলের মতো কোমল মনোরম বেগুনি রঙের কার্পেটের উপর দিয়ে হেঁটে আসার সময় তাঁর কাশি উঠে গেলো কারণ তার গলাটা ক্ষুধাপিপাসায় শুকিয়ে একেবারে খড়খড়ে হয়ে উঠেছিলো তবুও তিনি কোনো রকম বিশ্রাম না নিয়ে ধীর মন্থর গতিতে হেঁটে এসে রাজসিংহাসনে উপবশন করলেন

বাবর সিংহাসনে উপবেশন করার পর উপস্থিত সেনানায়ক এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ নিজের নিজের আসনে উপবেশন করলেন

প্রচলিত প্রথা অনুসারে খাজা আবদুল্ল্যা ফাতিহা পাঠ করলেন- হে আল্লাহ, বাদশাহকে রক্ষা করুন

উপস্থিত পাত্রমিত্র সমন্বিতে গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সমস্বরে বলে উঠলেন- হে আল্লাহ, বাদশাহকে রক্ষা করুন

সমবেত কন্ঠের ফাতিহা পাঠ শুনে বাবরের মুখমন্ডলে কৃতজ্ঞতা শোকের মিশ্রিত অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো সপ্রশংস দৃষ্টিতে তিনি সমবেত সবার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন তাঁর দুচোখ কৃতজ্ঞতায় ছলছল করতে লাগলো চোখের জল লুকোতে তিনি মেঝের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন

খোদাবন্দ হুকুমের মালিক খাজা আবদুল্ল্যা গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগলেন- মৃত বাদশাহের দক্ষতা মর্যদা অনুসারে যথাযোগ্য সন্মান প্রদর্শন করে আখসিতে শেষকৃত্য সমাপন করা হয়েছেআমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা সেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারিনি তার থেকেও দুর্ভাগ্য যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য আমরা মৃত বাদশাহের জন্য শোকতাপ প্রকাশ করা থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে বর্তমান আমাদের মাঝে এক প্রকারের বিপদসংকুল সন্ধিক্ষণ উপস্থিত শত্রু এসে প্রায় আন্দিজানের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে সেজন্য শত্রুর সাথে মোকাবিলা করার এক গধুর দায়িত্ব এসে পড়েছে আমাদের উপরে যারজন্য আমরা বিলম্ব না করে আমাদের নবনিযুক্ত বাদশাহের হাতে শাসনের বাঘডোর ন্যস্ত করা উচিত

প্রথমে ইয়াকুব বেগ খাজা আবদুল্ল্যার প্রস্তাব সমর্থন করে বললো- আপনি একেবারে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মৌলানা সাহেব আমরা এখন এই মুহূর্তে মির্জা জহিরুদ্দিন বাবরকে ফারগানার ন্যায়সংগত বাদশাহ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত

বাবর তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ইয়াকুব বেগের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন ইয়াকুব বেগের আন্তরিকতাপূর্ণ কন্ঠস্বর, আনুগত্য প্রকাশের ভংগী, শান্তশিষ্ট সমাহিত মুখমন্ডল, সন্মুখের ভগ্ন দন্ত দু'টির ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আসা হাসির ঝলক, উৎকণ্ঠা প্রভৃতি লক্ষ্য করে বাবরের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেলো ইয়াকুব বেগ মোগল বেগদের মাঝে সবচেয়ে প্রভাবশালী বেগ হিসাবে সবার কাছে পরিচিত বাবর দেখা স্বপ্নগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্ন ছিলো, পিতৃর সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেনা নায়কদের উপরে নেতৃত্ব এবং একজন প্রকৃত মুসলমান যোদ্ধার মতো সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে শত্রুর উপরে বিজয় সাব্যস্ত করা বর্তমান পিতৃর অনুপস্থিতিতে তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার সময় সমাগত ইয়াকুব বেগের বক্তব্যে তাঁর মনে সাহস এবং শক্তি সঞ্চার লো উদ্যম এবং সাহসের সাথে তাঁর হৃদয়ে সঞ্চারিত হলো অদম্য উচ্চাকাংক্ষা

ইয়াকুব বেগের পরে অন্যান্য সেনা নায়কগণও একজনের পর আরেকজন বাবরকে বাদশাহ হিসাবে স্বীকৃতি দিলেন বাবরের স্বপ্নগুলো ভাদ্রমাসের কালো মেঘের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলো এক অনাবিল আনন্দ উল্লাসে তাঁর দেহমন ভরে গেলো ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য তিনি যে মানসিক এবং শারীরিক দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়েছে সেই সব দুঃখকষ্ট যেন শীতের কুয়াসার মতো কোথায় বিলীন হয়ে গেলো ভবিষ্যতে তিনি একজন শক্তিশালী শাসকরূপে প্রতিষ্ঠিত হবে- সবাই তাঁর আদেশ নির্বিবাদে পালন করবে! এই সব কথা ভাবতেই এক প্রকার গভীর প্রশান্তিতে তাঁর দেহমন ভরে গেলো

ছেলেবেলা থেকেই নিজেকে একজন দক্ষ প্রভাবশালী সেনাধ্যক্ষ হিসাবে ভেবে বাবরের ভালো লাগতো তার প্রপিতামহ তৈমূরের ক্রুরতার বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন, কিন্তু প্রপিতামহের মতো নিষ্ঠুর হওয়ার ইচ্ছা তাঁর মোটেই ছিলো না প্রজাসাধারণের মনে ক্ষতচিহ্ন সৃষ্টি করাটা উচিত নয় বলে তিনি ছেলেবেলা থেকেই উপলব্ধি করতেন তিনি পূর্বপুরুষের মতো ক্রুরতা প্রদর্শন করতে চান না তিনি যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে মহান বিজয় সাব্যস্ত করতে চান অত্যধিক ইচ্ছা শক্তির দ্বারা প্রভাবশালী হিসাবে সুনাম অর্জন করতে চান তিনি স্বেচ্ছাচারি শক্তির বিরুদ্ধে মহান বিজয় সাব্যস্ত করতে চান নিজের বলবিক্রমের দ্বারা যেগুলো দেখে স্বেচ্ছাচারি শক্তিসমূহ আতংকে কেঁপে উঠবে

এরূপ কল্পনায় বিভোর হয়ে থাকতেই দারোগা উজ্জন হোসেন দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে ক্ষমা প্রার্থনার ভংগীতে বললেন- জাহাপনা, আপনার গোলাম কর্তব্যের তাগিদে সময় মতো আপনাকে স্বাগত জানাতে আসতে পারিনিতারজন্য অধীনকে কৃপা করুন আন্দিজানে বর্তমান ভিত্তিহীন মিথ্যা উড়ো খবর প্রচার হচ্ছে আমি সেই উদণ্ড বিদ্রোহীদেরকে গ্রেপ্তার করার জন্য ব্যস্ত ছিলাম এইমাত্র তাদের একজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছি, জাহাপনা

দরজার দিকে সবার দৃষ্টি প্রসারিত হলো ইয়াকুব বেগের মুখমণ্ডল উৎকণ্ঠায় রক্তশূন্য হয়ে উঠলো এতক্ষণের প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলে প্রকট হয়ে উঠলো দুঃশ্চিন্তার কালো ছায়া সহর দারোগা তাহলে আহম্মদ তনয়ালকে গ্রেপ্তার করলো নাকি? আহম্মদ তনয়ালকে গ্রেপ্তার করলে সব কথা প্রকাশ হয়ে পড়বে! সে নিজেও তখন গ্রেপ্তার হতে হবে! ইয়া আল্লাহ! এখন উপায়?

ইয়াকুব বেগ ভয়বিহ্বল হয়ে দেয়ালস্থিত খিড়কিগুলোর দিকে তাকাতে লাগলো কিন্তু খিড়কিগুলো খুবই সরু একজন লোক আসা-যাওয়া করার জন্য অনুপযুক্ত সর্বোপরি তার অবস্থান থেকে অনেকটা দূরে অবস্থিত খিড়কিগুলো খিড়কির পাশে আবার বসে রয়েছে হৃষ্টপুষ্ট থুলথুল বেগ থুলথুল বেগ প্রকৃতপক্ষেই স্থূল তার উপরেও সে খুবই প্রভাবশালী তাকে অতিক্রম করে খিড়কির মাঝ দিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব সেজন্য আসন্ন মৃত্যু ভয়ে ইয়াকুব বেগ নেতিয়ে পড়লো

ইয়াকুব বেগ এইসব কথা ভেবে থাকতেই দরজার সেপ্রান্ত থেকে গুরুগম্ভীর উত্তেজিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো- আমার হস্তের বন্ধন খুলে দিন আমি কোনো অন্যায় করিনি আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ

আল্লাহকে ধন্যবাদ!ইয়াকুব বেগ মনে মনে বললো- আহম্মদ তনয়ালের কন্ঠস্বর নয়

কিছুক্ষণ পরেই একজন হৃষ্টপুষ্ট লোক নিয়ে দুজন সিপাহি দরবার কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলো লোকটির পরণে ছিলো সুতার দীঘল ঢিলা জামা এবং হাত দু'টি পিঠের পেছন দিকে বাঁধা ছিলো

দেখছি দরবেশ গোব! ইয়াকুব বেগ এবং সভাসদগণ সমবেত কণ্ঠে বলে উঠলেন

দরবেশ গোব আন্দিজানের ভিস্তিয়ালা(জল বিতরণকারী বিষয়া) তার মাংসল গলা ষাঁড়ের মতো সন্মুখের দিকে বের হয়ে থাকার জন্য সবাই তাকে গোব অর্থাৎ ষাঁড় বলে সম্বোধন করতো তাকে সবাই গরিবের বন্ধু বলেও জানে ধনী প্রভাবশালী ব্যক্তির চেয়ে তিনি গরিব লোকদের অধিক গুরুত্ব দে আল্লাহ তায়ালা গরিবের প্রতি অধিক দয়াশীল বলে প্রকাশ্যে বলে থাকে প্রয়োজনে তিনি গরিবের হয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদও করে

খরা দিনে অনেক কয়েকটি বাগানে জল সিঞ্চন করতে হয় ফলে তখন জলের অভাব হয় তখন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গরিবের জলের লাইন থেকে জল বের করে নেওয়ার চেষ্টা করে একমাত্র দরবেশ গোবই তখন গরিবের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলে- আপনারা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শুধু নিজের কথা বেশি চিন্তা করেন তবে একটা কথা মনে রাখবেন, আল্লাহর চোখে ধনী-গরিব সবাই সমান

শুধু প্রতিবাদ করাই না, দরবেশ গোব প্রতিবাদ করে এই দুর্নীতি বন্ধও করে দিয়েছে বর্তমান ফলে গরিবরা তাঁকে মনে প্রাণে ভালোবাসে এবং প্রকাশ্যে সমর্থনও করে এই কার্যের ফলে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য না করলেও পেটে পেটে তাঁকে ঘৃণা করে বিশেষ করে উজ্জন হোসেন তাঁকে অনেক দিন থেকে খারাপ পায় এই কাজরে জন্যে

    দরবেশ গোবের হাত দুটি পিঠের পেছন দিকে বাঁধা ছিলো।। সে প্রথমে বাবরের দিকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করার পরে খাজা আবদুল্ল্যার দিকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করলো

বিচার করুন, জাহাপনা, বিচার করুন দরবেশ গোব মাথা নত করে আত্মসন্মান সহকারে বলতে লাগলো- আমি বিদ্রোহী নই, জাহাপনা! বাজারে একজন সিপাহি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো- শুনছেন নাকি গোব, বাদশাহ ওমর শেখ বোলে নেশা খেয়ে মাতাল হয়ে নদীর পাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং মির্জা বাবর শত্রুর ভয়ে আলতাউ পালিয়ে গেছে?

সব একেবারে মিথ্যা কথা বাবর বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন

সব যে মিথ্যা তার সন্ধান আমি পরে পেয়েছি, জাহাপনা আমি সেপাইর কাছ থেকে শুনা কথা কাউকে বলিনি, জাহাপনা আমার প্রতি কৃপা করুন, জাহাপনা দরবেশ গোব দুই তিন হাত এগিয়ে এসে আঁঠু গেড়ে বসে বললো- আমি নিজেও জানি এসব ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা জাহাপনা, আপনার মুখমণ্ডলে কূটিলতার লেশমাত্র নেই ফুলের মতো পবিত্র আপনার মুখমণ্ডল আপনার মুখমণ্ডল মদগর্বীদের মতো কখনও নয় বাজারে যখন দৌড়াদৌড়ি লেগে দোকানপাট বন্ধ হচ্ছিলো, আমি স্বীকার করি, তখন আমি ভয়-বিহ্বল হয়ে পড়ছিলাম তাই বলে আমি উড়ো খবর প্রচার করিনি, জাহাপনা কৌতূহল নিবারণের জন্য একজনকে শুধু জিঞ্জাসা করেছিলাম- ভাই, তুমি শুনেছ নাকি, মানুষগুলো কি বলছে? লোকটি বলেছিলো- হ্যাঁ শুনেছি আমি আবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম- এসব সত্যি নাকি? ঠিক তখনই সহর দারোগার গুপ্তচরগণ আমাকে গ্রেপ্তার করেছে

না না, তুমি মিথ্যা কথা বলছ উজ্জন হোসেন দৃঢ়কন্ঠে প্রতিবাদ করে উঠলেন- তুই শুধু জিজ্ঞাসা করার কথা বলছিস; কিন্তু তুই শুধু জিজ্ঞাসাই করিসনি, প্রচারও করছিলি

আমাকে কোরআন শরিফ দিন পবিত্র কোরআনের শপত খেয়ে বলব, আমি উড়ো খবর প্রচার করিনিদরবেশ গোব দৃঢ়কণ্ঠে বললো

অপরাধী বলছে, তাকে কোরআন শরিফ দেওয়া হোক ইয়াকুব বেগ বাবরের দিকে দৃষ্টি প্ৰসারিত করে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গীতে বললো- জাহাপনা, এই অপবিত্র আপনার বিশ্বাসী ভৃত্য হলে, নিশ্চয় উড়ো খবর প্রচার করা সেপাইটিকে ধরে সহর দারোগার হাতে সোপর্দ করতো নিশ্চয় অপরাধী - উড়ো খবর প্রচার করে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে

ইয়া আল্লাহ! দরবেশ গোবের মুখ থেকে শুধু একটি শব্দই বের হলো

বাবরের দিকে চেয়ে ইয়াকুব বেগ দুপাটি ভাঙা দাঁত বের করে বললো- জাহাপনা, আপনার পিতা এই পাপীকে অনুগ্রহ করে ভিস্তিয়ালার পদে নিয়োগ করেছিলেন এই পাপী সেই পূণ্যাত্মা মৃত বাদশাহের প্রতি অপমানজনক খবর প্রচার করেছে এই পাপীর উপরে গজব বর্ষিত হোক জাহাপনা, আমি আবার জোর দিয়ে বলছি, এই পাপী- মিথ্যা খবর প্রচার করেছে আমাদের পূণ্যাত্মা বাদশাহকে আল্লাহই বেহেস্ত নসিব করুন মদিরার নেশায় মাতাল হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে আমাদের প্রয়াত বাদশাহ! আঃ, কি রকম ঘৃণনীয় অপবাদ!

ইয়াকুব বেগ এভাবে বলে বাবরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো বাবরের ক্লান্ত নিবোধ দৃষ্টি কৌতুক কৌতূহলে আচ্ছন্ন শরতের স্বর্ণময় কারুকার্যখচিত আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘের মতো নির্বোধ কৌতুকাচ্ছন্ন দৃষ্টির অন্তরালে প্রচ্ছন্ন হয়েছিলো অপমানের গ্লানি এবং রোষের অভিব্যক্তি ইয়াকুব বেগ ভাবলো, এই কোমল হৃদয়ের বাদশাহকে প্রবঞ্চনা না করে কাকে প্রবঞ্চনা করবে! আশা ভরা দৃষ্টিতে সে বাবরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে বাবরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো

নিজেই মিথ্যা খবর প্রচার করছে বলে স্বীকার করেছে একজনকে জিজ্ঞাসা করা এবং বলার মাঝে কী পার্থক্য আছে, জাহাপনা? মজিদ বেগ আক্ষেপের সুরে বললো

মিথ্যা খবর প্রচার করা অবস্থায় যখন ধরা পড়েছে, তখন শান্তি পাওয়াই উচিত আলী দোস্ত বেগও কথাটায় সমর্থন জানালো

কাশিম বেগ মনে মনে বসে সবার কথা-বার্তা মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন হঠাৎ তাঁর শেরিম তাগায় বলা কবুতরের কথা মনে পড়ে গেলো তাঁর অনুমান হলো, সেই রহস্যময় কবুতরের সাথে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর নিশ্চয় কোনো দূরভিসন্ধিমূলক যোগসূত্র আছে সেজন্য কাশিম বেগ মৌনতা ভংগ করে প্রস্তাব রাখলো- এই ঘটনার আবার অনুসন্ধান করলে কেমন হয়, জাহাপনা?

কাশিম বেগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে মজিদ বেগ বলে উঠলো- দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালানোর জন্য আমাদের সময় কোথায়? শত্রু দরজা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে রকম পরিস্থিতে অনুসন্ধানের নামে সময় অপচয় করাটা মোটেই ঠিক হবে না এদিকে যুদ্ধের সময়ে উড়ো খবর প্রচার করে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করা, শাসকের বিরুদ্ধে মান হানিকর মন্তব্য করা লোকদের দেশের শত্রু হিসাবে গণ্য করা হয় রকম দেশদ্রোহীদে প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করাটা মোটেই উচিত নয়, জাহাপনা

উড়ো খবর প্রচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য -কে সাধারণ শাস্তি প্রদান করা হোক, জাহাপনা উজ্জন হোসেন পরামর্শ দিলেন

সাধারণ শাস্তির কথা শুনে দরবেশ গোবের মুখমণ্ডলে মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এলো কারণ তখনকার দিনে সাধারণ শাস্তির অর্থ ছিলো মৃতুদণ্ড সে আঁঠুর ওপরে ভর করে ঘেসড়িয়ে ঘেসড়িয়ে বাবরের কাছে এসে বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে মিনতি করে বললো- জাহাপনা, আমি অপরাধী নই আমি অপরাধীর রোষের শিকার হচ্ছি আমার প্রতি দয়া করুন, জাহাপনা আমার পাঁচটা ছেলেমেয়ে তাদের আপনি আশ্রয়হীন করবেন না

দরবেশ গোবের দুহাত পিঠির দিকে বাঁধা ছিলো এবং চোখের জল দাড়ি বেয়ে গড়িয়ে টপ টপ করে জমিতে পড়ছিলো

বয়োবৃদ্ধ একজন লোকের চোখে জল দেখে বাবরের ক্রোধ, অপমানবোধ, আক্ষেপ কর্পূরের মতো উড়ে গেলো সুগভীর মমতায় তাঁর মুখমণ্ডল আচ্ছন্ন হয়ে উঠলো তিনি খাজা আবদুল্ল্যার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন চোখের দৃষ্টি দ্বারাগরিবকে দয়া করুন' এই কথা বলার জন্য যেন তিনি খাজা আবদুল্ল্যার কাছে আবেদন জানাইতে ছিলেন

কিন্তু খাজা আবদুল্ল্যা বাবরের দৃষ্টির অর্থ বুঝেও না বুঝার ভান করে কোনো রকমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে মৌনতা অবলম্বন করলেন

এদিকে বেগবৃন্দ নিজেদের মতে অটল-অচল হয়ে দরবেশ গোবের মৃতুদণ্ডের জন্য আবেদন জানাতে লাগলো

যে লোকের পাঁচটা ছেলেমেয়ে সে ভেবেচিন্তে কথা বলা উচিত ইয়াকুব বেগ তিরস্কারের সুরে বললো

দরবেশ গোব প্রকৃতপক্ষেই বিদ্রোহীদের নেতা উজ্জন হোসেন হাত নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগলো- যে সেপাই মৃত বাদশাহের বিরুদ্ধে অপমানজনক কথা প্রচার করছিলো, তার দুপাটি দাঁত ভেঙে দেওয়াটা উচিত ছিলো মরহুম বাদশাহ নেশা খেয়ে মাতাল হয়ে নদীতে পড়ে মরেছে! কেমন ঘৃণনীয় কথা! এই অপবাদ যে সেপাইটি প্রচার করছিলো তাকে ধরে বেঁধে আমাদের কাছে আনলে না কেন?

নিবিড় রাতের ছায়ার মতো অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো দরবেশ গোবের মুখমণ্ডলে চরম বিপর্যয়ের অশুভ সংকেতে সে নিরুদ্ধ ক্ষোভ অপমানে উত্তেজিত হয়ে উঠলো আবেগ বিগলিত কণ্ঠে সে আবেদন জানালো- আমার বাদশাহ! বিচার করুন আমি আপনার পিতার আজ্ঞাধীন ভৃত্য আপনি এই বেগ(একটা গোটের সেনানায়ক)দের এখনো চিনতে পারেন নি এরা আমার ওপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে গরিবের হয়ে আমি এদের বিরুদ্ধে কথা বলি সেজন্য আমার ওপরে এদের আক্রোশ এদের বিশ্বাস করবেন না, জাহাপনা এই বেগদের বাইরে আন্দিজানের প্রতিজন লোককে আমার চরিত্রের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করুন....... প্রতিজন বিশ্বাসী লোকই আমাকে জানে আমি নিৰ্দোষ, জাহাপনা...

গোবের এই কাতর কণ্ঠের আবেদন বেগদের চিল্লাচিল্লির শব্দে চাপা পড়ে গেলো অরণ্যরোদনে পর্যবসিত হলো তাঁর হৃদয় ভাঙা কাতর আবেদন

আলী দোস্ত বেগ নিজের আসন ছেড়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে অভিযোগ ভরা কণ্ঠে আস্ফালন করে উঠলেন- বেগবৃন্দ বেইমান, শুনলেন তো জাহাপনা? আপনি দেখলেন তো, কী রকম কপট অন্তরের লোক এই দরবেশ গোব?

ইয়াকুব বেগ বাবরের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে তোতার মতো মুখস্থ বলে যেতে লাগলো- এই দরবেশ গোব শুধু দেশরই শত্রু নয়, রাজপরিয়াল এবং সভ্রান্ত লোকদেরও শত্রু বেগদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনতাকে প্ররোচিত করে পক্ষান্তরে দেশকে শত্রুর হস্তে অৰ্পণ করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো দেশের, দশের, জাতির শত্রু

এর মনোভাব খুবই খারাপ উজ্জন হোসেন ঘৃণায় নাক সিটকিয়ে বললো

বাবর নির্বিকারভাবে উজ্জন হোসেনের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন বাবরের নির্বিকার ভাব লক্ষ্য করে উজ্জন হোসেন উৎসাহিত হয়ে উঠলো দরবেশ গোবকে দরবারে নিয়ে আসা সিপাহিদের উদ্দেশ্য করে সে বললো- অনেক হয়েছে -কে এখন এখান থেকে নিয়ে যাও

আদেশ পাওয়া মাত্র সিপাহি দুজন বাজপাখির মতো এসে দরবেশ গোবকে বগলদাবা করে ধরে শূন্যে তুলে টেনে হিঁচড়িয়ে ঠেলা- গোঁতা মারতে মারতে দরজার দিকে নিয়ে গেলো

যাওয়ার সময় দরবেশ গোব আক্রোশে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলে গেলো- আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ আমার সন্তানদের হা-হুতাশ এই আত্মগর্বী বেগদের ধ্বংস ডেকে আনবে আমার নির্দোষ রক্ত এদের সর্বনাশ করবে

দরবেশ গোবের ক্ষুব্ধ আক্রোশ ভরা কন্ঠস্বরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুললো ধীরে ধীরে তাঁর ক্রুদ্ধ করুণ কন্ঠস্বর খীণ থেকে খীণতর হয়ে ইথারের সাথে মিলিয়ে গেলো

দরবেশ গোবের অভিযোগ ভরা অভিশাপ বাবরের হৃদয়ে কাঁটার মতো বিদ্ধ হতে লাগলো দরবেশ গোবের করুণ বিষণ্ণ মুখমন্ডলের কথা ভেবে ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগলো তাঁর হৃদয়

বাবরের মনে পড়ে গেলো, সকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাসমূহ সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত তাঁর হৃদয়ে শংকা এবং ভয়ের লেশমাত্র ছিল না সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত তিনি শায়ের আলীশের নবাইর ফটো দেখে তাঁর মতো বিখ্যাত মহান কবি হওয়ার স্বপ্নে মসগুল হয়ে ছিলেন তাঁর অনুমান হলো, সেইসব ঘটনা যেন অতীত হয়ে গেছে দুপর পর্যন্ত তাঁর হৃদয় যেন আকাশের মতো নির্মল ছিলো কোনো পাপ বা শংকার লেশমাত্র ছিল না তাঁর হৃদয়ে হৃদয়টা যেন রৌদ্রস্নাত নির্মল আকাশের মতো উদ্ভাসিত হয়ে আছিলো হঠাৎ কোথা থেকে এক খণ্ড মেঘ উড়ে এসে যেন তাঁর হৃদয় আকাশ ঝাঁপটে ধরেছে

কিন্তু নির্মল আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ কোথা থেকে সঞ্চার হলো? দরবেশ গোবের মৃত্যুদণ্ডের জন্য দাবি জানানো বেগদেরকে বাবরের মনে গর্জনরত কালো মেঘের মতো অনুমান হলো দয়া মমতাহীন ঝঞ্জা এবং কালো নিকষ নিরন্ধ্র অন্ধকার যেন অক্টোপাছের মতো তাঁকে থাবার ভেতর আবদ্ধ করে নিষ্পেষণ করতে লাগলো তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো সিংহাসন এবং রাজমুকুট যেন দরবেশ গোবের মতো নিরীহ লোকের রক্তের জন্য লালায়িত এক অজানা শংকাই বাবরের হৃদয় নির্মমভাবে নিষ্পেষণ করতে লাগলো

এদিকে বেগদের আবেদন প্রেতের উল্লাসের মতো ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো- এই অপবিত্রকে শিরচ্ছেদ করা হোক মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হোক আমরা দরবেশ গোবে মৃত্যুদণ্ড কামনা করছি...........ইত্যাদি ইত্যাদি......

বাবরের চোখে তখনও দরবেশ গোবের শ্বেত দাড়ি বেয়ে টপটপ করে চোখের জল ঝরে পড়া দৃশ্য ঝলমল করতেছিলো বাবর ভাবতে লাগলো, সতেজ, সুস্থ, সবল একজন লোককে শুধু একটা দোষের জন্য প্রাণহীন মাংসপিণ্ডে পরিণত করাটা উচিত হবে? উচিত হবে নাকি হত্যা করার জন্য আদেশ প্রদান করাটা? দরবেশ গোবের প্রতি বেগদের আক্রোশমূলক মনোভাবের কারণ কি? বেগবর্গ তাঁকে প্রবঞ্চনা করেনি তো? এই বেগদেরই কেউ একজন তাঁর পিতাকে ঠ্যালা মেরে নদীতে ফেলে দেয়নি তো? এই বেগদেরই একজন একদিন তাঁকেও হত্যা করবে নাতো? রকম হাজারটা প্রশ্ন তাঁর মনের মাঝে উঁকি মারতে লাগলো

ওস্তাদ! বাবর উৎকন্ঠিত কণ্ঠে খাজা আবদুল্ল্যাকে সম্বোধন করলেন

    খাজা আবদুল্ল্যা বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পারলেন তিনি বাবরের কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- আপনি কঠিন হয়ে থাকুন, জাহাপনা

বলুন, কি করব? বাবর উৎকন্ঠিতভাবে ফিসফিস করে সমিধান প্রার্থনা করলেন

দণ্ডাদেশ ঘোষণা করুন

আপনিও সেটাই করতে চান নাকি? বাবরের কণ্ঠে বিস্ময় মিশ্রিত সংশয়

আন্দিজান তথা সমগ্র ফারগানার ভাগ্য যেখানে নিহিত হয়ে রয়েছে, সেখানে দরবেশ গোবের মতো লোকের মূল্য কি? খাজা আবদুল্ল্যা উপদেশের স্বরে ফিসফিস করে বললেন- এই সংকটময় মুহূর্তে বেগদের বিরুদ্ধে যাওয়াটা মোটেই ঠিক হবে না হুকুম দিন- মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিন

খাজা আবদুল্ল্যার পরামর্শ অনুসারে সম্পূর্ণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবর দরবেশ গোবের মৃত্যু দন্ডাদেশ ঘোষণা করলেন- দরবেশ গোবের শিরশ্ছেদ করা হোক

পরের দিন ঢোল-খোল-নাগারার শব্দের মাঝে দরবেশ গোবের মৃত্যু দন্ডাদেশ কার্যকর করা হলো

ঠিক সেদিনই অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে আহম্মদ তনয়াল চুপে চুপে আখসির দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো

                 *   *   *

উশের আশেপাশে অবস্থিত শ্যামল সমতল প্রান্তরসমূহ হঠাৎ মুখর হয়ে উঠলো নৈঃশব্দের মাঝে সশব্দের প্রকাশে প্রাণের সঞ্চার হয়ে অচল প্রান্তর সচল হয়ে উঠলো মানুষের দৌড়াদৌড়ি, কলরবে মুখর হয়ে উঠলো সমগ্র প্রান্তর নির্জীব জড় যেন হঠাৎ প্রাণ পেয়ে সজীব হয়ে উঠলো

আন্দিজান থেকে প্রচুর জাঁকজমক ছাউনির সরঞ্জাম, আসবাব উটের পৃষ্ঠে বোজাই দিয়ে এনে বুরাতন পাহাড়ের পাদদেশে জমা করা হলো কলকল স্বরে বয়ে চলা আরিক নদীর তীরে সেসব আসবাব, সরঞ্জাম দিয়ে দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য ছাউনি নির্মাণ করা হলো বুরাসায় নদীর পাড়েও শত শত তম্বু দেখা যেতে লাগলো বুরাতান পাহাড় থেকে পালে পালে দুম্বা ধরে এনে জবাই করে বড় বড় ডেগে সুস্বাদু খাদ্য প্রস্তুত হতে লাগলো প্রস্তুত হতে লাগলো সিক কাবাব বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগলো তার মনপ্রাণ মাতানো সুঘ্রাণ

এইসব আয়োজন ছিলো একমাত্র বাবরের আগমন উপলক্ষ্যে অবশেষে আকাংক্ষিত দিন এলো সাথে সাথে বাড়লো ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠা

মির্জা বাবরের জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তিদের মাঝে বাস্তবিদ ফজিলুদ্দিন অন্যতম ছিলেন ফজিলুদ্দিন একজন সুদক্ষ বাস্তবিদ তথা ভাস্কর্য শিল্পী একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী হিসাবেও প্রখ্যাত ছিলেন তিনি সেদিনকার দিনটা ছিলো ফজিলুদ্দিনের ভাগ্য নির্ণয়ের দিন

ফজিলুদ্দিন আগে আখসিতে ছিলেন বাদশাহ ওমর শেখের মৃত্যুর পর তিনি বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে আন্দিজান এসেছিলেন প্রকাশ থাকে যে, বাবর প্রথম সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ছল চাতুরী করে ইয়াকুব বেগ উজির--আজমের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলো উজির--আজমের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরে সে অনেক দিন ফজিলুদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়নি ফলে ফজিলুদ্দিন আন্দিজান এসেও বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করা থেকে বঞ্চিত ছিলেন

কয়েক মাস পরে ফজিলুদ্দিন বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পায়

ইয়াকুব বেগ উজির--আজম হলেও সে মনে মনে বাবরকে ঘৃণা করতো সেজন্য সে সুযোগ বুঝে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তলে তলে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো, কিন্তু কাশিম বেগের তৎপরতার জন্য এক সময় সেই ষড়যন্ত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে ফলে শাস্তির ভয়ে ইয়াকুব বেগ আন্দিজান থেকে পালিয়ে যায় তবে, পালিয়ে গিয়েও সে শেষ রক্ষা করতে সমর্থ হয়নি সে পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে কাশিম বেগের নেতৃত্বে একদল সেনা তার পশ্চাদধাবন করে এবং সিরদরিয়ার পাড়ে সংঘটিত সন্মুখ সমরে ইয়াকুব বেগকে হত্যা করে

ইয়াকুব বেগ বাবরের প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য আহম্মদ তনয়াল বাবরের বিরুদ্ধে রচিত ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করে দিয়েছিলো কারণ আহম্মদ তনয়াল এবং ইয়াকুব বেগের মাঝে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা নিয়ে মনোমালিন্য চলছিলো সেই মনোমালিন্যই শেষে প্রতিহিংসার রূপ নিয়েছিলো এবং ইয়াকুব বেগের জীবনাবসান হয়েছিলো

ইয়াকুব বেগ নিহত হওয়ার পরে কাশিম বেগ উজির--আজম পদে অধিষ্ঠিত হয় এবং ফজিলুদ্দিনকে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করার অবসর করে দেয় প্রথম সাক্ষাতের দিনই বাবর তাঁকে বুরাতান পাহাড়ের উপরে উপাসনা গৃহ নির্মাণের দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন

বাদশাহ ওমর শেখের রাজত্ব কালেও ওমর শেখ ফজিলুদ্দিনকে দিয়ে অনেক সৌধ নির্মাণ করিয়ে ছিলেন সময়ে সময়ে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে অর্থাভাবের জন্য নক্সা প্রস্তুতের পরেও তিনি অনেক নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন ফজিলুদ্দিন বাবরের সাথে সাক্ষাতের প্রথম দিনই বাবর আক্ষেপ করে বলছিলেন- অশুভ যুদ্ধ সব তছনছ করে দিয়েছে এখন যুদ্ধ থেমেছে, সেজন্য আমি আব্বাজানের অসম্পূর্ণ কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ করতে চাইআপনি আমাকে এ বিষয়ে সহায় করতে হবে

সেদিনই বাবর বুরাতান পাহাড়ের উঁচু মালভূমির উপরে একটি মসজিদ (উপাসনা) গৃহ নির্মাণের দায়িত্ব ফজিলুদ্দিনকে অর্পণ করেছিলেন

কয়েক মাসব্যাপী অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ফজিলুদ্দিন উপাসনা গৃহ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছেন গৃহ নির্মাণের কাজ কয়েক মাস আগে সম্পন্ন হয়েছে যদিও নানান ব্যস্ততার জন্য গৃহটি পরিদর্শনের জন্য বাবর আসতে পারেন নি আজকে বাবর প্রথমবারের জন্য গৃহটি পরিদর্শনের জন্য আসার কথা সেজন্যই এতো ব্যস্ততা উৎকণ্ঠা

গৃহটি বাবরের পসন্দ অপসন্দের উপরে নির্ভর করবে ফজিলুদ্দিনের ভবিষ্যত যদি নির্মাণ কার্য পসন্দ হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও তিনি এর থেকেও বিশাল যোজনার কাজ পাওয়াটা একপ্রকার নিশ্চিত কিন্তু যদি অপসন্দ হয়? গৃহ নির্মাণের সময় এই প্রশ্ন মাঝে মাঝেই ফজিলুদ্দিনের মনে উদয় হয়ে তাঁকে হতাশ করে তুলছিলেন তখন তিনি বাবরের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সব উজাড় করে দিয়ে গৃহ নির্মাণের কাজে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন সংশয়, উৎকন্ঠা, চিন্তা-ভাবনার মাঝে তিনি প্রচুর অধ্যবসায় এবং নিষ্ঠার বিনিময়ে গৃহ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ করে তুলেছেন

আজকে ফজিলুদ্দিনের অগ্নি পরীক্ষা এতো দিনের অধ্যবসায় এবং নিষ্ঠার মূল্যায়ন হবে আজ সেজন্য বাবর আসার প্রাক্মুহূর্তে তিনি তৎপর হয়ে উঠেছেন প্রতিটা আয়োজন সুরুচিপূর্ণ এবং মর্যদাপূর্ণ করে তুলতে তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন মোট কথায় বলতে গেলে, ফজিলুদ্দিন যেন এই মুহূর্তে একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন

গৃহটি যতখানি সম্ভব সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য ফজিলুদ্দিন সুদৃশ্য দলিচা এবং তোশকের জন্য বাবরের নিকট পত্র লিখে পাঠিয়ে ছিলেন রাজ দরবার থেকে সৈন্যরা সেই সব ঈপ্সিত জিনিষপত্র এনে বুরাতান পাহাড়ের পাদদেশে ছাউনি পেতে রয়েছে

ফজিলুদ্দিন নিজে পাহাড়ের পাদদেশে এসে সেই সব জিনিষপত্র মালভূমির উপরে আনার ব্যবস্থা করলেন রাজকর্মচারিদের জিনিষপত্রগুলো মালভূমির উপরে বয়ে নেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি নিজেও তাদের সাথে সেগুলো বয়ে আনতে লাগলেন

পাহাড়ের উপরে উঠা ঢালু পথে হাঁটতে অনভ্যস্ত রাজকর্মচারিগণ উপরে উঠে আসা সময় পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল এবং তারা ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে লাগলো

রাজকর্মচারিদের মুখিয়াল ছিলো একজন হৃষ্টপুষ্ট লোক সামান্য ওজনের কাশগরি সুরাহি (পানীয় রাখার জন্য লম্বা মুখের এক প্রকার পাত্র) একটা নিয়ে উপরে উঠতে প্রত্যেক দশ পা হাঁটতেই সে বিশ্রাম নিতে লাগলো যেকোনো মুহূর্তে সুরাহি পড়ে গিয়ে ভাঙতে পারে এই আশংকা করে ফজিলুদ্দিন তার হাত থেকে সুরাহিটা নিজের হাতে এনে মুখিয়াল লোকটিকে বগলদাবা করে উপরে তুলে আনতে লাগলেন এক সময় জিনিষগুলো উপরে আনা শেষ হলো এবং ফজিলুদ্দিন উপাসনা গৃহটি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন

মুখিয়াল লোকটি রঙবিরঙের দলিচা বারান্দার সিঁড়ির উপরে পাড়তে চেয়েছিলো ফজিলুদ্দিন তাকে কাজটা করতে নিষেধ করলেনকারণ সিঁড়ির উপরে নক্সা অঙ্কন করা ছিলো পাথরে কাটা নক্সা যেকোনো সুন্দর দলিচার চেয়ে কম সুন্দর ছিল না সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় নক্সাগুলো যাতে বাবরের চোখে পড়ে তার জন্যই তিনি নক্সাগুলো না ঢেকে খোলাভাবে রাখার ব্যবস্থা করলেন     এইভাবে প্রত্যেকটা কাজের উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে তিনি উপাসনা গৃহটা রাজকর্মচারিদের সহযোগে সুদৃশ্য করে সাজিয়ে তুললেন কাজ সম্পূর্ণ করে মুখিয়ালসহ অন্যান্য রাজকর্মচারিরা উপাসনা গৃহ থেকে বেরিয়ে এসে এক খন্ড প্রস্তরের উপরে বিশ্রাম নিতে বসলো

পাহাড়ের উপর থেকে উশ সহরের আশপাশের এলাকা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে পরিশ্রান্ত মুখিয়াল রাজকর্মচারিটি পাহাড়ের পাদদেশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে সচকিত হয়ে উঠলো এবং স্প্রিঙের মতো লাফিয়ে উঠে বললো- ওই যে, দেখ, তিনি আসছেন

ফজিলুদ্দিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাজের ভুলত্রুটিগুলো নিরীক্ষণ করছিলেন মুখিয়াল কর্মচারিটির কথা তাঁর কানেও পৌঁছোল তিনি দ্রুত বারান্দার প্রান্তে এগিয়ে এসে পাহাড়ের পাদদেশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন

পাহাড়ের পাদদেশে দুদল অশ্বারোহী সমদল করে এগিয়ে আসা তাঁর চোখে পড়ল

প্রথম দলটির আগে আগে শ্বেত ঘোড়ায় চড়ে বাবর আসছিলেন এবং দ্বিতীয় দলটির আগে আগে আসছিলো তিনটি ঘোড়ায় টানা একটি সুদৃশ্য বগি

সেই সুদৃশ্য বগিতে কে কে থাকতে পারে ফজিলুদ্দিন একবার মনে মনে অনুমান করার চেষ্টা করলেন বগিটায় বাবরের মা কুতলু নিগার বেগম থাকাটা নিশ্চিত কিন্তু তিনি একাই এসেছেন, না সাথে আর কেউ রয়েছে? যদি রয়েছে, তাহলে কে হতে পারে! অন্য কেউ এলে নিশ্চয় বাবরের বড় বোন খানজাদা বেগম আসছেন!

খানজাদা বেগমের মুখ ফজিলুদ্দিনের মানসপটে ভেসে উঠার সাথে সাথে তিনি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন এক মিঠা শিহরণ খেলে গেলো তাঁর দেহমনে তাঁর এই কয়দিনের ব্যস্ততা শুধু বাবরের আগমন প্রতিক্ষা- ছিলো, না এর সাথে প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলো খানজাদা বেগমের আগমন বার্তা? ফজিলুদ্দিন প্রশ্নটা একবার নিজের মনে যাচাই করার চেষ্টা করতেই উৎকণ্ঠিত চিৎকারে তাঁর চিন্তার ডোঁর ছিড়ে গেলো ওই যে, তাঁরা দাঁড়িয়ে পড়েছে! মুখিয়াল কর্মচারিটি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার  বলে উঠলো

মুখিয়াল কর্মচারিটির চিৎকার শুনে ফজিলুদ্দিন উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন তিনি নিজেও সমগ্র সমদলটি জান্নাত আরিক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি বিশেষ ছাউনির নিকটে দাঁড়িয়ে পড়া লক্ষ্য করলেন

ছাউনিটা খাটি রুপোর খুঁটি দিয়ে নির্মিত নানা রকমের ফুল এবং সুদৃশ্য দলিচা দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছে ছাউনিটাপানাহারের সাথে আরামের পর্যাপ্ত সুব্যবস্থাও রয়েছে ছাউনিতে

নওজোয়ান মির্জা বাবর ছাউনিতে আরাম করে পরের দিন উপাসনাগৃহ পরিদর্শন করতে আসবেন ভেবে ফজিলুদ্দিন পরিকল্পিতভাবে সব সুব্যবস্থা করে রেখেছেন ছাউনিটায় কিন্তু ফজিলুদ্দিন ভাবা মতে হলো না বাবরের আগমনের পরে এক ঘণ্টা পার না হতেই বাবরের দেহরক্ষী সর্দারটি চারজন সৈনিক নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে পাহাড়ের উপরে উঠে এলো সে রাজকর্মচারিদের মুখিয়ালকে  উদ্দেশ্য করে বলল- জাহাপনা এখনই এখানে আসবে পাল্কী কোথায়?

রাজকর্মচারিদের মুখিয়াল সহায়ের আশায় ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকাল

    ফজিলুদ্দিন রেশমি কাপড়ের ঢিলা জামা পড়ে ছিলেন তিনি জামা শক্ত করে বেঁধে বুকে হাত রেখে দেহরক্ষী সর্দারের সন্মুখে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে বললেন- ক্ষমা করবেন, হুজুর

কী? দেহরক্ষী সর্দার ফজিলুদ্দিনের কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকাল

ফজিলুদ্দিন কথাটা বুঝিয়ে বললেন- আমি ভেবেচিন্তে দেখেছি, পাহাড়ের উপরে পাল্কী নিয়ে আসাটা কোনোমতে সম্ভব হবে না একজন লোকের জন্যই আসাযাওয়া করা অসুবিধা উপাসনা গৃহের জন্য ইঁটগুলো উপরে তুলে আনতে একজনের পেছনে আরেকজন শ্রেণিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তুলে আনতে হয়েছে পাল্কী একটি বয়ে আনতে অতিকমেও চারজন লোক একসাথে আসতে হবে কিন্তু এই ঢালু পথে চারজন লোক একসাথে উঠে আসা সম্ভব হবে না

দেহরক্ষীর সর্দার মনোযোগ সহকারে পথের অবস্থা নিরীক্ষণ করলো সরু সংকীর্ণ পথ একজন লোকের জন্যই আসাযাওয়া করাটা অসুবিধা একসাথে চারজন লোক পাল্কী নিয়ে উঠে আসা সম্ভব হবে না বলে তারও ধারণা হলো সেজন্য সে রাজকর্মচারির মুখিয়ালকে উদ্দেশ্য করে বললো- আচ্ছা, হেঁটে আসার ব্যবস্থাই করতে হবে এভাবে বলেই সে রাজকর্মচারির মুখিয়ালকে সাবধান করে দিলো- কিন্তু এখানে যেন প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত জন লোকও না থাকে তার ব্যবস্থা করুন

উপরে উঠে আসা সরু পথটি উপাসনা গৃহের সন্মুখে এসে শেষ হওয়ার আগে কয়েকটি প্রশস্ত সমতলের সমান্তরালভাবে কয়েকটি ছোট ছোট মালভূমি পার হয়ে আসতে হবে সেজন্য ফজিলুদ্দিন মালভূমি কয়টির উপরে জলের পাত্রের সাথে পরিচারক নিয়োগ করার কথা ভাবলেন যাতে প্রয়োজনে আরোহীরাঁ জল পান করতে পারেন এবং হাতমুখ ধোয়ার জন্যও ব্যবহার করতে পারেন ভাবামতেই তিনি মুখিয়াল রাজকর্মচারিকে উদ্দেশ্য করে বললেন- প্রয়োজনে জল পাওয়ার জন্য মালভূমি কয়টিতে জলের পাত্রের সাথে পরিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা করুন

ঠিক আছে, আমি এখনই জলের ব্যবস্থা করতেছি মুখিয়াল লোকটি ব্যস্তভাবে বললো

নিয়মমতে দেহরক্ষী সর্দার নিজে নিচে গিয়ে বাবরকে সাথে নিয়ে আসা প্রয়োজন, কিন্তু সরু ঢালু পথে দুবার আসাযাওয়া করাটা একজন হৃষ্টপুষ্ট লোকের জন্য খুবই কঠিন কাজ সেজন্য তিনি পথটা ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে হতাশ হয়ে পড়লেন পথটা নিরীক্ষণ করে তাঁর ধারণা হলো, তাঁর পক্ষে দুবার আসাযাওয়া করাটা একেবারে অসম্ভব সেজন্য সে দুজন সৈনিকের সাথে ফজিলুদ্দিনকে নিচে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের সুরে বললো- জ্বনাব, আমি দুবার আসাযাওয়া করাটা খুবই কষ্টকর কাজ হবে তার উপর পথের বিষয় আমার তেমন জ্ঞানও নেই আপনি পথটা ভালভাবে চেনেন, আসাযাওয়া করার অভ্যেসও রয়েছে সেজন্য আপনি দুজন সৈনিক নিয়ে নিচে গিয়ে জাহাপনাকে এগিয়ে নিয়ে আসুন

সর্দারের অনুরোধ মর্মে ফজিলুদ্দিন নিচে নেমে এলেন দেহরক্ষী সর্দার লোকটি একখন্ড মিহিভাবে পালিছ করা পাথরের উপরে বসে মুখের ঘাম মুছতে লাগলো

নির্মাণ কার্য চলার সময়ে ফজিলুদ্দিনকে প্রতেকদিন কয়েকবার উঠানামা করতে হয়েছে সেজন্য তিনি উঠানামা করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন সিঁড়িবেয়ে উপরে উঠার জন্য পাতল জোতা বেশি উপযোগী সেজন্য তিনি রবারের পাতল জোতা ব্যবহার করতেন বরাবরের মতো পাতল জোতা পরে তিনি পাহাড়ের পাদদেশে নেমে এলেন

বাবর ছাউনীতে ছিলেন না তিনি ছাউনীতে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই দলবল নিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্যসম্ভার উপভোগ করার জন্য বেড়াইতে গিয়েছিলেন সভ্রান্ত বেগদের উপরেও তাঁর সাথে গিয়েছিলেন মাতৃ কুতলু নিগার বেগম এবং ভগ্নী খানজাদা বেগম তাঁরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন

ফজিলুদ্দিন ছাউনীতে এসে কিছুক্ষণ জিরানোর পরে পাহাড়ের পূর্ব এবং দক্ষিণ দি ঘুরে প্রথম দলটি নিয়ে বাবর ছাউনীতে ফিরে এলেন তিনি ছাউনীতে আসার কিছুক্ষণ পরেই দ্বিতীয় দলটা এসে ছাউনীতে পৌঁছোলেন

দ্বিতীয় দলে ছিলেন মহিলাগণ সাদা কাপড় পরিহিতা কুতলু নিগার বেগম কস্তুরি রঙের ঘোড়ায় এবং কালোর সাথে লাল রঙ মিশ্রিত সুন্দর রেশমি কাপড় পরে বাদামী রঙের ঘোড়ায় চড়ে আসছিলেন বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগম

খানজাদা বেগমের মুখমন্ডল ওড়না দিয়ে আবৃত ছিলো দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসূলভ বসার ভংগি দেখেই ফজিলুদ্দিন তাঁকে খানজাদা বেগম বলে চিনতে পারলেন খানজাদা বেগমকে দেখেই ফজিলুদ্দিনের হৃদয়ে আবেগ ব্যকুলতা জেগে উঠলো উত্তেজনায় তাঁর দেহের সিরা উপসিরা ফুলে ফুলে উঠতে  লাগলো চোখে জেগে উঠলো বিস্ময় মুগ্ধতা জলের উপরের শেওলার মতো তাঁর হৃদয়ের গভীর প্রদেশ থেকে ভেসে উঠলো কিঞ্চিত স্মৃতির টুকরো তাঁর মন বাস্তব ছেড়ে অতীতের সোনালি দিনে উড়ে গেলো-

খানজাদা বেগম তাঁর অদ্বিতীয় বিস্ময়কর গুণ দিয়ে কয়েকবার ফজিলুদ্দিনকে আশ্চর্যচকিত করে তুলছিলেন

চার বছর আগে ফজিলুদ্দিন ওমর শেখের নির্দেশে হিরাত থেকে আন্দিজান পর্যন্ত দূর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেনতখনই তাঁর খানজাদা বেগমের সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো খানজাদা বেগমের বয়স তখন মাত্র ষোল বছর তাঁর উদ্ভিন্ন যৌবন তখন আধাফুটা কলির মতো প্রস্ফুটিত হতে সাজগোছের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন মাত্র যৌবনের সুষমায় দ্যুতিময়ী হয়ে উঠছিলেন তাঁর মুখমন্ডল তাঁর আয়ত হরিণ চোখে ছিলো লজ্জার রক্তিম স্বপ্নিল দৃষ্টি কৌতুকে নাচছিলো তাঁর চোখের মণি সভ্রান্ত যুবতীদের মধ্যে সবার চেয়ে সুন্দরী বলে তাঁর রূপের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো ঠিক সেরকম একটি মুহূর্তে তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো ফজিলুদ্দিনের

একদিন খানজাদা বেগম যুবকের বেশে ভ্রাতৃ বাবর এবং অন্যান্যদের সাথে চওগান( পোলো বা অশ্বারোহণে হকি খেলা) খেলতেছিলেন সেদিনকার সেই খেলা উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো ফজিলুদ্দিনের মুগ্ধ বিস্ময়ে তিনি উপভোগ করছিলেন সেই চওগান খেলা ফজিলুদ্দিনের সেই বিস্ময় মুগ্ধতা হয়তো খানজাদা বেগমের চোখে ধরা পরছিলেন তিনিও যেন ফজিলুদ্দিনের সেই বিস্ময় মুগ্ধতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছিলেন

ফজিলুদ্দিন তখন পঁচিশ বছরের যুবক দীর্ঘ আকর্ষণীয় মুখমন্ডল প্রতিভার দীপ্তিতে উজ্জ্বল দু'টি চোখ মুখমণ্ডলে তরুণ বয়সের উদ্ভিন্ন দাড়ি ওষ্ঠের উপরে কালো গোঁফের রেখা মুখে ভূবন বিজয়ী হাসি চোখের দৃষ্টিতে ছিলো শিশুসূলভ বিস্ময় মুগ্ধতা

খানজাদা বেগম হয়তো ফজিলুদ্দিনের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসূলভ চেহেরা এবং বিস্ময় মুগ্ধতা দেখে কৌতুক অনুভব করছিলেন খেলার মাঝেই দুই তিনবার ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে তিনি ওষ্ঠের কোণায় হাসির রেখা রেখায়িত করে কটাক্ষ করেছিলেন সেই কটাক্ষে বাণবিদ্ধ হয়ে ফজিলুদ্দিনের হৃদয় শরবিদ্ধ আহত হরিণের মতো ছট্ফট্ করে উঠছিলো

সেদিন খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে খানজাদা বেগম ফজিলুদ্দিনকে প্রাসাদে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সেই আহ্বানে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলেন ফজিলুদ্দিন তার চোখের সন্মুখে ভেসে উঠেছিলো খানজাদা বেগমের হাসির রেখা মিশ্রিত কটাক্ষ দুরু দুরু করে কেঁপে উঠেছিলো তাঁর হৃদয় আহ্বানের অন্তরালের রহস্য কি? খানজাদা বেগম তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি তো? এই আহ্বানের অন্তরালের রহস্য পুরস্কার, না তিরস্কার? তাঁর আকর্ষণের প্রতিক্রিয়া, না ঘৃণা বিদ্বেষ বিরাগ বিকর্ষণের প্রতিক্রিয়া? কিন্তু তাঁর চোখে তো তিনি কোনো কূটিলতা, ঘৃণা অথবা বিরাগের প্রতিচ্ছবি দেখেন নি দেখেছিলেন কৌতূহল এবং বিস্ময় মুগ্ধতা

দুর্বল মনে সব জায়গায় বিপদের আশংকা দেখে তিনি তখন সত্যিই খানজাদা বেগমের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন নাকি? যার জন্য তাঁর এই উৎকন্ঠা,

 ভয় বিহ্বলতা?

ফজিলুদ্দিন মনে সাহস সঞ্চয় করে আহ্বানের প্রতি সন্মান জানিয়ে উৎকণ্ঠিতভাবে রাজপ্রাসাদে গিয়েছিলেন কোনো অভিযোগ বা বিরাগের প্রতিক্রিয়া ছিলো না সেই আহ্বানের অন্তরালে রাজপ্রাসাদের ধসে যাওয়া দেয়ালে রং করার জন্য তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেনদায়িত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং খানজাদা বেগম তখন তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন তিরস্কৃত নয় পুরস্কৃত হয়েছিলেন তিনি ফজিলুদ্দিন নিজের বাসগৃহে এসে রং তুলি নিয়ে আবার রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হয়েছিলেন রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হওয়ার পরেই খানজাদা বেগমের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিলো খানজাদা বেগম তখন তাঁর সহচরীদের সাথে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন

কিছুক্ষণ আগে দেখা দক্ষ খেলোয়াড়ের বাঁশি থেকে তখন অপূর্ব মধুর সুর ঝংকারিত হচ্ছিল তখন তাঁকে অপূর্ব কমনীয় এবং মোহময়ী দেখাচ্ছিল সেই অপূর্ব রূপসুধা পান করে ফজিলুদ্দিন আত্মহারা হয়ে পড়ছিলেন সন্মোহিত হয়ে পড়ছিলেন সুমধুর বাঁশির মায়াজালে

অন্য একদিনের একটি ঘটনা দেখেও ফজিলুদ্দিন আশ্বর্যচকিত হয়ে উঠেছিলেন ফজিলুদ্দিন সেদিন প্রাসাদের দেয়ালে ভেলভেটের নক্সা অঙ্কন করছিলেন

হঠাৎ কোথা থেকে এসে খানজাদা বেগম মনযোগ সহকারে তিনি অঙ্কন করা নক্সা নিরীক্ষণ করছিলেন খানজাদা বেগমকে একলা সেভাবে আসতে দেখে ফজিলুদ্দিন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ছিলেন তাঁর বুক দুরু দুরু করে কাঁপতে শুরু করছিলো হঠাৎ তাঁর হাত থেকে রং তুলি খসে পড়েছিলো

এই ঘটনায় খানজাদা বেগম বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে সব দোষ নিজের গায় নিয়ে বলেছিলেন- আপনি খুব সুন্দর লতাপাতা অঙ্কন করেছেন হয়তো আপনার কাজে আমার চোখ লেগেছে! রং তুলি তুলে নিয়ে আবার শুরু করুন

অভয় পেয়ে ফজিলুদ্দিন পাকা মেঝে থেকে রং তুলি তুলে নিয়ে বিজ্ঞের মতো বলছিলেন- না না, শাহজাদী, যে নক্সায় আপনার চোখ লেগেছে সেই নক্সা প্রাণ পেয়ে আবার অধিক সুন্দর হয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে

মৌলানা, আমি শুনেছি, আপনি বোলে চিত্রকরও?

বাস্তুবিদ শিল্পী একজন চিত্র অঙ্কন জানাটা আবশ্যক, শাহজাদী এভাবেই ফজিলুদ্দিন নিজেই যে একজন চিত্রশিল্পী সেকথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছিলেন

তাহলে, আপনি আমার চিত্র এঁকে দিন না কেন?

ফজিলুদ্দিনের জন্য প্রস্তাবটা খুবই অপ্রত্যাশিত এবং লোভনীয় ছিলো

ফজিলুদ্দিন মুগ্ধ সপ্রশংস দৃষ্টিতে খানজাদা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কক্ষটিতে শুধু তাঁরা দুজনই ছিলেন সেদিন তবুও ফজিলুদ্দিনে অনুচ্চ স্বরে বলছিলেন- আপনি চাইলে আমি অতি আনন্দ মনেই আপনার চিত্র এঁকে দিব কিন্তু.... এক অজান আশঙ্কার জন্য ফজিলুদ্দিন বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারছিলেন না

ফজিলুদ্দিনের সংশয়ের কারণ উপলব্ধি করতে পেরে খানজাদা বেগম অভয় দিয়ে বলছিলেন- আপনি চিন্তা করবেন না, মৌলানা আমি সব কথা গোপন রাখব

তবুও যদি কোনো রকমে কথাটা প্রকাশ হয়ে যায় এবং আমার এই অমূল্য জীবন কোরবাণি দিতে হয়, তখন আমি আমার এই অমূল্য জীবন কোথায় পাব, শাহজাদী? ফজিলুদ্দিন এভাবে বলেই কিছুক্ষণ থেমে আবার ঠাট্টার স্বরে বলেছিলেন- আমার অনুমান হচ্ছে, আমার এই জীবন যেন কোথাও হারিয়ে যেতে চলেছে

খানজাদা বেগম ফজিলুদ্দিনের কৌতুক উপলব্ধি করতে পেরে মোহনীয় হাসি হেসে বলছিলেন- আমার চিত্র অঙ্কন করার জন্য যদি আপনার জীবন যায়, আমাকে বলবেন, আমি আমার জীবনটাই দিয়ে দিব আপনাকে এখন নিশ্চয় আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়?

খানজাদা বেগমের এই চিত্ত বিনোদক, চঞ্চল এবং সাবলীল রসিকতায় ফজিলুদ্দিন অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন এবং খানজাদা বেগমের চিত্র আঁকতে শুরু করছিলেন সেই চিত্র দেখে খানজাদা বেগম সন্মোহিত হয়ে পড়ছিলেন, কিন্তু সেদিন তিনি চিত্রটি নেয়নি সময়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চিত্রটি ফজিলুদ্দিনের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন

এর পরে অশুভ যুদ্ধ সব বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো ফজিলুদ্দিন ফারগানা থেকে পালিয়ে গিয়ে হিরাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তবুও হাজারটা বিপত্তির মাঝেও তিনি চিত্রটি অতিশয় যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে রেখেছেন খানজাদা বেগম চাইলে যাতে চিত্রটি তাঁকে দিতে পারে এই ভেবে এখনও চিত্রটি আছে তাঁর সিন্দুকে

গত শীতে খানজাদা বেগমের সাথে তার শেষবারের মতো সাক্ষাৎ হয়েছিলো কুতলু নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম গত শীতে উশ সহরে বেড়াইতে এসেছিলেন তখন মির্জা বাবর তাঁদের বুরাতান পাহাড়ে নির্মীয়মান উপাসনা গৃহটির বুঝ নেওয়ার জন্য বলে পাঠিয়েছিলেন কারণ উশ সহর থেকে বুরাতান পাহাড় খুবই নিকটে অবস্থিত

ফজিলুদ্দিন সেদিন শুধু একজন শিষ্য নিয়ে কাজ করছিলেন রশদ এবং ধনের অভাবে তিনি বাকি শ্রমিকদের ছাটাই করেছিলেন ফলে ইঁট, তক্তা এবং অন্যান্য রশদপাতি তাঁরা দু'জনেই নিচে থেকে পাহাড়ের উপরে বয়ে আনতে হচ্ছিল এমনকি পাথর কাটা কারিগরও ছিল না তদুপরি টাইলস কেনার জন্য পর্যাপ্ত ধনও ছিল না তখন তাঁর হাতে ফজিলুদ্দিন এইসব অভাব পূরণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন ঠিক তখনই খানজাদা বেগম নির্মাণ কার্যের বুঝ নিতে এসেছিলেন

ফজিলুদ্দিন এইসব অভাব অভিযোগের কথা খানজাদা বেগমকে বলতে উসখুস করছিলেন, তবে মণিমুক্তাখচিত রেশমি টুপি পরিহিতা, লাল নরম জোতা পরা, কোমলতার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি, দিব্য সৌন্দর্যের আঁকর যুবতী একজনের কাছে এইসব অভাব অভিযোগের কথা বলতে তিনি সংকোচবোধ করছিলেন তদুপরি খানজাদা বেগমের সৌন্দর্যে সেদিন ফজিলুদ্দিন নির্বাক হয়ে পড়ছিলেন এবং অভাব অভিযোগের কথা বলতে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন

কিন্তু খানজাদা বেগম নিজেই সেই সমস্যা সমাধান করে দিয়েছিলেন তিনি উপাসনা গৃহের নক্সা দেখতে চেয়েছিলেন- মৌলানা সাহেব, উপাসনা গৃহের নক্সাটি আমাকে দেখাতে পারবেন কি?

কেন পারব না নিশ্চয় পারব এভাবে বলেই ফজিলুদ্দিন অতি যত্নসহকারে নক্সাটি খানজাদা বেগমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন

খানজাদা বেগম অতিশয় মনযোগ সহকারে নক্সাটিতে চোখ ফিরিয়ে বলছিলেন- আপনি দেখছি, গম্বুজে উজ্জ্বল নীল বাখর খাটানোর কথা ভাবছেন?

কথাটা শুনে বিস্ময়ে ফজিলুদ্দিনের চোখের তারা নিশ্চল হয়ে পড়ছিলো এই যুবতী তো কম নয়! ইনি দেখছি বাস্তুকলার বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞাত! বাস্তুকলার বিষয়ে ইনি এই জ্ঞান কোথা থেকে পেলেন? ইনি এই বাস্তুকলার বিষয়ে কতদূর অধ্যয়ন করেছেন? ফজিলুদ্দিন বিস্ময়াভিভূত চোখে খানজাদা বেগমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এইসব কথার বুঝ নিয়ে বলছিলেন-আপনার অনুমান সত্য গম্বুজে নীল বাখর খাটাতে হবে

কিন্তু আপনার হাতে পর্যাপ্ত বাখর রয়েছে কি?

ফজিলুদ্দিনে নেতিবাচক ভংগিতে মাথা নেড়ে বলছিলেন- নেই, কিনতে হবে

বাখরগুলো তো খুব দামি! বাখর কিনার জন্য আপনার হাতে পর্যাপ্ত ধন আছে নাকি?

ফজিলুদ্দিন তখন অভাব অভিযোগের কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন

অভাব অভিযোগের কথা শুনে খানজাদা বেগম বলছিলেন- ঠিক আছে, বাখরের কথা আপনি ভাববেন না আপনি নক্সা অনুসারে কাজ করে যান বাখরের ব্যবস্থা আমি করে দিব

ফজিলুদ্দিন তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিলেন- আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ! আপনার এই বদান্যতার কথা আমি জীবনেও ভুলতে পারব না

মির্জা বাবর তখন সমরকন্দের বাদশাহ সুলতান আহম্মদের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন সেজন্য খানজাদা বেগম বলেছিলেন- শুধু উপাসনা গৃহই নয়, মির্জা বাবর যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে আব্বাজানের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগ নিব আমি তখন আরও অনেক সৌধ নির্মাণ করাব সেইসমূহ সৌধ নির্মাণের দায়িত্বও আপনাকেই নিতে হবে, মৌলানা

ফজিলুদ্দিন যেন এর থেকে স্নেহাশ্রিত মধুর শব্দ জীবনে আগে কোনদিন শুনেন নি এমনই ধারণা হয়েছিলো তাঁর

পরের দিন থেকে দুজন হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ সুগঠিত যুবক খাদ্যসামগ্রীর সাথে গৃহ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র এনে ফজিলুদ্দিনের কাছে জমা দিতে শুরু করছিলো এক সপ্তাহ পরে উটের পিঠে বোজাই হয়ে এসেছিলো চোখ ঝলসানো রংবিরঙের ঝলমলানো বাখর এবং টাইলস প্রতিটা টাইলস এবং বাখরের মাঝে ফজিলুদ্দিন যেন দেখতে পেয়েছিলেন খানজাদা বেগমের মোহময়ী মুখের প্রতিচ্ছবি তিনি খানজাদা বেগমের প্রতি কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন এবং অবসর পেলেই তখন থেকে প্রতিদিন খানজাদা বেগমের চিত্র সিন্দুক থেকে বের করে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতেন এবং চিত্রটি তাঁকে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতো

এখনও অবসর পেলেই তিনি চিত্রটি বের করে দেখেন চিত্রটি যেন জীবন্ত হয়ে তাঁর সাথে কথা বলে

চিত্রের খানজাদা বেগমকে নয়, আজ রক্তমাংসের খানজাদা বেগমকে স্বচক্ষে দর্শন করার সৌভাগ্য হবে তাঁর এক বছর পরে তিনি খানজাদা বেগমের মুখ দর্শন করতে সক্ষম হবেন সৌভাগ্য হলে খানজাদা বেগমের সাথে কথা বলারও সুযোগ পেতে পারেন! কথাগুলো ভাবতেই ফজিলুদ্দিন আত্মিক উত্তাপ অনুভব করতে লাগলেন

এক সময় মির্জা বাবরসহ খানজাদা বেগম পাহাড়ের পাদদেশে এসে উপস্থিত হলেন এবং ফজিলুদ্দিন অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বোরখা আবৃত খানজাদা বেগমের মুখ দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন

হৃদয়ের আবেগ যাতে বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ না হয়, তারজন্য ফজিলুদ্দিন নিজেকে সংযত করার জন্য কসরত করতে লাগলেন কয়েক পা দূরে থাকতেই ফজিলুদ্দিন মাথা নুইয়ে বাবরকে অভিবাদন জানালেন

মির্জা বাবর ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে গভীর সপ্রশংস সমাহিত চোখে তিনি চতুর্দিক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন

বাবরের বয়স তখন মাত্র পনের বছর কিন্তু তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ চাল-চলন এবং আভিজাত্যসূলভ ব্যবহার দেখে বাবরকে একজন কৈশোর অতিক্রান্ত পরিপক্ক যুবকের মতো অনুমান হলো ফজিলুদ্দিনের বাবরের চাল-চলনও যেন আগের থেকে সতর্ক মাত্র এঘার বছর বয়সে বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন সিংহাসনে আরোহণ করার চার বছর পূর্ণ হয়েছে মাত্র সেজন্য তাঁর বয়স বর্তমান পনের বছরের অধিক নয় কিন্তু বয়সের থেকে তাঁর দেহ এবং মনের বুদ্ধি যেন অনেক বেড়ে গেছে

কষ্টসাধ্য দুর্যোগময় সময় এবং ঘাত-সংঘাতময় জীবন মানুষকে তারাতারি সজাগ এবং পরিপক্ক করে তুলে বাবরের ক্ষেত্রেও যেন সেটাই হয়েছে! সিংহাসনে আরোহণ করার পরে তিনি যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন নানান ঘাত-সংঘাত এবং উত্থান-পতনের মাঝ দিয়ে তিনি দীর্ঘ চারটি বছর অতিবাহিত করতে হয়েছে অবশ্যে সব পুরুষ বয়স বাড়ার সাথে সাথে এক সময় পৌরুষ হয়ে উঠে, কিন্তু ঘাত-সংঘাতে যেন বাবরকে বয়সের তুলনায় অধিক পৌরষত্ব প্রদান করেছে শুধু সরু কোমর এবং অপুষ্ট কাঁধের প্রতি লক্ষ্য করলে, বুঝা যায় বাবর একজন যুবক নয়- একজন কিশোর

পনের বছর বয়স পাহাড়ে উঠার জন্য উপযুক্ত সময় সেজন্য উপাসনা গৃহে উঠে আসার সময় বাবর একটা মালভূমি থেকে আরেকটি মালভূমিতে আসতে সবাইকে পেছনে ফেলে উঠে আসতে লাগলেন উপরে উঠে আসতে মাতৃ এবং বোনকেও সহায় করতে লাগলেন সময়ে সময়ে সরু ঢালু পথে উপরে উঠতে কুতলু নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগম খুবই ক্লান্তি এবং কষ্ট অনুভব করছিলেন

মির্জা বাবরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত উজির--আজম কাশিম বেগ প্রথমাবস্থায় প্রায় বাবরের সমানে সমানে উঠে আসছিলেন, কিন্তু কাশিম বেগ ছিলেন হৃষ্টপুষ্ট স্বাস্থ্যবান সেজন্য তিনি আধা দূর এসেই শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লেন ঘন ঘন নিশ্বাস নিতে লাগলেন

কাশিম বেগের অবস্থা দেখে বাবর দাঁড়িয়ে পড়লেন

জিভার জল লুকোতে পান চাবানোর মতো কাশিম বেগ নিজের লজ্জা এবং অক্ষমতা লুকোতে ফজিলুদ্দিনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে কৌতুক করে বললেন-জ্বনাব, এখানে সিঁড়ি নির্মাণের কথা আপনার মনে পড়ল না কেন?

ফজিলুদ্দিন মাথা নুইয়ে সন্মান সহকারে বললেন- যদি হুজুরের হুকুম হয়..….

কাশিম বেগের অবস্থা দেখে বাবর একখন্ড পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি হাসছিলেন তিনি কিশোরসূলভ চঞ্চলতা এবং সুকুমার মধুর স্বরে কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য করে কৌতুক করে বললেন-মালভূমির উপরে উপাসনা গৃহ নির্মাণের সময় আপনার হৃষ্টপুষ্ট স্থূল দেহের কথা চিন্তা করে নিশ্চয় সিঁড়ি নির্মাণ করাটা উচিত ছিলো, কী বলেন বেগ সাহেব?

কাশিম বেগ সন্মান সহকারে বললেন- আপনার এই অধীনকে সিঁড়িয়েও ঘাম থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হত না, জাহাপনা

কুতলুগ নিগার বেগম কাশিম বেগের কাছে এসে পৌঁছেছিলেন তিনি কৌতুক করে ঠাট্টার স্বরে বললেন- বেগ সাহেব, এই মালভূমির মতো কষ্টকর জায়গায়ই তো রাজাপ্রজা সবাইকে এক সাথে হাঁটতে বাধ্য করে

এবং শাহজাদীকেও...বাবর বোনের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার সুরে বললেন

খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর সুরে সুর মিলিয়ে বললেন- এবং এরকম সময়ে ভ্রাতৃকেও বোনের কথা ভাবতে বাধ্য করে

এরকম হাসি ঠাট্টার মাঝ দিয়ে এসে সবাই এক সময় উপাসনা গৃহের সন্মুখস্থিত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন

নীল গম্বুজের নিচে ছোট সৌধটি বসন্তকালের সূর্যের কিরণ পড়ে ঝিলমিল করতে ছিলো এবং নীল গম্বুজে বসানো বাখর থেকে সূর্যের কিরণ বিকিরণ হয়ে চারদিকে ছিটকে পড়ছিলো চোখে ছাট মেরে ধরছিলো সেই সূর্য কিরণ সেই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য নিরীক্ষণ করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাবর শিশুসুলভ চপলতায় লাফিয়ে উঠলেন দূরের পাতল নীল পাহাড়, সৌধের বারান্দার খুঁটিতে অঙ্কন করা লতাপাতা, গম্বুজে খাটানো নীল বাখর সব জায়গায় সূর্যের রশ্মি পড়ে এক অভূতপূর্ব ঝিলিমিলি পরিবেশ সৃষ্টি করছিলো বসন্তের মৃদু মন্দ সমীরে এক প্রকারের মিষ্টি অনুভূতি সিঞ্চন করে দেহমন রোমাঞ্চিত করে তুলছিলো সবাই সেই নয়নাভিরাম বিরল সৌন্দর্যসম্ভার অভিভূতের মতো উপভোগ করে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন

বাবর, কুতলুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগমকে উপাসনা গৃহের সন্মুখ পর্যন্ত এগিয়ে এনে ফজিলুদ্দিন বারান্দা থেকে নেমে এসে পাথরের সিঁড়ির উপরে দাঁড়ালেন কারণ তিনি বাবরের অনুমতি অবিহনে সভ্রান্ত মহিলা দুজনের সাথে উপাসনা গৃহের ভেতরে প্রবেশ করতে অস্বস্তিবোধ করছিলেন

গৃহের ভেতর অন্ধকার ছিল না যদিও প্রচলিত নিয়মানুসারে মেহরাবের উপর মমবাতি জ্বলছিলো খিড়কি দিয়ে সূর্যের রশ্মি গৃহের ভেতর পড়ার জন্য মমবাতির শিখাগুলো কোনোমতে চোখে পড়ছিলো কিন্তু দেয়ালে অঙ্কিত লতাপাতার উপরে আলো পড়ে লতাপাতার সৌন্দর্য চোখে ছাট মেরে ধরছিলো এবং লতাপাতার সৌন্দর্য অনেক গুণে বাড়িয়ে তুলছিলো

বাবর সেই সৌন্দর্য সম্ভার নিরীক্ষণ করে অতিশয় রূপে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন মমবাতির আলো পড়ে ঝলকে থাকা লতাপাতাগুলো দেখে তিনি খানজাদা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন- যেন ইসলামের বাগান!

খানজাদা বেগম দুষ্টুমি করে বললেন- অভয় পেলে বলতে পারি

নিশ্চয়, বলুন তো কী বলতে চাইছেন আপনি? বাবর কৌতূহল প্রকাশ করে বললেন

খানজাদা বেগম ঘুরে দরজার পাল্লার উপরে খোদিত লতাপাতাগুলোর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন- ওই যে, ইসলামের বাগান সেখানে রয়েছে

খানজাদা বেগম যেগুলো চিত্রর দিকে ইংগিত করেছিলেন, সেইগুলো যেন বহ্নি শিখার মতো জ্বলছিলো সেগুলো যেন রং তুলিকায় অঙ্কিত চিত্র নয়, অগ্নিশিখা দিয়ে অঙ্কিত লতাপাতার চিত্র

কিন্তু একটি সত্যি কথা বলার জন্য ভগ্নীর চোখে দুষ্টুমি ভরা হাসি এবং অভয় খুঁজার কারণ বাবর উপলব্ধি করতে পারলেন না শুধু একটি কথাই তাঁর মনে উদয় হলো, তাঁর ভগ্নী হয়তো লতাপাতার প্রতি ইংগিত করে সমরকন্দে থাকা তাঁর বাগদত্তা আয়েসা বেগমের কথা বুঝাতে চাইছেন! সেজন্য তিনি শুধু সৌজন্যতাবশতঃ বললেন- আপনি ঠিকই বলেছেন, আমারই ভুল হয়েছিলো

এভাবে হাসি তামাশার মাঝ দিয়ে উপাসনা গৃহটি পরিদর্শন করে অভিভূত হয়ে এক সময় সবাই গৃহের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন তাঁদের চোখে-মুখে কৌতুক এবং আনন্দের অভিব্যক্তি দেখে ফজিলুদ্দিন উৎসাহিত হয়ে উঠলেন

বাবর ছাউনিতে ফিরে এসে শিল্পকর্মের পুরস্কার হিসাবে ফজিলুদ্দিনকে খেলাত(রাজা বাদশাহরাঁ প্রদান করা কোন উপাধির সাথে প্রদান করা সাজ-পোশাক) প্রদান করলেন এবং সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত করে একটি ঘোড়া ফজিলুদ্দিনকে প্রদান করার জন্য কাশিম বেগকে নির্দেশ দিলেন

পুরস্কার ঘোষণা করা দেখে আনন্দে ফজিলুদ্দিনের চোখ জলে ভরে উঠলো খানজাদা বেগম ফজিলুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি হাসলেন

সেই হাসির অর্থ উপলব্ধি করে ফজিলুদ্দিনের দেহমন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলো


Comments