ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা
মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
সূচীপত্র
আমাদের পাড়াটা
আমাদের দক্ষিণের পাড়া
আমাদের উত্তর পাড়া (বগুড়া পাড়া)
চরপাড়া
আলীগাওঁ
নিবেদন
আমি কেন
ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিখলাম?
স্বনামধন্য বিখ্যাত মনীষীদের জীবনী
সবাই লেখে, কিন্তু যারা আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই সমাজ
গঢ়েছে, যাদের কৃপাছায়ায় আমরা বড় হয়েছি, তাঁদের বিষয়ে
আমরা ছাড়া আর কেউ লিখবে না জানি। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, তাঁরাও
এই মাটির পৃথিবীর মানুষ-- সমাজের অংশ। তাঁরা আমাদের সমাজের জন্য অনেক কিছু করেছে।
তাঁরা সমাজ পরিচালনা করেছে—আইন শৃংখলা বর্তিয়ে রেখেছে।
ছেলে-মেয়েদের জ্ঞানার্জনের জন্য স্কুল-কলেজ স্থাপন করেছে। আমাদের অভাব পূরণের
জন্য তাঁরা হাজারটা প্রয়াস করেছে। তবে হ্যা, তাঁরা সারা বিশ্বের
নজর কাঢ়বার মতো কোনো কাজ করেনি। তাই তাঁদের জীবনী লেখবার তাগিদা কেউ অনুভব করেনি
এবং মনে হয়, ভবিষ্যতেও কেউ করবে না। ফলে এরাঁ কালে কালে
বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে-- সমাজের কাছ থেকে তো বটেই, নিজেদের
উত্তর পুরুষের কাছ থেকেও । নিজেদের বংশবৃক্ষের প্রয়োজন যে কত, সে
কথা ২০১৪ সালে এনআরসির ফর্ম পূরণ করার সময় নিশ্চয় সবাই অনুভব করেছে। তাই সমাজ
গঢ়ার অখ্যাত কারিগরদের স্মৃতি সজীব করে রাখার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। এই
ক্ষুদ্র বইয়ে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, অনেক স্বনামধন্য
ব্যক্তির পরিচয় লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হল না ৷ তাই তাঁদের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা
করছি। বইটি পাঠকের সমাদর পেলে পরবর্তীতে তাঁদের পরিচয় লেখার প্রয়াস করব। বইটি
প্রস্তুত করতে মজিবর রহমান, আবু বাক্কার সিদ্দিক, আমার
ছোট ভাই হোসেন আলী এবং অনেকের সহায়-সহযোগিতা পেয়েছি। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ
হয়ে রইলাম। বইটিতে রয়ে যাওয়া ভুল- ত্রুটি এবং তথ্য বিভ্রাটের জন্য সদাশয়
পাঠকের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ভুল-ত্রুটিগুলি আমার দৃষ্টিগোচর করলে আমি
কৃতার্থ হব।
বিনত আবুল হোসেইন
যতিগাঁও, বরপেটা, আসাম।
মোবাইল নম্বর- ৭০০২১-১২০১২
ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের
সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আমাদের পাড়াটা
আমাদের গ্রামের প্রকৃত নাম ছিল
জাহানাপাড়। কিন্তু বাইরের লোকেরা দেউলদি বলে জানত। দেউলদি মানে পূব দেউলদি।
আমাদের গ্রামটা বেকি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। বেকি নদীর দু'পাড়ে
দুটি গ্রাম ছিলো। আমাদের গ্রামটা বেকি নদীর পূব পাড়ে অবস্থিত ছিল। তাই নাম
হয়েছিল পূব দেউলদি। বেকি নদীর পশ্চিম পাড়ে আর একটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের নাম
ছিল পশ্চিম দেউলদি। আমাদের গ্রামের নাম পূর্বে পূব বালিকুরিও ছিল। পরে পূব দেউলদি
এবং পূব দেউলদির পরে জাহানারপাড় হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫৮ সালের ২৫
সেপ্টেম্বরে সরকার প্রথম জমি জরিপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। তখনই পর্যায়ক্রমে
অনেক নতুন গ্রাম সৃষ্টি করা হয়েছিলো। লাট মণ্ডলেরা তখন নতুন গ্রামগুলির নাম বিশেষ
পরিবেশ এবং বিশেষত্বের ওপড় নির্ভর করে নিজেদের সুবিধা মতো রেখেছিল। জাহানারপাড়ের
কাছেই ছিল জাহানা বিল। তাই সম্ভবতঃ আমাদের গ্রামের নতুন নামকরণ জাহানারপাড় করা
হয়েছিল। জাহানা বিলের পাড়ে অবস্থিত গ্রামটার নামকরণ করা হয়েছিল জাহানার ঘোলা।
নতুন নামগুলি অনেকে এখনও জানেনা। তাই বাইরের লোকেরাঁ সমগ্র অঞ্চলটাকে পূব দেউলদি
নামেই জানে। আমাদের গ্রামটা আসামের বরপেটা জেলার বাঘবর অঞ্চলে অবস্থিত।
জাহানারপাড় একটি হতদরিদ্র গ্রাম।
গ্রামের মানুষগুলো কৃষিজীবী। অশিক্ষিত। বাইরের বিশ্বের সাথে পরিচয় নাই বললেই চলে।
গ্রামের তিনদিকে জল। উত্তর দিকে বেকি নদী। দক্ষিণে জাহানা বিল। জাহানা বিল মাছের
জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। ইজারদাররা ডাকে নিয়ে মাছ ধরত। জাহানা বিলের দক্ষিণে
রামাপারা, দলাগাঁও পারি দিয়ে গেলে ব্রহ্মপুত্র নদ। ব্রহ্মপুত্র নদীকে লোকে
ব্রহ্মার পুত্র বলে জানে। তাই ব্রহ্মপুত্রকে নদী না বলে নদ বলে। জাহানারপাড় থেকে
জাহানা বিল এক মাইল দুরে অবস্থিত। জাহানা বিল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ এক সময় প্রায়
মাইল দু'য়েক দূরে অবস্থিত ছিলো। উত্তর দিকে বেকি নদী এক মাইল দূরে। গ্রামের
পূর্বদিকে বাঘবর পাহাড়। গ্রামথেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে। বাঘবর পাহাড় ৫২ খাদা
জমির উপড়ে বিস্তারিত বলে ছোট বেলা শুনেছি। (এক খাদায় ১৬ বিঘা।) বাঘবর পাহাড়ের
উত্তব-পূব প্রান্তে বাঘেশ্বরী থান। থানটা খুবই বিখ্যাত। থানটা কমতাপুড়ের রাজা
আরিমত্তই নির্মাণ করেছিলো বলে জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। গ্রামের পশ্চিম দিকে বেকি,
শেওরার পাথার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের সংগম স্থল। জাহানার পাড়ের চার
দিকে কয়েকটা গ্রাম আছে। দক্ষিণ দিকে জাহানার ঘোলা। ঠিক জাহানা বিলের পাড়ে। উত্তর
দিকে রৌমারী এবং বালাজান গ্রাম। জাহানারপাড়, জাহানার ঘোলা,
রৌমারী, বালাজান, মরাভাজ, বাঘবর
প্রভৃতি গ্রামগুলি নিন্ম জলাভূমি এবং বেকি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত। তাই
বৎসরের কয়েক মাস জলের তলে থাকত । প্রায় চার পাঁচ মাস। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিক থেকে
কার্তিকের আগ পর্যন্ত। আমাদের লাগোয়া গ্রাম বাঘবর পাথারের জালাল উদ্দিন আহমেদ
১৯৬৭ এবং ১৯৭১ সালে বাঘবর বিধানসভা সমষ্টির বিধায়ক হয়েছিলেন। একবার বন্যা
সম্পর্কে বিধানসভায় কথা উঠায় তিনি বলেছিলেন- আমার সমষ্টির কথা আর কি বলব,
অধ্যক্ষ মহাশয় । সরভোগ,বরপেটা, জনীয়া, ছেঙা
এইসকল সমষ্টির সব জল আমার সমষ্টি দিয়ে গড়ায়। এখন আপনি নিজেই অনুমান করুন আমার
বাঘবর সমষ্টির বন্যার পরিস্থিতি সম্পর্কে।
জালাল উদ্দিন সাহেব কথাটা যথার্থই
বলেছিলেন। বর্ষায় আমাদের গ্রামের বাড়ীগুলি কচুরি পানার মত ভাসতো। হাঁসেরা সাঁতার
কাটতো মনের আনন্দে । হ্যাজাক লাইট দিয়ে মাছ ধরতো জল কমে গেলে। রাতের বেলা হ্যাজাক
লাইটগুলি শারী শারী জোনাকি পোকার মতন চলাফেরা করতো। হ্যাজাকের সংখ্যা বেশি হলে
ফুলের মালার মত দেখা যেতো। গ্রামের বৃদ্ধ বণিতা, জী-বৌয়েরা সেই
দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগ করত প্রাণ ভরে। আমাদের কাকা ভেলু মিয়াও হ্যাজাক লাইট
জ্বালিয়ে মাছ ধরত। আলীগাঁয়ের এলাহি বক্সেরও হ্যাজাক দিয়ে মাছ ধরার নেশা ছিল।
এলাহি বক্স আমার কাকীর মামাত ভাই। সে মাজে-মধ্যে আমাদের বাড়ীতে গিয়ে কাকার সাথে মাছ ধরতে
যেত। একদিন তারা অনেক মাছ ধরেছিল। বলতে পারেন নৌকার খোল ভর্তি ।
আমাদের বাবা মিঠু মিয়া হ্যাজাক দিয়ে
মাছ ধরত না। সে মাছ ধরত দোয়াড়ি দিয়ে। কাকা মাজে-মধ্যে দাঁওন দিয়েও মাছ ধরত।
দাঁওন দুই প্রকারের ছিল। একটাকে বলত উরা দাঁওন এবং আরেকটাকে বলত ডুবা দাঁওন। উরা
দাঁওন পানীর ওপরে রশি টানিয়ে সেই রশিতে বরশী বেধে বরশীর মুখে মাছ গেঁথে দিত এবং
ডুবা দাঁওনে রশীর সাথে বরশি বেধে বরশির মুখে কেঁচু বা মাছ গেঁথে পানীর তলে ডুবিয়ে
দিত। উরা দাঁওনে বোয়াল মাছই ধরত বেশি। ডুবা দাঁওনে নানা রকম মাছ ধরত। পানী কম
থাকলে আমিও বাড়ীর কাছে উরা এবং ডুবা দুই ধরণের দাঁওনই দিতাম। এই কাজে আমাদের দাদী
বাহারজান নেসা আমাকে সাহায্য করত। আমাদের বাড়ীর সামনে এবং পেছনে দুটি ডোবা ছিল।
সেখানে চুঙা পেতেও মাছ ধরতাম। সন্ধ্যে বেলা চুঙাজলে ডুবিয়ে দিয়ে আসতাম এবং সকাল
বেলা সেই চুঙা তুলে আনতাম। চুঙা ভর্তি হয়ে মাছ থাকত ৷ বিশেষ করে জিওল মাছ।
আমাদের পাড়ার বাড়ীগুলি ফাঁক ফাঁক
ছিল। ছামের মাথায় মাথায়। প্রায় বিশ পঁচিশটা পরিয়াল বাস করত আমাদের পাড়ায়।
একমাত্র যদু মুন্সি ও মাতাব আলী মুন্সির বাইরে সবাই নিরক্ষর ছিলো। পাড়ার সবার
সাথে সবার সৌহৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। আমোদ-প্রমোদের কোনো সাধন ছিলনা, তাই
সন্ধ্যেবেলা ভাত খেয়ে একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যেতো। অনেক রাত অবধি গল্প-গুজব
করতো। এতে সম্পর্ক আরও নিবিড় হতো। আগেই বলেছি আমাদের পাড়াটা বছরের বেশির ভাগ
সময় জলের তলে থাকতো, তাই বর্ষায় নৌকা ছাড়া চলার কোনো সাধন ছিল না।
সবার আবার নৌকাও ছিল না। নৌকা থাকলেও বাওয়ার সমস্যার জন্য সবাই নৌকা নিয়ে হাটে
যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই হাটবারগুলোতে যারা নৌকা নিয়ে আগে বেরোত তাঁরাই পাড়ার
লোকদের ডেকে ডেকে নৌকায় তুলে হাটে নিয়ে যেতো। ঝঞ্জা হলে ঘর-দুয়ার ঠিক আছে কিনা
ডেকে ডেকে একে অপরের খবর নিতো।
আমাদের বাড়ি থেকে বাঘবর পাহাড় পূব
দিকে ছিলো। বাঘবর বরপেটা জেলার একমাত্র পাহাড়। বাঘবর পাহাড়ের পাদদেশে বাঘবর
থানা। ১৯৫৭ সালে স্থাপিত। বিষ্ণুরাম মেধি গৃহমন্ত্রী থাকাকালীন থানাটা স্থাপন করা
হয়েছিল। আমি নিজে থানার ঘরগুলো বানাতে দেখেছি, মা অথবা দাদীর
সাথে মামাদের বাড়ী যাওয়ার সময়।
প্রথমে বুধবারে হাট বসত বাঘবর পাহাড়ের
পাদদেশে। থানার কাছে। সেখানে থানার পুলিসরা মাঝে- মধ্যে তরু-তরকারি কিনে পয়সা দিত
না। তাই একদিন সেই পয়সা নিয়ে গণ্ডগোল হয় এবং হাট থানার নিকট থেকে স্থানান্তর
করে পূর্বদিকে কিছুদূরে মাথাউরির দক্ষিণ পাশে বসায়। তখন কেশব চৌধুরী, উপেন
পাটোয়ারী এবং রামেশ্বর গাঁওবুড়ারাঁ বাঘবরের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।
এখন বাঘবর পাহাড়ের চার দিকে বসতি।
রামাপাড়া, ধলাগাঁও, জাহানারপাড়,
রৌমারি, সুতিরপাড়, আলীগাঁও প্রভৃতি
গ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পরার ফলে লোকগুলো উঠে এসে বাঘবর পাহাড়ের
চারদিকে বসতি করেছে। আগে বাঘবর পাহাড়ের পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকে অসমীয়া হিন্দু
প্রধান গ্রাম ছিলো এবং উত্তর দিকে কয়েক ঘর বড়ো লোক ছিলো। বাঘেশ্বরী থান থেকে
পূর্ব এবং উত্তর দিকে বিস্তৃত ছিলো গোবিন্দপুড় রিজার্ভ । গোবিন্দপুড় রিজার্ভে
বাঘ ছিলো। আলীরপামের তমছেরকে গোবিন্দপুর রিজার্ভে বাঘে মেরে ছিলো। একবার বাঘবরের
লেম্প কাছাড়ি বন্দুক দিয়ে গুলী করে একটি বাঘ মেরেছিলো। বাঘটা বাঘবর থানার সামনে
বিশেষ প্রকারে বেধে খাড়া করে রেখেছিলো। সেই বাঘটি আমিও দেখেছিলাম। বাঘবর পাহাড়ের
পশ্চিম দিকে তখন কোনো বসতি ছিল না। আমাদের বাড়ি থেকে বাঘবর যেতে হলে একটি সুনসান প্রান্তর
পাড়ি দিয়ে যেতে হত। একা যেতে গা ছমছম করতো। বাঘবর পাহাড়ে বাঘ ছিলো বলে গুজব
ছিলো। অবশ্য কেউ কোনোদিন বাঘ দেখেছে এ রকম কথা সুনিনি। তবে, একবার দাদীর
সাথে আলীগাঁও যাওয়ার সময় শিয়াল দেখেই বাঘ বলে ভেবে ভয়ে ভয়ে বাঘবর থানা
পর্যন্ত গিয়েছিলাম।
গোবিন্দপুর রিজার্ভ থেকে মাঝে-মধ্যে
জংলা মহিষ আমাদের গ্রামে গিয়ে ফসল খেয়ে অনেক ফসল অনিষ্ট করতো। তাই মহিষ তাড়ানোর
জন্য প্রায় সবার বাড়িতে ফালা থাকতো। মাঝে-মধ্যে দিনের বেলাতেই আমাদের গ্রামে
বাঘবর পাহাড় থেকে জংলী যেত। একদিন সকাল বেলা এক পাল জংলী গিয়েছিল আমাদের পাড়ায়।
আমি তখন খুবই ছোট। কোনোদিন জংলী দেখিনি তাই এন্দুর ভেবে দাদীকে ডেকে বলেছিলাম- দেখ
দেখ, দাদী, কত বড় বড় এন্দুর এসেছে। দাদী বাইরে বেড়িয়া
এসে বলেছিলো- ওগুলো এন্দুর নয়, জংলী। বাঘবর পাহাড় থেকে এসেছে।
গ্রামের প্রধান ফসল ছিলো চিনাধান এবং
রবিশস্য- গম, সরিষা, মাসকালাই, ধইনা, তিল,
তিসি প্রভৃতি । কৃষকরা ধান অবশ্যে বপন করত; তবে, একটু
আগ মরশুমে বর্ষা হলেই সেই ধান জলে তলিয়ে যেত। তাই কৃষকেরা ধানের থেকে রবিশস্যের
ওপড়েই অধিক নির্ভরশীল ছিল। যাদের মাটি-বৃত্তি কম তারা বর্ষার মরশুমে অন্য গ্রামে
গিয়ে কামলা বেচত। আর যাদের অৱস্থা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ছিল তারা বাড়িতেই থাকত এবং
ছেলে-পিলে নিয়ে হই হুল্লোড় করে দিন কাটাত।
আমাদের পাড়াটা কারিকর পাড়া নামে
পরিচিত ছিল। কারণ পাড়াটায় কারিকর সম্প্রদায়ের লোক বাস করত । দুই চারটি বাড়ীতে
কাপড় বুনত, বিশেষ করে বর্ষার মরশুমে— - কৃষিকর্ম
না থাকলে। সে জন্যে তাঁতের খট্ খট্ শব্দও শুনা যেত সেই হই-হুল্লোড়ের মধ্যে । আমার
বাবাও বর্ষার মরশুমে কাপড় বুনত। এম, ই স্কুলে পড়া অবস্থায় গ্রীষ্মের
ছুটিতে বাড়ি গেলে আমিও কাপড় বুনতাম বাবা বাড়ী নাথাকলে। খুবই ভাল লাগত কাপড়
বুনে।
আমাদের পাড়ার লোকগুলো সারা বর্ষাই
জলের মধ্যে বাস করত, অথচ তাদের খাবার জলের ব্যবস্থা ছিল না।
বর্ষাকালে বানের জল খেত এবং খরা মরশুমে মাটিতে কুয়া খুঁড়ে জল তুলত। জলের অভাব
দূর করার জন্য আমাদের নানা ধনাই হাজি ১৯৬০ সালে আমাদের বাড়ীতে একটি ইদারা গেঁথে
দিয়েছিল। আলীগাঁয়ের বিনোদ মুন্সী সেই ইদারা গেঁথে ছিল। আমাদের পাড়ায় ছনের ছোট
একটি মসজিদ গৃহ। মসজিদের বাইরে অন্য কোনো অনুষ্ঠান ছিলনা আমাদের পাড়ায়। ঈদের
নামাজ পড়ার জন্য আমাদের কোনো ঈদগাহ ছিল না। মসজিদের সামনে যে ছোট এক টুকরো ছোট
জমি ছিল সেখানেই ঈদের নামাজ পড়া হতো। বর্ষায় সেই জমি টুকু বন্যার জলে তলিয়ে
গেলে যদু জেঠার বাড়িতে ঈদের নামাজ পড়া হতো। অবশ্যে এক বছর আমাদের উত্তর পাড়ার
গুমান হাজি সাহেবদের মসজিদের মাঠেও ঈদের নামাজ পড়েছিলাম। পরে অবশ্যে আঞ্চলিক
মুরব্বীরা মিলে বাঘবর পাথারের উত্তর পূর্ব প্রান্তে দানেশ মুন্সির ভাতিজা ইয়াদ
আলীর বাড়ীর কাছে একটি ঈদগাহের ব্যবস্থা করেছিলো। সেখানেই পরে আমরা দুই ঈদের নামাজ
পড়েছি।
আমাদের পাড়াটার একটা রেকর্ড ছিলো।
বাঘবর থানার কাছে হলেও কোনোদিন কারো নামে কোনো কেস হয়নি। অর্থাৎ কেউ কোনো
অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়নি।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
জাহানারপাড় গ্রামে মোট পরিয়ালের সংখ্যা ছিলো ২৪৬ এবং ভোটার ছিলো ৭১১ জন। আমাদের
পাড়ায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিলো ৬১ জন।
আমি প্রথমে পাখির চোখে ভোটার তালিকা
অনুসারে আমাদের পাড়ার যারা আমাকে কোলে পিঠে নিয়েছে ও আদর-সোহাগ করেছে তেমন
মুরব্বীদের বিষয়ে এবং পরে গ্রামের অন্যান্য মুরব্বীদের বর্ণনা দেওয়ার প্রয়াস
করবো-
মকবুল শ্বেখঃ-
ভোটার তালিকা অনুসারে আমাদের পাড়ার প্রথম ভোটার ছিলো মকবুল শেখ। তিনি মাঝারি
গঠনের ছিলেন এবং গাত্রের রং কালো ছিলো। মকবুল শেখের বাবার নাম ছিলো মুছা শেখ।
মকবুল শ্বেখ আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা ছিলেন। আমার জেঠির নাম ছিলো শুভক্ষন নেছা।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মকবুল শ্বেখের বয়স ৪৯ বছর এবং জেঠির বয়স ৩৫ বছর
ছিলো। মকবুল শ্বেখ একটু গোয়ার প্রকৃতির লোক ছিলেন। কাউকে তেমন তোয়াক্কা করতেন
না। নিজের খেয়াল-খুশি মতে চলতেন। কারো সাথে তেমন মেলা-মেশাও করতেন না। বাড়িতে
গেলে অবশ্যে খাতির করতেন । তিনি কৌতুকপ্রিয় লোক ছিলেন।
বাঘবর থানাটা নদীর অববাহিকা অঞ্চলে
অবস্থিত ছিলো। তাই বর্ষার মরশুমে ভাড়ায় নৌকা নিতো। আমাদের একটি ৩২ হাত নৌকা
ছিলো। আমাদের নৌকাটা কোনো কোনো বছর থানা থেকে ভাড়ায় নিতো। মকবুল জেঠা কিছুদিন
সেই নৌকায় ছিলো। একদিন জেঠার কাছে গিয়ে বসতে তিনি বলছিলেন, কাছিমের
মাংস দেখতে খুবই সুন্দর- লাল টুকটুকে।
কোথায় দেখেছ, জেঠা? আমি
প্রশ্ন করেছিলাম।
জেঠা উত্তরে বলেছিলো- থানায় দেখেছি।
বাবুরা খায়।
বাবুরা কি নিজেরাই রান্না করে খায়
না-কি?
না, আমি রেধে দিই।
আমি কৌতুক করে বলেছিলাম- তাহলে একটু
চেখে দেখতে পারলে না।
মকবুল শ্বেখ বলেছিল- একেবারে চেখে
দেখিনি বলাটা ঠিক হবে না। তরকারির লবণ চাখার সময় জোল চেখে দেখেছি। জোল খুবই সুস্বাদু
হয়েছিলো। মাংসটা মনে হয় আরও সুস্বাদ লাগতো। ধর্মে বাধা আছেতো, তাই
মাংসটা খাইনি।
এমনই ছিলো আমাদের মকবুল জেঠা। কোনো
লুকটাক করে কথা বলতেন না ।
আমাদের জেঠি শুভক্ষন নেসা খুবই
শান্তিপ্রিয় এবং সরল সহজ ছিলো। জেঠির শরীরের রং কালো এবং একটু খাটো গঠনের ছিলেন।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। তিন ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল বারেক, ইয়াকুব আলী, খতেমন নেসা,
হাসেন আলী এবং রহম আলী।
আমাদের পাড়াটা ব্রহ্মপুত্র নদের
ভাঙনের কবলে পরেছিলো আশীর দশকের শেষ ভাগে। নদী ভাঙনের ফলে আমাদের পাড়ার বেশি
সংখ্যক পরিয়াল বাঘবর পাথারে স্থানান্তর হয়েছিলাম। মকবুল জেঠা মরাভাজ গ্রামে উঠে
গিয়েছিলেন। তাই পরে তেমন যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। তাই কে কখন মৃত্যু বরণ করেছে
সঠিক করে বলা সম্ভব হল না। অবশ্যে জেঠা-জেঠি উভয়ে অনেক দিন আগেই মৃত্যু বরণ
করেছে।
আব্দুল বারেক-
আব্দুল বারেক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি লম্বা ছিপছিপে এবং শরীরের রং কালো।
আমার থেকে তিন/চার বছরের বড়। আমারা কাদং হাইস্কুলে একসাথে লেখা-পড়া করেছি। তিনি
আমার থেকে তিন ক্লাস ওপড়ে ছিলো। তিনি ২০১০ সালে অবসর নিয়েছেন। ২০১২ সালে
হজ্বযাত্রা করেছিলেন। স্বভাব অমায়িক। শিক্ষক হলেও তেমন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত
নয়। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে। তাঁর স্ত্রীর নাম আম্বিয়া খাতুন। আলীগাঁয়ের
বিনোদ মুন্সির মেয়ে। খুবই নম্র স্বভাবের। তাঁদের চার ছেলে, দুই মেয়ে।
ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে আমজাদ আলী, ইমান আলী, বাহারুল ইসলাম,
নুরজাহান বেগম, রেহেনা খাতুন, আনোয়ার হোসেন,
এবং মহিবুল হক। আমজাদ আলী অধিবক্তা, বরপেটা কোর্টে
উকালতি ব্যবসায়ে নিয়োজিত। ইমান আলী বি, এ, পাস। ব্যবসায়ে
নিয়োজিত। বাহারুল ইসলাম বি, এ পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত। নুরজাহান
বেগম বি, এ পাস। বিয়ে হয়েছে নওকুসির শফিকুলের সাথে। শ্বফিকুল ইসলাম
হাইস্কুলের শিক্ষক। রেহেনা বেগম বি,এসসি। তার বিয়ে হয়েছে নিজ বাঘবরের
আব্বাস আলীর সাথে। আব্বাস আলী বিএসসি পাস। সে টেট উত্তীর্ণ শিক্ষক। রেহেনা খাতুন
প্রাইভেট স্কুলের বিএসসি শিক্ষক। আনোয়ার হোসেন হায়ার সেকেন্ডারি উত্তীর্ণ। সে
ভারতীয় সেনা বাহিনীতে কর্মরত। মহিবুল ইসলাম বি, এ পাস। সে আসাম পুলিশে
কর্মরত।
ইয়াকুব আলী-
মাজু ছেলে ইয়াকুব আলী মাঝারি গঠনের এবং গাত্রের রং কালো ছিলো। সে লেখাপড়া
শেখেনি। তাই বাড়িতেই চাষ-আবাদ করতো। সে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের হুটু মিয়ার
মেয়ে বাহারজান নেসাকে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে
রমজান আলী, হানিফ আলী, কাজুলি খাতুন
এবং কহিনুর খাতুন। রমজান আলী নিরক্ষর। হানিফ আলী, কাজুলি খাতুন
এবং কহিনুর খাতুন স্বাক্ষর। ইয়াকুব আলী ২০০৪ সালে প্রবল বন্যার সময়ে মৃত্যুবরণ
করেছে। বাহারজান নেসা এখনও জীবিত ।
খতেমন নেসা-
খতেমন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণা ছিলো। নিরক্ষর। স্বভাব নম্র ছিলো। তার বিয়ে
হয়েছিলো বাঘবর পাথারের মজিবরের সাথে। সন্তান-সন্ততি জন্মের আগেই সে মৃত্যু বরণ
করেছে।
হাসেন আলী-
হাসেন আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। ম্যাট্রিক পাস। সে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলো।
তার স্বভাব নম্র ছিলো। সমাজের সাথে খুব সদ্ভাব রেখে চলত না। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত
হয়ে থাকতো। সে বিয়ে করেছিলো সত্রকনরার আজগর আলীর মেয়ে সোনাবানুকে। তাদের দুই
ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হামিদা খাতুন, খালিদা
খাতুন, সাদ্দাম হোসেন এবং শ্বফিকুল ইসলাম। হামিদা খাতুন এবং খালিদা খাতুন
ম্যাট্রিক পাস। তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। সাদ্দাম হোসেন বি, এ পাস। সে
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। হাসিনা আকতার স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। হাসেন আলী
২০১৫ সালে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে।
রহম আলী-রহম
আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে ম্যাট্রিক পাস। ফরেস্ট গার্ড হিসাবে কর্মরত।
সে বিয়ে করেছে বুড়ীগাঁয়ের আক্কেল দর্জির মেয়ে রহিমা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে
চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আফজালুর
রহমান, জেসমিনা খাতুন, রোশেনারা খাতুন এবং রাশিদুল ইসলাম।
আফজালুর রহমান হায়ার সেকেন্ডারি পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত। জেসমিনা খাতুন
ম্যাট্রিক পাস। সে গৃহিনী। রোশেনারা খাতুন হায়ার সেকেন্ডারি পাস। তার বিয়ে হয়ে
গেছে। রাশিদুল ইসলাম স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
খেদিনাঃ- আমাদের পাড়ার
প্রথম বাড়িটা ছিলো খেদিনা শ্বেখের। তবে, ভোটার তালিকায় অজ্ঞাত কারণে তার গৃহ
নম্বর ছিলো দুই। আমাদের পাড়ার সবাই কারিগর সম্প্রদায়ের লোক ছিলো। আমাদের
তুচ্ছার্থে অনেকে জোলাও বলত। একমাত্র খেদিনা ছিলো গেরস্থ সম্প্রদায়ের লোক। তিনি
গেরস্থ হলেও আমাদের কারিগর সম্প্রদায়ের সমাজে বাস করতো। খেদিনার আর্থিক অবস্থা
ভালো ছিলো না। কামলা বেচে চলত। আমাদের অঞ্চলে তখন ছনের গৃহ ছাড়া কোনো গৃহ ছিল না।
অবশ্যে অন্যান্য অঞ্চলে দুই একটি টিনের গৃহ যে ছিল না তা নয়। তবে খুবই কম ছিল।
তখন একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিলো। টিনের ঘরে খড়ির বেড়া ঐটাই হলো শ্বেখ পাড়া।
খেদিনা ছনের গৃহ ভালো ছাইতে পারতো। তাই গৃহ ছাওয়ার মরশুমে তাঁর খুব কদর বাড়তো। আমাদের পাড়ার
গৃহ ছাওয়ার কাজ খেদিনাই করতো।
খেদিনা লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। গঠন
ছিপছিপে। দেখতে খুবই সুন্দর ছিলো। খেদিনার বউয়ের নাম ছিলো ফুল খাতুন নেসা। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে খেদিনার বয়স ছিলো ৬৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী ফুল খাতুন
নেসার বয়স ৩৫ বছর। ফুল খাতুন নেসা লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। তিনি মিশুক এবং মিস্ট
স্বভাবের ছিলেন। খেদিনা দম্পতির ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম ছিলো যথাক্রমে আব্দুল হক, ফজল হক, হাসেনা
বানু, খবির উদ্দিন এবং আয়নাল হক।
আব্দুল হক-
আব্দুল হক লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। সে বয়সে আমার থেকে কিছুটা বড় ছিলো। সে
লিখা-পড়া শেখেনি। সে তার বাবার সাথে কামলা বেচত। সে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে।
ফজল হক-
ফজল হক লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। সে আলীগাঁয়ের দানেশ মুন্সীর বাড়িতে অনেক বছর চাকর
ছিলো। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের নুজি খাঁর মেয়েকে। তাঁরা এখন গুয়াহাটিতে
বাড়ি-ঘর করেছে। ব্যবসা করে।
হাসেনা বানু-
হাসেনা বানু লম্বা এবং ফর্সা। সে দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলো। তার বিয়ে হয়েছিলো
আমাদের পাশের গ্রাম সেওরার পাথারের পঞ্চ ফকিরের ছেলে কছিম উদ্দিনের সাথে। তার
ছেলে-মেয়ের বিষয়ে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি।
খবির উদ্দিন-
খবির উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে আমাদের বাড়িতে কয়েক বছর চাকর ছিলো। তার
স্বভাব খুবই অমায়িক। কোনোদিন কাজে ফাঁকি দিত না। খুবই বিশ্বস্ত ছিলো সে। এখন সে
কৃষিকাজ করে। তাঁর ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীর বিষয়ে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে
পারিনি।
আয়নাল হক-
আয়নাল হক খাটো এবং ফর্সা। সে কিছুদিন স্কুলে গিয়েছিলো। তবে, অর্থনৈতিক
অবস্থা খারাপ ছিলো বলে লেখা-পড়া বেশিদূর এগুতে পারেনি। প্রাইমারি পাশের আগেই
লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়েছিলো। তবে, তার আত্মসন্মানবোধ ছিলো। কোনোদিন কামলা
বেচেনি। গুয়াহাটিতে রিক্সা চালাতো। পরে কয়লার খনিতে কামলা যোগান দিয়ে সর্দারি
করতো।
নান্দু শ্বেখঃ- নান্দু শেখ
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে রোগা এবং দুর্বল ছিলো। সম্ভবতঃ
হাঁফানি ছিলো। নান্দু শ্বেখের বাবার নাম সাহাব আলী। নান্দু শ্বেখ কৃষিকাজ করতেন।
তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো শ্বরিফন নেছা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নান্দু
শ্বেখের বয়স ছিলো ৫০ বছর এবং তাঁর স্ত্রী সরিপন নেসার বয়স ৪০ বছর। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চারজন। তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম ছিলো, ইসমাইল
আলী, আব্দুল আলী, বুড়ী এবং শুকুর আলী। কেউ লেখা-পড়া
শেখেনি। বুড়ী নামটা কেমন জানি বেমানান লাগে। তার অন্য নাম থাকতে পারে, তবে
আমরা বুড়ী বলেই জানতাম ৷
ইসমাইল-
ইসমাইল লম্বা এবং কালো ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ২৫
বছর। কৃষিকাজ করতেন। তিনি সহজ-সরল এবং মিশুক প্রকৃতির লোক ছিলেন।
আব্দুল আলী-
আব্দুল আলী লম্বা এবং কালো ছিলো। সে ছিপছিপে গঠনের ছিলো। আব্দুলের বয়স ছিলো
অনুমান ১৮ বছর। আমার থেকে কিছুটা বড়। সে কৃষিকাজ করতো এবং কামলা বেচত।
বুড়ী-
বুড়ী লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। কম বয়সেই তার বিয়ে হয়েছিলো। তার বিয়ের
সময় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সেন্দুর নেয়নি বলে সেদিন রাতে বিয়েটা পড়ানো
হয়নি। পরের দিন আলীরপাম বাজার থেকে সেন্দুর আনার পরে বিয়ে পড়িয়েছিলো। আমি তখন
মামাদের বাড়িতে থেকে লেখা-পড়া করতাম। পূজার ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলোম। তখনই
ঘটেছিলো ঘটনাটি। নান্দুর বাড়িতে বাড়তি গৃহ ছিলনা বলে বরযাত্রীদের আমাদের গোয়াল
ঘরে বসতে দিয়েছিলো। সেদিন আমরা সারারাত জেগে বসেছিলাম। তাই কথাটা এখনও মনে আছে।
শুকুর আলী-একেবারে
ছোট ছেলের নাম ছিল শুকুর আলী। ডাক নাম ছিলো গুদু। সে ছোট বেলা আমার খেলার সাথী
ছিলো। বরপেটা জেলার ফেঙুয়াতে ওদের আর একটি বাড়ি ছিলো। মনে হয় ওরা ১৯৬৯ সালে
জমি-বাড়ি বিক্রী করে ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলো। ওদের জমি-বাড়ি আমাদের বাবা কিনে
নিয়েছিলো। নান্দু কেন জানিনা, আমাদের কাছে জমি বিক্রী না করে প্রথমে
আমাদের যদু মুন্সির কাছে বিক্রী করেছিলো। জমি বিক্রীর আগে নান্দু সব সময় আমাদের
বাড়ী আসতো। জমি বিক্রীর পরে নান্দু আমাদের এড়িয়ে চলতো। এই এড়িয়ে চলার কারণ কি
খোঁজতে গিয়ে আমাদের বাবা দেখে যে নান্দু মিয়া ইতিমধ্যে যদু মুন্সির কাছে জমি
বিক্রী করেছে।
নান্দুর জমির দুই পাশে আমাদের জমি
ছিলো। সেই সুবাদে আমরা প্রথমে জমি পাওয়ার দাবিদার ছিলাম, কিন্তু নান্দু শেখ
আমাদের না জানিয়ে যদু মুন্সির কাছে জমি বিক্রী করাতে বাবা আমাদের পাড়ার লোকদের
কথাটা অবগত করে। তবে পাড়ার লোকেরা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় বাবা
তদানীন্তন আমাদের লাটের মন্ডল গুণমণি দাসের কাছে গিয়ে এই বিষয়ে নালিশ করে। তখন
গুণমণি দাস এসে পাড়ার লোকদের ডেকে বলে যে, যেহেতু নান্দুর
জমির দুই পাশেই মিঠু মিয়ার জমি, তাই জমি মিঠু মিয়া পাবে। তবে হ্যা,
মিঠু মিয়া যদি জমি কিনতে অপারগ হয়, তখন অন্যে কিনতে
পারবে। গুণমণি মন্ডলের এই সিদ্ধান্তের পরে যদু মুন্সি জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য
হয়েছিলো এবং বাবা জমি কিনে নিয়েছিলো।
নান্দু মিয়া ফেঙুয়া যাওয়ার অনেক দিন
পরে শুকুর আলী আমাদের বাড়ি এসেছিলো, তবে, তাকে আমি চিনতে
পারিনি। এমনই পরিবর্তন হয়েছিলো তার চেহেরা।
নান্দু শ্বেখের গৃহিনী শরিপন নেছা
সম্ভবতঃ ১৯৬৮ সালে মারা গিয়েছিলো। নান্দু তখন ঝুমরের মাকে বিয়ে করেছিলো। নান্দুর
দ্বিতীয় স্ত্রীকে সবাই ঝুমরের মা বলেই ডাকতো, তাই আসল নাম
আমরা কখনো শুনিনি। ঝুমরের মার প্রথমে আগমন্দিয়ায় বিয়ে হয়েছিল। তাঁর প্রথম
স্বামী মৃত্যু বরণ করেছিলো। তাঁর আগের স্বামীর পক্ষে দুটি সন্তান ছিলো। একটি মেয়ে
এবং একটি ছেলে। ছেলের নাম ঝুমর। এই সুবাদেই সবাই তাঁকে ঝুমরের মা বলে ডাকতো।
মেয়ের নাম কি ছিল এখন মনে নেই। মেয়েটির বিয়ে দিয়েছিলো নান্দুর আগের পক্ষের
ছেলে আব্দুলের সাথে।
ফেঙুয়ার পরিয়াল-
ফেঙুয়ার একটি পরিয়াল আমাদের পাড়ায়
বাস করতো। ১৯৬৬ সালের আগেই তাঁরা আমাদের কাছে জমি বিক্রী করে আমাদের পাড়া ছেড়ে
ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলো। সেই জমি বিক্রী দলিল মতে তাঁরা ১৯৫৯ সালে আমাদের কাছে জমি
বিক্রী করেছিলো। সেই জমি বিক্রীর দলিল এখনও আমাদের কাছে আছে। তাঁদের বাড়িতে
মাঝে-মধ্যে ফেঙুয়ার যদু মিয়া কলের গান নিয়ে যেতো। তখন আমরা সবাই গোল হয়ে বসে
সেই কলের গান শুনতাম। সাধু মিয়ারাঁ তিন ভাই ছিলো। আলিমুদ্দিন, সাধু
মিয়া এবং নায়েব আলী।
আলিমুদ্দিন-
আলিমুদ্দিনকে আমি দেখিনি। শুনেছি, তিনি এবং তাঁর স্ত্রী কদবানু একটি ছেলে
সন্তান জন্মের পরেই মারা গিয়েছিলেন। সেই শিশু সন্তানের নাম ছিলো ইন্তাজ আলী।
ইন্তাজ আলীকে সাধু মিয়া এবং নায়েব আলী লালন-পালন করে মানুষ করেছিলেন। আমি ইন্তাজ
আলীকে দেখেছি। তিনি তখনও বিয়ে- থাওয়া করেননি। স্কুলে লিখা-পড়া শিখত। তাই সবাই
তাঁকে সরকার বলে ডাকতো। তিনি মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো।
শরীরের রং শ্যামলা হলেও তিনি সুদর্শন ছিলেন। ইন্তাজ আলীর স্ত্রীর নাম সূর্যবানু।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয় জন। পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
ময়নাল হক, মেহেরজান নেসা, বাহারজান নেসা,
মানিকজান নেসা, বেগম, বাছেদ আলী,
কাশেদ আলী, নাসের আলী এবং ইমরান আলী ।
২০২০ সালে আমি ফেঙুয়া গিয়েছিলাম। তখন
ইন্তাজ আলীকে আমি শয্যাগত দেখে এসেছিলাম। পরে খবর শুনেছি, তিনি উক্ত
সালেরই জুন মাসে মারা গিয়াছেন।
সাধু মিয়া-
সাধু মিয়া লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। খুবই মিস্টভাষী এবং মিশুক
প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি বালাজানের বিখ্যাত দেওয়ানী আব্বেছ আলী দেওয়ানীর মেয়ের
জামাই ছিলো। ওনার স্ত্রীর নাম ছিলো ফুলমতী নেসা। ফুলমতী খুবই সুন্দরী ছিলেন।
ফুলমতী লম্বা, ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
সাতজন। ছয় মেয়ে, এক ছেলে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে উজালা খাতুন,
সমেজ উদ্দিন, সখিনা খাতুন, জরুনা খাতুন,
সুরমা খাতুন, আসমা খাতুন এবং নূরজাহান বেগম। উজালা
খাতুন আমার সমবয়সী ছিলো। সমেজ উদ্দিন আমার থেকে কিছু ছোট ছিলো। তারা মাঝারি গঠনের
এবং ফর্সা ছিলো। অন্যান্য মেয়েদের আমি দেখিনি। সামেজ উদ্দিনের ছেলে আয়ূব আলী।
আয়ূব আলী স্নাতক। আয়ুবের স্ত্রীর নাম সুলতানা রেজিয়া। সুলতানা রেজিয়া বি,
এ-বি,টি। হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষয়িত্রী। তাঁদের
একমাত্র ছেলের নাম ঋদেন আহমেদ।
সাধু মিয়া ১৯৮৯ সালে এবং তাঁর স্ত্রী
ফুলমতী ২০১৩ সালে মারা গেছে।
নায়েব আলী-নায়েব
আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলেন। তিনি দেখতে সুদর্শন ছিলেন। তিনি
মিস্টভাষী এবং সামাজিক ছিলেন। সবার সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম
নবিরন নেসা। তিনি মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে সাত জন। পাঁচ
মেয়ে, দুই ছেলে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আউসী নেসা, সুরা খাতুন,
বাদশাহ মিয়া, ফতে খাতুন, ময়না খাতুন,
রমজান মিয়া এবং নমিসা খাতুন । আউসী নেসা বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোট
ছিলো। সে দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলো। মাঝারি গঠনের ছিপেছিপে এবং ফর্সা ছিলো।
ছেলেবেলা আমরা একসাথে খেলা-ধূলা করতাম। অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের দেখলেও তাদের কথা
আমার মনে নেই।
মিঠু মিয়াঃ- মিঠু মিয়া
আমাদের বাবা। তাঁর বাবার নাম বুদ্ধ মল্লিক। বাবারা দুই ভাই ছিলো। মিঠু মিয়া
এবং ভেলু মিয়া । আমাদের নিজা কোনো ফুফু ছিল না। বাবার বয়স যখন ১৪ বছর এবং কাকার
৪ বছর, তখন গাছ কাটতে গিয়ে গাছের তলায় চাপা পড়ে দাদু মারা গিয়েছিলেন।
তখন দাদী অনেক কষ্টে কাপড় বুনে বাবা এবং কাকাকে মানুষ করেছিলেন। দাদী দেখতে খুবই
সুন্দরী ছিলেন। বৃদ্ধা বয়সেও কাঁচা হলুদের মতো ছিলো তাঁর শরীরের রং। বাবা এবং
কাকা উভয়ে দাদীর খুবই ভক্ত ছিলো। দাদীর কথার বাইরে তাঁরা কোনো কাজ করতেন না। ১৯৭৪
সালে বার্ধক্যজনিত কারণে দাদী মৃত্যু বরণ করেছে।
মিঠু মিয়া মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল
শ্যামবর্ণ ছিলো। স্বাস্থ্য মোটা-মুটি ভালো ছিলো। সচরাচর কৃষিকাজ করতেন। তবে,
বর্ষার মরশুমে কোনো কাজ থাকতো না বলে কাপড় বুনত। থেঁতা(টানা) জাল,
গামছা, লুঙি, চাদর প্রভৃতি। আগেই বলেছি, আমাদের
একটি বড় নৌকা ছিলো। কাকা বর্ষায় সেই নৌকা নিয়ে দলগোমা অঞ্চলে খেজুর পাতা কাটতে
যেতেন এবং সেগুলো কাদং অঞ্চলের রূপাকুছির কারিগর পাড়ায় বিক্রী করতেন। বাবা এবং
কাকার সম্পর্ক খুবই ভালো ছিলো। কোনোদিন কোনো বিষয় নিয়ে তাঁদের মতানৈক্য হতে
দেখিনি। বাবার আদেশ কাকা কোনো রকম দ্বিধা না করেই পালন করতেন। কাকা ১৯৮৩ সালের জুন
মাসে হঠাৎ মারা গিয়েছিলো। তখন আমাদের কাকাতো ভাই-বোনেরা সবাই ছোট ছোট ছিলো। কাকী
খুবই কষ্ট করে তাদের মানুষ করেছে, ঠিক আমার দাদী যেভাবে মানুষ করেছিলো
আমাদের বাবা এবং কাকাকে। আমাদের বাবার ১৯৮৪ সালে অর্দ্ধাংগ বেমার হয়েছিলো। বাবা
মারা গিয়াছে ১৯৯৫ সালের ৭ জানুয়ারিতে। সেদিন সোমবার ছিলো।
আমাদের বাবা বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের
সবচেয়ে ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ধনাই হাজির মেয়ে আমার মা আয়শা খাতুনকে এবং
কাকা বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়েরই আর এক ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি দানেশ মুন্সীর
মেয়ে অছিরন নেচাকে। কাকা কখন বিয়ে করেছিলো মনে নেই, তবে, একদিন
আমাদের সমন্ধীয় জেঠাতো ভাই শিরাজ ভাইর সাথে চাচীকে বাপের বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলাম
। আলীগাঁও জাহানার পাড় থেকে পাঁচ মাইল দূরে। আসার সময় চাচীর সাথে একটি মাটির
কলশে মুড়ি এবং মোয়া দিয়েছিলো । কলশটা চূণ দিয়ে রং করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে
দিয়েছিলো। কলশটা শিরাজ ভাই-ই মাথায় করে আনছিলো। এক সময় কলশটা আমার মাথায় দিয়ে
বলেছিলো- তুই কিছুদূর নিয়ে চল, আমি একটু জিরিয়ে নিই। আমি তখন খুবই
ছোট। তাই কিছুদূর আসার পর কলশটা আমার মাথা থেকে পরে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিলো।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে বাবার
বয়স ৪২ বছর এবং মার ২৮ বছর। মা এবং কাকীর সাথে খুবই সদ্ভাব ছিলো। কোনোদিন কোনো
বিষয় নিয়ে তর্ক করতে দেখিনি। মা ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারিতে মারা গিয়াছে।
আমরা পাঁচ ভাই এবং দুই বোন ছিলাম।
ভাই-বোনদের নাম যথাক্রমে আবুল হোসেইন, হোসেন আলী, খোদেজা খাতুন,
জহুরুল হক, জেলেকা খাতুন, সামচুল হক এবং
ওমর আলী।
আবুল হোসেইন-
আবুল হোসেই অর্থাৎ আমি সবার বড়। আমি মোটা-মুটি লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। আমার জন্ম
১৯৫১ সালের ১২ নভেম্বর। আমি-ই আমাদের পাড়ায় প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান
করেছিলাম । আমি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে অবসর
নিয়েছি। আমার দুটি পক্ষ। প্রথম পক্ষ ভেরাগাঁয়ের হাকিমুদ্দিনের মেয়ে সফুরা
খাতুন। আমাদের বিয়ে হয়েছিলো ১৯৭৩ সালে। দ্বিতীয় পক্ষ কয়াকুছি অঞ্চলের খরমার
ছয়ফল মিয়ার মেয়ে তারাভানু। বিয়ে হয়েছিলো ১৯৮৫ সালে। প্রথম পক্ষের দুই ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সোহরাব আলী আহমেদ, আমিনা
খাতুন, আবিদা খাতুন, সাহিদা খাতুন,সোলেমান কবির
এবং খালিদা পারবিন ।
বড় ছেলে সোহরাব আলী আহমেদের জন্ম ১৯৭৭
সালে। সে বিজ্ঞানের স্নাতক। ধুবুড়ি জেলার চাপড় শিক্ষাখন্ডে প্রাইমারি স্কুলের
শিক্ষক এবং হাট শিঙিমারিতে সিআরসিসি হিসাবে কর্মরত। দ্বিতীয় সন্তান আমিনা খাতুন।
সে বিজ্ঞানের স্নাতক। জন্ম ১৯৮০ সালে। বঙ্গাইগাঁও জেলার বইটামারি শিক্ষাখন্ডের
অন্তর্গত ঔডুবি এম, ই মাদ্রাসায় বিজ্ঞান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত।
আবিদা খাতুন স্নাতক এবং এএনএম নার্স। জন্ম ১৯৮২ সালে। হাট শিঙিমারিতে নার্স হিসাবে
কর্মরত। সোলেমান কবির বিএইসএমসিটি(হোটেল ম্যানেজমেন্ট) উত্তীর্ণ। জন্ম ১৯৮৬ সালে।
অস্ট্রেলিয়ায় পি এন্ড ও জাহাজ কোম্পানীতে কর্মরত। খালিদা পারবিন বিএসসি নার্স।
জন্ম ১৯৯৩ সালে। সে ধুবড়িতে নার্স হিসাবে কর্মরত।
দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে। সাহজাহান
আলী আহমেদ এবং রাহুল আমিন। সাহজাহান আলী আহমেদ এম, কম। জন্ম ১৯৯২
সালে। সাহজাহান আলী আহমেদ হাউলীর ন্যাশনাল সায়েন্স কলেজে কৰ্মরত। সে জিএসটি এবং
ইনকান ট্যাক্সে কাজ করে।একেবারে ছোট ছেলে রাহুল আমিন বিফার্ম উত্তীর্ণ। জন্ম ১৯৯৭
সালে। সে আহমেদাবাদের
টরেণ্ট ঔষধ কোম্পানীতে কর্মরত।
হোসেন আলী-
আমার ছোট ভাই হুসেন আলী আমার থেকে চার বছরের ছোট। সে মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ।
সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের রখমত মিস্ত্রীর মেয়ে হাজেরন নেছাকে। হুসেন আলী
লিখা-পড়া শেখেনি, মানে লিখা-পড়া করার সুযোগ পায়নি। হুসেন আলী
বলতে গেলে আমার থেকেও অনেক বেশি বুদ্ধিমান। তবে, কোনো কাজ সে মন
দিয়ে করতে পারেনি। কৃষিকাজ, কাপড় বুনা থেকে শুরু করে সে ফেরি করে
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চুড়িও বিক্রী করেছে, আন্ডা কিনেছে।
অনেক কিছুই সে করেছে। তবে, কোনোটাই ধরে রাখতে পারেনি।
হুসেন আলী অভিনয়ে খুবই ভালো। আমিও
নাটকে অভিনয় করেছি। তবে, হুসেন আলী অভিনয় করেছে যাত্রা- মানে
গীতিনাট্য দলে। হুসেন আলী যাত্রাদলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেনাপতির অভিনয় করতো।
তাই অনেকে তাকে আদর করে ‘সেনাপতি’ বলে ডাকে। এখন
হুসেন আলী পুতুল নাচের সাথে জড়িত। পুতুল নাচে সে খুবই ভালো ডায়লগ গায়। পুতুল নাচে কে ডায়লগ প্রক্ষেপ করে দেখা যায়
না। শুনেছি, পরের দিন সকালে কে ডায়লগ প্রক্ষেপ করেছে তাকে
দেখার জন্য অনেকেই কৌতুহল প্রকাশ করে। হুসেন আলী দেখতে একটু রোগা । তাই অনেকে এই
রোগা মতো লোকটা এতো সুন্দর ডায়লগ বলে এ কথা বিশ্বাস করতে টান পায়। আসলে হুসেন
আলী সরকারের কাছ থেকে শিল্পী পেন্সন পাওয়ার যোগ্য। হুসেন আলীর চার ছেলে, তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাসেনা বানু, আকলিমা খাতুন,
রোশেনারা খাতুন, হুসিয়ার আলী, ওয়াশিদ আলী,
সাদ্দাম হোসেন এবং মৃদুল আকতার। কেউ তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। হুসিয়ার
আলী বিভিন্ন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। ওয়াশিদ আলী দর্জি। সাদ্দাম আলী কৃষিকাজে
নিয়োজিত । মৃদুল আকতার শিক্ষার্থী। ক্লাস নাইনে পড়ে। মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে
গেছে।
খোদেজা খাতুন-
খোদেজা খাতুনের শরীরের রং শ্যামলা এবং একটু রোগা। গঠন মাঝারি। সে লিখা- পড়া
শেখেনি। খোদেজার বিয়ে হয়েছে আগমন্দিয়ার ওয়াজ আলীর সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন।
তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে নূরজাহান বেগম, মল্লিক
খোরশেদ আলম, আলাল উদ্দিন এবং জালাল উদ্দিন। নূরজাহানের
বিয়ে হয়েছে গোবিন্দপুড়ের খইমুদ্দিনের ছেলে জামাল উদ্দিনের সাথে। তাদের দুই ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে শাহরুখ ইসলাম, সরিফুল
ইসলাম এবং জেরিফা খাতুন। মল্লিক খোরশেদ আলমের দুই ছেলে। রিহান মল্লিক এবং রিকিত
মল্লিক। আলাল উদ্দিনের দুই ছেলে । ফারহান মল্লিক এবং ইরফান মল্লিক। খোরশেদ আলম এবং
আলাল উদ্দিন বেশি লেখা-পড়া শেখেনি। তারা সোনারু কর্মকার। উভয়ে বিবাহিত। জালাল
উদ্দিন বি, এ পাশ করেছে। সে এখন ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
জহুরুল হক-
জহুরুল হক মাঝারি গঠনের হৃষ্ট-পুষ্ট এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। সে হা-ডু-ডু
খেলায় খুব ভালো ছিলো। আমি হা-ডু-ডু খেলা পসন্দ করতাম না। তাই সে আমাদের ফাঁকি
দিয়ে হায়ারে হা-ডু-ডু খেলতে যেত। তার লিখা-পড়ায় তেমন মন ছিল না। তাই আমাদের
অগোচরে এটা ওটা ব্যবসা করতো। ১৯৮৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর মেলেরিয়া জ্বর
হয়ে সে গোয়ালপাড়া সিভিল হাসপাতালে মারা গেছে। জহুরুল মারা যাওয়ার ছয় মাস পরে
কাকা ভেলু মিয়া মারা গিয়েছিলেন। একই বছর দুটি মৃত্যুতে আমরা খুবই মর্মাহত হয়ে
পরেছিলাম।
জালেকা খাতুন-
জালেকা খাতুন ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের। সে কিছু লিখা-পড়া করেছিলো। অবশ্যে
প্রাইমারি পাশ করতে পারেনি। একটু কম বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের সুলতান
মিয়ার একমাত্র ছেলে বাহারুল ইসলামের সাথে। বাহারুল ইসলাম এমনিতেও আমাদের খালাতো
ভাই। তাদের তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুল হাই
খালিদ, মঞ্জুয়ারা খাতুন, রঞ্জিত আলী এবং ছিদ্দিক আলী।।
মঞ্জুয়ারার বিয়ে হয়েছে মিলিজুলির জমির হোসেনের সাথে। আব্দুল হাই বিবাহিত। সে
হায়ার সেকেন্ডারি উত্তীর্ণ। সে কাদিয়ানি সমাজের অন্তর্ভূক্ত। তাই তার সাথে
বর্তমান আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। রঞ্জিত আলী এবং সিদ্দিক আলীও বিবাহিত। এরা কেউ
তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। রঞ্জিত আলী এম্বুলেন্স চালক এবং সিদ্দিক আলী ব্যবসায়ী।
সামসুল হক-
জালেকা খাতুনের ছোট সামসুল হক। সামসুল হকের জন্ম ১৯৭১ সালে। মাঝারি গঠনের এবং
শ্যামবর্ণ। সে বি, এসসি উত্তীর্ণ। ম্যাট্রিকে গণিতে লেটার মার্ক
নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সে এখন বরপেটা রোডের
একটি এম, ই, স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। সে বিয়ে করেছে
নিচুকার জিন্নত আলীর মেয়ে আবিদা খাতুনকে। আবিদা খাতুন স্নাতক। সে একটি ব্যক্তিগত
খন্ডের স্কুলে শিক্ষকতা করে। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে
সানিয়ারা মল্লিক বড় এবং ছেলে আশানূর মল্লিক ছোট। উভয়ে শিক্ষার্থী।
ওমর ফারুক
কিবরিয়া- ওমর ফারুক মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে হিন্দী
মেজর নিয়ে বি, এ পাস করেছে। সে নলবারি জেলার ডকোহা এম,
ই, স্কুলের হিন্দী শিক্ষক। শিক্ষকতার আগে সে
সাংবাদিকতা করতো। শিক্ষক হিসাবে কাজে যোগদান করার পরে আসাম সরকারের নির্দেশনা
অনুসারে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়েছে। সে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ
আদি লেখে। সে একটি কবিতার বই প্রকাশ করেছে। সে বিয়ে করেছে রামপুরের চতলার শিক্ষক
দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে রেহেনা পারবিনকে। তাঁদের দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। বড়
মেয়ের নাম ফারহানা কিবরিয়া। ফারহানার পরে রেজাউল তারিক কিবরিয়া। রেজাউলের ছোট
ফাহিমা কিবরিয়া। সবাই শিক্ষার্থী।
ভেলু মিয়াঃ- ভেলু মিয়া
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলেন। সে কৃষিকাজ করতেন। সে বিয়ে করেছিলেন
আলীগাঁয়ের দানেশ মুন্সির মেয়ে অছিরন নেসাকে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
তাঁর বয়স ৩২ বছর এবং চাচী অছিরন নেছার ২৪ বছর। তাঁদের তিন ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে রেজিয়া খাতুন, আয়নাল হক,
সালেহা খাতুন, মহেলা খাতুন, জয়গন নেসা,
আক্কাস আলী, আফসার আলী এবং সোনাবানু।
রেজিয়া খাতুন-
রেজিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলো। তার বিয়ে হয়েছিলো
আলীগাঁয়ের রজব আলীর ছেলে ওয়াজেদ আলীর সাথে। সে অনেক দিন আগেই মারা গেছে। তার দুই
মেয়ে। বড় মেয়ের নাম অজুপা খাতুন এবং ছোট মেয়ের নাম রাজুবালা খাতুন ৷
আয়নাল হক-
আয়নাল হক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কিছু লেখা-পড়া শিখেছে। কৃষিকাজ করে। সে
বিয়ে করেছে কাদঙের সোহরাব আলীর মেয়ে হাফিজা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন।
দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাবিজুল ইসলাম, আসমা
খাতুন, সাইফুল ইসলাম এবং আর্জিনা খাতুন। কেউ লেখা-পড়া শেখেনি।
সালেহা খাতুন-
সালেহা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে বাঘবর পাথারের মামুদ
আলীর ছেলে আবু বাক্কারের সাথে। তাঁদের দুই ছেলে এবং চার মেয়ে। সন্তানদের নাম
যথাক্রমে মিনুয়ারা খাতুন, আলতাব হোসেন, নিলীমা খাতুন,
জাহানারা খাতুন এবং আলী আহমেদ। মিনুয়ারা খাতুন আসাম পুলিশ-এ কর্মরত।
আলতাব হোসেন ব্যবসায়ী।
মহেলা খাতুন-
মহেলা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে সত্রকনরার
মুলামদির ছেলে জবান আলীর সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিন জন। এক ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মুক্তার আলী, জয়নব খাতুন এবং
সানিয়ারা খাতুন। তারা এখন গোয়ালপাড়ার কৃষ্ণাইয়ে বসবাস করে।মুক্তার আলী পেশায় অধিবক্তা।
জয়গন নেসা-
জয়গন নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে ছনপুরার হুটু মিয়ার
ছেলে জাকির হোসেনের সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। এক ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে জাহিদুল ইসলাম, মামনি খাতুন এবং সানিয়ারা খাতুন ।
আক্কাস আলী-
আক্কাস আলী লম্বা এবং ফর্সা। সে ব্যবসায়ী। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের বালাচানের
মেয়ে ফুল খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
শ্বাহ আলম, সাহিনারা খাতুন, সাইজুদ্দিন এবং
নাজমা খাতুন। শ্বাহ আলম এবং সাইজুদ্দিন ব্যবসায়ী। সাহিনারা ম্যাট্রিক উত্তীর্ণ।
তার বিয়ে হয়ে গেছে। নাজমা খাতুন শিক্ষার্থী।
সোনাবানু-লম্বা
এবং ফর্সা। সে কিছু লেখা-পড়া শিখেছে। তার বিয়ে হয়েছে নওকুসির লালচানের ছেলে
রুস্তম আলীর সাথে। তাঁদের দুই মেয়ে। সুলতানা পারবিন এবং রুমনা পারবিন। রুমানা
পারবিন জিএনএম নার্স পাঠ্যক্রমে অধ্যয়নরত। সুলতানা পারবিনের বিয়ে হয়ে গেছে।
আফসার আলী-আফসার
আলী ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের
নুরমহম্মদের মেয়ে ফরিদা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। দুই ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফাইজুল ইসলাম, জয়নব খাতুন এবং
রুমি আকতার। সবাই ছোট ছোট।
আব্দুল খালেকঃ-
আব্দুল খালেক লম্বা ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। জমি-জমা তেমন ছিল
না। তাই কৃষিকাজের সমান্তরালভাবে কামলাও বেচতেন। পূব দেউলদির ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকায় তাঁর নাম নেই। সম্ভবতঃ ১৯৬৬ সালের আগেই ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলেন। তার বয়স
১৯৬৬ সালে অনুমান ৫৫ বছর ছিলো। মনে হয় মকবুল জেঠার সমবয়সী ছিলো। খালেককে আমি
জেঠা বলে ডাকতাম। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় খালেকের স্ত্রীর নাম লিখতে পারলাম
না। খালেকের স্ত্রী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামলা ছিলো। তিনি খুবই ধীর-স্থির প্রকৃতির
স্ত্রীলোক ছিলেন। মৃদুভাষীও ছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। দুই ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কমলজান নেছা,
বিমলা খাতুন, ফুলজান নেসা(ফুলি), ভুলিমন
নেসা(ভুলি), হাসমত আলী এবং হাসেন আলী। কমলজান নেসার বিয়ে
হয়েছিলো আমাদের পাড়ার ওয়াজুদ্দিনের সাথে। আব্দুল খালেকের চার বিঘা একসনা জমি
ছিলো। সেই জমি এক হাজার টাকায় বিক্রী করে তিনি ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলেন। সেই জমি
আমাদের বাবা আমাদের ফুফাতো ভাই আশুত আলীকে কিনে দিয়েছিলো। আব্দুল খালেক তাঁদের
জমি আমাদের
কাছেই বিক্রী করতে চেয়েছিলো। তবে, বাবার অত টাকা ছিল না বলে আশুত আলীকে
কিনে দিয়েছিলো। তখনকার এক হাজার টাকা এখনকার ৫ লক্ষের কম হবেনা। তখন ধানের মোন
ছিলো পাঁচ টাকা, ছয় টাকা। সালটা সম্ভবতঃ ১৯৬৪ ছিলো। সেই বছর
একদিন বাবা হাট থেকে এসে কাকাকে ডেকে বলেছিলো- ভেলা, ধানের দাম খুব
বেড়েছে। সাত টাকা, আট টাকা মোন। আমার মনে আছে আমি যখন প্রাইমারিতে
পড়ি তখন এক সের চালের মূল্য ছিলো আট আনা। এখনকার ত্রিশ চল্লিশ টাকা। গুড় ছিলো আট
আনা সের।
যদু মুন্সিঃ- যদু মুন্সি
একটু বেঁটে ধরণের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা। তাঁর বাবার
নাম ছিলো জিগির শ্বেখ। গ্রামের মধ্যে একমাত্র তিনি এবং মাতাব আলী মুন্সি স্বাক্ষর
ছিলেন। কারো কোনো চিঠিপত্র অথবা দলিল পত্র দেখতে হলে তাঁদের কাছেই যেতে হতো। যদু
জেঠা আমাদের দাদীকে মামী বলে ডাকতেন।
যদু মুন্সি খুবই সহজ সরল লোক ছিলেন।
কোনো কাজিয়া পেচালে ছিল না। কৃষিকাজের সমান্তরালভাবে তিনি সমাজের ইমামতিও করতেন।
গ্রামের জমি সম্পর্কিত কোনো কাজ করতে হলে সবাই তাঁর শরণাপন্ন হতো এবং তিনিই অফিস
আদালতে যেতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম আমিরন নেসা। তিনি লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। খুবই
সহজ-সরল ছিলেন তিনি। আমরা তাঁকে জেঠি বলে ডাকতাম। আমাদের ভাই-বোনদের খুবই আদর-
সোহাগ করতেন। লেখা-পড়ার জন্য আমি ছোট থেকেই বেশিরভাগ সময়ই বাহিরে থাকতাম। তাই
আমি বাড়িতে এসে দেখা করতে গেলে চিড়া-মুরি যা ঘরে থাকতো বের করে খেতে দিতো। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে যদু মুন্সির বয়স ৬২ বছর এবং জেঠি আমিরন নেসার ৫৫ বছর।
তাঁদের ছেলে- মেয়ে ৮ জন। ছয় ছেলে, দুই মেয়ে। তাঁদের নাম যথাক্রমে শিরাজ
উদ্দিন, আফাজ উদ্দিন, রহিমন নেসা, হাবেজ
উদ্দিন(হাবু), জয়তন নেসা, হানিফ আলী,আজগর
আলী এবং ময়সের আলী।
শিরাজ উদ্দিন-
শিরাজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তাঁর হাঁফানি বেমার ছিলো, তাই
একটু পরিশ্রম করলেই হাঁফিয়ে উঠতেন। তার স্ত্রীর নাম রাবিয়া খাতুন। আলীগঁয়ের রজব
আলীর মেয়ে। রাবিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। কালো হলেও দেখতে সুন্দরী
ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে শিরাজ উদ্দিনের বয়স ২৫ এবং রাবিয়া
খাতুনের ২১ বছর ছিলো। শিরাজ উদ্দিন হাটে হাটে চুন বিক্রী করতেন। তাঁর শশুড় রজব
আলীও চুন বিক্রী করতেন। শশুড়কে দেখেই সম্ভবতঃ শিরাজ ভাই চুনের ব্যবসা করতে
উৎসাহিত হয়েছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। চার ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে বিল্লাল হোসেন, ইজ্জত আলী, নিয়েত আলী,
সাহেরা বানু, মমতাজ খাতুন এবং রমজান আলী।
ছেলে-মেয়েদের কেউ লিখা-পড়া শেখেনি।
বড় ছেলে বিল্লাল হোসেন গুয়াহাটিতে অটো চালায়। অন্যান্যরা বিভিন্ন কাজে নিযোজিত।
মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। শিরাজ উদ্দিন এবং রাবিয়া খাতুন
অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
আফাজ উদ্দিন-
আফাজ উদ্দিন একটু বেঁটে ধরণের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি বাঘবর থানার
নৌকায় থাকতেন। বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের শরিফন নেছাকে। শরিফন নেসা মাঝারি গঠনের
এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা ছিলো। খুবই সহজ-সরল ছিলো। মুখে বসন্তের দাগ ছিলো যদিও
দেখতে অসুন্দর ছিলো না । বলা যায় সুন্দরিই ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
আফাজ উদ্দিনের বয়স ২৩ এবং শরিফন নেসার ২২ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে আঠ জন। চার ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সরবেশ আলী, কুলছুন নেছা,
নূর জাহান বেগম, পরশ আলী, আছাতন নেছা,
সহর আলী, মানিকজান নেসা এবং শফিকুল ইসলাম।
ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত। ছেলেরা
বিভিন্ন ব্যবসায়ে নিয়োজিত এবং মেয়েরা গৃহিনী। কেউ লেখা- পড়া শেখেনি। আফাজ
উদ্দিন এবং শরিফন নেসা কয়েক বছর আগে মারা গেছে।
রহিমন নেছা-
রহিমন নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণা। আমার থেকে বয়সে কিছু বড়। তাঁর বিয়ে
হয়েছে আমাদের গ্রামের পন্ডিত আলীর ছেলে শুকুর আলীর সাথে। আমাদের পাড়ায় দু'জন
পন্ডিত আলী ছিলো।
শুকুর আলীর বাবা পন্ডিত আলীর একটা হাত কনুই পর্যন্ত ছিলো। তাই তাঁকে সবাই ‘টুইন্ডা’
পন্ডিত বলতো। রহিমনের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। তিন ছেলে, দুই
মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে নায়েব আলী,বছিরন নেসা, ময়নাল হক,
জয়গন নেসা এবং হুরমুজ আলী। ময়নাল হক কিছুদিন আগে মারা গেছে।
জয়তন নেসা-
জয়তন নেসা লম্বা এবং ফর্সা। মুখমন্ডল একটু চেপটা ধরণের। আমার থেকে বয়সে কিছু
ছোট। তার বিয়ে হয়েছে ভেড়াগাঁয়ের মুংলা মুন্সির ছেলে ছিদ্দিক আলীর সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
আঠজন। তিন ছেলে, পাঁচ মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে জয়নাল আবদিন,
মনোয়ারা খাতুন, জয়নুদ্দিন, আনোয়ারা খাতুন,
আইনুদ্দিন, মেঘজান নেসা, আমেলা খাতুন এবং
তারাবানু। ছেলে-মেয়ে সবাই বিবাহিত। জয়নুদ্দিন এবং আইনুদ্দিন গুয়াহাটীতে অটো
চালায় ।
হাবেজ উদ্দিন-
হাবেজ উদ্দিন একটু বেঁটে ধরণের এবং শ্যামবর্ণ। সে আমার থেকে দুই বছরের বড়।
ছেলেবেলা আমরা একসাথে খেলা-ধূলা করেছি। সে খুবই সহজ-সরল লোক। নদী ভাঙার আগে সে
কৃষিকাজ করতো। নদী ভাঙার পরে গুয়াহাটিতে হাজিরা করতো। সে বিয়ে করেছে তাঁর মামাত
বোন কমলা খাতুনকে । কমলা খাতুন আমাদের পাড়ার আব্দুল রখমানের মেয়ে। কমলা খাতুন
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। সে খুবই সহজ-সরল। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন।
তিন ছেলে, এক মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে একাব্বর আলী, করম আলী,
সাহানূর আলী এবং বায়লা খাতুন । একাব্বর আলী অনেক দিন আগে মারা গেছে।
তাঁরা এখন গোয়ালপাড়া জেলার কৃষ্ণাইতে বসবাস করে।
হানিফ আলী-
হানিফ আলী মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে হালুইকর। হাটে হাটে মিস্টি, দৈ,
মুরি বিক্রী করে। সে আগমন্দিয়ার আমার ভগ্নীপতি ওয়াজ আলীর বোন
মালেকা খাতুনকে বিয়ে করেছে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম মানিক আলী, হামিদা খাতুন, এলিজা খাতুন এবং
মান্নান আলী। মানিক আলী বেঁটে ছিলো। হাটে হাটে পান-সুপারি বিক্রী করতো। সে খুবই
কৌতুকপ্রিয় ছিলো। সে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে। জীবিতরা সবাই বিবাহিত।
মজিবর রহমান-মজিবর
রহমান মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। বিয়ে করেছে মরাভাজের
নবুরুদ্দিনের মেয়ে তছিরন নেসাকে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
তৈয়ব আলী, ডালিমন নেসা, মজিরন নেসা এবং
মফিদা খাতুন। ছেলে-মেয়ে সবাই বিবাহিত। তৈয়ব আলী ব্যবসায় করে । মজিবর রহমান
কিছুদিন আগে পর্যন্ত গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। তার কন্ঠস্বর খুবই সুরেলা
ছিলো। গীতিনাট্যে মেয়ের রোল করতো। মাজিবর রহমান এখন ভেরাগাঁয়ে বসবাস করে।
আজগর আলী-
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। সে কৃষিকাজ করতো। সে বিয়ে
করেছিলো বাঘবর পাথারের খইমুদ্দিনের মেয়ে আয়মনা খাতুনকে । আজগর লেখা-পড়া শেখেনি।
সে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে। তার ছেলে-মেয়ে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই ।
ময়সের আলী-
ময়সের আলী সবার ছোট। সে মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং কালো। সে বিয়ে করেছে বাঘবরের
ইয়াসিনের মেয়ে কমলা খাতুনকে। সে লেখা-পড়া শেখেনি। সে কৃষিকাজে নিয়োজিত। ছেলে-
মেয়ের তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি।
নিয়ামত আলী বেপারীঃ-
নিয়ামত আলী বেপারীকে আমি বৃদ্ধ অবস্থায় দেখেছি। তিনি তখন কুঁজা হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি গৌর বর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিলো পুচাই শেখ। তিনি যদু জেঠার শশুড় ছিলেন।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৮৫ বছর। তাঁর স্ত্রীকে আমি
দেখিনি। দেখলেও মনে নেই। সে জন্য তাঁর স্ত্রীর নাম আমার জানা নেই। সম্ভবতঃ আমি ছোট থাকতেই মারা
গিয়েছিলো। নিয়ামত দম্পতির ছেলে-মেয়ে চারজন। তিন ছেলে, এক
মেয়ে। তাঁদের নাম যথাক্রমে আমিরন নেসা, আব্দুল রকমান, নবুর উদ্দিন এবং
আব্দুল হক।
আমিরন নেসা-
আমিরন নেসার বিবরণ যদু মুন্সির পরিয়ালের সাথে আগেই দেওয়া হয়েছে।
আব্দুল রকমান-
আব্দুল রকমান মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম
ছিলো আমিরন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আব্দুল রকমানের বয়স ৫৩ এবং
তাঁর স্ত্রী আমিরন নেসার ৪২ বছর। তাঁদের দুই ছেলে, চার মেয়ে। বড় ছেলের নাম
ছিদ্দিক আলী এবং ছোট ছেলের নাম আব্দুল বারেক। মেয়েদের নাম সহরজান
নেসা, কমলা খাতুন, সোনাবানু(পাতা) এবং রহমজান নেসা। কেউ
লিখা-পড়া শেখেনি।
নবুর উদ্দিন-
নবুর উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। মুখমন্ডলে হালকা বসন্তের দাগ ছিলো। মাথার
চুলগুলো ছিলো কোঁকড়ানো। তিনি কবিরাজি করতেন। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ফিট-ফাট হয়ে
থাকতে পসন্দ করতেন। তিনি তেল মাখানো একটি ছোট লাঠি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। কৃষিকাজ
করতেন। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা কেফাতুল্লাহর মেয়ে সূর্যবানুকে বিয়ে
করেছিলেন। সেই সম্পর্কে তিনি আমাদের বোনের জামাই ছিলো । আমরা তাঁকে মিয়াভাই বলে
ডাকতাম। তিনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন। সূর্যবানুর মুখমন্ডলে হালকা বসন্তের দাগ
ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নবুর উদ্দিনের বয়েস ছিলো ৪৩ বছর। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকায় সূর্য্যবানুর নাম নেই। তাই তাঁর বয়স দেওয়া সম্ভব হল না।
১৯৬৬ সালে তাঁর বয়স মনে হয় ২০ বছর ছিলো। তাই সম্ভবতঃ ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি।
কারণ তখন ২১ বছর না হলে ভোটার তালিকায় নাম উঠত না। তাঁদের দুই ছেলে, জিন্নত
আলী এবং ইন্নাস আলী। চার মেয়ে যথাক্রমে রূপজান নেসা, লালবানু,
হামেলা খাতুন এবং চম্পা খাতুন। কেউ লিখা-পড়া শেখেনি।
আব্দুল হক-
আব্দুল হক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি নিরক্ষর ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন।
সে বিয়ে করেছিলো মরাভাজের তমেজ আলীর মেয়ে জিলিমন নেসাকে। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে আব্দুল হকের বয়স ৩৬ বছর এবং তাঁর স্ত্রী জিলিমনের ৩২ বছর। জিলিমন
স্বাক্ষর ছিলো। সে কোরান পড়তে পারত। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। সন্তানদের নাম
যথাক্রমে সমেজ উদ্দিন (বেপারী), শুকুরজান নেসা, আমিরজান নেসা,
আনার আলী এবং আয়নাল হক। এরা কেউ লেখা-পড়া শেখেনি। সবাই কৃষিকাজ
করে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
আব্দুল হক ২০০৪ সালে এবং জিলিমন নেসা
২০১৫ সালে মারা গেছে।
কছিম উদ্দিন মল্লিকঃ-
কছিমুদ্দিন মল্লিক খুবই লম্বা ছিলেন। প্রায় ছয় ফুটের মতো। তাঁর শরীরের রং
শ্যামলা ছিলো। আমি যখন দেখেছি তখন কছিমুদ্দিন বৃদ্ধ। তবুও তাঁর শরীরের গঠন দেখে
বুজতে অসুবিধা হত না, যে যৌবনকালে তিনি খুবই বলশালী ছিলেন। তাঁর
স্ত্রীর নাম বাহারজান নেসা। তাঁর নাকের মাঝ বরাবর একটি বড় আকারের তিল ছিলো,
সেজন্য লোকে লোক সমাজে তিনি তিল্লুকি নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে কছিম উদ্দিনের বয়স ৭২ বছর এবং বাহারজান নেসার ৫৫ বছর ছিলো।
তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি ছিলনা, সেজন্য বৃদ্ধ অবস্থাও কছিমুদ্দিন নিজে
চাষ- আবাদ করতেন। পরে অবশ্যে সাহেদ আলী নামের একটি কিশোর ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন।
সাহেদ আলীর বাবা-মার কলেরায় মৃত্যু হয়েছিলো।
তখনকার দিনে কলেরা এবং বসন্ত রোগে অনেক
লোকজনের মৃত্যু হতো। কোনো কোনো বাড়ী একেবারে উজাড় হয়ে যেতো। ১৯৬৮ সালে বসন্ত রোগে
আমাদের মামাতো বোন জিন্নতমালার এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচজন মেয়ের মৃত্যু
হয়েছিলো। সে একেবারে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলো। তখন কলেরা রোগেও অনেক লোজকজন
মারা যেতো। পরিয়াল উজাড় হয়ে যেতো। সাহেদ আলীর পরিয়াল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সাহেদ আলী বড় হওয়ার পরে বিয়ে-থা করে সংসারের হাল ধরেছিলো। সাহেদ আলী বয়সে আমার
থেকে কিছুটা ছোট।
বাহারজান নেসা কবিরাজি চিকিৎসা করতেন।
ধাই হিসাবে তাঁর খুবই নাম-ডাক ছিলো। জটিল কেসে বাইরের গ্রাম থেকেও তাঁর ডাক আসতো।
তিনি উপযেচে গিয়ে সন্তান সম্ভাবা বউ-জীদের তদারকি করতেন, শলা-পরামর্শ দিতেন।
যেচে গিয়ে বৌ-জীদের হাতের কাজ করতেন। কারো অসুখ-বিসুখ হলে তিনি সবার আগে গিয়ে
তার সেবা-যত্ন করতেন। মাথায় জলপটি দিতেন। তাই সবাই তাঁকে স্নেহ ও সন্মান করতো।
আমি একবার তাঁর অভিনব চিকিৎসায়
পাঁচড়া থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। সেবার আমার পাঁচড়া হয়েছিলো। সম্ভবতঃ ১৯৬৮ সাল।
আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম- খালা, আমার পাঁচড়া হয়েছে। সারতেছে না। ঔষধ
দাও।
তখন বর্ষা মাস। আমাদের পাড়ায় সবার
উচো উচো ভিটা ছিলো। তাই বাড়ীর ভিটার নিচেই জল। তিনি বললেন- যাও, লেংটা হয়ে জলের
মাঝে দাঁড়িয়ে থাকো।
আমি বললাম- জলের মাঝে লেংটা হয়ে ?
কেন ?
তিনি বললেন- চেলা মাছে খেলে পাঁচড়ার
বাপও বাপ বাপ করে ভেগে যাবে।
আমি তাঁর পরামর্শ অনুসারে লেংটা হয়ে
জলের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং চেলা মাছ আমার পাঁচড়ায় ঠোকর মেরে মেরে ঘাঁ থেকে
রক্ত বের করে দিয়েছিলো। তবে, আমার পাঁচড়া সেরে গিয়েছিলো।
আর একটি মজার কথা আছে তিল্লুকি খালাকে
নিয়ে। একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বেলা তখন ডুবু ডুবু
অবস্থা। অল্প পরেই ডুববে আর কি! তখন রমজানের রোজা চলছিলো। ইফতারের সময় হতে খুব
দেরি নেই। দেখি তিনি ভাত খাচ্ছেন। তাই আমি বললাম- খালা, তুমি এখন ভাত
খাচ্ছ? ইফতারের সময় হতে এখনও অনেক বাকী। রোজা ছিলে না?
রোজা ছিলাম। এখন সেহেরি খাচ্ছি।
এখন সেহেরি খাচ্ছ মানে? একটু
পরেইতো ইফতার করতে হবে। কখন রোজা ছিলে?
আমি রাতের বেলা রোজা থাকি। দিনে রোজা
থাকি না।
আমি অবাক! এ আবার কেমন রোজা! তাই
বললাম- রাতে রোজা থাকলে রোজা হবে?
কেন হবে না। রাতও আল্লাহর, দিনওতো
আল্লাহরই, না-কি?
আমি আর কি বলব! তখন আমার উপদেশ দেবার
মতো বয়স ছিল না। তাই মনে মনে চলে এসেছিলাম। বাহারজান নেসা সুফি পীরের শিষ্যা
ছিলেন। সুফি পীরের শিষ্য-শিষ্যাদের অনেকে তখন এ রকম আজগুবি আচরণ করতেন, এখনও
সম্ভবতঃ অনেকে করে।
পন্ডিত আলীঃ- পন্ডিত আলী
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি রোগা এবং দুর্বল ছিলেন। আমি যখন তাঁকে
দেখেছি তখন তিনি বৃদ্ধ। কাজ-কাম করতেন না। বসে বসে হোকা টানতেন। আমিও অনেক দিন
তাঁর কাছে গিয়ে হোকা টেনেছি, যদিও তখন আমি ধূমপান করতাম না। আমি
গেলেই হোকা জ্বালিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলতেন- ধুয়া বের কর।
তাঁর হুকুম মতো হোকায় মুখ লাগিয়ে
টেনে ধুয়া বের করতাম। এমনি কয়েকদিন করার পর আমার প্রায় হোকার নেশায় পেয়ে
বসেছিলো। বাড়িতে থাকলেই সময়-সুযোগ বুজে তাঁদের বাড়ী গিয়ে তাঁর সাথে হোকা
টানতাম ৷
পন্ডিত আলী আমাদের সম্পর্কীয় ফুফা ছিলেন।
আগেই বলেছি আমাদের কোনো ফুফু ছিল না। তাই পন্ডিত আলীকেই আপন ফুফা এবং তাঁর স্ত্রী
হালিমন নেসাকে আপন ফুফু বলে ভাবতাম। তাঁরা আমাদের আপন ফুফা-ফুফু নয় একথা কখনো
মনেই আসতো না। ফুফু নিজের ভাইপো-ভাইজীর মতোই আদর সোহাগ করতেন। তাঁদের বাড়ী গেলে
ঘরে যা কিছু থাকতো বের করে খেতে দিতেন। তাঁদের সেই আদর- সোহাগের কথা জীবনেও ভুলতে
পারব না।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
পন্ডিত আলীর বয়স ৬২ বছর এবং ফুফু হালিমনের বয়স ৫৯ বছর ছিলো। তাঁদের তিন ছেলে,
কোনো মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে আশুদ আলী, ফজল
হক এবং খোরশেদ আলী।
আশুদ আলী-
আশুদ আলী লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। সে কৃষিকাজ করতেন। লম্বার জন্য শেষ বয়সে তাঁর
শরীর কিছু বেঁকে গিয়েছিলো। একটু কুঁজা হয়ে হাটতেন। তিনি রোগা এবং দুর্বল ছিলেন।
সম্ভবতঃ হাঁফানি বেমার ছিলো। সে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের তহের আলীর মেয়ে সখিনা
খাতুনকে। সখিনা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তিনি হেলা-ভোলা ছিলেন। সাজিয়ে
কথা বলতে পারতেন না। কেউ কথা বললে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে শুনতো। অবশ্যে মনটা খুবই
উদার ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আশুদ আলীর বয়স ২৯ বছর এবং সখিনার ২১
বছর। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ভোটার তালিকায় নাম ভুল উঠেছিলো। আশুদ আলীর নাম
উঠেছিলো আরহুদ আলী এবং সখিনা খাতুনের চকুরান। এই নামের ভুলের জন্য তাঁদের এক ছেলে
সহর আলী বিদেশী ঘোষিত হয়েছে। আশুদ আলীর দুই ছেলে- ইমান আলী, সহ
আলী এবং একমাত্র মেয়ে বুড়ী। ইমান আলী কয়েক বছর আগে মারা গেছে।
ফয়জল হক-
ফয়জল হক লম্বা এবং শ্যামলা ছিলো। বয়স কম থাকার জন্য ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায়
তাঁর নাম নেই। আমার থেকে তিনি সম্ভবতঃ দুই বছরের বড় ছিলেন। তিনি ব্যবসা করতেন।
সামাজিক লোক ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের সমাজের মাতবরও ছিলেন। তিনি বিয়ে
করেছিলেন আমাদের পাড়ারই জোনাব আলীর মেয়ে রংমালাকে। রংমালা অনেক দিন আগে মারা
গেছে। রংমালা মারা যাওয়ার পরে বিয়ে করেছিলো ভক্তের ডোবার একটি মেয়েকে। তাঁর নাম
আমার জানা নেই। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফজিরন নেছা, মজিরন নেছা এবং হুকুম আলী। হুকুম আলীকে
লোকে পাগলা বলে ডাকতো। এরা কেউ লিখা-পড়া শেখেনি। দ্বিতীয় পক্ষের তিন ছেলে,
মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে আমির হামজা, শহিদুল ইসলাম
এবং জহুরুল ইসলাম।
জহুরুল ইসলাম বি, এ
পাস। বাকীরা তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। তবে, সবাই স্বাক্ষর।
খোরশেদ আলী-
খোরশেদ আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তার নাম নেই।
সে আগে কৃষিকাজ করতো। নদী ভাঙার পরে বাঘবর এসেও কৃষিকাজ করতো। পরে চাহ- দোকান
করেছে। এখন ছেলেরা
রোজগার করে। তাই সে এখন কৃষিকাজ থেকে অবসর নিয়েছে। বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের জুরান
বেপারীর মেয়ে জরিমন নেসাকে। জরিমন একটু খাটো ধরণের এবং শ্যামবর্ণা। খুবই অমায়িক।
তাদের তিন ছেলে। মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম হলো- জরিপ আলী,
ওমর আলী এবং জাহিদুল ইসলাম। জাহিদুল ইসলাম বি, এ পাস। সবাই
ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
দুখী শ্বেখঃ- দুখী শ্বেখ
আমাদের পাড়ার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ
ছিলেন। তাঁর লম্বা লম্বা দাড়ি ছিলো। খুবই সৌম্য দেখা যেতো তাঁকে। দুখী শ্বেখের
দুটি বাড়ী ছিলো। একটি বাড়ী ছিলো জাহানারপাড়ে এবং আরেকটি ছিলো কাদং অঞ্চলের
রূপাকুছি। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা ছিলেন। বাবাদের ফুফাতো ভাই। তিনি আমাদের
দাদীকে মামী বলে ডাকতেন। তাঁর বাবার নাম ছিলো ইলিমুদ্দিন দেওয়ানী। তিনি
রূপাকুছিতেই থাকতেন। তাই ইলিমুদ্দিন দেওয়ানীকে আমি কোনোদিন দেখিনি। এমনও হতে পারে
হয়তোবা তিনি আমার জন্মের আগেই মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
দুখী শ্বেখও মাঝে-মধ্যে রূপাকুছি গিয়ে
থাকতেন, তবে বেশির ভাগ সময় আমাদের পাড়াই থাকতেন । দুখী শ্বেখের স্ত্রীর নাম
ফুলবানু খাতুন। তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন। মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। ধীর-স্থির
এবং হেঁসে হেঁসে, মেপে কথা বলতেন। তাঁদের পাঁচ ছেলে এবং এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সবুর উদ্দিন, ইয়ার উদ্দিন,
মফিজ উদ্দিন, আফাজ উদ্দিন খফিস উদ্দিন এবং রাজুবালা
খাতুন।
সবুর উদ্দিন-
সবুর উদ্দিন লম্বা ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। তিনি কৃষিকাজ করতেন। খুবই অমায়িক
ছিলেন। ছোট ছোট করে কথা বলতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম তুষ্টবানু। তাঁদের পাঁচ ছেলে,
পাঁচ মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সখিনা খাতুন, ইন্নস
আলী, জহুরা খাতুন, সফুরা খাতুন(মৃত), জিন্নত
আলী, নিয়ামত আলী, হাসেন আলী, আবুল হোসেন,
সরবানু, মমতাজ খাতুন ।
সবুর উদ্দিন পনের বছর এবং তুষ্টবানু
চার বছর আগে মারা গেছে। মেয়ে সরবানুও তিন বছর আগে মারা গেছে।
কফিল উদ্দিন-
কফিল উদ্দিন বয়সে আমার থেকে কিছুটা বড় ছিলো। তিনি কাদং হাইস্কুলে পড়তেন। লোক
সমাজে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। নাটকে ভালো অভিনয় করতেন। একবার সে ডাকাতি কেসে
ধরা পরে জেল খেটেছিলো। জেলখানায় তিনি ‘বন্দির ছেলে’ নাটক করে খুবই
নাম করেছিলেন। পরে জেনেছি কেসটা মিথ্যা ছিলো । কেস থেকে খালাস পেয়েছিলো। সে বিয়ে
করেছিলো মরাভাজের লতিফ মুন্সির মেয়ে সুফিয়া খাতুনকে। তাঁদের দুই ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কহিনুর বেগম, সামিনা আকতার,
সানিয়ারা আকতার, শ্বফিকুল ইসলাম আব্দুল মান্নান এবং
হেলমিনা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত। কহিনুর আকতার অংগনবাদী কর্মী।
দুখী শ্বেখের সন্তাদের মধ্যে আমাদের
পাড়ায় থাকতেন ইয়ার উদ্দিন, মফিজ উদ্দিন এবং আফাজ উদ্দিন।
ইয়ার উদ্দিন-
ইয়ার উদ্দিন লম্বা ছিপছিপে গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি খুবই শান্ত এবং
ধীর-স্থির স্বভাবের ছিলেন।। আমাদের সমাজের মাতব্বর ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রীর নাম
আয়মনা খাতুন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে ইয়ার উদ্দিনের
বয়স ৩৭ বছর এবং আয়মনা খাতুনের ২৯ বছর। তাঁদের দুটি মাত্র মেয়ে ছিলো। ছেলে নেই।
মেয়েদের নাম হনুফা খাতুন এবং রহিমা খাতুন। হনুফার বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই
বুদ্ধু মিয়ার সাথে। বুদ্ধ অনেক দিন আগেই মারা গেছে। অর্দ্ধাংগ রোগ হয়ে হনুফা
খাতুন বর্তমান শয্যাশায়ী। ইয়ার উদ্দিন এবং আয়মনা খাতুন নদীতে ভাঙার আগেই মারা
গিয়েছিলো।
মফিজ উদ্দিন-
মফিজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের বলিষ্ঠ এবং তাঁর শরীরের রং ফর্সা ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকায় আমাদের গ্রামে তাঁর নাম নেই। সম্ভবতঃ তাঁর ভোট রূপাকুছিতে হয়েছিলো ৷
তিনি প্রথমে বিয়ে করেছিলেন আমাদের পাড়ারই পন্ডিত আলীর মেয়ে হাজেরা খাতুনকে। একটি সন্তান
হওয়ার পরে হাজেরা খাতুন মারা গিয়েছিলো। হাজেরা খাতুন মারা যাওয়ার পরে তিনি
বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের মুন্তাজ আলী দেওয়ানীর মেয়ে জেলেকা খাতুনকে। নদী ভাঙার
পরে তাঁরা রূপাকুছি উঠে গিয়েছিলো। তাই তাঁদের ছেলে মেয়ের বিষয়ে বলতে পারব না। অবশ্যে পরে
তাঁরা শেওরার পাথারে জমি কিনে ঘর-বাড়ী বানিয়ে ছিলো। মফিজ উদ্দিন অল্প কয়েকদিন
আগে শেওরার পাথারেই মারা গেছে।
আফাজ উদ্দিন-
আফাজ উদ্দিন লম্বা, বলিষ্ঠ এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ
করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বয়স ছিলো ২৬ বছর। সে বিয়ে করেছিলো
বালাজানের মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে জহুরন নেসাকে। মোসলেম উদ্দিন বাবাদের চাচাতো ভাই
ছিলো। সেই সুবাদে জহুরন নেসা আমাদের চাচাতো বোন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায়
জহুরনের বয়স ছিলো ২১ বছর। জহুরন নেসা অনেক দিন আগে মারা গেছে। জহুরনের মৃত্যুর
পরে আফাজ উদ্দিন কয়াকুছির ভৌকামারিতে আবার বিয়ে করে সংসার বেঁধেছিলেন। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর কয়েকজন ছেলে-মেয়ে আছে বলে শুনেছি, তবে, তাঁদের
বিষয়ে আমি বলতে পারব না।
আফাজ উদ্দিন অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
রাজুবালা-
রাজুবালা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণা ছিলো। সে মানসিকভাবে কিছু বাধাগ্রস্ত ছিলো।
তাঁর বিয়ে হয়েছিলো রূপাকুছির কালু মিয়ার সাথে। তাঁদের একটি মাত্র ছেলে। নাম
জাকির হোসেন। রাজুবালা মারা গেছে।
এবাদুল্যা শ্বেখঃ-
এবাদুল্যা লম্বা, বলিষ্ঠ এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার নাম
পলান শেখ। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৫৫ বছর। তাঁর স্ত্রীকে
আমি দেখেছিলাম যদিও তাঁর চেহেরা মনে নেই। তিনি যে মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ
ছিলেন শুধু এইটুকুই মনে আছে।। তিনি ১৯৬৬ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন। যার জন্য
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তাঁদের একমাত্র ছেলে নালু মিয়া। মেয়ে
নেই।
নালু মিয়া-
নালু মিয়া ছোট-খাটো এবং শ্যামবর্ণের ছিলেন। তিনি কৃষি কাজ করতেন। তিনি মাছ ধরায়
খুব ওস্তাদ ছিলেন। হাত বরশী এবং দাঁওন দিয়ে তিনি অনেক মাছ মারতেন। এমনও প্রবাদ
ছিলো যে, জলে মাছ নাথাকেলও নালু মিয়ার বরশীতে মাছ ধরে। নানা রকম ঘুড্ডি
বানাতেও ওস্তাদ ছিলেন তিনি। চং, পত্তিঙা, চিলা প্রভৃতি।
তাঁর ঘুড্ডিগুলো দেখতে খুবই সুন্দর হতো। তিনি খুব ভালো অভিনয় করতেন। তাঁর
কণ্ঠস্বর খুবই বলিষ্ঠ ছিলো। অন্যান্য পাড়ার লোকদের নিয়ে আমাদের পাড়ায় একটি
যাত্রাদল গঠন করেছিলো। তাঁরা অভয়-দুলাল যাত্রাপালা অভিনয় করতো। সেখানে নালু
মিয়া ধর্মের অভিনয় করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নালু মিয়ার বয়স
ছিলো ২১ বছর।
নালু মিয়া বিয়ে করেছিলো মহম্মদ পুরের
তারাবানুকে। আমাদের কাকা ভেলু মিয়া তাঁদের বিয়েয় উকিল হয়েছিলো। তখন উকিল
মেয়েকে নিজের মেয়ের মতোই আদর করতো উকিল বাবারা। সেই সুবাদে নালু মিয়া আমাদের
ভগ্নীপতি ছিলেন। আমরা তাঁকে ‘মিয়াভাই বলে ডাকতাম। আমাদের উকিল বোন
তারাবানু মাঝে-মধ্যেই আমাদের বাড়ীতে নাইওর যেতো। আমরা তাঁকে আপন বড় বোনের মতই
শ্রদ্ধা করতাম। তাঁরাবানু দেখতে খুবই উচা-লম্বা এবং হৃষ্ট-পুষ্ট ছিলো। একেবারে
পালোয়ানের মতো। পাঞ্জাব অথবা হারিয়ানায় জন্ম হলে নিশ্চয় সে পালোয়ানই হতো।
তাঁদের দুই ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম সমেজ উদ্দিন ও মিনাজ
উদ্দিন এবং মেয়ের নাম মজিরন নেসা।
নালু মিয়া এবং তারাবানু অনেক দিন আগেই
মারা গেছে।
জহুরুদ্দিনঃ- জহুরুদ্দিন
লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মেহের শ্বেখ। তিনি আমাদের গ্রামের
বয়োবৃদ্ধ লোকদের একজন ছিলেন। তাঁদের দু'টি বাড়ী ছিলো। একটি ছিলো জাহানারপাড়ে
এবং অপরটি আলীগাঁয়ে। তাঁর দু'টি পক্ষ ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর
নাম মজিরন নেসা। জহুরুদ্দিনের পরিয়াল আগে আলীগাঁয় বাস করতেন। ১৯৬০ সালে তাঁর
ছেলেরা আমাদের পাড়ায় স্থানান্তর হয়েছিলো। তখন জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে
জহুরুদ্দিন কয়েক বছর তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আলীগাঁয় তাঁর ছোট ভাই কাঞ্চু শ্বেখের
পরিয়ালে ছিলেন। সেজন্য তাঁর ছেলেদের ভোট ১৯৬৬ সালে পূব দেউলদি হয়েছিলো যদিও ১৯৬৬
সালে জহুরুদ্দিন এবং মজিরন নেসার ভোট আলীগাঁয় হয়েছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে জহুরুদ্দিনের বয়স ৭৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী মজিরন নেসার ৬০ বছর।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম বেলি
খাতুন। তিনি আমাদের পাড়ারই নান্দু শ্বেখের মেয়ে।
বেলি খাতুন বোবা ছিলেন। মোটেই কথা বলতে
পারতেন না। শুধু আ- আ- করতেন। তাই সবাই তাঁকে বোবী বলে ডাকত। তিনি দেখতে খুবই
সুন্দরী ছিলেন। লম্বা-চওড়া এবং গাত্রের রং কাচা হলুদের মতো ছিলো। কথা বলতে না
পারলেও সবার সাথে সৎ ব্যবহার করতেন এবং সকল কাজ সুন্দরভাবে করতে পারতেন।
ইস্টি-কুটুম্ব গেলে তাঁদের যথাযথ সমাদর করতেন।
জহুরুদ্দিনের প্রথম পক্ষের স্ত্রী
মজিরন নেসার তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হিকমত আলী,
হায়াত আলী, ফুলমালা খাতুন এবং ওয়াজুদ্দিন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী বেলি খাতুনের
এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের নাম পলান আলী এবং মেয়ের নাম হামেলা খাতুন।
হিকমত আলী-
হিকমত আলী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। তিনি ধীর-স্থির স্বভাবের ছিলেন। হিকমত
আলীর স্ত্রীর নাম বেলিমন নেসা। আমাদের পাড়ারই মাতাব আলী মুন্সির মেয়ে। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হিকমত আলীর বয়স ৪২ বছর এবং তার স্ত্রী বেলিমনের ২৮
বছর। আমি বয়সে হিকমত আলীর চেয়ে অনেক ছোট হলেও আমাকে যথেষ্ট সন্মান করতেন। অনেক
কাজে আমার পরামর্শ নিতেন। বাঘবর থানা নদীপ্রবণ এলেকায় হওয়ার জন্য থানায় সব সময়
দু'টি নৌকা মজুত থাকতো। হিকমত আলীদের একটি বড় নৌকা ছিলো। সেই নৌকা
নিয়ে তিনি বাঘবর থানায় থাকতেন ।
হিকমত আলীর দু'টি পক্ষ ছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী বেলিমনের গর্ভে রূপবানু এবং সহরবানু নামের দুটি মেয়ে জন্মের
পরে আর কোনো সন্তান হয়নি। তাই ছেলে সন্তানের আশায় আমাদের পাড়ার নবুরুদ্দিনের
মেয়ে হামেলা খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন। তবে, তাঁর ছেলে
সন্তানের আশা পূরণ হয়নি। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে চারটি মেয়ে সন্তান জন্ম
লাভ করেছে। মেয়েদের নাম যথাক্রমে নয়ন বানু, ফুলবানু,
জ্যোৎস্না বানু এবং চন্দ্ৰবানু।
হিকমত আলী ১৯৯৫ এবং বেলিমন নেসা ২০১৮
সালে মারা গেছেন।
হায়েত আলী-
হায়েত আলী লম্বা-চওড়া এবং বলিষ্ঠ। তাঁর শরীরের রং ফর্সা। তিনি চাষ-আবাদের সমান্তরালভাবে
ধান-চালের ব্যবসা করতেন। এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে এবং ছেলে-পেলে কাজের উপযুক্ত
হয়েছে, তাই এখন আর ব্যবসা করেন না। তিনি বিয়ে করেছেন চারটি। প্রতিটা
বিয়েতেই আমি উকিল হয়েছি। তিনি প্রথম বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের হাকিমুদ্দিনের
বোন তারাবানুকে। তারাবানুকে বিয়ে করার সময় আমি খুবই ছোট ছিলাম এবং তখন আমরা
আলীগাঁয়ে ছিলাম। তারাবানুকে কখন বিয়ে করেছিলো সেকথা আমি বলতে পারব না। তবে,
সে যে আমার উকিল মেয়ে ছিলো এ কথা জানা ছিলো। সে আমাকে কোলে নিয়ে
ঘুরে বেড়াতো। কি জন্য জানিনা, তারাবানু ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিলো।
তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। তারাবানুর মৃত্যুর পরে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের
তহের আলীর মেয়ে জবেদা খাতুনকে। তখন আমি ছোট ছিলাম যদিও বিয়ের কথা আমার মনে আছে।
তাহের আলীর ওঠোনে সামিয়ানা টানিয়ে সেখানে বরযাত্রীদের বসতে দিয়েছিলো। আমি বাবার
কোলে বসে একটি চাদরের এক প্রান্তে ধরেছিলাম এবং হায়াত আলী অন্য প্রান্তে
ধরেছিলেন। মুন্সি সাহেব কেমনে বিয়ে পড়িয়েছিলো, সে কথা আমার মনে নেই।
অজ্ঞাত কারণে জবেদা খাতুনের নাম
তারাবানুই রেখেছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হায়াত আলীর বয়স ৩৯ বছর এবং
জবেদা খাতুনের ২৯ বছর। জবেদা খাতুন শান্ত-শিষ্ট এবং ধীর-স্থির স্বভাবের ছিলো।
জবেদা খাতুনের গর্ভে এক মেয়ে, চার ছেলে। মেয়ের নাম কদবানু। মেয়ে
সবার বড়। বিয়ে হয়েছে শালবারী অঞ্চলের চেংলীমারীর আব্দুল হামিদের ছেলে আরফান
আলীর সাথে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে মহম্মদ আলী, ইয়াদ আলী,
নিয়েত আলী এবং রহম আলী। নিয়েত আলী হায়ার সেকেন্ডারী পাস করেছিলো।
সে ২০১৭ সালে মারা গেছে। মহম্মদ আলী স্নাতক। সে পোষ্ট মাস্টর। ইয়াদ আলী বাঘবর
বাজারে মুদির দোকান করে। রহম আলীও ব্যবসায়ী।
জবেদা খাতুনের মৃত্যুর পরে বিয়ে
করেছিলো আলীগাঁয়ের আশ্রব আলীর মেয়ে খোদেজা খাতুনকে। সে বিয়ে বেশিদিন টেকেনি।
বছরখানেক পরেই উভয়ের সন্মতিতে তালাক হয়ে গিয়েছিলো। খোদেজা খাতুনের কোনো
সন্তান-সন্ততি হয়নি।
খোদেজা খাতুনের সাথে তালাকের পরে বিয়ে
করেছে শালবারীর নবুরুদ্দিনের মেয়ে তারাবানুকে। তারাবানুর গর্ভে এক ছেলে, এক
মেয়ে। ছেলের নাম তরপ আলী এবং মেয়ের নাম হাসেনা বানু।
হায়েত আলী আলী ২০২২ সালে মারা গেছেন। তারাবানু
এখনও জীবিত।
ওয়াজুদ্দিন-
ওয়াজুদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। ছোট বেলা তাঁর বসন্ত রোগ হয়েছিলো । তাই
মুখে বসন্তের দাগ বিদ্যমান ছিলো। তিনি কৃষিকাজের সমান্তরালভাবে ব্যবসায় করতেন।
তিনি বিয়ে করেছিলেন আমাদের পাড়ারই আব্দুল খালেকের মেয়ে কমলজান নেসাকে। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে ওয়াজুদ্দিনের বয়স ২৯ বছর এবং কমলজান নেসার ২৩ বছর।
কমলজানের শরীরের রং শ্যামলা। স্বভাব শান্ত-শিষ্ট। তবে, একটু খাটো এবং
স্বাস্থ্যবান। তাঁদের ছেলে-মেয়ে তিন জন। দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে বিশ্বা মিয়া, লালবানু এবং আব্দুর রহিম। বিশ্বা
লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ। বাঘবর পঞ্চায়েত নির্বাচনে সে একবার বাঘবর পাথারের
ওয়ার্ড মেম্বার হয়েছিলো। আব্দুর রহিম দর্জি কাজ করে। সে মার মতোই একটু খাটো। তবে
শরীরের রং ফর্সা এবং স্বাস্থ্যবান। কমলজান নেসা এখনও জীবিত।
পলান মিয়া-পলান
মিয়া জহুরুদ্দিনের দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। সে লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা। আমার থেকে
কিছুটা ছোট। যৌবনকালে তাঁর শরীরে প্রচুর শক্তি ছিলো এবং নৌকার দাঁড় বৈঠা টানায়
খুব ওস্তাদ ছিলো। তাঁর দাঁতগুলো একটু ফাঁক ফাঁক। সে ধীর-স্থির স্বভাবের। সে
চাষ-বাসের সমান্তরালভাবে ব্যবসা করে। সে বিয়ে করেছে আমাদের পাড়ারই আসরুদ্দিনের
মেয়ে আউসীমন নেসাকে। তাঁদের ছয় ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম আসান আলী,
পাশান আলী, সাহজাহান আলী, ময়েজ উদ্দিন,
আতর আলী এবং গোলাপ হোসেন। মেয়েদের নাম উজালা খাতুন এবং হালিমন নেসা।
ছেলেরা ব্যবসায় করে।
পলান এবং তাঁর স্ত্রী এখনও জীবিত আছে।তবে
পলান আলী কেন্সার রোগে আক্ৰান্ত।
হামেলা খাতুন-
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে হামেলা খাতুন । সে লম্বা-চওড়া এবং শরীরের
রং কাচা হলুদের মতো। ছোট বেলা সন্নিপাত জ্বর হয়ে সে চোখের দৃষ্টি শক্তি
হারিয়েছিলো। অন্ধ হলেও সে সকল কাজ-কাম নির্ভুলভাবে করতে পারতো। তবুও অন্ধ কারণে
কেউ বিয়ে করতে এগিয়ে আসেনি। তাই অন্ধত্ব থেকে পরিত্রাণের জন্য অনেক চিকিৎসা করা
হয়েছিলো। আমি নিজেই একবার তার ভাইদের সহযোগিতায় কোচবিহার নিয়ে গিয়েছিলাম।
ডাক্তর পরীক্ষা করে বলেছিলেন- আমি পরীক্ষা করে দেখলাম, আলো অনুভব করতে
পারে। উন্নত চিকিৎসা করালে ভালো হতে পারে। তবে, কোচবিহারে এর
চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না। পাটনা গিয়ে দেখতে পারেন।
পাটনা নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো যদিও পরে
আর নিয়ে যাওয়া হয়নি। তাই তাকে চিরজীবন অন্ধকারেই কাটাতে হচ্ছে। একটু বেশি বয়সে
তাকে বিয়ে করেছে মরাভাজের শুকুর আলীর ছেলে আয়নাল হক। তাদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে
হয়েছিলো। তারা শিশু অবস্থাই মারা গেছে। হামেলা খাতুনও ২০০৮ সালে মারা গেছে।
জয়ধর আলীঃ- জয়ধর আলী
আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা। বাবাদের খালাত ভাই। তিনি লম্বা-চওড়া হৃষ্ট-পুষ্ট এবং
শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর স্বভাব শান্ত-শিষ্ট ছিলো। তিনি আমাদের মসজিদের জন্য আধা
বিঘা জমি দান করেছিলেন। তিনি কৃষিকাজ করতেন। জয়ধর জেঠার দুটি পক্ষ ছিলো। প্রথম
পক্ষের স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে মৃতু বরণ করেছিলো। প্রথম পক্ষের
স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে তিনি ছেঙা অঞ্চলের রৌমারি গ্রামের শামেলা খাতুনকে বিয়ে
করেছিলেন। প্রথম পক্ষের স্বামী মারা যাওয়ার পরে সামেলা খাতুন হুটু নামের একটি
ছেলে সহ জয়ধর আলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো। সেই সুবাদে জয়ধর আলীর তিন
ছেলে এবং দুই মেয়ে। প্রথম পক্ষের ছেলের নাম ছিলো মেসের আলী। মেসের আলী অনেকদিন
আগে মারা গেছে। অবশ্যে তার ছেলে-মেয়েরা জীবিত আছে।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী সামেলা খাতুনের
দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হুটু মিয়া, জমেলা
খাতুন, হরিন বানু এবং আমির আলী। হরিন বানুকে লোকে হর বলে ডাকতো। আমি তামাসা
করে হর গোবিন্দ বলে ডাকতাম। ছেলেরা সবাই মারা গেছে। এখন জীবিত আছে জমেলা খাতুন এবং
হরিন বানু। ওদের বালিকুরিতে বিয়ে হয়েছে। কারণ আমাদের পাড়াটা নদী ভাঙনের কবলে
পরার পরে জেঠী ছেলে- মেয়েদের নিয়ে বালিকুরি অঞ্চলের টেবিল-এ উঠে গিয়েছিলো।
জেঠি সামেলা খাতুন প্রথমে গিয়ে এলাহি
বক্সের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলো। এলাহি বক্স আমাদের ফুফু হালেমন নেসার ধর্মবাবা
ছিলো। সেই সুবাদেই এলাহি বক্সের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক ছিলো। এলাহি বক্সের ছেলের
বিয়েতে আমি ফুফুর সাথে একবার তাঁদের বাড়ী গিয়েছিলাম। সেই বিয়েতে কাদঙের ‘শ্বহীদ
কারবালা' গীতিনাট্য অভিনীত হয়েছিলো।
তালু মিয়াঃ- তালু মিয়া
মাঝারি গঠনের হৃষ্ট-পুষ্ট এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি ১৯৬৬ সালের আগেই
আমাদের পাড়ার ওয়াজুদ্দিনের কাছে জমি বিক্রী করে কাদং অঞ্চলের রূপাকুছি চলে
গিয়েছিলেন। তাই ১৯৬৬ সালের পূব দেউলদির ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তালু মিয়া
বলশালী, সাহসী এবং গোয়ার প্রকৃতির লোক ছিলেন। আগেই বলেছি আমাদের পাড়াটা ছিলো
বন্যাপ্রবণ এলেকায়। বছরের প্রায় পাঁচ ছয় মাস জলের তলায় ডুবে থাকতো। আউশ,
আমন বা শালিধান তেমন হতো না। তাই গরু ছাগলের খাবার জন্য ঘাস থাকতো
না। বর্ষা মাসে ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চর থেকে কাইশা বন কেটে এনে গরু ছাগলদের
খাওয়াতে হতো। ব্রহ্মপুত্র নদ তখন খুবই ভয়ংকর ছিলো। স্রোত ছিলো প্রচন্ড তীব্র।
বড় বড় ঘূর্ণিপাক পড়তো। এক মাইল দূর থেকেই জলের গর্জন শুনা যেতো। তাই কেউ ছোট
নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে সাহস করতো না। বড় বড় নৌকা নিয়ে কাইশা বন কাটতে যেতো।
তালু মিয়ার চৌধ্য পনের হাত একটি নৌকা ছিলো। সে একাই সেই নৌকা নিয়ে ঘাস কাটতে
যেতো। একবার ঘূর্ণি পাকে পরে তাঁর নৌকা ডুবে গিয়েছিলো। নৌকায় কাইশা থাকার জন্য
নৌকাটা কিছু পরেই জলের উপরে ভেসে উঠেছিলো। তখন বড় নৌকা গিয়ে তাঁকে নৌকা সহ
উদ্ধার করেছিলো।
একবার তালু মিয়া কাদং বাজার থেকে দেড়
মোন ধান কিনেছিলো। কাদং আমাদের গ্রাম থেকে কমেও আঠ মাইল দূরে। তখনকার দিনে কাদং
আসা-যাওয়ার জন্য খরা মরশুমে হাঁটা পথ এবং বর্ষার মরশুমে নৌকাই ছিলো একমাত্র ভরসা।
তালু মিয়া একবার উন্না মাসে কাদং হাটে গিয়ে দেড় মোন ধান কিনেছিলো। সেই ধান
মাথায় নিয়ে মুড়ি চিবোতে চিবোতে তিনি বাড়ী এসেছিলেন। এমনকি গুদারা নৌকায়ও তিনি
ধানের বস্তা মাথায় নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলো। এমনই বলশালী ছিলো তালু মিয়া। তালু
মিয়া কাদং অঞ্চলের মহম্মদ পুর গ্রামে ২০ বছর আগে মারা গেছে।
তালু মিয়ার স্ত্রীর বাম চাপার মাংস
ছিল না। তাই বাম চাপার দাঁতগুলো বের হয়ে থাকতো। সেও অনেকদিন আগে মারা গেছে।
তালু মিয়ার ছেলে-মেয়ে চারজন। বড়
মেয়ের নাম ছিলো রংমালা। পরের দুই মেয়ের নাম সূর্য্যবানু এবং চন্দ্রবানু। ছেলের
নাম মহম্মদ আলী। রংমালার বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের মহম্মদ আলীর ছেলে আসান
উদ্দিনের সাথে। আসান ১৫ বছর ও রংমালা ১২ বছর আগে মারা গেছে। তাঁদের ছেলে-মেয়েরা
জীবিত আছে।
ছেলে মহম্মদ আলী ২০১৮ সালে মৃত্যু বরণ
করেছে।
আসরুদ্দিনঃ- আসরুদ্দিন
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শামবর্ণ ছিলো। তাঁর বাবার নাম মাজম আলী। তিনি আমাদের
কাকা ভেলু মিয়ার ভায়রা ছিলেন। তাঁর সাথে আমাদের কাকার খুবই সদ্ভাব ছিলো ।
আসরুদ্দিন প্রায়ই ভাটিবেলা আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতেন এবং রন্ধন গৃহে চৌকার
পাশে বসে চাচীর সাথে গল্প করতেন ৷ ভাত না খেয়ে প্রায় যেতেনই না। তাই আমাদের কাকা
একদিন ভাত খেতে ডাকার পরে আসরুদ্দিন বলেছিলো- কি দিয়ে ভাত?
তখন কাকা ঠাট্টা করে বলেছিলো- না,
আজ তরকারি নেই। মরিচ বাটা দিয়েই খেতে হবে।
তখন আসরুদ্দিন বলেছিলেন- রেজিয়ার মার
হাতের মরিচ বাটাও অনেকদিন খাইনি। বাড়তে বল। রেজিয়া আমাদের কাকার বড় মেয়ে। তাই
আসরুদ্দিন চাচীকে রেজিয়ার মা বলে ডাকতেন। এমনই সুসম্পর্ক ছিলো আমাদের কাকার সাথে
আসরুদ্দিনের। তাঁকে আমরা খালু বলে ডাকতাম। আসরুদ্দিন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। তাঁর কাজ
খুব পরিপাটি ছিলো। তবে, কাজ খুব আস্তে-ধীরে করতেন, কাজ
টিপে টিপে করতেন বলে সবাই তাঁকে ‘টিপা’ মিস্ত্রী বলতো।
তাঁদের একটি পাতি লেবুর গাছ ছিলো। গাছটি আমাদের পাড়ায় খুবই বিখ্যাত ছিলো। পাড়ার
সবাই জানতো গাছটির কথা। লেবু খুবই সুস্বাদু ছিলো। মুখে রুচি না থাকলে সেই লেবু
দিয়ে ভাত খাওয়া যেতো। তখনকার দিনেই একটি লেবু চার আনা করে বিক্রী করতো।
আসরুদ্দিনের স্ত্রীর নাম সুরিয়া খাতুন। সুরিয়া খাতুন
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি খুবই অমায়িক এবং মৃদুভাষী ছিলেন।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
আসরুদ্দিনের বয়স ৫২ বছর এবং তাঁর স্ত্রী সুরিয়া খাতুনের বয়স ৪০ বছর ছিলো।
তাঁদের তিন ছেলে এবং চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আমিরন নেসা, আউসীমন নেসা, খুশিমন নেসা,
সবুরুদ্দিন, হাবেজ উদ্দিন, ময়নাল হক এবং
ফিরোজা খাতুন।
ছেলে-মেয়ে কেউ লিখা-পড়া শেখেনি।
মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ব্যবসা করে ছেলেগুলো সবাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ছোট ছেলে
ময়নাল হক ব্যবসায়ে খুবই উন্নতি করেছে। তাকে বাঘবর অঞ্চলে সবাই মারোয়ারি বলে
সম্বোধন করে।
সুরিয়া খাতুন ১৯৮৯ এবং আসরুদ্দিন ১৯৯১
সালে মৃত্যু বরণ করেছে। ছেলে-মেয়েরা সবাই জীবিত আছে।
জোনাব আলীঃ- জোনাব আলী
অপেক্ষাকৃত খাটো এবং স্বাস্থ্যবান ছিলো। মুখে চাপ দাড়ি এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর
বাবার নাম লালচান মিয়া। প্রথম জীবনে তিনি কৃষিকাজ করতেন। পরে সুফি পীর হয়েছিলেন।
তাঁর কিছু মুরিদান আছে। তিনি সবার সাথে মিশতে পারতেন। সহজ-সরল লোক ছিলো। তাঁর
স্ত্রী ওয়াকজান নেসা সুন্দরী ছিলেন। তিনি মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। মৃদুভাষী
এবং সহজ-সরল ছিলেন। আমাদের ফুফাত ভাই ফজল হক তাঁদের মেয়ে রংমালাকে বিয়ে করেছিলো।
সেজন্য জোনাব আলীকে তাওই এবং ওয়াকজান নেসাকে আমরা মাউই বলে সম্বোধন করতাম। তাঁরা
আমাদের খুবই আদর-সোহাগ করতো।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে জোনাব
আলীর বয়স ৪২ এবং ওয়াকজান নেসার ৩২ বছর ছিলো। নদী ভাঙনের পরে জোনাব আলী বালাজান
উঠে গিয়েছিলো। বালাজানও ১৯৮৭ সালে বেকি নদীর ভাঙনের কবলে পরাতে ছেলেগুলো কেউ কেউ
গোয়ালপাড়া উঠে গিয়াছে এবং কেউ কেউ বাঘবর অঞ্চলেই রয়ে গেছে।
জোনাব আলী ১৯৯৭ সালে এবং ওয়াজান নেসা
২০১৫ সালে গোয়ালপাড়াতে মারা গেছে।
জোনাব আলী দম্পতির চার ছেলে এবং তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রংমালা খাতুন, দির গজ আলী,
হজরত আলী, রহম আলী, হোসেন আলী,
জয়মালা খাতুন এবং খইমালা খাতুন। রংমালা খাতুন- রংমালা দেখতে খুবই
সুন্দরী ছিলো। মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং কাচা হলুদের মতো ছিলো। তার বিয়ে
হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই পন্ডিত আলীর ছেলে ফয়জল হকের সাথে। তাঁদের দুই
মেয়ে ফজিরন নেসা এবং মজিরন নেসা। রংমালা অনেকদিন আগে মারা গেছে।
দিরগজ আলী-দিরগজ
আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে ছেলেবেলা চঞ্চল স্বভাবের
ছিলো। খুব কথা বলতো। কারো সাথে কাইজা-পেচাল করতো না। হেঁসে হেঁসে কথা বলতো। কিছুটা
কৌতুকপ্রিয়ও ছিলো।
দিরগজ আলী খোলা-ধুলায় ভালো ছিলো।
ব্রহ্মপুত্র নদ তখন একেবারে আমাদের বাড়ীর সামনে। তাই নদী থেকে বালু উঠে আমাদের
পাড়ায় বালুর পুরো আস্তরণ পরেছিলো। সেই বালুর মাঝে যদু জেঠার বাড়ীর সামনে আমরা
বিকেল বেলা হা-ডুডু খেলতাম। হা-ডুডু খেলার মাঝে হাই-জাম্প এবং লং-জাম্পেরও
প্রেকটিস্ করতাম। তখন দিরগজ আলী হাইজাম্পে পাঁচ ফুট এবং লংজাম্পে ১৭ ফুট পর্যন্ত
যেতে পারতো।
দিরগজ আলী বর্তমান গোয়ালপাড়াতে থাকে।
সে বিয়ে করেছে বালাজানের জবেদ আলীর মেয়ে তাজিরন নেসাকে। দিরগজ আলী এখন সুফি
সাধক। মুর্শিদি গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে। বাড়ীতে ঢোল-খোল- তাল-দোতারা
আছে। তাঁদের তিন মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়েদের নাম জেলেকা খাতুন, এলেসা
খাতুন ও সালেহা খাতুন এবং ছেলেদের নাম তাইজুদ্দিন ও সাইজুদ্দিন। ছেলে-মেয়েরা কেউ
তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। ছেলেরা ব্যবসায়ে নিয়োজিত। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। দিরগজ
আলীর স্ত্ৰী ২০২২ সালে মারা গেছে।
হজরত আলী-
হজরত আলী লম্বা ছিপছিপে গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে মৃদুভাষী। সে বিয়ে করেছে
কাদঙের আব্দুল কাদেরের মেয়ে অজুপা খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাফিজা খাতুন, বাবুল আকতার এবং
রুবুল আকতার।
রহম আলী-রহম
আলী মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা। সে বিয়ে করেছে গোয়ালপাড়ার কদবানুকে ।
তাদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মহিবুল
ইসলাম, আরিফ আলী, রহিমা খাতুন এবং তালেব আলী। রহম আলী ব্যবসায়ী।
হোসেন আলী-
হোসেন আলী মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা। সে মৃদুভাষী। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের
মিয়াচানের মেয়ে মিশ্রন নেসাকে। তাদের এক ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে হোসনা বানু, সাহিদা খাতুন, সিলিমা খাতুন
এবং মেহের আলী। হোসেন আলী ব্যবসায়ী।
সালাম উদ্দিনঃ-
জোনাব আলীর ছোট ভাই সালাম উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। কারো
সাথে তেমন মেলা-মেশা করতো না। সহজ-সরল স্বভাবের ছিলো। তাঁর স্ত্রী ফুলজান নেসাও
সহজ-সরল স্বভাবের ছিলো। সে মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে সালাম উদ্দিনের বয়স ৪০ বছর এবং ফুলজান নেসার ২৮ বছর। সালাম
উদ্দিন ১৯৮৩ সালে বাঘবর পাথারে মারা গেছে।
সালাম উদ্দিনের দুটি পক্ষ ছিলো। প্রথম
পক্ষের স্ত্রী ফুলজান নেসার মৃত্যুর পর বালাজানের ইয়াকুব আলীর মেয়ে ফালানী
খাতুনকে বিয়ে করেছিলো।
সালাম উদ্দিনের প্রথম পক্ষের তিন ছেলে
যথাক্রমে শিরজন আলী, কুজরত আলী এবং দরবেশ আলী। দ্বিতীয় পক্ষের
একমাত্র মেয়ের নাম জহুরা খাতুন। ছেলেগুলো মাঝারি গঠনের এবং শ্যামলা রঙের । কেউ
লিখা-পড়া শেখেনি। মেয়ে জহুরা খাতুন ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। বিয়ে হয়ে গেছে।
ঘর-গৃহস্থালি করে।
মাতাব আলী মুন্সি-মাতাব
আলী মুন্সি ছোট-খাটো গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলেন। তিনি
আমাদের মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। আরবী এবং বাংলা সাবলীলভাবে
পড়তে পারতেন। তিনি মাঝে সময়ে প্রয়োজনে ভিক্ষাও করতেন। তবে, গ্রামে
না, হাটে হাটে। খুবই অমায়িক স্বভাবের লোক ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৭৫ বছর। মাতাব আলী মুন্সির দুটি পক্ষ ছিলো । প্রথম
পক্ষের স্ত্রীকে আমি দেখিনি। নামও জানিনা। আমি ছোট থাকতেই সম্ভবতঃ মারা গিয়েছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বেলিমন নেসা নামের একটি মেয়ে এবং ডাওরী নামের একজন ছেলে
সন্তান ছিলো। বেলিমন নেসার বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই জহুরুদ্দিনের ছেলে হিকমত
আলীর সাথে। আমরা যখন দেখেছি তখন ডাওরী মাতাব আলী মুন্সির সাথে থাকতো না। বিয়ে করে
আমাদের গ্রামেই অন্য পাড়ায় বসবাস করতো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে
মাতাব আলী মুন্সি সরিফন নেসাকে বিয়ে করেছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সরিফন নেসার বয়স ছিলো ৪৮ বছর। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় বোন ছিলো। আমি বুবু বলে
ডাকতাম। খুবই জনপ্রিয় মহিলা ছিলেন। শরীরের রং কালো ছিলো। হৃষ্ট-পুষ্ট, স্বাস্থ্যবান
ছিলেন। তিনি ধাই হিসাবেও বিখ্যাত ছিলেন। হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। প্রচুর পাণ খেতেন।
পাণ খেলেও দাঁতগুলো পরিস্কার করে রাখতেন। ছোট-খাট রোগের চিকিৎসাও করতেন। আমার এক
সময় মাঝে সময়ে মাথা ব্যথা করতো। তখন তিনিই আমার মাথা ব্যথার চিকিৎসা করতেন। টাকা
পয়সা কিছু দিতে হতোনা, হাজত হিসাবে এক গোছা করে পাণ দিতে হতো। চোখের
ওপড় এবং তলের কোলের ভেতর সেই পাণের ডাঁটি ঢুকিয়ে চোখ থেকে এক ধরণের বিজল বের করে
জলের মাঝে ছেড়ে দিতো। তখন জলের মাঝে সেই বিজল ভাসতো । এই রকম কয়েক দফা বিজল বের
করে দিলেই মাথাব্যথা কমে যেতো। পরে আমি নিজেই এ-কাজ করতাম এবং বেদনা থেকে উপশম পেতাম। কারও মাথা ব্যথা
হলে আমি তাকে এ-কাজ করার জন্য পরামর্শ দিতাম। আসলে চোখের মাঝে
এক ধরণের বিজল জমা হলে মাথা ব্যথা করে, বিজল বের করে দিলেই ব্যথা উপশম হয়।
এখানে অন্য কোনো কেরামতি নেই।
মাতাব আলীর দুই ছেলে। মেয়ে নেই। বড়
ছেলের নাম ছিলো বুদ্ধু মিয়া এবং ছোট ছেলের নাম বোরহান আলী। বুদ্ধু মিয়া- বুদ্ধু
মিয়া মাঝারি গঠনের এবং দেখতে মায়ের মতই হৃষ্ট-পুষ্ট ছিলো। তাঁর শরীরের রং কালো
ছিলো। সে কাঠমিস্ত্রী ছিলো। তাঁর কাজ খুব পরিপাটি ছিলো। আমাদের বাড়ীর অনেক কাজ
করিয়েছি তাঁকে দিয়ে। আমার পরামর্শ মতে সে আমাকে একটি তিন পায়া টেবিল বানিয়ে
দিয়েছিলো। টেবিলটা অবশ্যে নেই, তবে তার একটি পায়া এখনও আছে আমাদের
বাড়ীতে। সে দোতরা বাজাতে পাড়তো। আমি কয়েকদিন তাঁর কাছে দোতরা বাজনা শিখেছিলাম।
দোতরাটাও বুদ্ধই যোগাড় করে দিয়েছিলো। অবশ্যে শিক্ষা শেষ করতে পারিনি।
বুদ্ধু মিয়া সাহসী এবং একটু গোয়ার
প্রকৃতির ছিলো। সে যে গোয়ার এবং সাহসী ছিলো একটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।
১৯৭৮ সালের কথা। আমরা একবার গোয়ালপাড়ার শিমলতলা খগেন মেধির কাঠ-মিলে নৌকা নিয়ে
কাঠ কিনতে গিয়েছিলাম। সেদিন আমার সাথে ছিলো ওয়াজুদ্দিন, ফয়জল হক, পলান মিয়া এবং
বুদ্ধু মিয়া। আরও কয়েকজন ছিলো যদিও এখন তাঁদের নাম মনে নেই।
বর্ষার মরশুম ছিলো। জলজলি নদীর একটি
খাল দিয়ে এগিয়ে গিয়ে নৌকাটা একেবারে খগেন মেধি বাড়ীর ঘাটে ভিরিয়ে ছিলাম। আমরা
কাঠ দেখে এসে খগেন মেধির বাড়ীতে বসে খগেন মেধির ছেলে উৎসব মেধির সাথে কথা
বলছিলাম। উৎসব মেধি লোকটি খুবই ভদ্র এবং অমায়িক ছিলো। তাঁর সাথে কথা বলে খুবই
ভালো লাগছিলো।
আমরা বসেছিলাম কয়েকটি রোম বিশিষ্ট
একটি পাকা ঘরে। আমরা যে রোমে বসেছিলাম সেই রোম সংলগ্ন একটি রোম তালাবদ্ধ ছিলো।
তালায় মরচে ধরে গিয়েছিলো। তাই তালার অবস্থা দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে
রোমটা অনেক দিন যাবত তালাবদ্ধ হয়ে আছে। উৎসব মেধির ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে আমাদের কে
একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলো- রোমটা তালা দিয়ে রেখেছেন কেন?
তখন উৎসব মেধি আক্ষেপ করে বলেছিলো-
রোমটা প্রায় ছয় মাস যাবত তালাবদ্ধ করে রেখেছি। রোমে আইড়া বল্লায় বাসা বেঁধেছে।
প্রথমে চাকটা ছোট ছিলো। এখন মস্ত বড় হয়েছে। কেউ এখন রোমে থাকতে চায় না। তাই
তালাবদ্ধ করে রেখেছি।
তখন বুদ্ধু মিয়া বলল- আমি চাকটা ভাঙতে
পারব।
উৎসব মেধি বলল- যদি কেউ চাকটা ভাঙতে
পারে, আমি তাঁকে পুরস্কৃত করব।
সেদিন রাতেই বুদ্ধু মিয়া একটি বস্তায়
ভরে চাকটা ভেঙে দিয়েছিলো এবং উৎসব মেধি তাঁকে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার দিয়েছিলো।
তখন পঞ্চাশ টাকার মূল্য কি ছিলো সেই
বিষয়ে একটু অনুমান করা যাক। তখন এক কেবি (কিউবিক)শালকাঠের মূল্য ছিলো সাড়ে তিন
টাকা। নদীপ্রবণ এলেকায় তখন দোতালা ঘর দেওয়ার এক প্রবণতা ছিলো । দোতলা ঘরের খুঁটির
জন্য ২১/২২ ফুট খুঁটির প্রয়োজন হতো। সেই খুঁটির মূল্য ছিলো যোরা ৬০
টাকা। ১২/১৩ ফুট কাঠের খুঁটির মূল্য ছিলো যোরা ১০/১২ টাকা। আমি ৩ টাকার কাঠ কিনে
একটি খাট বানিয়ে ছিলাম। খাটটি এখনও আমরা ব্যবহার করছি। এই কাঠগুলো আমরা খগেন
মেধির কাঠমিল থেকে কিনেছিলাম । তাই একেবারে প্রামাণ্য মূল্য।
বুদ্ধু আমার থেকে বয়সে কিছুটা বড়
ছিলো। সে চৌধ্য পনের বছর আগে বাঘবর পাথারে মারা গেছে। সে আমাদের পাড়ারই ইয়ার
উদ্দিনের মেয়ে হনুফা খাতুনকে বিয়ে করেছিলো। হনুফা অর্দ্ধাংগ রোগ হয়ে বর্তমান
শয্যাশায়ী। তাঁদের তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে হানিফ আলী, ইমান আলী ও
ওয়াজেদ আলী। মেয়েদের নাম সুন্দরী নেসা ও সুরমা খাতুন ।
বোরহান আলী-
বুদ্ধু মিয়ার ছোট ভাইয়ের নাম বোরহান আলী। বোরহান আলী আমার থেকে কিছুটা ছোট।
বোরহান লম্বা এবং ছিপছিপে গঠনের। শরীরের রং শ্যামলা। সে বিয়ে করেছে কয়াকুছির
ভোগামারির গাজী মামুদের মেয়ে সাহেরা খাতুনকে। নদী ভাঙনের পরে সে কিছুদিন
ভোগামারিতে ছিলো। এখন ভক্তেরডোবা অঞ্চলের হরিক্ষেত্রীতে ঘর-বাড়ী করে আছে। তার চার
মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে ফুলমালা খাতুন, আয়সা
খাতুন, সবেদ আলী(ছাবেদ আলী), ফালানী খাতুন এবং তাসমিনা খাতুন।
তাসমিনা খাতুন ম্যাট্রিক পাশ করেছে।
অন্যরা কেউ তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। প্রাইমারি পর্যন্ত পড়েছে। ছেলেরা দোকানপাট
করে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বোরহান আলী কৃষিকাজ করে।
জংসের আলীঃ- মাতাব আলী
মুন্সির পরের বাড়ীটা ছিলো জংসের আলী দেওয়ানীর। তাঁর স্ত্রীর নাম সাহাতন নেসা।
১৯৬৬ সালে তিনারা বালিকুরিতে ছিলেন। ১৯৭০ সালের পরে জাহানারপাড়ে উঠে এসেছিলেন।
জংসের আলী বৃদ্ধ ছিলেন। শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামলা ছিলো। তাঁর স্ত্রী সাহাতন
নেসাকে আমি যখন দেখেছি তখন কুঁজা হয়ে গিয়েছিলো। তাঁদের তিন ছেলে, আফাজ
উদ্দিন, মফিজ উদ্দিন এবং বসির উদ্দিন। মেয়ে তিনজন। মেয়েদের নাম আমার অজানা
।
আফাজ উদ্দিন-আফাজ
উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা ছিলো। আমার থেকে বয়সে কিছুটা বড় ছিলো।
তিনি মাতব্বরীও করতেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন বালিকুরির পরাণ দালালের মেয়ে ফুলজান
নেসাকে। তাঁদের তিন ছেলে,
ফখরুদ্দিন, আজিমুদ্দিন ও বাদশাহ মিয়া। চার মেয়ে,
সামেলা খাতুন, কমলা খাতুন, করিমন নেসা এবং
রহিমন নেসা। ছেলেদের মধ্যে একমাত্র আজিমুদ্দিন হায়ার সেকেন্ডারী উত্তীর্ণ। আফাজ
উদ্দিন অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
মফিজ উদ্দিন-
মফিজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা ছিলো। সে আমার থেকে কিছু ছোট ছিলো।
সে মৃদুভাষী ছিলো। ধীরে ধীরে সাজিয়ে ছোট ছোট করে কথা বলতো। গল্প করতে ভালো বাসতো।
সে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের ফজর আলীর মেয়ে জহুরা খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে,
নয়ান আলী এবং আয়ান আলী ।
নয়ান আলী শান্ত স্বভাবের ছিলো। তাকে
অজ্ঞাত কারণে দুস্কৃতিকারীরা হত্যা করেছে। মফিজ উদ্দিন অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
বছির উদ্দিন-
বছির উদ্দিনের শরীরের রং শ্যামলা এবং মাঝারি গঠনের। সে মৃদুভাষী এবং সাজিয়ে কথা
বলতে পারে। গল্প করতে ভালোবাসে। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের বিনোদ আলী মুন্সির
মেয়ে জুরিয়া খাতুনকে। জুরিয়া খাতুন আমার ছাত্রী ছিলো। তাদের দুই ছেলে, সাইজুদ্দিন
ও তাইজুদ্দিন। তিন মেয়ে, বাসিরন নেসা, এসনূর খাতুন এবং
আসমিনা খাতুন। বছির উদ্দিন কৃষিকাজে নিয়োজিত ।
পন্ডিত আলীঃ- পন্ডিত আলীর
বাবার নাম ছিলো আলিমুদ্দিন। তিনি লম্বা-চওড়া এবং শ্যামলা ছিলেন। তিনি প্রতিবন্ধী
ছিলেন। তাঁর ডান হাত কনুই পর্যন্ত ছিল না। তাই তাঁকে লোকে ‘টুইন্ডা’
পন্ডিত বলতো। মৃদুভাষী ছিলো। কারো সাথে কোনো কাজিয়া-পেচাল ছিল না।
শান্ত-শিষ্ট ছিলো। হাত নেই বলে তিনি কৃষিকাজ করতে পারতেন না। ছেলেরা কাজের উপযুক্ত না হওয়া
পর্যন্ত তিনি হাটে হাটে গিয়ে ভিক্ষা করতেন। ছেলেরা কাজের উপযুক্ত হওয়ার পরে
ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছিলো। পন্ডিত আলীর স্ত্রীর নাম ছিলো ভুলিমন নেসা। তিনি
উচা-লম্বা ছিলেন। তাঁর শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ
ছিলেন। কোনো কোনো সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ী থেকে চলে যেতেন। তখন তাঁকে
খোঁজে খোঁজে বাড়ীতে
ফিরিয়ে আনতে হতো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে পন্ডিত আলীর বয়স ৫১ বছর এবং
ভুলিমন নেসার ৩৮ বছর ছিলো।
তাঁদের তিন ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলেদের
নাম শুকুর আলী, আলিমুদ্দিন এবং জেলহক আলী। মেয়ের নাম হাজেরা খাতুন । হাজেরা খাতুনের
বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই দুখী মিয়ার ছেলে মফিজ উদ্দিনের সাথে। সে অনেক দিন
আগেই মারা গেছে।
শুকুর আলী-
শুকুর আলী চম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ। সে মৃদু ভাষী এবং হেঁসে হেঁসে কথা বলে। খুবই
অমায়িক এবং মিশুক প্রকৃতির। কৃষিকাজ করেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর
বয়স ২৬ বছর। তিনি বিয়ে করেছেন আমাদের পাড়ারই যদু মুন্সির মেয়ে রহিমন নেসাকে।
রহিমন নেসার রং শ্যামলা এবং মাঝারি গঠনের। মৃদুভাষী। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম, নায়েব আলী,বছিরন নেসা,
ময়নাল হক, জয়গন নেসা এবং হুরমুজ আলী।। ময়নাল হক
২০১৯ সালে মারা গেছে। জয়গন খাতুনও কয়েক বছর আগে নাগালেন্ডে মারা গেছে। ছেলেদের
মাঝে একমাত্র হুরমুজ আলী কিছু লিখা-পড়া শিখেছে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলো যদিও
পাস করতে পারেনি।
আলিমুদ্দিন-
আলিমুদ্দিন লম্বা গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। হেসে হেঁসে কথা বলে। মৃদুভাষী। কৃষিকাজ
করে। সামনের দাঁত বের হয়ে থাকে। আলিমুদ্দিনের বয়স ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে ২৩ বছর। সে বিয়ে করেছিলো আমাদের পাড়ারই নবুরুদ্দিনের মেয়ে রূপজান
নেসাকে। রূপজান নেসা আমাদের সম্পর্কীয় ভাগনি। রূপজান নেসার শরীরের রং শ্যামলা এবং
লম্বা-চওড়া। তাঁদের দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে। ছেলেদের নাম নোয়াব আলী ও নওশাদ আলী।
মেয়েদের নাম নূরবানু, জয়মালা, তারাবানু এবং
ফিরোজা খাতুন। কেউ তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। ছেলেদের মধ্যে একমাত্র নওসাদ ক্লাস এইট
পর্যন্ত লেখা-পড়া শিখেছে এবং মেয়ের মধ্যে ফিরোজা খাতুন ম্যাট্রিক ফেল।
আলিমুদ্দিন ২০১৪ সালে মারা গেছে।
জেল হক আলী-
জেলহক আলী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা। সে আমার সমবয়সী। ছোটবেলা একসাথে খেলা-ধুলা
করেছি। মৃদুভাষী এবং হেঁসে হেঁসে কথা বলে। অবশ্যে কথা কম বলে। তার আত্মসন্মানবোধ
প্রবল। কেউ তাকে গুরুত্ব না দিলে সে তাকে গুরুত্ব দেয় না। জেলহক আলী কৃষিকাজের
পাশাপাশি ব্যবসা করে। তার পক্ষ দুটি। সে প্রথম বিয়ে করেছিলো শালবাড়ীর পানপাড়ার
ফটিক আলীর মেয়ে পরিস্কার বেগমকে। পরিস্কার বেগম মারা যাওয়ার পরে বিয়ে করেছে
বালাজানের হায়াত আলীর মেয়ে লতিফা খাতুনকে। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর দুই ছেলে,
এক মেয়ে। ছেলেদের নাম পরশ আলী এবং সুলতান আলী। মেয়ের নাম জেলেমন
খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর তিন মেয়ে। আলিয়া খাতুন, সাজেদা খাতুন
এবং তাজমিনা খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের মেয়েগুলো ছোট ছোট। সবাই স্কুলে পড়ে।
নান্দু শ্বেখঃ-
নান্দু শ্বেখকে আমি দেখিনি। নাম শুনেছি। তাঁর ছেলে-মেয়েদের দেখেছি। নান্দু
শ্বেখের চার ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে দারোগালী, বেলি
খাতুন, গোপাল শ্বেখ, ছত্তর আলী এবং নোয়াই পাগলা। তাঁরা সবাই
লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। তবে, সবারই দাঁত ফাঁক ফাঁক ছিলো।
দারোগালী-
দারোগালী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স
৫৫ বছর। তিনি বিয়ে-থা করেননি। সংসার বিরাগী ছিলো। কৃষি কাজ করতো। খুবই সহজ-সরল ও
মৃদুভাষী ছিলো। সবার সাথে মিশতে পারত। তবে, মানুষের সংগ
এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। তিনি অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
বেলি খাতুন-
বেলি খাতুন লম্বা-চওড়া এবং শরীরের রং কাচা হলুদের মতো ছিলো। তিনি বোবা ছিলেন ।
কথা বলতে পারত না, শুধু আ-আ- করতো। তাঁর আসল নাম কেউ জানত না,
সবাই বোবী বলে ডাকতো । বেলি খাতুন দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলো যদিও
গলায় ছোট মতো একটি গেগ ছিলো। বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই জহুরুদ্দিনের সাথে।
তাঁদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে বড়। নাম পলান। মেয়ের নাম হামেলা খাতুন।
হামেলা খাতুন অন্ধ ছিলো। হামেলা খাতুনের বিষয়ে জহুরুদ্দিনের পরিয়ালে বর্ণনা করা
হয়েছে। তাই বাহুল্য হবে বলে এখানে বর্ণনা করলাম না।
গোপাল শ্বেখ-
গোপাল শ্বেখ লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে গোপাল
শ্বেখের বয়স ৫৫ এবং তাঁর স্ত্রী আজিলা খাতুনের ২৭ বছর। গোপাল শ্বেখ কৃষিকাজ
করতেন। তিনি সহজ-সরল ও মৃদুভাষী ছিলেন। মানুষের সংগ এড়িয়ে চলতেন। শান্তিপ্রিয়
ছিলেন। কারো এলে-মেলে থাকতেন না। তাঁদের এক মেয়ে। নাম ছিলো হরিনা খাতুন। গোপাল
শ্বেখ এবং আজিলা খাতুন উভয়ে অনেকদিন আগে মারা গেছে।
ছত্তর আলী-
ছত্তর আলী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় ছত্তর আলীর নাম
নেই। কেন নাম উঠেনি সে কথা অজ্ঞাত। তবে, তিনি যে ১৯৬৬ সালে আমাদের পাড়ায়
ছিলেন এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই।
ছত্তর আলীর মতো অনেকেরই নাম তখন ভোটার
তালিকা থেকে বাদ পড়তো। কারণ তখন ইনমারেটর হিসাবে বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার যুবকদের
নিয়োগ করা হতো। তারা বেশির ভাগই বরপেটার বাসিন্দা ছিলো । তারা গ্রামে তারা গ্রামে
এসে এক বাড়ীতে বসে সবার নাম লিখে নিতো। তাই অনেকের নাম বাদ পরে যেতো। ১৯৭৭ সালে
আমাদের পাড়ার সবারই নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পরে গিয়েছিলো। তখন আমাদের পাড়াটা
একেবারে নদীর পাড়ে পড়েছে। নদীর বান এসে বালির পূরো আস্তরণ পরে গ্রামটা একেবারে
মরুভূমির মতো হয়ে গিয়েছিলো। ইনুমারেটর বাঘবর এসে আমাদের তখনকার পঞ্চায়ত সভাপতি
বিল্লাল হোসেনকে গ্রামের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি অনুসন্ধান না করেই বলে
দিয়েছিলেন, গ্রামটা নেই। নদী ভাঙনের ফলে সবাই অন্যত্র চলে
গেছে।সভাপতির মুখে গ্রাম নেই বলে জেনে আমাদের গ্রামে লোক নেই বলে ইনুমারেটর
নির্বাচন পঞ্জীয়ন পদাধিকারীকে রিপোর্ট দিয়েছিলো। ঘটনাটা জানতে পেরে হিকমত আলী,
হায়েত আলী, আমি নিজে এবং অন্যান্য কয়েকজন মিলে
বরপেটা গিয়ে ইনুমারেটরের সাথে সাক্ষাৎ করে ভোটার তালিকার ড্রাফ্টে নাম লিখিয়ে
দিয়েছিলাম। সে ড্রাফ্টের কপি দুই একজনের কাছে সম্ভবতঃ এখনো আছে। তবে, জানিনা
কি কারণে, সে বছর আমাদের নাম ভোটার তালিকায় উঠেনি। এমনিভাবেই হয়তো ছত্তর আলীর
নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলো। স্মরণযোগ্য যে, আমাদের গ্রামের
সবার ১৯৫১ সালের এনআরসিতে নাম ছিলো। জমিয়ত উলেমা থেকে ১৯৬৫ সালে এনআরসির কপি
দিচ্ছিলেন। তখন সেখান থেকে
অনেকেই এনআরসির কপি সংগ্রহ করেছিলো। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, আমাদের
গ্রামের ১৯৫১ সালের এনআরসি ছিলো। তবে, সেই এনআরসির কপি সরকারের কাছে মজুত না
থাকাতে সবাই ২০১৪ সালে ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা দিয়ে এনআরসির ফর্ম পূরণ করতে
হয়েছে। সরকারের এই
দায়িত্বহীন কর্মকান্ডকে ধিক্কার জানানোর বাইরে অন্য কিছু করার উপায় নেই।
ছত্তর আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো।
তাঁর গলায় মস্তবড় একটি গেগ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। মৃদুভাষী ছিলো। তবে,
তেমন কথা-বার্তা বলতেন না। তিনি বিয়ে করেছিলেন বালাজানের
কিয়ামুদ্দিনের মেয়ে চম্পা খাতুনকে । তাঁদের তিন ছেলে, এক মেয়ে।
ছেলেদের নাম শুকুর আলী, মহম্মদ আলী ও ফয়জল হক এবং মেয়ের নাম কমলা
খাতুন। ছত্তর আলী অনেক দিন আগেই মারা গেছে। তাঁর স্ত্রী এবং ছেলে- মেয়েরা এখনও
জীবিত।
নোয়াই শ্বেখ-
নোয়াই শ্বেখও লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। নোয়াই শ্বেখের নামো ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকায় নেই। তিনি সংসার বিরাগী ছিলেন। সন্যাসীদের মতো জীবন যাপন করেতেন।
কারো এলে-মেলে যেতেন না। বেশি কথা বলতেন না। একাই মনে মনে বসে থাকতেন। তিনি টং
বেঁধে সুনসান কৃষিক্ষেত্রেও রাত্রি যাপন করতেন। তিনি অনেক দিন আগেই মারা গেছেন।
আমাদের পাড়ায় যে কয়টি পরিয়াল ছিলো
তাঁদের বিষয়ে পাখির চোখে তখন যা দেখেছি তাই লিখলাম । কিছু তথ্য আমি আমার সহোদর
হোসেন আলীর কাছে শুনেও লিখেছি। দুই চারটি পরিয়ালের সাথে যোগাযোগ করেও লিখেছি। তবু
যদি আমার অজানিতে কোনো তথ্য বিভ্রাট হয়ে থাকে তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
আমাদের দক্ষিণের পাড়া
আমাদের পাড়ার বাহিরেও আমাদের গ্রাম
এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের অন্য দুই-চারজন ব্যক্তির বিষয়ে কিছু কথা না
লিখলে অন্যায় হবে।
জাহানারপাড়েরই আমাদের দক্ষিণের
পাড়ায় ছিলো হোসেন আলী মুন্সির পরিয়াল । আমাদের বাড়ী থেকে দক্ষিণ পূবে ছিলো
তাঁদের বাড়ী। আমাদের বাড়ী থেকে হোসেন মুন্সিদের বাড়ী দেখা যেতো।
হোসেন আলী মুন্সিঃ- হোসেন
মুন্সি মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিলো পবন মুন্সি। তিনি আমাদের অঞ্চলের একজন
বিশিষ্ট মুরব্বী ছিলেন। আমাদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিলো।
তাঁর মুখে চাপ দাড়ি ছিলো। তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। আরবী ও বাংলা সাবালীলভাবে পড়তে
পারতেন। আরবী আয়াত দিয়ে তিনি চিকিৎসাও করতেন। তাঁর ব্যাগে সবসময় গঞ্জল আরশ
নামের একটি পুস্তিকা থাকতো। সেই গঞ্জল আরশ দিয়ে তিনি অনেক রোগের চিকিৎসা করতেন।
তখনকার দিনে দোস্ত পাতাটা আমাদের
বাঙালী মুসলমান সমাজে এক প্রকার পরম্পরার মতো ছিলো। দোস্ত ছিলনা এমন পরিয়াল তখন
খুবই কম ছিলো। এই পরম্পরা অনুসারেই আমাদের বাবা জনীয়া অঞ্চলের বাংলীপাড়ার কফিল
উদ্দিনের সাথে দোস্ত পেতেছিলেন। তাঁদের এই দোস্তির সম্পর্ক খুবই নিবিড় ছিলো। মাসে
একবার হলেও একজন আরেকজনের সাথে বাড়ীতে গিয়ে দেখা করতেন। রাত্রি যাপন করতেন। সুখ-
দুঃখের খবর নিতেন। একজনের বিপদ-আপদে আরেকজন ঝাঁপিয়ে পরতেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত
তাঁদের এই সুসম্পর্ক অটুট ছিলো।
হোসেন আলী মুন্সির ভাগনে ছিলেন কফিল
উদ্দিন। সেই সুবাদেই হয়তো বা হোসেন আলী মুন্সি আমাদের পরিয়ালের সাথে সুসম্পর্ক
রেখে চলতেন। হোসেন মুন্সি মাসে একবার হলেও আমাদের বাড়ীতে যেতেন এবং আমাদের
সুখ-দুঃখের খবর নিতেন।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হোসেন
মুন্সির বয়স ছিলো ৪৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী শুভক্ষন নেসার ৩৪ বছর। ভোটার তালিকায়
শুভক্ষন নেসার নাম উঠেছিলো হবক্ষন নেসা। শুভক্ষন নেসা ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণা
ছিলেন। তাঁদের পাঁচ ছেলে এবং দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সুবল উদ্দিন,
আজমত আলী, মুন্তাজ আলী, জমিরুদ্দিন,
হাজেরা খাতুন, জহুরন নেসা এবং আব্দুর রহমান।
সুবল উদ্দিন-
সুবল উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শ্যমবর্ণ ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সুবল উদ্দিনের বয়স ছিলো ২৮ বছর। তিনি কৃষিকাজ করতেন। ভোটার তালিকায় তাঁর নাম
উঠেছিলো মবিল উদ্দিন। তাঁর বয়সও ভুল উঠেছিলো। মার বয়স ৩৪ এবং ছেলের বয়স ২৮ বছর।
হাস্যকর ব্যাপার। তখন মনে হয় শুভক্ষন নেসার বয়স ছিলো ৩৮ বছর এবং সুবল উদ্দিনের
২৩ বছর।
আজমত আলী-
আজমত আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আজমত
আলীর বয়স ছিলো ২৫ বছর। আজমত আলীর নাম ভোটার তালিকায় উঠেছিলো হাসমত আলী। আসলে
আজমত আলীর নাম এবং বয়স দুটোই ভুল ছিলো। তখন এ রকম নামের ভুল সচারচরই দেখা যেতো।
এর জন্য পরবর্তী সময়ে অনেক অসুবধিার সন্মুখীন হতে হয়েছে অনেকে। আজমত আলীর ছোট
মোন্তাজ আলী। মোন্তাজ আলীর ছোট জমিরুদ্দিন এবং আব্দুর রহমান। ভাই- বোনেরা কেউ
লেখা-পড়া শেখেনি। একমাত্র আব্দুর রহমান প্রাইমারী পাস করেছিলো।
সলিমুদিন মুন্সি-
হোসেন মুন্সিদের বাড়ীর কিছু পশ্চিম দিকে ছিলো সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ী। আমাদের
বাড়ীর ঠিক দক্ষিণ দিকে। আমাদের বাড়ীর পশ্চিম দিক দিয়ে একটি গো-হালট দক্ষিণ দিকে
প্রসারিত ছিলো। সেই হালটেরই পশ্চিম পাশে ছিলো সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ী। তিনি কিছু
শিক্ষিত ছিলেন। লম্বা-চওড়া এবং শ্যামলা বর্ণের ছিলেন তিনি। তাঁর বাবার নাম ছিলো
ছেফাতুল্যা। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো বাচাতন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সলিমুদ্দিন মুন্সির বয়স ছিলো ৩৯ এবং তাঁর স্ত্রীর ২৫ বছর।
সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ীতে মুদির
দোকান ছিলো। তেল, মরিচ, সাবান, ছোড়ার পাশাপাশি
তিনি প্রাইমারী স্কুলের কিছু পাঠ্যপুস্তকও বিক্রী করতেন। প্রাইমারীতে পড়ার সময়
বাবার সাথে গিয়ে সেখান থেকে আমি পাঠ্যপুস্তক, কাগজ, কালির
দোয়াত, ময়ূরের পাখি কিনে আনতাম। তখন প্রাইমারী স্কুলে কলম ব্যবহার করার
অনুমতি ছিল না। ময়ূরের পাখি কলমের নিবের মতো করে চুকিয়ে কালির দোয়াতে চুবিয়ে
লিখতে হতো।
সলিমুদ্দিন মুন্সির দোকান থেকে আমি প্রথম পুস্তকটি কিনেছিলাম ‘নবপাঠ'। সলিমুদ্দিন
মুন্সি অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
ইউসুফ
সেক্রেটারীঃ-ইউসুফ আলী (সেক্রেটারী)দের বাড়ীও ছিলো উক্ত
পাড়ায় । সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ীর কিছু পশ্চিম দিকে। ইউসুফ আলীর
বাবার নাম ওয়াজুদ্দিন এবং মার নাম আসমা বিবি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
ওয়াজুদ্দিনের বয়স ৭৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী আসমা বিবির বয়স ৫০ বছর। ইউসূফ আলীরা
চার ভাই ছিলো। মুজাফর আলী, নাগরালী, ইন্নস আলী এবং ইউসূফ
আলী। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মুজফরের বয়স ৩৮, নাগর আলীর ৩১
এবং ইন্নস আলীর ২৯ বছর ছিলো। ইউসূফ আলীর নাম সেই ভোটার তালিকায় নেই।
ইউসূফ আলীর সাথে আমি কাদং হাইস্কুলে
একসাথে পড়তাম। তিনি আমার থেকে দুই ক্লাস উপড়ে ছিলো। তিনি মাঝারি গঠনেব এবং
শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি সুস্বাস্থের অধিকারী ছিলেন। তিনি কাদঙের শ্বহীদ কারবালা
যাত্রাদলে মারোয়ানের চরিত্রে অভিনয় করতেন। তাই অনেকে তাঁকে মারোয়ান নামেও
সম্বোধন করতো। পরবর্তী জীবনে আমরা একসাথে অনেক নাটক করেছি। তিনি হা-ডুডু খেলায়ও
ভালো ছিলেন। তিনি হা-ডুডু খেলার রেফারিও করতেন। ইউসূফ আলী ধীর-স্থির এবং ভালো
বিচারক ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক মরাভাজের বিশিষ্ট সমাজকর্মী আব্বাস আলী দর্জির সাথে
তাঁর সুসম্পর্ক ছিলো। বালাজান এমই, স্কুল এবং তাজুদ্দিন হাইস্কুল স্থাপনের
ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। ইউসূফ আলী বাঘবর গাঁও পঞ্চায়েতের সেক্রেটারী
ছিলেন। আফজালুর রহমান এবং আবুল কালাম তাঁর সুযোগ্য সন্তান। আফজালুর রহমান বিএসসি
উত্তীর্ণ এবং বাঘবর হাইস্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। কালাম বাঘবর সমবায় সমিতির সভাপতি
ছিলেন এবং সম্প্রতি উক্ত সমিতির সেক্রেটারী। ইউসূফ আলী ২০২১ সালে মারা গেছেন।
গেদু বেপারী:-
গেদু বেপারী বয়োবৃদ্ধ লোক ছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ ১৯৬৬ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন।
তাই ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম উঠেনি। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো পিয়ারজান
নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৬৩ বছর। গেদু বেপারীদের বাড়ীর
কাছেই ছিলো পূব দেউলদি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি কয়েকদিন সেই স্কুলে পড়তে
গিয়েছিলাম। স্কুলে যাওয়ার সময় গেদু বেপারীদের বাড়ীর সামনে দিয়ে যেতো হতো। আমি
তখন তাঁকে কয়েক দিন বারান্ডায় কুঁজা হয়ে বসে থাকতে দেখেছি। গেদু বেপারীর চার
ছেলে, বসির উদ্দিন, হজরত আলী, আব্দুল গফুর এবং
আব্দুল লতিফ আহমেদ। মেয়েদের কথা বলতে পারব না।
বসির উদ্দিন-
বসির উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর স্ত্রীর নাম মেহেরজান নেসা।
১৯৬৬ সালের ভোটার অলিকা অনুসারে বসির উদ্দিনের বয়স ৪৪ এবং তাঁর স্ত্রীর বয়স ২৬
বছর ছিলো। বসির উদ্দিন একজন মার্জিত এবং গম্ভীর স্বভাবের লোক ছিলেন। নিন্মস্বরে
কথা বলতেন। তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। বাংলা ভালোভাবে পড়তে পারতেন। তিনি একজন ভালো
সমাজকর্মীও ছিলেন। সমাজ উন্নয়নের জন্য তিনি যথাসাধ্য কাজ করেছেন। তিনি আমাদের
গ্রামের ভোটার তালিকাগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। তিনি অনেকদিন আগে মারা গেছেন।
তাঁর বড় ছেলে আবু বক্কার আমার সমবয়সী। সে পোস্ট অফিসের পিয়ন ছিলো। কিছুদিন আগে
মারা গেছে। আবু বক্কারের ছোট ভাই আক্কাস আলী সম্ভবতঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্নাতক। সে
পশু চিকিৎসক।
হজরত আলী- হজরত
আলী মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। ১৯৬৬সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৩৯ বছর
এবং তাঁর স্ত্রী সহরজান বেগমের বয়স ২৫ বছর। হজরত আলী ‘হট টেম্পারে’র
লোক ছিলেন । সাধারণ কথা নিয়েই মানুষের সাথে কলহ করতেন। তাই লোকে তাঁকে হজা পাগলা
বলতেন ৷ তাঁর ছেলে হুরমুজ আলী হা-ডুডু খেলায় ভালো ছিলো। হুরমুজ আলী আমার সমবয়সী
ছিলো। তাঁর শরীরের রং ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের হাঁট্টাগোট্টা ছিলো। সে দেখতে প্রায়
পালোয়ানের মতো ছিলো। সে
হা-ডু-ডু খেলায় ভালো ছিলো।
আব্দুল গফুর-
আব্দুল গফুর অনেক লম্বা এবং শ্যামলা বর্ণের ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো লালবানু।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আব্দুল গফুরের বয়স ৩৭ এবং তাঁর স্ত্রী লালবানুর
২২ বছর। আব্দুল
গফুর সহজ-সরল এবং স্পষ্টবাদী ছিলেন। গলগল করে কথা বলতেন। কোনো কথা পসন্দ নাহলে
মুখের উপড়েই প্রতিবাদ করতেন। তাঁর ছেলে-মেয়ের বিষয়ে আমার জানা নেই।
আব্দুল লতিফ
আমহমেদ- আব্দুল লতিফ স্নাতক এবং এডভোকেট ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর
নাম বেগম হাসিনা আহমেদ। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আব্দুল লতিফের বয়স ৩৪
বছর এবং তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগমের বয়স ২৫ বছর। আব্দুল লতিফ লম্বা এবং শরীরের রং
কালো ছিলো। খুব পাণ চিবোতেন। তিনি বরপেটা সেসন কোর্টে উকালতি করতেন। উকালতির আগে
তিনি কাদং হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ইংরাজি এবং অসমিয়া পড়াতেন । কাদং
হাইস্কুলে শিক্ষকতা করাকালীন তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। সম্ভবতঃ ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা
ছেড়ে তিনি উকালতি শুরু করেছিলেন। উকালতি করা অবস্থায়ই তিনি মনে হয় ১৯৭৪ সালে
একবারের জন্য বাঘবর গাঁও পঞ্চায়েতের আঞ্চলিক সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন
পঞ্চায়ত খুব বড় ছিলো। তিনি এখন বরপেটার বাসিন্দা। ছয় সাত বছর আগে মারা গেছে।
ফজর আলী(গাঁওবুড়া)- ফজর আলী মাঝারি
গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন । লম্বা লম্বা দাড়ি ছিলো। ছেলেবেলা আমি তাঁকে দেখেছি।
তাঁদের বাড়ীটা আমাদের দক্ষিণ পাড়ার একেবারে পশ্চিম প্রান্তে ছিলো। তিনি
গাঁওবুড়া ছিলেন। তাই সবাই তাঁকে ফজু গাঁওবুড়া বলে জানত। তিনি সামাজিক কাজের সাথে
জড়িত ছিলেন। বিচারক হিসাবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষ
স্ত্রীর নাম হনুফা বিবি এবং দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রীর নাম তারাবানু। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে ফজর আলীর বয়স ৭০ বছর এবং স্ত্রী হনুফা বিবির বয়স ৫৪ বছর।
দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রী তারাবানুর বয়স ৩০ বছর ছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী হনুফা বিবির
ছেলে-মেয়ে নয় জন। পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল জলিল, আব্দুল ফাজিল, রফিক আলী,
আমজাদ আলী এবং সদর আলী। মেয়েদের নাম, জরিমন নেসা,
করিমন নেসা, মরিয়ম খাতুন এবং অজুপা খাতুন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী তারাবানুর ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। তাঁদের নাম, বধুদর আলী, হানিফ আলী,
জংসের আলী, সাজাহান আলী এবং আজাহার আলী। একমাত্র
মেয়ের নাম জাহানারা খাতুন।
আব্দুল জলিল-
আব্দুল জলিল ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি ব্যবসায়ের পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন।
তিনি সামাজিক কাজের সাথেও জড়িত ছিলো। তিনি সমাজের মাতাব্বরিও করতেন। তিনি আমার
চেয়ে বয়সে চার/পাঁচ বছরের বড় ছিলো। তাঁর ছেলে-মেয়ে ছয়জন। চার ছেলে, দুই
মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে বাহারুল ইসলাম, শুকুর আলী,
ফরহাদ আলী এবং আতোয়ার রহমান। মেয়েদের নাম যথাক্রমে মনোয়ারা খাতুন,
জায়েদা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত। আব্দুল জলিল কয়েক বছর
আগে নিজ বাঘবর গ্রামে মারা গেছে।
আব্দুল ফাজিল-
আব্দুল ফাজিল মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। তিনিও আমার চেয়ে বয়সে বড়। ইউসূফ
আলী সেক্রেটারির সমবয়সী। আমরা এক সাথে পূব দেউলদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন
করতাম। আমি যখন ক-শ্রেণীতে পড়তাম তখন ফাজিল উদ্দিন এবং ইউসূফ আলী তৃতীয় শ্রেণীতে
পড়তেন। তিনি টাইগার প্রজেক্টের কেরাণি ছিলেন। এখন অবসর নিয়েছে। তাঁর ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে দিলোয়ার হোসেন,
আতোয়ার হোসেন, ইব্রাহীম আলী, রুজু মিয়া এবং
রাহুল আমিন। একমাত্র মেয়ের নাম রুমি খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত।
রফিক আলী-রফিক
আলী ছোট-খাট এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসা করে । তাঁর
ছেলে-মেয়ে ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম, রুস্তম
আলী, হুমায়ূন আলী, হাশেম আলী, কাশেম আলী এবং
মিজুমাল আলী। একমাত্র মেয়ের নাম কুলছুম নেসা ৷
আমজাদ আলী-
আমজাদ আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। তাঁর ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
চার ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে ঠান্ডু মিয়া, তৈবুল আলী,
রাসেল আলী এবং বুল হোসেন। একমাত্র মেয়ের নাম মাজেদা খাতুন ।
বধুদর আলী-
বধুদর আলী মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়
করে। তার ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে আরান
আলী এবং সানিদুল আলী। মেয়েদের নাম, রূপসি খাতুন এবং
জরুনা খাতুন।
হানিফ আলী-হানিফ
আলী লম্বা ছিপছিপে এবং ফর্সা। সে শিক্ষিত। সে একবার বাঘবর গাঁও পঞ্চায়েতের
আঞ্চলিক সদস্য হয়েছিলেন। সে ব্যবসায়ে নিয়োজিত এবং সামাজিক কাজের সাথে জড়িত।
তার দুই ছেলে। মহিবুল ইসলাম এবং ইনজামুল হক।
সদর আলী-
সদর আলী ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণ। সে ব্যবসায়ের পাশাপাশি কৃষিকাজে নিয়োজিত। তার
দুই ছেলে। বাদশা মিয়া এবং গোলাপ হোসেন ।
জংশের আলী-
জংসের আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সে সমাজের
মাতব্বরিও করে। তার ছেলে-মেয়ে ছয়জন। তিন ছেলে, তিন মেয়ে।
ছেলেদের নাম, দিলবর আলী, আজমল আলী এবং
কালাম আলী। মেয়েদের নাম, নারজিনা খাতুন, নিলীমা খাতুন
এবং সিলিমা খাতুন ।
সাজাহান আলী-
সাজাহান আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সাথে
জড়িত। তার চার ছেলে। সন্তানদের নাম ছাপু মিয়া, নুর ইসলাম,
নজরুল আলী এবং মকিম মিয়া ৷ আজাহার আলী-আজাহার আলী মাঝারি গঠনের এবং
ফর্সা। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। তার একমাত্র ছেলের নাম রুবুল
আলী।
দক্ষিণ পাড়ায় আমার জানা আরও কয়েকটি
পরিয়াল ছিলো যদিও তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হইনি বলে তাদের বিষয়ে লেখা সম্ভব
হল না। তারজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
আমাদের
উত্তর পাড়া (বগুড়া পাড়া)
আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে লাগোয়া
গ্রাম ছিলো রৌমারী গাঁও। রৌমারী গ্রামটা আমাদের পাড়ার পেছন থেকেই শুরু হয়েছিলো।
আমাদের পাড়ার বাড়ীগুলো জাহানারপাড়ে হলেও জমিগুলো ছিলো রৌমারী গ্রামে।
রৌমারী গ্রামে পূর্ববঙের বগুড়া জেলার
লোক বাস করতো। তাঁদের কথা-বার্তা এবং চাল-চলন আমাদের থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিলো।
বগুড়া জেলার লোক বাস করতো বলে আমরা পাড়াটাকে বগুড়া পাড়া বলতাম । পাড়ার প্রায়
সবাই বেপার করতো। পাট, সরিষা, কলাই প্রভৃতির । হাটে প্রবেশের রাস্তার
মাথায় দাঁড়িয়ে পাট- শরিষা শস্যাদি কিনতো এবং বড় বেপারির কাছে সেই হাটেই বিক্রী
করতো। তাই তাঁদের লোকে ‘ফইড়া’ বলতো। তাঁরা পাটগুলো খুব সুন্দরভাবে
পাইট করতে পারতেন। ‘বটম’ পাট তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় ‘টপ’
হয়ে উঠত। সেই পাড়ায় সোভাহান বেপারী, আয়াজ বেপারী,
ইয়াকুব মুন্সি, মবেদ মিস্ত্রী, গুমান হাজি,
মোকাম আলী, মুগর আলী, জাহের মন্ডল
প্রভৃতি লোকেরা বাস করতো।
সোভাহান বেপারী-বগুড়া
পাড়ার সবার সাথেই সম্পর্ক ভালো ছিলো যদিও সোভাহান বেপারীর সাথে আমাদের সম্পর্ক
অধিক ঘনিষ্ট ছিলো। সোভাহান বেপারী লম্বা-চওড়া এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ
ছিলেন। ছোভাহান বেপারী বয়সে আমাদের বাবার থেকে কিছু বড় ছিলো। তিনি ভুষি মালের
বেপার করতেন। শবিষা, কলাই, ধনিয়া প্রভৃতির। বানের তান্ডবের জন্য
আমাদের অঞ্চলে ধানের আবাদ তেমন ভালো হত না। তাই সবাই ধনিয়া, শরিষা,
কলাইর আবাদ করতেন। আমাদের পাড়ার উৎপাদিত শস্যাদি ছোভাহান বেপারী
কিনে নিয়ে গোয়ালপাড়া সহরে বিক্রী করতেন। আমাদের যত শস্য হতো সবই সোভাহান বেপারী
বাকীতে কিনে নিতেন এবং বাবার তলব মতো টাকা আদায় দিতেন।
বন্ধুত্বের সম্পর্ক অধিক সুদৃঢ় করার
জন্য সোভাহান বেপারীর ছেলে গোলাপ হেসেনের সাথে আমাদের বাবা আমার দোস্ত পাতিয়ে
দিয়েছিলেন। সোভাহান বেপারী আমাকে সার্ট, জোতা প্রভৃতি উপহার দিতেন। আমি কলেজে
পড়ার সময় বাবার হাতে টাকা ছিল না বলে তিনি আমাকে একটি সাইকেলও কিনে দিয়েছিলেন।
বাবা পরে অবশ্যে সেই টাকা পরিশোধ করে দিয়েছিলেন। গোলাপ হোসেন লিখা-পড়া শেখেনি,
তাই আমার সাথে তাঁর কোনোদিন ঘনিষ্ট সম্পর্ক গঢ়ে উঠেনি। আমাদের চেয়ে
উভয়ের বাবার সম্পর্কই অধিক ঘনিষ্ট ছিলো।
সোভাহান বেপারীর স্ত্রীর নাম ছিলো
গোলাপী খাতুন। তাঁদের দুই ছেলে, ছয় মেয়ে। ছেলেদের নাম গোলাপ
হোসেন ও জেলহক আলী। মেয়েদের নাম রেজিয়া খাতুন, হালিমা খাতুন,
আসমা খাতুন, সূৰ্য্যবানু, আনোয়ারা খাতুন
এবং শান্তবানু।
গোলাপ হোসেন-
গোলাপ হোসেন লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে খুবই শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের ছিলো।
কারো সাথে তেমন কথা-বার্তা বলত না। কৃষিকাজের পাশাপাশি সে তাঁর বাবাকে ব্যবসায়ে
সহযোগিতা করতো। অনেকদিন আগেই সে মৃত্যু বরণ করেছে।
জেলহক আলী-
জেলহক আলী লম্বা এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। সে একটু গোয়ার প্রকৃতির এবং চঞ্চল
স্বভাবের ছিলো। সে কিছু লিখা-পড়া শিখেছিলো এবং রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। সে
আজীবন অসম গণ পরিষদ দলের সদস্য ছিলো। সে এক বছর বাঘবর হাটের লেসিও ছিলো। গলার
কেন্সার হয়ে সে অনেক দিন আগে মারা গেছে। আমার দোস্তের চেয়ে জেলহকের সাথেই আমার
সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ট ছিলো।
মুগর আলী-মুগর আলী আমাদের
অঞ্চলের বয়োবৃদ্ধ এবং জ্ঞানী ব্যক্তি গুমান হাজি সাহেবের বড় ছেলে। মুগর আলী
লম্বা-চওড়া এবং শরীরের রং ফর্সা ছিলো। তিনি খুই বলশালী ছিলেন। তিনি আমাদের বাবার
চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট ছিলেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি তিনি কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন।
তাঁর কাজ-কাম খুবই পরিপাটি ছিলো এবং দ্রুত কাজ করতে পারতেন। একদিনেই তিনি একটি
সাধারণ খাট বানিয়ে ফেলতে পারতেন। লোকের বিপদে-আপদে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এই
সম্পর্কে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে- আমাদের পাড়ার সব জমি বরপেটার মহাজনেরা
পাট্টা করেছিলো। সেই জমি আমাদের কিনে নিতে হয়েছিলো। একবার আমাদের জমি রামাপাড়ার
কয়েকজন লোকে কিনে নিয়েছিলো। তাঁরা সেই জমি দখল করতে আসলে মুগর আলী লাঠি নিয়ে
তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখিয়ে বলেছিলো, এরা জংঘল সাফা
করে এই জমি অতদিন ধরে ভোগ-দখল করে আসছে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে সেই জমি বরপেটীয়া মহাজনেরা
পাট্টা করে নিয়েছ। এই জমি কিনতে হলে এরাই কিনবে, তোমরা কিনতে
পারবেনা। তোমরা যে টাকায় জমি কিনেছ সেই টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবুও যদি জমি দখল
করতে আস, তাহলে আমার লাশের ওপড় দিয়ে এসে এই জমি দখল নিতে হবে।
মুগর আলীর এই কথায় ভয় পেয়ে
রামাপাড়ার লোকেরা আমাদের জমি ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিলো এবং আমরা তাঁদের টাকা ফেরত
দিয়ে সেই জমি কিনে নিয়েছিলাম। আ-মৃত্যু মুগর আলীর এই উপকারের কথা আমাদের মনে
থাকবে।
মুগর আলীর পক্ষ দু'টি
ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম রহিতন নেসা এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম
আয়মনা খাতুন। প্রথম পক্ষ স্ত্রী রহিতন নেসার তিন ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে হালিমা খাতুন, মরিয়ম নেসা, আনোয়ারা বেগম,
তোফাজ্জল আলী, সাইফুল আলী এবং রহিমুদ্দিন। দ্বিতীয়
পক্ষের আয়মনা খাতুনের স্ত্রীর চার ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
তফিজুদ্দিন, ফাতেমা খাতুন, রহিজুদ্দিন,
ময়নাল হক, সাবিয়া খাতুন, ময়জান নেসা এবং
জয়নাল আবদিন।
হালিমা খাতুন-
হালিমা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে খাজারটারির মনজুল হকের ছেলে
শমসের আলীর সাথে। তাঁদের ছয় মেয়ে, ছেলে নেই। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
খোদেজা খাতুন, কুলচুম বেগম, মালেকা বেগম,
আকলিমা খাতুন, সফুরা খাতুন এবং মফিদা খাতুন।
ছেলে-মেয়ে সবাই বিবাহিত । মরিয়ম খাতুন- মরিয়ম খাতুন লম্বা এবং শ্যামবর্ণা। তাঁর
বিয়ে হয়েছে খাজারটারির হানিফ আলীর সাথে। তাঁদের তিন ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে মহিরুদ্দিন, জহিরুদ্দিন, হামিদা খাতুন,
হাসেনা বানু, রফিকুল ইসলাম এবং আসমা খাতুন। রফিকুল
ইসলাম পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।
আনোয়ারা খাতুন-
আনোয়ারা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। আনোয়ারা খাতুনের বিয়ে হয়েছে বাঘবরের রৌমারির
সাবান বেপারির ছেলে গণি মিয়ার সাথে। তাঁদের সাত ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আলা উদ্দিন, কালাম আলী, গুলবানু,
সুন্দরি খাতুন, হবিবর রহমান, আজিবর রহমান,
আতাবর আলী, কিতাব আলী, আজগর আলী এবং
জাহানারা খাতুন ।
তোফাজ্জল আলী-
তোফাজ্জল আলী লম্বা ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। কৃষিকাজ করে। সে বিয়ে করেছে
ধর্মপুড়ের আব্দুল হকের মেয়ে হনুফা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। চার ছেলে,
দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হোসেন আলী, মনোয়ারা বেগম,
আঞ্জোয়ারা খাতুন, আসাদ আলী, ইব্রাহীম আলী
এবং ইউসুফ আলী।
সাইজুল আলী-
সাইজুল আলী লম্বা এবং ফর্সা । কৃষিকাজ করে। তার পক্ষ দু'টি। সে প্রথম
বিয়ে করেছে নলবারী জেলার শিয়ালমারির রূপচান শ্বেখের মেয়ে সাকিনা খাতুনকে।
দ্বিতীয় বিয়ে করেছে শিয়ালমারির সাহিদা খাতুনকে। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর দুই ছেলে,
তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাসেন আলী, শ্বাহজাহান আলী,
আবিরন নেসা, সাজেদা খাতুন এবং মাজেদা খাতুন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
জাহিদুল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম, সানিদুল আলী
এবং..... ।
রহিমুদ্দিন-
রহিমুদ্দিন লম্বা এবং ফর্সা। কৃষিকাজ করে। সে বিয়ে করেছে, লাংলার বনগুগির
আমির আলীর মেয়ে আন্না খাতুনকে। তাদের চার ছলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে করিম আলী, কুরবান আলী, সুরমান আলী,
আরফান আলী এবং রমিনা খাতুন ।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছেলে-মেয়ে
নিয়ে শিয়ালমারি থাকে। তাই তাঁদের ছেলে-মেয়ে সম্পর্কে কিছু লিখতে পারলাম
না।
নদী ভাঙার পরে মুগর আলী নলবারী জেলার
শিয়ালমারি চরে উঠে গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন ।
চরপাড়া ।
আমাদের পাড়াটা ১৯৮০ সালে ব্রহ্মপুত্র
নদীর ভাঙনের কবলে পরেছিলো। তখন আমাদের পাড়ার প্রায় সব কয়টি পরিয়ালই বাঘবর
পাথারে স্থানান্তর হয়েছিলো। বাঘবর পাথার গ্রামটা আমাদের গ্রামের পূর্বপ্রান্ত
থেকে একেবারে বাঘবর পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আমরা বাঘবর পাথারের
একেবারে শেষ প্রান্তে বাঘবর পাহারের পাদদেশে বসতি স্থাপন করেছিলাম। আমরা যেখানে
বসতি করেছিলাম সেখানে সর জমিনে বালু পরে একেবারে চরের মতো হয়েছিলো। তাই আমাদের
পাড়াটাকে সবাই চর পাড়া বলত। চর পাড়াটা বাঘবর থানা থেকে আধা মাইল উত্তর দিকে
ছিলো। সেই চর পাড়ায় কিছু সংখ্যক অন্য গ্রাম মানে বাঘবর পাথার, রৌমারি,
শেওরার পাথার প্রভৃতি গ্রামের পরিয়ালো স্থানান্তরিত হয়ে এসেছিলো।
আমি সেই পরিয়ালগুলোর বিষয়ে কিছু কথা লেখার প্রয়াস করব-
কাশেম আলী:- আমাদের
সম্পর্কীয় তাউই। তিনি খাটো গঠনের বলিষ্ঠ চেহেরার এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার
নাম সবের মল্লিক। কাশেম আলী কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সরিফন নেসা। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে কাশেম আলীর বয়স ৫০ বছর এবং সরিফন নেসার বয়স ৪১ বছর।
তাঁদের চার ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কদবানু,
সুরত আলী, সরবানু, জাজিয়ার হোসেন,
রাজন আলী, লালবানু, নীলবানু এবং
শ্বাহজাহান আলী।
কদবানু-
কদবানু সবার বড়। তিনি মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে আগমন্দিয়ার
নসের বেপারীর ছেলে ইন্নসের সাথে। তাঁর ছেলে-মেয়ের বিষয়ে আমার জানা নেই। তিনি
গৃহিনী। তাঁদের ছেলে- মেয়ে পাঁচজন। দুই ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম সামসুল হক, নুরজাহান, শিরাজুল হক,
হাজেরা খাতুন, মিনুয়ারা খাতুন ।
সুরত আলী-
আমার থেকে বয়সে কিছুটা ছোট। তিনি মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা। তিনি
স্বল্প শিক্ষিত। এখন নিজ বাঘবর গ্রামের গাঁওবুড়া। তিনি বিয়ে করেছেন আগ মন্দিয়ার
রহিমুদ্দিনের মেয়ে সালেহা খাতুনকে। সালেহা খাতুন স্বাস্থ্যবান এবং একটু খাটো
গঠনের। সালেহা খাতুন আমাদের মামাতো বোন এবং আমাদের বাবা তাঁদের বিয়েতে উকিল
হয়েছিলো। তাঁদের ছয় ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল খালেক, হানিফ আলী, জাহিদুল ইসলাম,
ইসমাইল হোসেন, শ্বাহানূর আলী আহমেদ, সানিয়ারা
খাতুন এবং মিজানূর রহমান।
আব্দুল খালেক বাঘবর সমবায় সমিতির
সভাপতি। সে তেমন লেখা-পড়া করেনি। শুধু স্বাক্ষর । হানিফ আলী ব্যবসা করে। জাহিদুল
ইসলাম ম্যাট্রিক পাস। ইসমাইল হোসেন ম্যাট্রিক ফেল। শ্বাহানূর ইসলাম, সানিয়ারা
খাতুন এবং মিজানুর রহমান বি, এ পাশ। সানিয়ারা খাতুনের বিয়ে হয়ে
গেছে। ছেলেরা সবাই ব্যবসায় করে।
সরবানু-
সরবানু মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। যৌবনকালে তাঁকে পুতুলের মতো দেখা যেতো। তাঁর বিয়ে
হয়েছে আলীগাঁয়ের আব্বেশ আলীর ছেলে তমসের আলীর সাথে। ১৯৭০ সালে আলীগাঁয়ে তাঁর
ভোট হয়েছে। সেই ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২২ বছর। তাঁদের তিন মেয়ে। ছেলে
সন্তান নেই। মেয়েদের নাম নুরজাহান বেগম, সবিয়া খাতুন এবং মেহেরজান নেসা। তমছের
আলীর দু'টি পক্ষ ছিলো । দ্বিতীয় পক্ষের একটি ছেলে। সরবানু সতীনের সেই ছেলেকে
নিয়ে বাঘবর অঞ্চলের মিলিজুলি ঘর-বাড়ী করে আছে। তমসের আলী অনেক দিন আগে মারা
গেছে।
জাজিয়ার হোসেন-
জাজিয়ার হোসেন কাঠমিস্ত্রিী। দেখতে ছোট-খাটো এবং শ্যামবর্ণ। সে বিয়ে করেছে
আলীগাঁয়ের বিনোদ মুন্সির মেয়ে বিন্দু নেসাকে। তাদের তিন ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে বিল্লাল হোসেন, রূপজান নেসা,
বাবুল হোসেন এবং শ্বাহ আলম। বাবুল হোসেন স্নাতক এবং এলআইসি এজেন্ট।
রূপজান নেসা স্বাক্ষর। তার বিয়ে হয়ে গেছে। বাবুল হোসেন স্নাতক। ফার্মাসিষ্ট। একেবারে ছোট ছেলে
ম্যাট্রিক পাস। বাবুল হোসেনের সাথে ফার্মাসিতে থাকে।
রাজন আলী-রাজন
আলী হলুইকর । আগে হাটে হাটে দৈ, মিষ্টি, মুরি বিক্রী
করতো। ছেলেরা রোজগারের উপযুক্ত হওয়ার পরে উক্ত কাজ থেকে অবসর নিয়েছে। সে বিয়ে করেছে
বাঘবর পাথারের হাবেজ ফকিরের মেয়ে হালিমা খাতুনকে। তাঁদের তিন ছেলে, ছয়
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রংমালা খাতুন, আব্দুল হামিদ,
নূরবানু, জোৎস্না বানু, রহিমা খাতুন,
আন্না খাতুন, রেজাক আলী, আব্দুল হালিম
এবং আমিরুল ইসলাম। এদের মধ্যে রেজাক আলী এবং আব্দুল হামিদ ম্যাট্রিক পাস। অন্যরা
শুধু স্বাক্ষর।
হানিফ আলী-
হানিফ আলী কাঠমিস্ত্রী। তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। শুধু স্বাক্ষর। সে বিয়ে করেছে
বালাজানের আব্দুল হাকিমের মেয়ে জয়গন নেসাকে। জয়গন নেসা আমাদের চাচাতো বোন। সে
গৃহিনী। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
ইনজামুল হক, হাজমিনারা খাতুন, রুজিনা পারবিন
এবং ইমরান হোসেন। সবাই স্কুলে পড়ে। ইনজামূল হক ২০২০ সালে চারটা বিষয়ে লেটার
মার্ক নিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছে।
লালবানু- লালবানুর বিয়ে
হয়েছে মহম্মদ পুরের মহিরুদ্দিনের ছেলে হাবেজ উদ্দিনের সাথে। সে এখন গৃহিনী।
নীলবানু-নীলবানুর
বিয়ে হয়েছে বাঘবর পাথারের খোদারমের ছেলে হানিফ আলীর সাথে। সে গৃহিনী ।
শ্বাহজাহান আলী- শ্বাহজাহান আলী মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে বি,এ,
পাস। সে দিগজানির একটি ভেন্সার হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে। সে বালিকুরির
আমির হোসেন মাস্টারের মেয়ে তাহমিনাকে বিয়ে করেছে। তাদের এক ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জাকারিয়া আহমেদ, সেবিনা খাতুন
এবং আজমিনা খাতুন। জাকারিয়া আহমেদ স্নাতক। সেবিনা এবং রুজিনা পারবিন হায়ার
সেকেন্ডারি পাস।
বিদেশী মিয়াঃ- বিদেশী মিয়া
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি একটু রোগা ধরণের ছিলেন। মনে হয় হাঁফানি ছিলো। তাঁর
স্ত্রীর নাম সবিরন নেসা। তিনিও রোগা ধরণের ছিলেন। তাঁদের তিন ছেলে, মেয়ে
নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে খোদাবক্স, রহিম বক্স, আব্দুল করিম এবং
নুরু মিয়া ৷
খোদাবক্স-
খোদাবক্স আমার থেকে বয়সে কিছু ছোট। সে মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। বাবার
মতোই সে একটু রোগা ধরণের ছিলো। তাঁর স্ত্রীর নাম জিলিমন নেসা। বাঘবর পাথারের খৈমুদ্দিনের
মেয়ে। তাঁদের তিন ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে সবার বড়। নাম আদুরি
নেসা। ছেলেদের নাম, জুলহাস উদ্দিন, জয়নাল আবদিন
এবং ইসমাইল হোসেন। ছেলেদের সবাই স্বাক্ষর। অবশ্যে কেউ ম্যাট্রিক পাস করেনি।
খোদাবক্স ছোট-খাট ব্যবসায় করতো। কয়েক বছর আগে মারা গেছে।
রহিম বক্স-রহিম
বক্স একটু খাটো ধরণের এবং ফর্সা। সে বিয়ে করেছে খরমার সাধু মিয়ার মেয়ে আজিরন
নেসাকে। রহিম বক্স হালুইকর। হাটে হাটে মিষ্টি, দৈ, মুরি
বিক্রী করে। তাঁদের একমাত্র ছেলের নাম আফসের আলী। লেখা-পড়া শেখেনি।
করিম বক্স-
করিম বক্স একটু খাটো ধরণের এবং ফর্সা। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের মামুদ আলীর
মেয়ে হামিদা খাতুনকে। করিম বক্সও হালুইকর। হাটে হাটে মিষ্টি, দৈ,
মুরি বিক্রী করে। তাদের এক ছেলে, হাবিজুল ইসলাম।
তিন মেয়ে, কহিনূর বেগম, আকলিমা আনসারি
এবং পারবীন সুলতানা। হাবিজুল ইসলাম ম্যাট্রিক ফেল। কহিনূর বেগম ম্যাট্রিক পাশ,
আকলিমা আনসারি এম, এ পাস। পারবীন সুলতনা বি, এ,
পড়তেছে।
নুরু মিয়া-
নুরু মিয়াও একটু খাটো ধরণের এবং শ্যামবর্ণ। নুরু মিয়ার পক্ষ দুটি। সে প্রথম
বিয়ে করেছিল খরমার আজিমুদ্দিনের মেয়ে ময়না খাতুনকে। একমাত্র মেয়ে নূরবানুর
জন্মের পরে ময়না খাতুনকে তালাক দিয়ে পরে ভাতনাপাইতির জহুরুদ্দিনের মেয়ে হালিমন
নেসাকে বিয়ে করেছে। সে বর্তমান বরপেটা রোডের বাসিন্দা। মারোয়ারিদের গোদামে কুলির
কাজ করে। দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম
যথাক্রমে শুকুরি নেসা, চন্দ্রবানু, কামাল উদ্দিন,
চায়না বানু, সাদ্দাম হোসেন, সূর্যবানু এবং
রাবিয়া খাতুন । ছেলে-মেয়েরা কেউ তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। তবে, সবাই
স্বাক্ষর।
খোদারম মিয়াঃ-
খোদারম মিয়া মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। স্বাস্থ্য ভালো ছিলো। মুখে
চাপদাড়ি ছিলো। হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। খুব পাণ চিবোতেন। মুখে সর্বদা পাণের পিক
লেগেই থাকতো। তিনি মৃদুভাষী ছিলেন। তাঁর বাবার নাম আলিমুদ্দিন। স্ত্রীর নাম হালিমা
খাতুন। তিনি কৃষিকাজ করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে খোদারমের বয়স ৪৫ এবং
হালিমা খাতুনের ৪০ বছর। তাঁদের চার ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
হানিফ আলী, শুকুর আলী, হাকিম আলী,
সামেজ উদ্দিন এবং কুলসুম খাতুন।
হানিফ আলী-
হানিফ আলী কৃষিকাজ করার সমান্তরালভাবে ধর্মীয় কাজ-কাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে।
হানিফ আলী আমার থেকে মনে হয় বয়সে কিছু বড় হবে। সে বিয়ে করেছে বাঘবর পাথারের
কাশেম আলীর মেয়ে নীলবানুকে। তাঁদের তিন ছেলে এবং তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম
যথাক্রমে নুরুল ইসলাম, নাজিবুল হক, সানিদুল ইসলাম,
হাজেরা খাতুন, সেলিমা আকতার এবং জেসমিনা আকতার। নুরুল
ইসলাম ও নাজিবুল হক ম্যাট্রিক পাস। হাজেরা খাতুন হায়ার সেকেন্ডারি পাস। সানিদুল
ইসলাম ও সেলিমা আকতার বি, এ, পাস। জেসমিনা
আকতার সায়েন্স নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করেছে।
শুকুর আলী-
শুকুর আলী মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। আগে
গুয়াহাটীতে ডিমের কারবার করতো। এখন কৃষিকাজ করে। সে মিস্টভাষী। সবার সাথে মিশতে
পারে। সে বিয়ে করেছে কাদং অঞ্চলের রূপাকুছির কুরবান আলীর মেয়ে ফুলমালা খাতুনকে।
তাদের চার ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ময়নাল হক,
সাইজুদ্দিন, আবু বক্কার সিদ্দিক, রফিকুল
ইসলাম, চন্দ্রবানু, খোদেজা খাতুন, জেসমিনা আকতার
এবং সামিনা আকতার। ময়নাল হক, আবু বক্কার সিদ্দিক এবং রফিকুল ইসলাম
বি, এ পাস। সাইজুদ্দিন ম্যাট্রিক পাস। চন্দ্রবানু এবং খোদেজা খাতুন
হায়ার সেকেন্ডারী পাস। জেসমিনা আকতার এবং সামিনা আকতার শিক্ষার্থী। ছেলেরা সবাই
বিভিন্ন ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
হাকিম আলী-
হাকিম আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সেও এক সময় গুয়াহাটীতে ডিমের ব্যবসায় করতো। এখন
কৃষিকাজ করে। সে মিস্টভাষী। সাজিয়ে কথা বলতে পারে এবং গল্প করতে ভালোবাসে। সে
বিয়ে করেছে জাহানারপাড়ের নবুরুদ্দিনের মেয়ে চম্পা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সবুরি খাতুন, সানিদুল
ইসলাম, সুফিয়া খাতুন, রুজিনা আকতার এবং রেনুকা আকতার। সবুরি
খাতুন এবং সুফিয়া খাতুন হায়ার সেকেন্ডারী পাস। সানিদুল ইসলাম ম্যাট্রিক পাশ।
রুজিনা আকতার এবং রেনুকা আকতার শিক্ষার্থী।
সামেজ উদ্দিন-
সামেজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে হায়ার সেকেন্ডারী পাস।
মৃদুভাষী এবং সমাজকর্মী। ব্যবসায় করে। সে বিয়ে করেছে বালাজানের নুরুল ইসলামের
মেয়ে নূরজাহান বেগমকে। নূরজাহান বেগম আমাদের মামাতো বোন রুকিয়া বেগমের মেয়ে।
সেই সম্পর্কে সে আমাদের ভাগনী। তাদের দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে কুলচুম খাতুন, মিজানূর রহমান এবং আমিনুল ইসলাম।
মিজানুর রহমান আয়ুর্বেদিক(বিএএমএস)-এর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। আমিনুল ইসলাম হাইস্কুলের
শিক্ষার্থী। কুলচুম খাতুন ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। তার অনেক আগেই বিয়ে হয়েছে।
পনের / ষোল বছর আগে তার স্বামী মারা গেছে। তাঁর তিন ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম, সাদুল্যা আহমেদ, নাসির উদ্দিন,
নূরজাহান বেগম এবং মামণি আকতার। সাদুল্যা, নূরজাহান এবং
মামণি আকতার ম্যাট্রিক পাস। নাসির উদ্দিন বি,এ, পাস।
জবেদ আলীঃ-জবেদ আলী
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। বসে থাকলে একটু কুঁজা হয়ে বসতো। খুবই মিশুক
প্রকৃতির লোক ছিলেন। সবার সাথে মিশতে পারতো। নিন্মস্বরে কথা বলতো। ছোট-বড় সবাইকে
সন্মান দিয়ে চলতো। সে কৃষিকাজ করতো। তাঁর স্ত্রীর নাম সূর্য্যবানু। সূর্য্যবানুর
শরীরের রং ঈষৎ কালো এবং মাঝারি গঠনের ছিলো। মিশুক প্রকৃতির মহিলা ছিলো। অতিথি
সৎকার করতে ভালো বাসতো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে জবেদ আলীর বয়স ৪১ এবং
সূর্য্যবানুর ২৮ বছর। তাঁদের ছেলে- .মেয়ে ১১ জন। তিন ছেলে, আঠ মেয়ে।
ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে হালিমন নেসা, আকমত আলী, রখমত আলী,
নবিরন নেসা, হিকমত আলী, তাহেরন নেসা,
সাহেরা খাতুন, ছবিয়া খাতুন, সোনাবানু,
তারাবানু এবং বাছাতন নেসা।
আকমত আলী-
আকমত আলী লম্বা এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। মিশুক প্রকৃতির। সবার সাথে মিশতে
পারে। নিন্মস্বরে কথা বলে। সে আগে গুয়াহাটীতে ডিমের ব্যবসায় করতো। এখন ভুটভুটি
নৌকা চালায়। সে বিয়ে করেছে তিনটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম জহিরন নেসা।
মন্দিয়া অঞ্চলের বামুনবাড়ীর ওহাব আলীর মেয়ে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম
বাতাসী নেসা। নিজ বাঘবরের ইয়াসিনের মেয়ে। একটি সন্তান জন্মের পরেই বনিবনা না
হওয়ায় তালাক দিয়েছে। তৃতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম উজালা খাতুন। বাঘবর পাথারের রহু
বেপারীর মেয়ে।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছেলে-মেয়ে
চারজন। তাদের নাম যথাক্রমে জহুরুদ্দিন, মহিরুদ্দিন, করিমন নেসা এবং
আমিরুদ্দিন। ছেলেরা ভূটভূটি নৌকা চালায়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর একটি মাত্র মেয়ে ৷ নাম আকলিমা খাতুন। বিয়ে হয়ে গেছে। তৃতীয়
পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলে। মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম, জহর আলী,
মহর আলী এবং ওমর আলী। জহর আলী রাজমিস্ত্রী। মহর আলী হায়ার সেকেন্ডারিতে
এবং ওমর আলী হাইস্কুলে অধ্যয়নরত।
রখমত আলী-
রখমত আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে সহজ-সরল লোক। বাহিরা জগত সম্পর্কে
উদাসীন। সর্বদা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কৃষিকাজ করে। তার স্ত্রীর নাম সালেহা
খাতুন। বাঘবরের মাজম মিস্ত্রীর মেয়ে। তাদের ছেলে মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জালিমুদ্দিন, রহিমা খাতুন,
আলিমুদ্দিন, আশ্রব আলী এবং হাসমত আলী। জালিমুদ্দিন
বাবার সাথে কৃষিকাজ করে। রহিমা খাতুনের বিয়ে হয়ে গেছে। আলিমুদ্দিন এবং আশ্রব আলী
রাজমিস্ত্রী। আশ্রব আলী ম্যাট্রিক পাস। হাসমত আলী রাজমিস্ত্রীর যোগাড়ি।
হিকমত আলীঃ-
লম্বা ছিপছিপে এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। মিশুক প্রকৃতির। সবার সাথে মিশতে পারে।
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলে। তার স্ত্রীর নাম তহিরন নেসা। বাঘবর
অঞ্চলের শিলোশি পাথারের তোতা মিয়ার মেয়ে। আমার ছোট ভাই হোসেন আলী তাদের বিয়েতে
উকিল হয়েছে। তাদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে।
ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে তাইজুদ্দিন, সাইজুদ্দিন, সাজেদা খাতুন,
রাইজুদ্দিন, ইয়ার বাদশাহ এবং তাজিবুল ইসলাম।
তাইজুদ্দিন বাবার সাথে কৃষিকাজ করে। সাইজুদ্দিন ম্যাট্রিক পাস। রাজমিস্ত্রী।
রাইজুদ্দিন কলেজে পড়ে। ইয়ার বাদশাহ ভূটভূটি নৌকা চালায়। সাজেদা খাতুনের বিয়ে
হয়ে গেছে পশ্চিম ময়নবরির আব্দুল কাদেরের ছেলে জহুরুল ইসলামের সাথে।
মামুদ আলী- মামুদ আলী
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর বাবার নাম বিলাত আলী। মামুদ আলী
কৃষিকাজের পাশাপাশি কাপড় বুনতেন । তিনি সামাজিক কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। সবার সাথে
হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। মামুদ আলীর দুটি পক্ষ ছিলো। তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের নাম
আকিতারা খাতুন এবং নেসা খাতুন। আকিতারা খাতুনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পরে নেসা
খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মামুদ আলীর বয়স ৫০ বছর
এবং নেসা খাতুনের বয়স ৩১ বছর। সম্ভবতঃ ১৯৬৬ সালের আগেই আকিতারা
খাতুনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিলো। সেজন্য আকিতারা খাতুনের নাম ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকায় নেই। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম
ময়ূরি খাতুন, আব্দুল আলিম এবং ফালানী নেসা। এদের বিষয়ে আমি
বিশেষ কিছু জানিনা। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে এবং আব্দুল আলিম হাজো সমষ্টির
বরম্বৈয়ে বসবাস করতেছে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর ছয় ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুল মান্নাফ, আবু শামা, মরিয়ম খাতুন,
বান হাশেম, আবু বাক্কার সিদ্দিক, আবুল
কাশেম, আবু হানিফা আনসারি, হামিদা খাতুন এবং হনুফা খাতুন।
আব্দুল মান্নাফ-আব্দুল
মান্নাফ মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
সে বাঘবর বাজারের সাথে জড়িত। বাজারে গোদাম গৃহ আছে। আমার থেকে বয়সে কিছু ছোট। সে
বিয়ে করেছে খরমার অটার ছয়ফল আলীর মেয়ে ময়ফল খাতুনকে। তাঁদের দুই ছেলে, তিন
মেয়ে । সন্তানদের নাম যথাক্রমে আদহাম আলী, আবিদা খাতুন,
আনোয়ারা খাতুন, তালহা আলী এবং মফিদা খাতুন । তালহা আলী
ব্যবসায়ী। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। আদহাম আলীকে ২০০১ সালে দুষ্কৃতিকারীরা হত্যা
করেছে।
আবু শামা-
আবু শামা লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ। সে হায়ার সেকেন্ডারি পাস। ফটোগ্রাফির সাথে
জড়িত ছিলো। বর্তমান মুদির দোকান করে। সে মৃদুভাষী এবং মিশুক প্রকৃতির। সে বিয়ে
করেছে হেলচাপামের মুকতার আলী মুন্সির মেয়ে সুফিয়া খাতুনকে। সুফিয়া খাতুন লম্বা
এবং ছিপছিপে গঠনের। তাঁর শরীরের রং শ্যামলা। তাদের দুই ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে শাকেত আলী, তাসিন আলী এবং শামিমা খাতুন।
মরিয়ম খাতুন-
মাঝারি গঠনের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মানসিকভাবে অসুস্থ। কথা বলতে পারেনা। শুধু
হাঁসে। ভাইদের সাথে খুব মিলে মিশে থাকে। তার বিয়ে হয়নি।
বান হাশেম-বান
হাসেম মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে কথা কম বলে এবং হেঁসে হেঁসে বলে।
পাণ খেয়ে ঠোঁট লাল করে রাখে। সে হালুইকর। হাটে হাটে মিস্টি, দৈ,
মুড়ি বিক্রী করে। সে বিয়ে করেছে কাদঙের দাগু মিয়ার মেয়ে নবিরন
নেসাকে। তাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
মিরকাল আলী, সুরমাল আলী, আসমিনা খাতুন
এবং গোলাপজান নেসা।
আবু বাক্কার-
আবু বাক্কার মাঝারি ছিপছিপে হালকা গঠনের। তাঁর শরীরের রং শ্যামবর্ণ। এখন মাথায়
লম্বা লম্বা চুল রেখেছে। বাবরি চুল। সে ব্যবসায়ী। সে একবার বিস্কুটের ফেক্টরিও
খুলেছিলো। ফেক্টরিতে সে সফলো হয়েছিলো। তবে, কর্মচারির অভাবে
ফেক্টরি বাদ দিয়েছে। বাঘবর বাজারে গোদাম গৃহ আছে। গোদাম ভাড়া দেয়। সে এক সময়
রাজনীতির সাথেও জড়িত ছিলো। সে ১৯৯৭ সালে বাঘবর সমবায় সমিতির সভাপতি পদে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এক ভোটে পরাজয় বরণ করেছিলো। ২০০১ সালে আবার বাঘবর পঞ্চায়তের
পঞ্চায়ত নির্বাচনে আঞ্চলিক কাউন্সিলার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজয় বরণ করেছে। সে জাহানারপাড়ের
ভেলু মিয়ার মেয়ে সালেহা খাতুনকে বিয়ে করেছে। সালেহা খাতুন আমাদের চাচাতো বোন।
সালেহা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তাঁদের দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে মিনুয়ারা খাতুন, আলতাব হোসেন, নিলীমা খাতুন,
জাহানারা খাতুন এবং আলী আহমেদ। মিনুয়ারা খাতুন আসাম পুলিশ-এ কর্মরত।
আলতাব হোসেন ব্যবসায়ী।
আবুল কাশেম-
আবুল কাশেম মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে সুদর্শন। ছোট ছোট করে হেঁসে
হেঁসে কথা বলে ৷ সে ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। ম্যাট্রিক পাস। সে বিয়ে করেছে চাচরার
হজরত আলীর মেয়ে আরজিনা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম লুলু আনসারি এবং রিনা আনসারি ।
আবু হানিফা
আনসারি- আবু হানিফা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে
মদুভাষী। হেঁসে হেঁসে কথা বলে। সে এখন কাশ্মীরে থেকে ব্যবসায় করে। সে বিয়ে করেছে
মিলিজুলির হামিদ আলীর মেয়ে সূর্যবানুকে। তাদের চার মেয়ে, এক ছেলে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফরিদা খাতুন, হালিদা খাতুন, আসমানা খাতুন,
জিনিপা খাতুন এবং হাসানূর আনসারি।
হামিদা খাতুন-
হামিদা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। মৃদুভাষী। তার বিয়ে হয়েছে নিজ বাঘবরের বিদেশীর
ছেলে করিম বক্সের সাথে। তাদের এক ছেলে, হাবিজুল ইসলাম। তিন মেয়ে, কহিনূর
বেগম, আকলিমা আনসারি এবং পারবীন সুলতানা। হাবিজুল ম্যাট্রিক ফেল। কহিনূর
বেগম ম্যাট্রিক পাশ, আকলিমা আনসারি এম, এ পাস। পারবীন
সুলতানা বি, এ, পড়তেছে।
হনুফা খাতুন-
হনুফা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। মিশুক প্রকৃতির এবং মৃদুভাষী। তার বিয়ে হয়েছে
বরপেটা জেলার কাপাসতুলির মোসা মুল্যার ছেলে আবু শামার সাথে। তাদের তিন ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম, সাদ্দাম হোসেন, সাদেক আলী,
সাহানূর আলী এবং মাজেদা খাতুন ।
চড় পাড়ায় অন্য দু'টি
পরিয়াল ছিলো যদিও তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হইনি। সেজন্য তাদের বিষয়ে লেখা
সম্ভব হল না ।
আলীগাওঁ
বাড়ী আমাদের জাহানারপাড়ে হলেও এক
সময়ে আলীগাঁয়েও ছিলো। আমার জন্ম আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ধনাই হাজির বাসগৃহে।
ধনাই হাজি আমাদের মাতামহ। আমার শৈশব এবং যৌবন বলতে গেলে আলীগাঁয়েই কেটেছে। তাই
আলীগাঁয়ের সাথে আমার নাড়ীর সম্পর্ক ছিলো।
আলীগাঁও গ্রামটা মন্দিয়া থেকে পাঁচ
মাইল পশ্চিমে এবং বাঘবর পাহার থেকে তিন মাইল পূবে। গ্রামের চারপাশে কয়েকটি গ্রাম
আছে। উত্তরে রাণির পাম, পূবে আলীগাঁও পাথার দক্ষিণে আলিরপাম এবং
পশ্চিমে পালারপাম, সুতির পাড় এবং সারগাওঁ। আলিরপামের দক্ষিণেই
ছিলো মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র নদ। গ্রামের সবাই কৃষিজীবী ছিলো। চাকরিজীবী কেউ ছিল না।
তবুও মানুষের মাঝে সুখ-শান্তি বিরাজমান ছিলো। ধনে-ধানে পরিপূর্ণ ছিলো গ্রামটা।
১৯৫৯ সালে তারাবারিতে প্রথম
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের তান্ডব শুরু হয়। এর কিছুদিন পরে অর্থাৎ ১৯৬০ সালে
আলীরপাম এবং ১৯৬১ সালে আলীগাঁও ভাঙনের কবলে পরে। ফলে মানুষ অন্তহীন দুঃখ-দুর্দশার
সন্মুখীন হয়। মানুষগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরে। যাদের একশ বিঘা জমি ছিলো তারাও পথের
ভিক্ষারিতে পরিণত হয়। একটি উদাহরণ দিলে কথাটা স্পষ্ট হবে- আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী
ব্যক্তি ছিলেন সদু বেপারি। এমন প্রবাদ আছে যে, সদু বেপারিদের
কয়টা গরু ছিলো তার হিসাব ছিল না। গোয়াল ঘরে গরুর পাঘা দেখে গরুর হিসাব রাখতো।
অর্থাৎ পাঘা খালি থাকলে, পাঘা খালি কেন? গরু কি হল?
তখন গরুর খবর করা হতো। শুনেছি, রাখালরা একবার
তাঁদের গরু চুরি করে বিক্রী করেছিলো। তখন পাঘা খালী দেখে সেই গরুর সন্ধান করতে
গিয়ে রাখালরা যে চুরি করে গরু বিক্রী করেছে সে কথা বের হয়েছিলো। নদী ভাঙার পরে
সদু বেপারির ছেলেরা মাছের ব্যবসায় করে।
পুচাই দেওয়ানী, ধনাই হাজি,
দানেশ মুন্সি, রমজান দেওয়ানী, কয়েদ আলী
ফকিররা আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী লোক ছিলো। শুনেছি,এদেঁর একশ ডেরশ
বিঘা করে জমি ছিলো। দানেশ মুন্সিদেরতো শুনেছি আড়াইশ বিঘা জমি ছিলো । জমিই কৃষকের
সম্বল। জমি না থাকলে কৃষকের কোনো মূল্য
থাকেনা। জমি নদীর পেটে যাওয়ার পরে তাঁদের ছেলে-পিলেরা অভাব-অনাটনের মাঝে দিন
অতিবাহিত করছে। কেউ দিন হাজিরা করছে, কেউ আবার ব্যবসায় করে কোনো রকমে
পরিয়াল ভরণ-পোষণ করছে। নদী ভাঙার পরে কিছু সংখ্যক পরিয়াল বিভিন্ন জায়গায়
স্থানান্তর হয়েছিলো। অনেকে আবার কিছু উত্তর দিকে এসে আলীগায়ের উত্তর প্রান্তে,
পালার পাম, সুতিরপাড়, রাণিরপাম
প্রভৃতি গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলো।
আলীগাঁয়ে অনেক গণ্য-মান্য লোক ছিলো।
সবার বিষয়ে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে লেখা সম্ভব হবে না। তাই সেই লোকগুলোর মাঝে আমি
ছেলেবেলা যাদের ওতঃপ্রোত সান্নিধ্যে এসেছিলাম তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়ার
প্রয়াস করব। যাদের পরিচয় এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে দেওয়া সম্ভব হলনা তাঁদের কাছে আমি
ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
মতিয়ার রহমানঃ-
মতিয়ার রহমান আলীগাঁয়ের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মহেজ
উদ্দিন। তাঁর শরীরের রং ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর
স্ত্রীর নাম ভায়েলা খাতুন। ভায়েলা খাতুন আলীগাঁও অঞ্চলের বিখ্যাত ব্যক্তি কয়েদ
আলী ফকিরের মেয়ে। বলতে কয়েদ আলী ফকিরই আলীগাঁও গ্রামের পত্তন করেছিলেন। কয়েদ
আলী ফকির সুফি সাধক ও গুণীলোক ছিলেন। তিনি আয়ুর্বেদিক উপায়ে অনেক রোগের চিকিৎসা
করতেন। বিয়ের পরে মতিয়ার দম্পত্তির অনেক দিন কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি। তখন
কয়েদ আলী ফকির সন্তান লাভের জন্য চিকিৎসা করেছিলেন এবং সেই চিকিৎসার পরেই
মজিবর রহমানের জন্ম হয়েছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মতিয়ার রহমানের
বয়স ৪৫ এবং ভায়েলা খাতুনের ৩০ বছর। তাঁদের একমাত্র ছেলে মজিবর রহমান ।
মতিয়ার রহমান শিক্ষিত ছিলেন। তিনি
খুবই সামাজিক লোক ছিলেন। তিনি আলীগাঁও অঞ্চলের তথ্যাদি সংগ্রহ করে রাখতেন। ১৯৫২
সাল থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সকল প্রকার ভোটার তালিকা তাঁর কাছে সংরক্ষিত ছিলো।
এখন সেগুলো তাঁর সুযোগ্য ছেলে মজিবর রহমানের কাছে সংরক্ষিত আছে। আমাদের এক সময়
আলীগাঁয়েও বাড়ী ছিলো। মতিয়ার রহমান আমার সম্পর্কীয় তাউই। আলীগঁয়ের বাড়ীটা
মতিয়ার রহমান তাউইর বাড়ীর সাথে লাগোয়া বাড়ী ছিলো। বাড়ীগুলো একটু দ জায়গায়
ছিলো। বর্ষায় জল হতো। তাই ভিটাগুলো উচু উচু ছিলো। দুটি উঁচু ভিটা বাঁধতে গেলে
মাঝখানে যে একটু ব্যবধান সৃষ্টি হয়, সেটুকু ব্যবধানই ছিলো আমাদের দুই
বাড়ীর মাঝখানে।
আমাদের বাবার সাথে মতিয়ার রহমানের
খুবই সুসম্পর্ক ছিলো। বাবা কোনো কাজ করতে গেলে মতিয়ার রহমানের সাথে পরামর্শ করে
করতেন। তাঁদের এই সম্পর্ক অটুট রাখার জন্য আমার ছোট ভাই হোসেন আলী এবং মতিয়ার
রহমানের একমাত্র সন্তান মজিবরের জন্মের আগেই উভয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, যদি
তাঁদের ছেলে সন্তান হয় তবে দোস্ত পাতাবে এবং মেয়ে সন্তান হলে সই পাতাবে। আমার
ছোট ভাই হোসেনের জন্ম আগে হয় এবং মজিবর রহমানের জন্ম হোসেেেনর জন্মের কিছুদিন পরে
হয়। আগের প্রতিজ্ঞা অনুসারে মজিবর রহমানের জন্মের পরেই তাঁদের দোস্ত পাতিয়ে
ছিলেন। তখন উভয়ে কোলে ছিলো। খুব ধুমধাম করে দোস্ত পাতিয়েছিলেন উভয়ের বাবা-মায়েরাঁ।
মজিবর রহমানের মামা কলিমুদ্দিন ‘সয়ফর
মুল্লুক বদিউজ্জামান' নামের একটি যাত্রাপালা গঠন করেছিলো। হোসেন এবং
মজিবরের দোস্তী পাতা উপলক্ষ্যে মজিবরদের বাড়ীতে সেই যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত করেছিলো।
তখন আমার বয়স চার পাঁচ বছর হবে। আমি বাবার কোলে বসে সেই যাত্রাপালা উপভোগ
করছিলাম। যাত্রাপালায় রাক্ষসের ভুমিকা ছিলো। মুখা ব্যবহার করে রাক্ষসের অভিনয়
করছিলো। হাউ-মাউ করে রাক্ষসগুলো এসে সয়ফর মুল্লুকের পক্ষের লোকদের ধরে নিয়ে
যাচ্ছিল। আমি সেই দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠেছিলাম। মজিবরদের উঠানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেই
যাত্রাপালা। খুব লোকজন ছিল না। তাই আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কিছু সময়ের জন্য
যাত্রাপালা স্থগিত রেখে সবাই আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো। যারা রাক্ষসের অভিনয়
করছিলো তাঁরা মুখা খোলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছিলো । আমি শান্ত
হওয়ার পরে আবার অভিনয় শুরু করেছিলো। সেই দৃশ্য আমার মানসপটে এখনও উজ্জ্বল হয়ে
আছে।
নদী ভাঙার কিছু বছর পরেই মজিবরের মাতৃ
ভায়েলা খাতুনের মৃত্যু হয়েছিলো।
ভায়েলা খাতুনের মৃত্যুর অনেকদিন পরে
মতিয়ার রহমান মন্দিয়া পাথারের হাকিম আলীর মেয়ে কুতুবজান নেসাকে বিয়ে করেছিলেন।
সেই স্ত্রীর পক্ষে তিন ছেলে, মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম মহিদুর রহমান,
মৃদুল রহমান এবং মিরজুল রহমান।
মজিবর রহমান-
মজিবর রহমানের জন্ম ১৯৫৫ সালে। শরীরের রং ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের। সে বিশেষ
লিখা-পড়া শেখেনি। তবে, অভিজ্ঞতা থেকে সে অনেক কিছু শিখেছে। সে ভালো
বক্তা। একজন ভালো সমাজকর্মীও। ভ্রমণ পিপাসী। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। সে মিশুক
প্রকৃতির। সবার সাথে মিশতে পারে। সে সাহসী এবং পরোপকার করতে ভালোবাসে। সে
ব্যবসায়ে নিযোজিত। পরিস্কার-পরিচ্চন্নতা খুব পসন্দ করে। সে পাণ-সাদা এবং ধূমপানের
তীব্র বিরোধী। দাঁতের খুব যত্ন করে। সাদা ঝকঝকে দাঁত পসন্দ করে। পোশাক- পরিচ্ছদ
সম্পর্কেও সে খুব মনোযোগী।
মজিবর রহমানের পক্ষ দু'টি।
সে প্রথম বিয়ে করেছিলো সারগাঁয়ের মিজানুর রহমানের মেয়ে বাতাসী নেসাকে । সেই ঘরে
এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে মঞ্জু আকতার, মনোজ
রহমান। প্রথমা স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় সে দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছে
মনিরুদ্দিন সরকারের মেয়ে রাজিয়া সুলতানাকে। রাজিয়া সুলতান কয়েদ আলী ফকিরের
নাতনি। সেই ঘরে এক ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম, ময়না
আকতার এবং মিলন রহমান।
মঞ্জু এবং ময়নার বিয়ে হয়ে গেছে।
মঞ্জু আকতারের দুই মেয়ে এবং একছেলে। তার সন্তানদের নাম যথাক্রমে মিথিলা আকতার,
মোহনা আকতার এবং মাহির শিকদার। ময়নার এখন পর্যন্ত কোনো
সন্তান-সন্ততি হয়নি।
মনোজ রহমান মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ
(এম,আর)। সে বিয়ে করেছে সত্র কনরার কেরামত আলীর মেয়ে পরীমালা আহমেদকে।
তাদের দুই ছেলে। মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে মিসর রহমান এবং মিমর রহমান। মিলন
রহমান এম, কম পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত।
মতিয়ার রহমানের অন্য তিন ছেলে মহিদুর
রহমান, মৃদুল রহমান এবং মিরজুল রহমান ব্যবসায়ের সাথে জড়িত।
ধনাই হাজিঃ- আলীগাঁও
অঞ্চলের নক্ষত্র স্বরূপ জনাই হাজির জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষের বংগদেশের ঢাকা জেলার
অরগজ নামের একটি নদীপ্রবণ গ্রামে ১৮৮৬ সালে। তাঁর পিতৃর নাম নাজির মল্লিক এবং
মাতৃর নাম ময়না খাতুন। সাতজন ভাই-বোনের মধ্যে ধনাই হাজি ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন। তাঁর
ভাই-বোনদের নাম যথাক্রমে মহারাজ মল্লিক, গাদু মল্লিক, কোরপান বেপারী,
কামাল বেপারী, রূপাই মাতবর, ধনাই হাজি এবং
জাহের আলী। তাঁদের একমাত্র বোনের নাম ছিলো রূপজান মল্লিক। মাত্র চার বছর বয়সে
রূপজান মল্লিক নিউমোনিয়া হয়ে অকালে মারা গিয়েছিলো।
ধনাই হাজির কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলেন
না। তিনি নিজের প্রচেষ্টায় ঘরুয়া শিক্ষকের কাছে বাল্যশিক্ষা এবং কোরান শ্বরিফ
পড়তে শিখেছিলো। ১৯১৭ সালে তিনি ঢাকা জেলার দিগলীয়া গ্রামের টেনু মল্লিকের
একমাত্র মেয়ে মজিরন নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে মজিরন নেসার বয়স ৬৫ বছর ছিলো।
টেনু মল্লিকের কোনো পুত্র সন্তান
ছিলনা। তবে, অনেক জমি-জমা ছিলো। শশুড়ের মৃত্যুর পরে ধনাই
হাজি শশুড়ের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শশুড় বাড়ীতে থাকতে শুরু করেছিলেন।
তবে, টেনু মল্লিকের কোনো পুত্র সন্তান না থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁর আত্মীয়
স্বজনেরা সেই সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। ধনাই হাজি
শান্তিপূর্ণ স্বভাবের লোক ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনের মনোভাব লক্ষ্য করে তিনি বংগদেশ
ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জমি-জমা বিক্রী করে ১৯১৯ সালে আসাম চলে আসেন। আসাম
এসে তিনি বরপেটা সহর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিম এবং জনীয়া থেকে দুই কিলোমিটার
দক্ষিণে অবস্থিত মহম্মদপুড় গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। মহম্মদপুড় গ্রামেই প্রথম
সন্তান মোসলেম উদ্দিনের জন্ম হয়। এর পরে ক্রমে মহম্মদ আলী এবং হারেশ আলীর জন্ম
হয়, কিন্তু মহম্মদ আলী এবং হারেশ আলীর অকাল বিয়োগ হয়। অবশ্যে কিছুদিন
বিরতির পরে জয়নাল আবদিন, জুলহাস উদ্দিন, বাহারজান নেসা,
আয়সা খাতুন, শিরাজুল হক এবং ফয়জল হক জন্ম গ্রহণ
করে।
ধনাই হাজি ১৯৩৭ সালে মহম্মদ পুড়ের
জমি-জমা বিক্রী করে বরপেটা জেলার মন্দিয়া মৌজার অন্তর্গত আলীগাঁও গ্রামে উঠে আসে।
আলীগাঁও আসার পরে তাঁর প্রচেষ্টাতে ১৯৩৯ সালে আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন
করা হয়। বিদ্যালয় গৃহটি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই বিঘা জমি তিনি দান
করেছিলেন। বিদ্যালয় গৃহটি স্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে সহযোগ করেছিলেন, পাক্কু
বেপারি, কয়েদ আলী ফকির, বাজু মল্লিক, জহুর উদ্দিন,
নজর দেওয়ানী, বসির খান, নিজাম খান,
বিনোদ দেওয়ানী, মোকসেদ আলী, আশ্রফ আলী,
মাজম গাঁওবুড়া, ইমারত খান, সমসের বয়াতী,
ঘুতু দেওয়ানী, জলিল হাজি, মানিক দেওয়ানী,
আরিফ মুন্সি, নায়েব আলী মুল্যা, ফিকির
দেওয়ানী, আলম খান, কালু খান, ফালু দেওয়ানী,
নালু দেওয়ানী, মেসের আলী প্রভৃতি তখনকার স্বনামধন্য
ব্যক্তিগণে ।
বিদ্যালয়টি স্থাপন হওয়ার পরে আলীগাঁও
এবং আশেপাশের গ্রামগুলিতে শিক্ষার ক্ষেত্রে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয়টিতে
আলীগাঁও, আলীগাঁও পাথার, আলীর পাম, পালার পাম,
বরলি, সারগাঁও প্রভৃতি গ্রামের ছাত্রদের বাহিরেও অন্য
গ্রাম থেকে ছাত্র এসে লজিং থেকে অধ্যয়ন করতেন। বিদ্যালয়টি ১৯৪২ সালে লোকেল
বোর্ডদ্বারা মঞ্জুরিপ্রাপ্ত হয় ৷
ধনাই হাজি নারী শিক্ষার পোষকতা করতেন।
যাঠের দশকেই আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তারাবানু, সাজেদা খাতুন,
সামর্ত বানু প্রভৃতি ছাত্রীরা অধ্যয়ন করতেন। এম, ই
স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যেও তিনি চিন্তা-চর্চা করছিলেন, তবে শিক্ষকের
অভাবে তাঁর সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬০ সাল থেকে মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন
শুরু হয়। ১৯৬২ সালে তাঁদের বাড়ি ভাঙনের কবলে পরে। ফলতঃ তিনি দুই কিলোমিটার
উত্তর-পশ্চিম দিকে এসে বসতি স্থাপন করেন। নিজের গৃহের সাথে তিনি
বিদ্যালয় গৃহটিও স্থানান্তর করে নিজের বাড়ীর পাশেই স্থাপন করেছিলেন।
বিদ্যালয়টিকে এখনও অনেকে ধনাই হাজির স্কুল বলে পরিচয় দেয়।
ধনাই একজন ধর্মভীরু ব্যক্তি ছিলেন।
তিনি দুবার হজ্ব যাত্রা করেছিলেন। প্রথমবার ১৯৩৯ এবং দ্বিতীয়বার ১৯৫৩ সালে। তাঁর
প্রচেষ্টাতে আলীগাঁয় গ্রামসেবক কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিলো। গ্রামসেবক
কোয়ার্টারের জন্য প্রয়োজনীয় এক বিঘা জমি তিনি দান করেছিলেন। তাঁর গৃহটি হাজি
সাহেবের গৃহ হিসাবে অঞ্চলের লোকে জানত। সামাজিক কাজের পাশাপাশি তিনি রাজনীতির
সাথেও জড়িত ছিলেন। ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ, তাজ উদ্দিন আহমেদ, ধনীরাম
তালুকদার, রেনুকা বরকটকীর মতো স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর
সুসম্পর্ক ছিলো। নির্বাচনের সময়ে এইসকল নেতারা ধনাই হাজির গৃহে আশ্রয় নিয়ে
নির্বাচনী প্রচার চালাতেন।
১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আজীবন সমাজ
সেবক, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ধনাই হাজি মৃত্যু বরণ করেন।
ধনাই হাজির ছেলে-মেয়ে নয় জন। মোসলেম
উদ্দিন, মহম্মদ আলী, হারেস আলী, জয়নাল আবদিন,
জুলহাস উদ্দিন, বাহারজান নেসা, আয়সা খাতুন,
শিরাজুল হক এবং ফয়জল হক।
মোসলেম উদ্দিন-
মোসলেম উদ্দিনকে আমি দেখিনি। আমার জন্মের আগেই তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
নানা-নানীর মুখে শুনা মতে তিনি একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। মসজিদের ইমামতি
করতেন। ১৯৪৬ সালে একমাত্র সন্তান রুকিয়া খাতুনের জন্মের পরে তিনি মৃত্যু বরণ
করেছিলেন। রুকিয়া খাতুন এখনও জীবিত। মহম্মদ আলী এবং হারেস আলী-হারেস আলী এবং
মহম্মদ আলীর অকালে মৃত্যু হয়েছিলো। তাই তাদের বিষয়ে লেখা সম্ভব হল না ।
জয়নাল আবদিন-
জয়নাল আবদিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি
ব্যবসায় করতেন। তিনি মৃদুভাষী এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। সামাজিক কাজের সাথেও
জড়িত ছিলেন তিনি। তাঁর দুটি পক্ষ ছিলো। তিনি প্রথম বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের
কান্দু মিয়ার মেয়ে রহমজান নেসাকে। দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন শিতুলির আবুলির বোন
সালেহা খাতুনকে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে জয়নাল আবদিনের বয়স ৪৫ বছর,
রহমজানের বয়স ৩৪ বছর এবং সালেহা খাতুনের বয়স ২২ বছর। প্রথম পক্ষের
স্ত্রীর তিন ছেলে এবং চার মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে সামত বানু, আব্দুর
রহমান, দুবুলা খাতুন, আকমালা খাতুন, আনোয়ার হোসেন,
শ্বহিদুল ইসলাম এবং রাশিদা খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে,
তিন মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে সাজেদা খাতুন, আনোয়ারা খাতুন,
ময়নাল হক এবং মঞ্জোয়ারা খাতুন। আব্দুর রহমান কাঠমিস্ত্রী। শ্বহিদুল
ইসলাম ম্যাট্রিক পাশ। দর্জি কাজে নিয়োজিত। আনোয়ার হোসেন ব্যবসায়ী। ময়নাল হক
অনেক বছর ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে আছে।
সামৰ্ত বানু ১৯৬৮ সালে বসন্ত রোগে
আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে।
জুলহাস উদ্দিন-
জুলহাস উদ্দিনকে আমি দেখিনি। নানা-নানীর মুখে শুনা মতে, তিনি বরপেটার
সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতেন। তিনি শ্রেণীতে সব সময় প্রথম
হতেন। সেজন্য তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে তিন বছর পশমীর চাদর
উপহার পেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার কয়েকদিন
আগে ম্যালেরিয়া জ্বর হয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
বাহারজান নেসা-
বাহারজান নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি অতিথিপরায়ণ ধর্মপ্রাণ
মহিলা ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৩০ বছর। তাঁর বিয়ে
হয়েছিলো আলীগঁয়ের জব্বর আলীর ছেলে সুলতান মিয়ার সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে সাতজন।
এক ছেলে, ছয় মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাজেরা খাতুন, নবিয়া
খাতুন, রুকিয়া খাতুন, বাহারুল ইসলাম, দুলন নেসা,
রূপজান নেসা এবং সাহেরা খাতুন।
নবিয়া খাতুন কৈশোর অবস্থায় এবং
রূপজান নেসা কয়েক বছর আগে মৃত্যু বরণ করেছে।
আয়সা খাতুন-
আয়সা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। আয়সা খাতুন আমাদের মাতৃ । তিনি সহজ-
সরল মহিলা ছিলেন। সবার সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের আদর-সোহাগ
করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২৮ বছর। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো
আমাদের বাবা মিঠু মিয়ার সাথে। তাঁদের পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আবুল হোসেইন, হোসেন আলী, খোদেজা খাতুন,
জহুরুল হক, জালেকা খাতুন, সামসুল হক এবং
ওমর ফারুক কিবরিয়া।
জহুরুল হক ১৯৮৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর-এ
ম্যালেরিয়া জ্বর হয়ে মারা গেছে। আয়সা খাতুন ২০০১ সালে মৃত্যু বরণ করেছেন ।
শিরাজুল হক-
শিরাজুল হক মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তিনি পঞ্চায়েত সেক্রেটারি ছিলেন।
২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেছেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৩০ বছর।
অবসরের আগে এবং পরে তিনি সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। এখন শয্যাশায়ী। তিনি
বিয়ে করেছেন গোবিন্দপুড়ের উমেদ আলী হাজির মেয়ে বাসিয়া বেগমকে। তাদের চার ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সিরিয়া খাতুন, আব্দুল
বাসেদ, আব্দুল বারেক, মহিদুল ইসলাম এবং আরিফুল ইসলাম। ছেলেরা
সবাই ব্যবসায়ী। তবে, মহিদুল ইসলাম কাদিয়ান সম্প্রদায় ভূক্ত। সে
বলতে গেলে ধনাই হাজির বংশের কলংক। তাঁকে তার বাবা শিরাজুল ইসলাম ত্যাজ্যপুত্র
করেছে কাদিয়ান সম্প্রদায় ভূক্ত হওয়ার জন্য। মহিদুল উগ্র স্বভাবের। লোকের সাথে
তেমন সদ্ভাব রেখে চলে না । শিরাজুল ইসলাম ২০২১ সােলর ৩১ জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেছেন।
ফয়জল হক-
ফয়জল হক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি সামাজিক কাজের সাথে জড়িত থাকার
পাশাপাশি অভিনয়ের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর অভিনয় খুবই বলিষ্ঠ ছিলো। তিনি অনেক
নাটক এবং গীতিনাট্যে অভিনয় করেছেন। সুযোগ পেলে তিনি সিনেমায়ো অভিনয় করতে
পারতেন। তাঁকে সবাই সন্মান করে ‘হক সাহেব’ বলে সম্বোধন
করতো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২৫ বছর। তিনি বিয়ে করেছিলে
রূপাকুছির ইয়াদ আলীর মেয়ে খোদেজা খাতুনকে। খোজেদা খাতুন কিছু শিক্ষিত এবং খুবই
অমায়িক মহিলা ছিলেন। আমি তাঁদের বিয়েতে উকিল হয়েছিলাম। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
সাতজন। তিন ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে খোরশিদ আলম,
মমতাজ খাতুন, ফরিদা খাতুন, মফিদা খাতুন,
মাজিবুল ইসলাম, সুফিয়া খাতুন এবং রাখিফুল ইসলাম।
খোরশিদ আলম অটোচালক। ফরিদা খাতুন ম্যাট্রিক পাস। অংগনবাদী কর্মী। মাজিদুল ইসলাম
ম্যাট্রিক পাস। ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। অন্যরা সবাই কম-বেশি পরিমাণে স্বাক্ষর।
হোসেন মল্লিকঃ-হোসেন
মল্লিক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি ছিপছিপে গঠনের ছিলেন। সহজ-সরল
ছিলেন এবং কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সরবেশ নেসা। সরবেশ নেসা একটু স্থূল,
মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামবর্ণ ছিলো। খুবই সহজ-সরল মহিলা
ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হোসেন মল্লিকের বয়স ৫২ বছর এবং
সরবেশ নেসার ৪৭ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে দশজন। চার ছেলে, ছয় মেয়ে।
ছেলেদের নাম সরবেশ আলী, আলী হোসেন, একাব্বর আলী,
তালেবর রহমান। মেয়েদের নাম, রংমালা খাতুন, জয়গন নেসা,
তুষ্ট বানু, রাবিয়া খাতুন, সবিয়া খাতুন
এবং সুফিয়া খাতুন।
সরবেশ আলী-
সরবেশ আলী মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা। তিনি সহজ-সরল এবং সাজিয়ে কথা বলতে
পারে। খইয়ের মতো কথা বেরোয় তাঁর মুখ থেকে। তিনি আলীগাঁও লাটের গাঁওবুড়া। তিনি
বিয়ে করেছেন আলীগাঁয়ের রখমত আলীর মেয়ে নবিরন নেসাকে। নবিরন নেসা মাঝরি গঠনের
এবং শরীরের রং ফর্সা। দেখতে সুন্দরী। সহজ-সরল স্বভাবের মহিলা। আমার থেকে বয়সে
কিছু ছোট। তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
নবির উদ্দিন, সাহেরা খাতুন, বিমলা খাতুন,
মহির উদ্দিন এবং শহিদুল ইসলাম। শহিদুল ইসলাম হায়ার সেকেন্ডারি পাস।
অন্যরা স্বাক্ষর। ছেলে-মেয়ে সবার বিয়ে হয়ে গেছে । নবির উদ্দিন বাদে
ছেলে-মেয়েরা সবাই আমার ছাত্র ছিলো।
আলী হোসেন-
আলী হোসেন লম্বা এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে এখন বরপেটা রোডের নিচুকা গ্রামের
বাসিন্দা। কৃষিকাজ করে। তিনি বয়সে আমার থেকে কিছুটা বড়। খুবই সহজ-সরল। কম কথা
বলে। তিনি স্বাক্ষর। তিনি বিয়ে করেছেন আলীগাঁয়ের খৈমুদ্দিনের মেয়ে আসাতন
নেসাকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে তিন জন। এক ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে জরিমন নেসা, কমলা খাতুন এবং আজাহার আলী। জরিমন নেসা
স্বাক্ষর। আমার ছাত্রী ছিলো । কমলা খাতুন ২০১২ সালে মারা গেছে।
একাব্বর আলী-
একাব্বর আলী লম্বা এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে স্বাক্ষর। আগে কৃষিকাজ করতো, নদী ভাঙার
পরে ব্যবসায় করে। সে সহজ-সরল। কম কথা বলে। সে বিয়ে করেছে পিঠাদির কাশেম মুন্সির
মেয়ে পিয়ারজান নেসাকে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে রফিকুল ইসলাম, জেহেরুল ইসলাম এবং মফিদা খাতুন। রফিকুল
ইসলাম হায়ার সেকেন্ডারি পাস। মফিদা খাতুনকে বিয়ে দিয়েছে গোবিন্দপুড় অঞ্চলের
বিখ্যাত সমাজ সেবক মোসলেম উদ্দিন সরকারের নাতি মহির উদ্দিনের সাথে।
তালেবর রহমান-
তালেবর রহমান লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সে আগে গুয়াহাটীতে অটো চালাতো, বর্তমান
ব্যবসায় করে। সে মৃদুভাষী, নম্র। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের কছিম
উদ্দিনের মেয়ে সামচুন নেহারকে। সামচুন নেহার আমার ছাত্রী ছিলো। সামচুন নেহার
লম্বা এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। খুবই নম্র এবং মৃদুভাষী। তাদের ছেলে
দুইজন। মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম, সানোয়ার রহমান এবং আনোয়ার রহমান।
সানোয়ার রহমান হায়ারসেকেন্ডারি পাস।
রংমালা-
রংমালা মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী, সহজ-সরল।
তাঁর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের মাতবর আলীর ছেলে পিয়ার আলীর সাথে। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আব্দুর রহমান, সাদেক আলী, নূরজাহান বেগম
এবং রেজিয়া খাতুন ।
জয়গন নেছা-
মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার বিয়ে
হয়েছে আলীগাঁয়ের খৈমুদ্দিনের ছেলে জলিমুদ্দিনের সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম তুষ্টবানু, আয়সা খাতুন,
খোরশেদ আলী, মুক্তার আলী, কাশেম আলী এবং
লোকমান আলী। তুষ্টবানু- তুষ্টবানু মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং কালো। মুখমন্ডলে
বসন্তের দাগ বিদ্যমান। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার বিয়ে হয়েছে গোবিন্দপুড়ের
খইমুদ্দিনের সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম জালাল উদ্দিন, জামাল
উদ্দিন, বিল্লাল হোসেন, আব্দুল করিম, আবুল হোসেন এবং
ময়ূরজান নেসা।
রাবিয়া খাতুন-
রাবিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার
বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের নসের আলীর সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে,
দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জ্যোৎস্না বানু, বাদশাহ
মিয়া, আক্কেস আলী এবং রাশিদা খাতুন ।
সাবিয়া খাতুন-
সাবিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে আগমন্দিয়ার আলী
হোসেনের ছেলে রমজান আলীর সাথে। তাঁদের এক ছেলে। নাম ফালু মিয়া। সাবিয়া খাতুন
কিছুদিন আগে মারা গেছে। সুফিয়া খাতুন- সুফিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল
শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার বিয়ে হয়েছে হেলচাপামের আজিবর রহমানের ছেলে
লিয়াকত আলীর সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে।
তাঁদের নাম মোন্নাফ আলী, সানিদুল ইসলাম, নূরজাহান বেগম
এবং পরীমালা খাতুন ।
বাজু মল্লিক- বাজু মল্লিককে
আমি দেখিনি। তাই তাঁর বিষয়ে
বিশেষ কিছু উল্লেখ করা সম্ভব হবে না। তবে, লোক মুখে শুনেছি, তিনি
ভালো বিচারক এবং সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। বাজু মল্লিকের স্ত্রীর নাম ছিলো
কমলা খাতুন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে কমলা খাতুনের বয়স ছিলো ৭০ বছর।
তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কুরজত আলী,
বিন্দু নেসা, মুন্তাজ আলী এবং ইন্তাজ আলী।
কুরজত আলী- কুরজত
আলী লম্বা ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। তাঁর দুটি পক্ষ ছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম ছিলো তসিরন নেসা। তসিরন নেসা ইদারা থেকে জল তুলতে গিয়ে
ইদারায় পরে মারা গিয়েছিলো। তসিরন নেসা মারা যাওয়ার পরে সরিপন নেসাকে বিয়ে
করেছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে কুরজত আলীর বয়স ৪৮ বছর এবং সরিফন নেসার
২৮ বছর। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নেই। মনে হয়,
তিনি ১৯৬৬ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর তিন
ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে তাইজুদ্দিন, কালাচান,
মনুরুদ্দিন এবং মালেকা খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে,
তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মজিবর রহমান, জমেলা
খাতুন, বাসিরন নেসা, আসিরন নেসা এবং সাহেরা খাতুন।
ভাই-বোনদের মধ্যে একমাত্র কালাচানই বি, এ, পাস। অন্যান্যরা
স্বাক্ষর।
বিন্দু নেসা-
বিন্দু নেসা লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। বিন্দু নেসাকে আমি নানী বলে ডাকতাম। তিনি খুবই
স্নেহশীল মহিলা ছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের নালু মল্লিকের সাথে। শুনেছি,খাজনা
না দেওয়ার জন্য নালু মল্লিকের ৮০ বিঘা জমি সরকার খাস করেছিলো। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফালু মিয়া,
আদরজান নেসা, নুরুল ইসলাম, জয়নব খাতুন.
জিন্নতমালা, ময়ূরি খাতুন এবং আঞ্জোয়ারা খাতুন। ফালু
মিয়াৰ একটি চোখ কানা ছিলো। ছোটবেলা বসন্ত রোগ হয়ে তাঁর চোখ কান হয়ে গিয়েছিলো। নুরুল
ইসলাম আমার সমবয়সী ছিলো। তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব ছিলো। সে ভারতীয়
মার্ক্সবাদী কমিউনিষ্ট দলের সদস্য ছিলো। সে এম, ই স্কুলের
শিক্ষক ছিলো। ২০১৫ সালে সে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলো। সে হার্টের অপারেশ্বন
করিয়ে ছিলো। অপারেশ্বনের কয়েক মাস পরে সে ২০২১ সালের ২ আগষ্টে মারা গেছে। বড় মেয়ে
আদরজান নেসা অনেকদিন আগে এবং ফালু মিয়া ২০০৭ সালে মারা গেছে। নালু মিয়া এবং
বিন্দু নেসাও অনেকদনি আগে মারা গেছে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নালু
মল্লিকের বয়স ৫৩ এবং বিন্দু নেসার ৪০ বছর ছিলো। জীবিত মেয়েরা সবাই গৃহিনী।
মুন্তাজ আলী-
মুন্তাজ আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি
কাপড়ের দোকান করতেন। পরবর্তী জীবনে তিনি বিচারক হিসাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে খুবই
সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাঁকে সবাই মুন্তাজ দেওয়ানী হিসাবে জানত। আমার সাথেও তাঁর
সুসম্পর্ক ছিলো। তাঁর সাথে দুই একটি বিচারে আমিও অংশ গ্রহণ করতাম। তাঁর পক্ষ দুটি।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম আমিরন নেসা এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম লক্ষী নেসা।
লক্ষী নেসা আমার সমবয়সী এবং আলীগাঁয়ের আমেজ উদ্দিনের মেয়ে। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে মুন্তাজ আলীর বয়স ২৮ বছর এবং আমিরন নেসার বয়স ২৩ বছর। প্রথম
পক্ষের স্ত্রীর দুই ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
জেলেকা খাতুন, ওমর আলী এবং আহসান আলী। দ্বিতীয় পক্ষের
স্ত্রীর তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রতন আলী(কালু
মিয়া), ফজর আলী, জুলমত আলী এবং জাহানারা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা
সবাই বিবাহিত।
ইন্তাজ আলী-
ইন্তাজ আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি কাপড়ের
ব্যবসায় করতেন। তিনি সামাজিক কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। তাঁর পক্ষ দুটি। প্রথম
পক্ষের স্ত্রীর নাম বসিরন নেসা। আগমন্দিয়ার রহিমুদ্দিন হাজির মেয়ে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর নাম হরিন নেসা। হরিন নেসা ভক্তেরডোবার মেয়ে। তাঁর বাবার নাম আমার
জানা নেই। প্রথম পক্ষ স্ত্রীর চার ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল লতিফ (বসিরুদ্দিন), কছিম উদ্দিন, জমির আলী,
জয়নাল আবদিন, ডালিমন নেসা, কদবানু এবং
সরবানু। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
হুরমুজ আলী, মরিয়ম নেসা, ফিরোজা খাতুন
এবং রাশিদা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত।
আব্দুর রশিদঃ-আব্দুর
রশিদ লম্বা-চওড়া ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি সমাজিক কাজের সাথে
জড়িত ছিলেন। সাজিয়ে কথা বলতে পারতেন। একবার গল্প বলা শুরু করলে তাঁর কাছ থেকে
উঠে আসা সম্ভব হতো না। এমনকি প্রসাব করতে যাওয়াও সম্ভব হতো না। তিন-চার ঘন্টা
বিরামহীনভাবে গল্প বলতে পারতেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প। একটা গল্প শেষ হতে
না হতেই আর একটি গল্প শুরু করতেন। আমি দু-চারবার তাঁর গল্প শুনেছি। মানুষের সাথে
তাঁর খুবই সদ্ভাব ছিলো। তিনি খুবই সাহসী ছিলেন। নিজের ক্ষতি হলেও পরের উপকার করতে
ভালোবাসতেন। প্রথম জীবনে তিনি ধূমপান করতেন যদিও শেষ জীবনে ধূমপান ছেড়ে
দিয়েছিলেন এবং অন্যরা যাতে ধূমপান না করে তার জন্য উপদেশ দিতেন। তিনি ১৯৬৩ সালে
মানিকপুড় পঞ্চায়তের সভাপতি এবং ১৯৮৫ সালে পশ্চিম মন্দিয়া সমবায় সমিতির সভাপতি
নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি আলীগাঁও এম, ই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাপক সভাপতি ছিলেন।
অব্দুর রশিদের দু'টি
পক্ষ ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম ছিলো কমলা খাতুন। কমলা খাতুন নিঃসন্তান
ছিলেন। তাই তিনি করিমন নেসাকে দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে আব্দুর রশিদের ৫০ বছর, প্রথমা স্ত্রী কমলা খাতুনের ৩৫ বছর এবং
দ্বিতীয় স্ত্রী করিমন নেসার ২২ বছর বয়স ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর কোনো
সন্তান-সন্ততি নেই। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সাত ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে কালু মিয়া(খেপু), ছমিরন নেসা, আমিরন নেসা,
জংসের আলী, সোহরাব আলী, রাশিদা বেগম(জামিরননেসা),
আব্দুল বারেক আলী, সামসুল হক আজিজুল হক এবং জাকির হোসেন।
আব্দুর রশিদ ১৯৯৮ সালে জুলাই মাসের ১৫
তারিখে এবং কমলা খাতুন ১৯৯৯ সালে নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে মারা গেছে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রী করিমন নেসা এখনও জীবিত।
কালু মিয়া-
কালুমিয়া লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ।ছিপছিপে। আমার থেকে বয়সে কিছুটা ছোট। সে
কাঠ মিস্ত্রী। সে বাবার মতো সাজিয়ে কথা বলতে পারে। মৃদুভাষী। মানুষের সাথে সদ্ভাব
রেখে চলে। সে বিয়ে করেছে বালিকুরির জহুরুদ্দিনের মেয়ে জহুরা খাতুনকে। তাঁদের দুই
ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রুকিয়া খাতুন, জেহেরুল
ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, রেজিয়া খাতুন এবং ডালিমন নেসা ।
ছমিরন নেসা-
জমিরন নেসা লম্বা এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে শিতুলির হজরত আলীর ছেলে আবুল
কাশেমের সাথে। তাঁদের দুই ছেলে। আকবর আলী এবং আতোয়ার রহমান(আব্দুল আলিম।)
আমিরন নেসা-
আমিরন নেসা লম্বা-চওড়া ছিপেছিপে গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে মিশুক প্রকৃতির এবং
নরম মেজাজের মহিলা ছিলো। তার বিয়ে হয়েছিলো বঙ্গাইগাঁও জেলার ডালকাটার সামসুল
হকের ছেলে আব্দুল কাদেরের সাথে। তাদের এক ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আনোয়ার হোসেন, সানিয়ারা খাতুন, রাজিমা
খাতুন এবং সিলিমা খাতুন।
আমিরন নেসা ২০০৯ সালে মারা গেছে। মেয়ে
রাজিমা খাতুন ২০০২ সালে অকালে মারা গেছে।
জংসের আলী-
জংসের আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সে কাঠমিস্ত্রী। মিশুক প্রকৃতির, কম কথা বলে। সে
বিয়ে করেছে কনরা গ্রামের আবু মিয়ার মেয়ে হাসিনা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম, জেসমিনা খাতুন এবং সানিদুল ইসলাম।
উভয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পাস।
সোহরাব আলী-
সোহরাব আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজে নিয়োজিত। মিশুক প্রকৃতির ছোট ছোট
করে কথা বলে। সে বিয়ে করেছে মরাভাজের আশ্রব আলীর মেয়ে নুরজাহান বেগমকে। তাদের এক
ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সুরিয়া খাতুন, জান্নাতুল
ফিরদৌসি, ফাতিমা খাতুন এবং মাসুদ জোবায়ের। জান্নাতুল ফিরদৌসি ম্যাট্রিক এবং
হায়ার সেকেন্ডারি (বিজ্ঞান)তে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে এখন ম্যাডিকেল
এন্ট্রান্সের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছে।
রাশিদা খাতুন-
লম্বা এবং ফর্সা। মৃদুভাষী। সবার সাথে মিশতে পারে। তার বিয়ে হয়েছে সত্র কনরার
শংসের বয়াতীর ছেলে আবু বাক্কার সিদ্দিকের সাথে। তাদের এক ছেলে, চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাজিদা খাতুন, রাশিদুল ইসলাম, সুলেমা খাতুন,
তাহমিনা খাতুন এবং রুনা লায়লা।
আব্দুল বারেক-
আব্দুল বারেক মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী। মিশুক
প্রকৃতির। প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করে। সে বিয়ে করেছে সত্র কনরার আব্দুল
মান্নাফের মেয়ে আনোয়ারা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম আনাস আলী এবং আঞ্জুমা খাতুন।
সামসুল হক-
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মিশুক প্রকৃতির। হাফিজিও পড়েছিলো। তবে,
সম্পূর্ণ করতে পারেনি। এখন সে একটি প্রাইভেট স্কুলের কেরানি। সে
দ্বীনি তালিমের বরপেটা জেলার সেক্রেটারি। সে বিয়ে করেছে আগমন্দিয়ার নাজিম
উদ্দিনের মেয়ে রাশিদা খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আরিফুল হক, সাদিকা আফ্রিন এবং মিসবাহুল হক।
ছেলে-মেয়েরা সবাই শিক্ষার্থী।
আজিজুল হক-
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। সে রাজমিস্ত্রী। তার পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষের
স্ত্রীর নাম আনোয়ারা খাতুন। সে কয়াকুছি পাথারের রহিম বাদশাহর মেয়ে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর নাম আসমিনা খাতুন। গোয়ালপাড়া জেলার বরপাহারের মোকসেদ আলীর মেয়ে।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী আনোয়ারা খাতুনের একমাত্র মেয়ের নাম আয়সা সিদ্দিকা।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে এক মেয়ে। সন্তানদের নাম ইমামূল হক এবং আতিকা
খাতুন।
জাকির হোসেন-
জাকির হোসেন মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী। ব্যবসায়ী। সে
বিয়ে করেছে ১ নং চাচরার রফিকুল ইসলামের মেয়ে নারজিনা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম জুবাইদা খাতুন এবং খালিদ হোসেন।
পুচাই দেওয়ানী-
পুচাই দেওয়ানী লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। আলীগাঁও
প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিলো । তিনি ভালো
বিচারক ছিলেন এবং সমাজের মাতব্বরি করতেন। ব্রিটিশের আমলে তিনি জুরির হাকিম
নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম সুরতজান নেসা।
তিনি মারা যাওয়ার পরে বাছাতন নেসাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে পুচাই দেওয়ানীর বয়স ৮৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী বাছাতন নেসার বয়স ৭০ বছর।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী সুরতজান নেসা ১৯৬৬ সালের অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাই ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী সুরতজান নেসার চার
ছেলে। মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুর রশিদ, ওয়াজুদ্দিন,
রখমত আলী এবং হাকিমুদ্দিন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী বাছাতন নেসার
ছেলে-মেয়ে সাতজন। তিন ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফজল
হক(হজরত আলী), জয়তন নেসা, কাশেম আলী,
জায়েদা খাতুন, মানিকজান নেসা, মোবারক আলী এবং
চন্দ্ৰবানু।
আব্দুর রশিদ-
আব্দুর রশিদের বর্ণনা আগেই দেওয়া হয়েছে। আবার বর্ণনা দেওয়া বাহুল্য হবে বলে
এখানে বর্ণনা দিলাম না।
ওয়াজুদ্দিন-
ওয়াজুদ্দিন লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিলেন।
শেষ বয়সে তিনি সুফিপীর হয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম মজিরন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে ওয়াজুদ্দিনের বয়স ৪৮ বছর এবং মজিরন নেসার বয়স ৪৫ বছর। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে আঠজন। সাত ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে নুর হোসেন, মৈজুদ্দিন,
খোদেজা খাতুন, মহুরুদ্দিন, বসিরুদ্দিন,
ইউনূস আলী আহমেদ, সিদ্দিক আলী এবং কদ্দুস আলী। এদের
মধ্যে নুর হোসেন, মৈজুদ্দিন এবং মহুর উদ্দিন স্বাক্ষর।
বসিরুদ্দিন বি,এ পাস, ইউনূস আলী বিএসসি পাস। সিদ্দিক আলী ও
কদ্দুস আলী হায়ার সেকেন্ডারি পাস। ইউনূস আলী মানিকপুড় জনকল্যাণ হাইস্কুলের
বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলো। সে ২০০৯ সালে হজ্ব যাত্রা করেছিলো । ২০১০ সালে হার্ট অ্যাটাক
করে সে হঠাৎ মারা হেছে। ইউনূস আলীর মৃত্যুর কিছুদিন পরে মৈজুদ্দিনো হার্ট অ্যাটাক
হয়ে মারা গেছে।
রখমত আলী-রখমত
আলী লম্বা, ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি আমার ছোট
ভাই হোসেন আলীর শশুড়। তিনি প্রথমে কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিলেন এবং পরে
কাঠমিস্ত্রী হিসাবে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। তিন ছেলে,
তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সূর্যবানু, ফজর আলী,
হাজিরন নেসা, সাদেক আলী, মুনসের আলী,
সাজিরন নেসা এবং রহিমা খাতুন। সূর্যবানু অনেক আগে বার বছর বয়সে মারা
গেছে। মহিষে গলার মাঝে শিং হেনে তাকে হত্যা করেছিলো। ফজর আলী ২০০৮ সালে এবং সাদেক
আলী অবিবাহিত অবস্থায় বার বছর বয়সে ম্যালেরিয়া হয়ে মারা গেছে।
আগে বসন্ত, কলেরা এবং
ম্যালেরিয়া হয়ে অনেক লোকের জীবন হানি হত।
হাকিমুদ্দিন-
হাকিমুদ্দিন লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর বাম
চোখ বগে ঠোকর দিয়ে কানা করেছিলো। হাকিমুদ্দিনের দুটি পক্ষ ছিলো। প্রথম পক্ষের
স্ত্রীর নাম শুকুরজান নেসা এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম রূপবানু নেসা। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হাকিমুদ্দিনের বয়স ৩৮ বছর, শুকুরজান নেসার
৩১ বছর এবং রূপবানু নেসার ২৯ বছর। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে বায়লা
খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর রূপবানু নেসার ছেলে-মেয়ে চার জন। দুই ছেলে,
দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাসমত আলী, হাসেন আলী,
মনোয়ারা খাতুন এবং আনোয়ারা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত এবং
জীবিত আছে। রূপবানু নেসাও জীবিত।
ফজল হক-
ফজল হক লম্বা ছিপছিপে গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলো। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৩৫ বছর। তার পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর
নাম আদরজান নেসা। আদরজান নেসা চিররোগী ছিলেন। তাই তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম সোনাবানু। তিনি রূপাকুছির নুরবক্সের মেয়ে। প্রথম
পক্ষ স্ত্রীর ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম, হনুফা
খাতুন, মেহেরুন নেসা, হানিফ আলী এবং হাসেনা বানু। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর ছেলে- মেয়ে নয়জন। দুই ছেলে, সাত মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে বানু নেসা, আসমা খাতুন, সমেলা বেগম,
নোমাজ আলী, রমেলা খাতুন, নিলীমা খাতুন,
মেঘজান নেসা, হালিদা খাতুন এবং হোসেন আলী।
ফয়জল হক ২০১৭ সালে মারা গেছে।
জয়তন নেসা-লম্বা-চওড়া
এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের কবির আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের সাথে।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আকবর আলী, সাহেলা খাতুন, মুননুজান, নেসা এবং জবেদ
আলী।
কাশেম আলী-কাশেম
আলী লম্বা, বলিষ্ঠ এবং শ্যামবর্ণ। তিনি কৃষিকাজে নিয়োজিত।
এখন ছেলেরা কাজের উপযুক্ত হয়েছে। তাই তিনি এখন কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি
বর্তমান ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। তিনি বিয়ে করেছেন সত্র কনরার মহম্মদ আলীর মেয়ে
কদবানুকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয়জন। পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে মেসের আলী, সাহজাহান আলী, আজাহার আলী,
জাহানারা খাতুন, রফিদা খাতুন, মঞ্জোয়ারা
খাতুন, সারিফুল ইসলাম। জাহাঙ্গীর আলম, মিনুয়ারা
পারবিন। ছেলে-মেয়েরা সবাই আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিলো।
মেসের আলী ম্যাট্রিক পাস। মেসের আলী
এবং আজাহার আলী ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সাহজাহান আলী কৃষিকাজে নিয়োজিত।
সারিফুল ইসলাম বি, এ পাশ। সে এখন ‘জমাটো' কোম্পানীতে
কর্মরত। জাহাঙ্গীর আলম হাফিজি বিভাগে অধ্যয়ন করেছিলো, তবে অধ্যয়ন
সম্পূর্ণ করতে পারেনি। সে এখন মাধ্যমিক স্কুলে ক্লাস এইটে অধ্যয়রত। মেয়েদের সবার
বিয়ে হয়ে গেছে।
জায়েদা খাতুন-
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছিলো আশ্রব আলীর ছেলে শুকুর আলীর সাথে।
তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি নেই। এখন সে কাশেম আলীর সংসারে জীবন যাপন করছে।
মোবারক আলী-
মোবারক আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। ম্যাটিক পাস। সে প্রথমে দর্জি কাজ
করতো পরে কাঠমিস্ত্রী কাজে নিয়োজিত হয়েছিলো। সে মৃদুভাষী এবং গম্ভীর প্রকৃতির
ছিলো। সে বিয়ে করেছে আলীগঁয়ের সুলতান মিয়ার মেয়ে সাহেরা খাতুনকে। তাদের
ছেলে-মেয়ে ছয়জন। তিন ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
সহিদুল ইসলাম, সফিকুল ইসলাম, মাজেদা খাতুন,
ফরিদা খাতুন, ইকবাল হোসেন এবং এসমিনা খাতুন । সহিদুল
ইসলাম রাজমিস্ত্রী, সফিকুল ইসলাম ম্যাডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ,
ইকবাল হোসেন বি, এ পাস। ঔষধ ব্যবসায়ে নিয়োজিত।
মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। মোবারক আলী ২০১৯ সালে মারা গেছে।
চন্দ্রবানু-
চন্দ্রবানু লম্বা এবং ফর্সা। মৃদুভাষী। বিয়ে হয়েছে সত্রকনরার তুফান আলীর ছেলে
খোরশেদ আলীর সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। এক ছেলে, চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে সূর্যবানু, সাহিদা বেগম, রাশিদা খাতুন,
সাহানূর আলী এবং ইলিমা খাতুন ।
দানেশ মুন্সি- দানেশ
মুন্সি মাঝারি গঠনের স্বাস্থ্যবান এবং কালো ছিলেন। তাঁর বাবার নাম পাকু বেপারি।
আমি পাক্কু বেপারিকে একেবারে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখেছি। তখন তিনি কুঁজা হয়ে
গিয়েছিলেন। লাঠি নিয়ে কুঁজা হয়ে চলা-ফেরা করতেন। চোখে চশমা লাগাতেন। দানেশ
মুন্সি আমাদের কাকা ভেলুমিয়ার শশুড়, আমাদের সম্পর্কীয় নানা। আলীগাঁয়ের
মাঝে দানেশ মুন্সি সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। শুনেছি, তাঁদের আড়াইশ
বিঘা জমি ছিলো। তিনি ব্যবসায়ে নিয়োজিত ছিলেন। মরশুমে পাট, সরিষা, কালাই
প্রভৃতি কিনে ‘স্টক’ করে রাখতেন এবং দাম উঠলে বিক্রী করতেন।
তাঁদের ভেতর বাড়ীর উঠানে সব সময় পাটের একটি পুঁজি থাকতো। সেই পুঁজিতে শেওলা পরে
থাকতো। তাঁরা নতুন ধানের ভাত খুব কমই খেতেন। তিন চার বছরের পুরানা ধানের চালের ভাত
খেতেন। আমি মাঝে মধ্যে তাঁদের বাড়ী গিয়ে পুরানা ধানের ভাত খেতাম। মাস কলাইর ডাল
এবং পুরানা চালের ভাত খেতে ভালই লাগতো। রাখাল চাকর দিয়ে বাড়ী সব সময় সরগরম হয়ে
থাকতো। তাঁদের একটি মহিষের গাড়ী ছিলো। মহিষ দুটি খুবই বড় ছিলো। একটির রং সাদা
এবং একটি কালো ছিলো। মহিষের শিংগুলো খুবই বড় বড় ছিলো। সেই অঞ্চলের মাঝে তাঁদের
মহিষই সবচেয়ে বড় এবং দেখতে সুন্দর ছিলো। নদী ভাঙনের পরে অবস্থা অনেকটা দুর্বল
হয়ে গিয়েছিলো। তবে, তেমন নয়। কথায় আছেনা, নদী মরলেও নদীর
রেখ থাকে !
শুনেছি, দানেশ মুন্সি
হেঁটেই বহরি বাজারে যাওয়া আসা করতেন। বহরি আলীগাঁও থেকে কমেও দশ/বার মাইলের
রাস্তা। কথাটা ভাবতে অবাক লাগে! সাইকেল অবশ্যে ছিলো, তবে দানেশ
মুন্সি সাইকেল খুব কম চালাতেন। সাইকেল থাকতে সাইকেল কেন চালায় না,
এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন- হাঁটলে শরীর সুস্থ থাকে। যেখানে
হেঁটেই পারা যায়, সেখানে সাইকেল চালানোর কি দর্কার? পায়ের
চাপেই যে খুঁটি গাড়া যায়, সেখানে ঢেঁকির দর্কার কি !
দানেশ মুন্সি আমাকে ভালই স্নেহ করতেন।
আমি মাঝে-মধ্যে তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। তিনি একদিন বলেছিলেন- ‘আবুল,
যার সমালোচনা বেশি, সে তত বিখ্যাত লোক। একমাত্র পাথরের
সমালোচনা নেই। আল্লাহই যাকে চুল ধরে ওপড়ের দিকে টানে, মানুষ বাল ধরে
টেনে তাকে তল মুখে নামাতে পারে না । এই কথা সব সময় মনে রাখবে।'
দানেশ মুন্সির স্ত্রীর নাম ছিলো সুহাগী
নেসা। তিনি মাঝারি গঠনের স্বাস্থ্যবান এবং ফর্সা ছিলেন। খুবই অমায়িক মহিলা ছিলেন।
ধনী বলে কোনোদিন অহংকার করতে দেখিনি। আমরা তাঁদের বাড়ী গেলে নিজের নাতি- পুতির
মতোই স্নেহ আদর করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে দানেশ মুন্সির বয়স ৬০ এবং
সুহাগী নেসার ৪৫ বছর ছিলো। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। দুই ছেলে, তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আয়সা খাতুন, জমেলা খাতুন,
জুরান আলী, জাকির হোসেন এবং হামেলা খাতুন ।
অসিরন নেসা-
অসিরন নেসা মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো জাহানারপাড়ের বুদ্ধু
মিয়ার ছেলে ভেলু মিয়ার সাথে। ভেলু মিয়া আমাদের কাকা। সেই সুবাদে তিনি আমাদের
কাকী। তিনি খুবই অমায়িক এবং মৃদুভাষী মহিলা। তাঁদের তিন ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে রেজিয়া খাতুন, আয়নাল হক, সালেহা খাতুন,
মহেলা খাতুন, জয়গন নেসা, আক্কাস আলী,
আফসার আলী এবং সোনাবানু। রেজিয়া খাতুনের বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের
রজব আলীর ছেলে ওয়াজেদ আলীর সাথে। রেজিয়া খাতুন অনেকদিন আগে মারা গেছে।
জমেলা খাতুন-
জমেলা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। দানেশ মুন্সির ছেলে-মেয়ের মধ্যে ধনী
হিসাবে কেউ তেমন অহংকারী নয়। বলতে খারাপ লাগলেও বলতে হয় যে, জমেলা
খাতুন একটু অহংকারী বলে ধারণা হয়। তবে, তেমন নয়। সবার সাথেই মিশতে পারে।
জমেলা খাতুনের বিয়ে হয়েছিলো বাঘবর পাথারের জবান আলী ফকিরের ছেলে জহুরুদ্দিনের
সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে আঠজন। সাত ভাই, এক বোন। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফয়জল
হক, নুরুল ইসলাম. হাসেন আলী, মোনসের আলী, হানিফ আলী,
রখমত আলী, আকমত আলী এবং হাসেনা বানু।
ফয়জল হক আগে চাহ দোকান করতো, ছেলেরা
কাজের উপযুক্ত হওয়াতে এখন অবসর নিয়েছে। নুরুল ইসলাম এম, এ, বি,
এড। সে ভেঞ্চার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। হাসেন আলী একটু
অন্যপ্রকৃতির। সে কবিরাজি করে। সাধু সন্যাসীদের মতো জীবন যাপন করে। হানিফ আলী এবং
রকমত আলী চাহ দোকানী। ছোট ছেলে আকমত আলী সুপারির ব্যবসায় করে। একমাত্র মেয়ে
হাসেনা খাতুনের বিয়ে হয়ে গেছে।
জুরান আলী-
জুরান আলী মাঝারি গঠনের স্বাস্থ্যবান এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে হায়ার সেকেন্ডারি
পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত। সে বাঘবর হাটের লেসিও ছিলো। সে বিয়ে করেছে বাঘবর
পাথারের ছবিল উদ্দিন ডাক্তারের মেয়ে রেজিয়া খাতুনকে। রেজিয়া খাতুন শিক্ষিতা,
সরবরাহি মহিলা এবং সামাজিক কাজের সাথে জড়িত। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে, রুজিনা
পারবিন (জুরিয়া খাতুন), রফিকুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম
এবং রুমানা পারবিন ।
রুজিনা পারবিন মাঝারি গঠনের এবং
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। ম্যাট্রিক পাস। সে আমার ছাত্রী ছিলো। তার বিয়ে হয়েছে
সত্রকনরার ইজ্জত আলী মাস্টারের ছেলে পিয়ার আলীর সাথে। রফিকুল ও শফিকুল কম্পিউটার
ইঞ্জিনিয়ার ৷এখন বাঘবর বাজারে কম্পিউটার ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। রুমানা পারবিন বি,
এ পাস। তার বিয়ে হয়ে গেছে।
জাকির হোসেন-
জাকির হোসেন লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে হায়ার সেকেন্ডারি পাস। সে
খেলা-ধুলায় ভালো ছিলো। এখন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সে বাঘবর হাটের লেসি। সে বিয়ে
করেছে নওকুসির রমজান আলীর মেয়ে আমিনা খাতুনকে। আমিনা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। খুবই
অমায়িক মহিলা। অতিথি পরায়ন। তাদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আমির হামজাহ, আমিনুল হক,
হোসনিয়ারা পারবিন, মহিবুল ইসলাম এবং মনিরুল ইসলাম।আমির
হামজাহ এবং আমিনুল ইসলাম ম্যাট্রিক পাস। উভয়ে কম্পিউটার অপারেটর। হোসনিয়ারা
পারবিন ম্যাট্রিক ফেল। বিয়ে হয়ে গেছে। মহিবুল ইসলাম বি, এ পাস। মনিরুল ইসলাম স্নাতক পর্যায়ের
শিক্ষার্থী।
হামেলা খাতুন-হামেলা
খাতুন একটু ছোট-খাট ধরণের এবং ফর্সা। সে অমায়িক। তার বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের
জয়নুদ্দিনের ছেলে নুরুল ইসলামের সাথে। তাদের মেয়ে তিনজন। ছেলে নেই। মেয়েদের নাম
যথাক্রমে নূরজাহান বেগম, আলেকজান
নেসা এবং নারজিনা পারবিন। আলেকজান নেসা কিছুদিন আগে মারা গেছে।
ভুবন মুন্সি- ভুবন মুন্সি
মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তিনি কিছু শিক্ষিত ছিলেন। বাংলা এবং আরবী পড়তে
পারতেন। মসজিদের ইমামতি করতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর খুবই সুমধুর ছিলো। কেরাত করে সুরা
পাঠ করলে খুবই সুমধুর লাগতো। তিনি সুমধুর কণ্ঠে মৌলুদ পড়াতেন। আমি ছেলেবেলা তাঁর
মৌলুদ পড়ানো শুনেছি। সেই মৌলুদের সুর এখনও আমার কাণে বাজে।..ইয়া নবি সালাম আলাই
কা, ইয়া হাবিব
সালাম আলাই কা.....। ভূবন মুন্সির স্ত্রীর নাম সন্দেশ নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে ভূবন মুন্সির বয়স ৪৫ বছর এবং সন্দেশ নেসার ৩৮ বছর ছিলো। তাঁদের
ছেলে দুইজন। মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে সামেজ উদ্দিন এবং সহর আলী।
সামেজ উদ্দিন-
সামেজ উদ্দিন লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। মুখে হালকা বসন্তের দাগ বিদ্যমান। সে
আমার থেকে কিছুটা ছোট। সে প্রথমে কাপড় বুনত। এখন কাঠমিস্ত্রীর কাজে নিয়োজিত। সে
সিপিআই(এম) দলের সাথে জড়িত। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের আমেজ আলীর মেয়ে
চন্দ্রবানুকে। তাঁদের পাঁচ ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সবিরন নেসা, চান মাহমুদ, মান্নাফ আলী, ফকরুল আলম, মোস্তাফিজুর রহমান এবং কামরুল আলম। এরা
প্রায় সবাই আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিলো। সবিরন নেসার বিয়ে হয়েছে রুভির রাইজুদ্দিনের
ছেলে ময়নাল হকের সাথে। চানমাহমুদ এবং মোস্তাফিজুর হায়ার সেকেন্ডারি পাস। মান্নাফ
আলী এবং ফকরুল আলম বি, এ
পাস। কামরুল আলম ‘ক্লাস
টেনে' পড়ে। চানমাহমুদ
সামাজিক কাজের সাথে জড়িত।
সহর আলী-
সহর আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে বিভিন্ন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। প্রথমে
কাপড় বুনত। কিছুদিন কর্মকারের কাজও করেছে। তার পক্ষ দু'টি। সে প্রথম বিয়ে করেছিলো আলীগঁয়ের
তহের আলীর মেয়ে সূর্যবানুকে এবং দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের ইমান আলীর
মেয়ে ময়ূরজান নেসাকে। প্রথম পক্ষের চার ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাজিয়া খাতুন, সাগর বানু, সরিফন নেসা, মোনসের আলী, মোসলেম উদ্দিন এবং সবদের আলী। কেউ তেমন
লেখা-পড়া করেনি। দ্বিতীয় পক্ষের তিন ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাহেরা খাতুন, ময়নাল হক, আয়নাল হক, মাজেদা খাতুন এবং মহিবুল হক। মাজেদা
খাতুন বি, এ
পাস। সাজিয়া খাতুন আমার ছাত্রী ছিলো।
ভূবন মুন্সিরা তিন ভাই এবং এক বোন
ছিলো। ভাই-বোনদের নাম যথাক্রমে ভূবন মুন্সি, ইন্তাজ আলী, আহ্লাদি
খাতুন এবং সুলতান আলী। ভূবন মুন্সি এবং ইন্তাজ আলীকে নিয়ে একটি মুখরুচক প্রবাদ
প্রচলিত ছিলো আলীগাঁও অঞ্চলে। ভূবন মুন্সি বলেছিলো, কলা খায় ইন্তাজ এবং কৃমি পরে আমার মার্গ দিয়ে। কথাটা তিনি যথার্থই
বলেছিলেন। ছেলে-মেয়ে, ছোট
ভাইয়েরা দোষ করলে অভিভাবকদেরইতো জবাবদিহি করতে হয় । ইন্তাজ আলী- মাঝারি
গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম জমেলা খাতুন। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে ইন্তাজ আলীর বয়স ৩৬ বছর এবং জমেলা খাতুনের ২৮ বছর।
জমেলা খাতুন আলীগাঁয়ের কান্দু মিয়ার মেয়ে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। দুই ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
রূপজান নেসা, জামাল
উদ্দিন, ইনসন নেসা, কাঞ্চনমালা, হামিদা খাতুন এবং জাকির হোসেন। কেউ
তেমন লেখা-পড়া শেখেনি।
আহ্লাদি খাতুন-
মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের আজগর আলীর সাথে।
আজগর আলী চাহ দোকানী ছিলো। তাঁকে আমরা ভাই বলে ডাকতাম। তাঁদের ছেলে-মেয়ে সাতজন।
তিন ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সোনাবানু, সরবানু, আজিরন
নেসা, বাতাসী নেসা, মজিবর রহমান, আজিমুদ্দিন এবং কাজিমুদ্দিন। মজিবর
রহমান ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। কাজিমুদ্দিন ভেঞ্চার এম, ই স্কুলের শিক্ষক।
সুলতান আলী-সুলতান
আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম শান্ত নেসা
৷১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে সুলতান আলীর বয়স ২৮ বছর এবং পান্ত নেসার ২২
বছর। তাঁদের এক ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম ফিরোজা খাতুন এবং হেলাল উদ্দিন ৷
সন্তান দু'টি জন্মের পরে তাঁরা বাংলাদেশে চলে
গেছে।
মাতবর আলী- মাতবর আলী
লম্বা এবং কালো ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাঁকে আমি দেখিনি।
তাঁর ছেলেদের কাছ থেকে তাঁর বিষয়ে জেনেছি। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো মমিরন নেসা।
মমিরন নেসাকে আমি দেখেছি। তেনি লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলেন। কুকুরে
কামড়ানোর ফলে ক্ষেপে দিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে মারা গেছেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন।
চার ছেলে, দুই
মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে লালচান আলী, রয়তন নেসা, ময়জান
নেসা, নিলু
মিয়া(নিলীম উদ্দিন), মেঘু
মিয়া, পিয়ার আলী এবং
রাবিয়া খাতুন।
লালচান আলী-
লালচান আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। তিনি কৌতুকপ্রিয় ছিলেন।
লাঠিবাড়ি খেলায় ভালো ছিলেন। নাটকেও কৌতুক অভিনয় করতেন। ১৯৫১ সালের এনআরসি
অনুসারে তাঁর বয়স ১৫ বছর। তাঁর স্ত্রীর নাম জামেলা খাতুন। তাঁদের তিন ছেলে. এক
মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে সামেজ উদ্দিন, সামত বানু, জবেদ
আলী এবং আব্দুস সালাম। ছেলেরা কৃষিকাজ করে। মেয়েরা গৃহিনী। সামা বানু ২০১০ সালে
মারা গেছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের পরে লালচান
আলী বরপেটা রোডের মণিপুর-এ উঠে গিয়েছিলেন। ছেলেরা এখন মণিপুরেই বসবাস করে।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে অনেকদিন আগে মণিপুর গ্রামে মারা গেছে।
রয়তন নেসা-
রয়তন নেসা লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের নজা
মল্লিকের সাথে। রয়তনের মা মমিরন নেসাকে কুকুরে কামড়ে ছিলো এবং সে জন্যই ক্ষেপে
গিয়ে মারা গিয়েছিলো । মৃত্যুর একদিন আগে মমিরন নেসা রয়তন নেসাকে খামচে ছিলো।
খামচানোর ফলে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সেও ক্ষেপে গিয়ে ১৯৮৪ সালে তাঁর মার
মৃত্যুর এক মাস পরে মারা গিয়েছিলো। তাঁদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। তিন জনই ছেলে। মেয়ে
নেই। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মফিজ আলী, নুরমহম্মদ এবং রতন আলী। মফিজ উদ্দিন ১৯৯৪ সালে এবং নুরমহম্মদ ২০১৮
সালে মারা গেছে। রতন আলী এখনও জীবিত জীবিত । কৃষিকাজে নিয়োজিত।
ময়জান নেসা-ময়জান
নেসা লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আগমন্দিয়ার আসান
আলীর সাথে। সে বার্ধক্যজনিত কারণে ২০১০ সালে মারা গেছে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
দুই ছেলে, তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম বেগম নেসা,
ইমান আলী, আনোয়ারা
খাতুন, আশক আলী এবং
সামতন নেসা। ছেলেরা কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। মেয়েরা গৃহিনী।
নিলু মিয়া-
নিলু মিয়া লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি কাপড় বুনার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন। তিনি
ভালো দোতারা বাজাতে পারতেন। নম্র স্বভাবের এবং হিসেবী ছিলেন। নিরক্ষর হলেও
দেশ-বিদেশের খবর রাখতেন। না জানা বিষয় জানার চেষ্টা করতেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন
আলীগাঁয়ের সুলতান মিয়ার মেয়ে হাজেরা খাতুনকে। তিনি একটু খাটো এবং শ্যামবর্ণ।
হাজেরা খাতুন আমাদের খালতো বোন। সেই হিসাবে নিলু মিয়াকে আমরা মিয়া ভাই বলে
ডাকতাম। তিনি আমাদের খুব
স্নেহ করতেন। তাঁর পেটের ব্যথা ছিলো। সেজন্য তিনি দু'বার পেট অপারেশ্বন করিয়েছিলেন। ১৯৫১
সালের এনআরসি অনুসারে নিলু মিয়ার বয়স ১২ বছর এবং হাজেরা খাতুনের বয়স ৪ বছর।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। দুই ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জহুরা খাতুন, সামেনা খাতুন, হাসেনা বানু, মর্জিয়ানা খাতুন, গোলাপ হোসেন এবং আলতাব হোসেন। নিলু
মিয়া ১৯৯৩ সালে মারা গেছে। হাজেরা খাতুন এখনও জীবিত। তিনি ছেলেদের নিয়ে এখন
যতিগাঁও বসবাস করে। মর্জিয়ানা খাতুন ২০০০ সালে মারা গেছে।
মেয়েরা গৃহিনী। গোলাপ হোসেন হায়ার
সেকেন্ডারী পাস। বিল্ডিং নির্মাণের ঠিকাকাজ করে। আলতাব হোসেন ম্যাট্রিক ফেল। সে
রাজমিস্ত্রী এবং বড় ভাইয়ের মতোই বিল্ডিং নির্মাণের ঠিকাকাজ করে। মেয়েরা গৃহিনী।
মেঘু মিয়া-
মেঘু মিয়া একটু খাটো এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর
আত্মসন্মানবোধপ্রবল ছিলো। তিনি বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের নুরবক্সের মেয়ে
কাঞ্চনমালাকে। কাঞ্চনমালারা দুই বোন ছিলো । কাঞ্চনমালা এবং সরসী নেসা। কাঞ্চনমালার
মাতৃর নাম সরবেশ নেসা। দুই বোনের জন্মের পরে নুরবক্স মারা গিয়েছিলেন এবং মাতৃ
সরবেশ বিধবাই তাঁদের লালন-পালন করে বড় করেছিলেন। ১৯৬০ সালে আলীগাঁয়ে একটি
লটারি(ভাগ্য পরীক্ষা)খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেখানে কাঞ্চনমালা একটি বেঞ্জু
পেয়েছিলো। তাই তখন কাঞ্চনমালা নামটা আলীগাঁও অঞ্চলে খুবই বিখ্যাত হয়েছিলো। ১৯৫১
সালের এনআরসি অনুসারে মেঘু মিয়ার বয়স ৯ বছর এবং কাঞ্চনমালার ৩ বছর। এনআরসি
লিপিবদ্ধের সময় মেঘু মিয়া বালিকুরি এবং কাঞ্চনমালা নলিরপাম গ্রামে ছিলো।
মেঘু দম্পতির ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার
ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে কাদের আলী,
মালেকা খাতুন আনসের আলী, তমসের আলী এবং মুনসের আলী। মেঘু মিয়া সংসার সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন।
কাজ- কামে তেমন মন ছিল না। তাই কাঞ্চনমালা লোকের বাড়ীতে কাজ করে ছেলে-মেয়েদের
মানুষ করেছে। কাদের আলী এবং আনসের আলী রাজমিস্ত্রী। তমসের আলী এবং মুনসের আলী
টাইলস মিস্ত্রী। মেয়ে গৃহিনী। মেঘু মিয়া ২০১২ সালে এবং কাঞ্চনমালা ২০১৮ সালে
মারা গেছে।
পিয়ার আলী-
পিয়ার আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি
কাপড় বুনতেন। তাঁর হাতের কাজ খুউব পরিপাটি ছিলো। তিনি বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের
হোসেন মল্লিকের মেয়ে রংমালাকে। নদী ভাঙনের পরে তাঁরা বরপেটা রোডের নিচুকা গ্রামে
বসতি স্থাপন করেছে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুর রহমান, নুরজাহান বেগম, সাদেক আলী এবং রেজিয়া খাতুন। আব্দুর
রহমান ব্যবসায়ী। সাদেক আলী এম,
এ পাস। সত্র কনরা জুনিয়র কলেজের প্ৰবক্তা। মেয়েরা গৃহিনী।
পিয়ার আলী পনের বছর আগে মারা গেছে।
রংমালা এখনও জীবিত।
রাবিয়া খাতুন-
রাবিয়া খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। মিস্টভাষী। তাঁর বিয়ে হয়েছিল আলীগাঁয়ের জুরান
আলীর সাথে। জুরান আলী ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৯৫ সালে মারা গেছে। তাঁদের তিন ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
রব্বেন আলী, জরিমন
নেসা, করিমন নেসা, নিয়েত আলী, মোন্নাফ আলী এবং রোশেনারা খাতুন।
রব্বেন আলী ব্যবসায়ী। নিয়েত আলী বি, এ পাস। নিচুকা হাইস্কুলের শিক্ষক। মোন্নাফ আলী বিএসসি। প্রাইভেট
স্কুলের শিক্ষক। রোশেনারা খাতুন বি,এ
পাস। প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষিকা। জরিমন নেসা এবং করিমন নেসা গৃহিনী ।
নজর আলী দেওয়ানী-নজর
দেওয়ানী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। আমি তাঁকে একেবারে বৃদ্ধ অবস্থায়
দেখেছি। নজর দেওয়ানী, কয়েদ
আলী ফকিররাই আলীগাঁও গ্রামের পত্তন করেছিলো বললে অত্যুক্তি করা হবে না। নজর আলীর
স্ত্রীর নাম নসিমন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নজর আলীর বয়স ৯৫ বছর
এবং তাঁর স্ত্রী নসিমন নেসার ৭০ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম রমজান আলী, রুস্তম আলী, তোতা মিয়া, হামিদ আলী এবং মালঞ্চ খাতুন। রমজান
আলী-রমজান আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন । তিনি কিছু
কিছু ক্ষেত্রে কবিরাজি চিকিৎসাও করতেন। বিশেষ করে আমাদের অঞ্চলে কাউকে কুকুরে
কামড়ালে তিনিই চিকিৎসা করতেন। সমাজের মাতবরও ছিলেন তিনি। তিনি খুবই অমায়িক
ছিলেন। তাঁর একটি সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুক ছিলো। সেই বন্দুক নিয়ে একটি মুখরুচক
প্রবাদ প্রচলিত আছে। তিনি একদিন পাখী শিকার করতে গিয়েছিলেন। তবে, পাখী শিকার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন
কে একজন জিজ্ঞাসা করেছিলো- দেওয়ানী সাহেব, কোথায় গিয়েছিলেন?
তখন তিনি বলেছিলেন- পাখী শিকার করতে।
তখন লোকটি বলেছিলো- পাখী কই? পাখী পাননি ?
তখন রমজান দেওয়ানী বলেছিলো- পাখী
পেয়েছিলাম। গুলিও করেছিলাম। তবে,
তিন হাতের জন্য পাখীর গায় লাগেনি।
তাঁদের এই কথোপকথন আলীগাঁও অঞ্চলে অনেক
দিন মুখরুচক হিসাবে ব্যবহার হতো। কেউ কোনো কাজকরতে ব্যর্থ হলে বলতো- অল্পের জন্য
হয়নি, মাত্র তিন হাতের
জন্য।
রমজান দেওয়ানীর স্ত্রীর নাম খিরমন
নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে রমজান আলীর বয়স ৫২ এবং খিরমন নেসার ৪০
বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয়জন। চার ছেলে, পাঁচ মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রংমালা(তারাবানু), নয়নবানু, ফুলমতী, লালচান আলী, সদাগর
আলী, আয়সা খাতুন, মহর আলী, রজব আলী আহমেদ এবং রহিমা খাতুন। মেয়েরা গৃহিনী। মহর আলী দর্জি এবং
রজব আলী শিক্ষক। অন্যান্য ছেলেরা কৃষিকাজে নিয়োজিত ।
রুস্তম আলী-
রুস্তম আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। কিছু কবিরাজি চিকিৎসার
সাথেও জড়িত ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রীর নাম নবিরন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে রুস্তম আলীর বয়স ৪০ বছর এবং তাঁর স্ত্রী নবিরন নেসার ৩০ বছর। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চার জন। দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাধু মিয়া, আদরজান নেসা, কদরজান
নেসা এবং জিন্নত আলী। ছেলেরা কৃষিকাজে নিয়োজিত । সাধু মিয়া আমার সমবয়সী, আমার থেকে কিছুটা ছোট। তার সাথে আমার
সদ্ভাব ছিলো । তোতা মিয়া- তোতা মিয়া ছোট-খাটো এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। কৃষিকাজ
করতেন। তিনি সামাজিক লোক ছিলেন। সবার সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। আমার সাথে তাঁর
সদ্ভাব ছিলো। আমি তাঁকে মামা বলে ডাকতাম। তাঁর স্ত্রীর নাম রেজিয়া খাতুন। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে তোতা মিয়ার বয়স ৩৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী রেজিয়া খাতুনের ২২
বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রাবিয়া খাতুন, আফসের আলী, ওমর আলী এবং বাক্কার আলী।
কুকুরে কামড়ানোর ফলে আফসের আলী খেপে গিয়ে
১৯৯০ সালে অল্প বয়সেই মারা গিয়েছে।
কুকুরে কামড়ানো নিয়ে কিছু মন্তব্য
করা যেতে পারে। সেই কুকুরটি আফসেরের সাথে আরও কয়েকজনকে কামড়ে ছিলো । জইটার ভাগনে
এবং রথীন্দ্র রায়ের মেয়ে বুলবুলি এবং দানেশ মুন্সির একটি মহিষকেও কামড়ে ছিলো।
আমাদের অঞ্চলটা সহর থেকে অনেক দূরে ছিলো এবং যাতায়তের খুবই অসুবিধা ছিলো। তদুপরি
আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে লোক সচেতন ছিল না। তাই অনেক রোগে বিশেষ করে কুকুরে
কামড়ালে লোক কবিরাজি চিকিৎসার ওপড়েই নির্ভরশীল ছিলো। তখন কুকুরে কামড়ালে রমজান
দেওয়ানীই চিকিৎসা করতেন। এদের চিকিৎসাও রমজান দেওয়ানী করেছিলো। এমনকি মহিষটির
চিকিৎসাও রমাজন দেওয়ানী চিকিৎসা করেছিলো। তাঁর চিকিৎসার পরেও আফসের আলী, জইটার ভাগনে এবং দানেশ মুন্সির মহিষটি
মারা গিয়েছিলো। একমাত্র বুলবুলি বেঁচে গিয়েছিলো। তখন আমরা গবেষণা করে সিদ্ধান্তে
এসেছিলাম যে, কুকুরে
কামড়ানোর পরে বুলবুলিকে মাছ-মাংস,
শিম খেতে দেয়নি। এমনকি শিম গাছের তল দিয়েও যেতে দেয়নি। সেজন্যই
সম্ভবতঃ বুলবুলি বেচে গিয়েছিলো। বুলবুলি এখনও জীবিত।
আফসের এবং জইটার ভাগনে মাছ-মাংস
বাচ-বিচার করে খায়নি সেজন্যই সম্ভবতঃ তারা মারা গিয়েছিলো। তাই কুকুরে কামড়ালে
চিকিৎসার পাশাপাশি মাছ-মাংস এবং শিম বেচে খেতে হয়, তখন আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। সম্ভবতঃ আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক
ছিলো।
হামেদ আলী-হামেদ
আলী মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। সে কিছু লেখা-পড়া শিখেছিলো। সে একটু কৌতুকপ্রিয়
ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২১ বছর। সে বিয়ে করেছিলো
আলীগাঁয়ের ছেদুদের বোন আমেলা খাতুনকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয়জন। দুই ছেলে, সাত মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
রহিম বাদশ্বাহ, মমতাজ
বেগম, মর্জিনা খাতুন, জামাল উদ্দিন, হালিমন নেসা, বেলিয়া খাতুন, আলিয়া খাতুন, এলিজা খাতুন এবং আসিয়া খাতুন ।
মালঞ্চ নেসা-
মালঞ্চ নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তাঁর বিয়ে হয়েছে সারগাঁয়ের আসান আলীর
সাথে। তাঁদের সন্তানদের নাম যথাক্রমে বাদশাহ মিয়া, আনোয়ারা খাতুন, ময়না
খাতুন, জেহের আলী এবং
আশক আলী । আশক আলী ম্যাট্রিক পাস।
সৈয়দ গোলাম মোস্তফা-
গোলাম মোস্তফা লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। লম্বা সাদা দাড়ি ছিলো। খুবই সৌমা
দেখা যেত তাঁকে। তাঁর চেহেরা ঠিক নবাবদের মতো ছিলো। দেখলেই ভক্তিভাব উদয় হতো।
তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। বাংলা এবং আরবী খুব সাবলীলভাবে পড়তে পারতেন। তখনকার দিনে
শিক্ষিতলোকের খুবই অভাব ছিলো। চিঠি লেখা বা পড়ার জন্য লোক তালাশ করতে হতো। তখন
গোলাম মোস্তাফাই ছিলো একমাত্র ভরসা। তিনি মাঝে-মধ্যে মসজিদের ইমামতিও করতেন। তিনি
খুবই নম্র এবং ভদ্র ছিলেন। নিম্নস্বরে কথা বলতেন। সবার সাথে ভদ্র ব্যবহার করতেন।
তিনি বাড়ীতে ছেলে-মেয়েদের আরবী পড়াতেন।
আমি যে স্কুলে শিক্ষকতা করতাম, সেই স্কুলটি গোলাম মোস্তফার বাড়ীর
লাগোয়া ছিল। গোলাম মোস্তফার বাড়ীতে একটি জলফাই এবং কয়েকটা পিয়ারা গাছ ছিলো।
অবসরে(লেইজারে)র সময় ছাত্র-ছাত্রীরা সেই গাছের জলফাই এবং পিয়ারা পেরে খেত। এ
নিয়ে তাঁকে বা তাঁর পরিবারকে কোনোদিন কোনো ধরণের অভিযোগ করতে দেখিনি। বাড়ীতে কোনোদিন
উচ্চস্বরে কথাও বলতে শুনিনি।
গোলাম মোস্তফার স্ত্রীর নাম ছিল জিন্নত
বেগম। জিন্নত বেগম সারগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী সদু বেপারির বোন ছিলো। জিন্নত বেগমো
স্বাক্ষর ছিলেন। বাংলা এবং আরবী পড়তে পারতেন। তিনি খুবই নম্র এবং ভদ্র ছিলেন।
বাইরে বেরোলে বোর্খা পিন্ধে বেরোতেন। বাড়ীতে বোর্খা পরতেন না যদিও পর পুরুষে যাতে
মুখ না দেখে তার জন্য সদা সতর্ক হয়ে চলতেন। আমি অনেক দিন তাঁদের বাড়ীর কাছে
শিক্ষকতা করেছি, তবে, কোনোদিন তাঁর মুখ দেখিনি। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে, তিন
মেয়ে। ছেলের নাম নাসির উদ্দিন এবং ছোট মেয়ের নাম রহিমা খাতুন। বড় দুই মেয়ে
বয়সে আমার থেকে অনেক বড় ছিলো। তাঁদের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। তাই
তাঁদের তথ্য আমি সংগ্রহ করতে পারিনি।
নাসির উদ্দিন এবং রহিমা খাতুন বাবার
মতোই লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। তারা খুব নম্র এবং ভদ্র ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে গোলাম মোস্তফার বয়স ৫৫ বছর এবং তার স্ত্রী জিন্নত বেগমের বয়স ৪৫ বছর
ছিলো।
গোলাম মোস্তফা এবং তাঁর স্ত্রী অনেকদিন
আগে মারা গেছেন।
কয়েদ আলী ফকিরঃ-
কয়েদ আলী ফকির লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। মুখমন্ডলে সাদা লম্বা দাড়ি ছিলো।
চুলগুলি লম্বা লম্বা ছিলো। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে সুন্নত বাবরি চুল। তাঁর বাবার
নাম নিমাই সরকার। একবার নজর আলী দেওয়ানীদের বাড়ীতে লটারি (ভাগ্য পরীক্ষা)খেলা
অনুষ্ঠিত হয়েছিলো । নজর দেওয়ানীর বাড়ী এবং কয়েদ আলী ফকিরের বাড়ী পাশাপাশি
ছিলো। তখন সেই খেলায় কয়েদ আলী ফকির পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তখন তাঁকে আমি দেখেছিলাম। (প্রকাশ থাকে যে, সেই লটারি খেলায় আলীগাঁয়ের মেঘু মিয়ার স্ত্রী কাঞ্চনমালা একটি
বেঞ্জু পেয়েছিলো। বেঞ্জু পাওয়ার সুবাদে কাঞ্চনমালা নামটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখন
খুবই বিখ্যাত হয়েছিলো। কাঞ্চনমালা আমাদের ভগ্নীপতি নিলু মিয়ার ছোট ভাইয়ের বউ
ছিলো। আমি তাঁদের বাড়ী গিয়ে বেঞ্জুটা কিছুক্ষণের জন্য বাজিয়ে ছিলাম। খুবই
সুমধুর ছিলো সেই বেঞ্জুর সুর। একটি লটারি টিকেটের মূল্য ২৫ পয়সা করে ছিলো। সালটা
মনে হয় ১৯৬০ ছিলো।)
কয়েদ আলী ফকির খুবই গুণী লোক ছিলেন।
সমাজের মাতব্বরি করার পাশাপাশি তিনি কবিরাজিও করতেন। সন্তানহীনদের জন্য তিনি
ধন্বন্তরি স্বরূপ ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার ফলে অনেক সন্তানহীন দম্পতি সন্তান লাভ করতে
সক্ষম হয়েছিলো। তাঁর বড় মেয়ে ভায়েলা খাতুন বিয়ের অনেক বছর পরেও নিঃসন্তান
ছিলো। কয়েদ আলী ফকিরের চিকিৎসার ফলেই সে সন্তান লাভে সক্ষম হয়েছিলো।
কয়েদ আলী ফকিরের ছেলে-মেয়ে চারজন।
দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফৈজুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, ভায়েলা
খাতুন এবং জয়তন নেসা ।
ফৈজুদ্দিন-
ফৈজুদ্দিন লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁর ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। এক ছেলে, চার মেয়ে। ছেলের নাম আইনুদ্দিন এবং
মেয়েদের নাম যথাক্রমে উজালা খাতুন,
রমিসা খাতুন, ফুলমালা
খাতুন এবং বাতাসী নেসা। ছেলে-মেয়ের জন্মের পরে ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্থান
চলে গেছেন। পূর্ব পাকিস্থানে তাঁদের জমি ছিলো। সে জমি রক্ষণাবেক্ষনের জন্যই তিনি
পূর্ব পাকিস্থান চলে গিয়েছিলেন। সে অনেকদিন আগে মারা গেছে। তাঁর ছেলে-মেয়েরা
এখনও জীবিত।
কলিমুদ্দিন-
কলিমুদ্দিন লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি সমাজের মাতব্বরি
করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সিবারন নেসা। ১৯৫১ সালের এনআরসি অনুসারে কলিমুদ্দিনের
বয়স ৪৩ এবং সিবারন নেসার ২৮ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। দুই ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়েদের নাম যথাক্রমে কুলসুন নেসা, ভোলার মা এবং হামিদা খাতুন। ছেলেদের
নাম, হানিফ আলী এবং
সিদ্দিক আলী। বড় তিন মেয়ে ছোট থাকতে মারা গিয়েছিলো। তিন মেয়ে মারা যাওয়ার পরে
হানিফ আসীকে দত্তক নিয়েছিলেন। হানিফ আলী প্রাইমারীতে আমার সহপাঠী ছিলো।
হানিফ আলী-
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। তাঁর স্ত্রীর নাম কদবানু। মনিকপুড়ের
কানু মিয়ার মেয়ে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে করম আলী, আবুল হোসেন, হালিমন
নেসা এবং হামেলা খাতুন। করম আলী কৃষিকাজে নিয়োজিত। আবুল হোসেন ঔষধ ব্যবসায়ের
সাথে জড়িত। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
সিদ্দিক আলী-
সিদ্দিক আলী মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি মসজিদের ইমামতি করে।
সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের নেওয়াজ আলীর মেয়ে জরিনা খাতুনকে। তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে চান
মিয়া, রাকিবুল ইসলাম, সানিদুল ইসলাম, বাসিরন নেসা এবং আসিয়া খাতুন । চান
মিয়া এবং সানিদুল ইসলাম গডরেজ নির্মাণ কারখানার সাথে জড়িত। রাকিবুল ইসলাম দর্জি।
মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
ভায়েলা খাতুন-
ভায়েলা খাতুনের বিবরণ মতিয়ার রহমানের পরিয়ালে দেওয়া হয়েছে।
জয়তন নেসা- জয়তন নেসা লম্বা এবং
ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের মৈজুদ্দিনের ছেলে হাসেন আলী মুন্সির সাথে। জয়তন
নেসা খুবই অমায়িক এবং মিস্টভাষী ছিলেন। হাসেন মুন্সি মসজিদের ইমামতি করতেন। তিনি
লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। ছোট ছোট করে কথা বলতেন এবং খুবই অমায়িক ছিলেন। তাঁর
ইমামতিতে অনেক দিন নামাজ পড়েছি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হাসেন মুন্সির
বয়স ৫৫ বছর এবং জয়তন নেসার ৪০ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে আঠজন। পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
সাকায়েত হোসেন, হাজেরা
খাতুন, মোজাম্মেল হক, আনোয়ার হোসেন, দলার মা, আমিনা খাতুন, জমির
হোসেন এবং জয়নাল আবদিন। সাকায়েত হোসেন আমার সহপাঠী ছিলো। সে শিক্ষকতা বৃত্তির
সাথে জড়িত ছিলো। ২০১৫ সালে অবসর নিয়েছে। মোজাম্মেল হক কৃষিকাজের সাথে জড়িত।
আনোয়ার হোসেন দর্জি। জমির হোসেন টিভি মেকানিক। জয়নাল আবদিন ব্যবসায়ী।
হাসেন মুন্সি ২০০৯ সালে এবং জয়তন নেসা
২০২১ সালে মারা গেছে।
ভোলাই সেখ- ভোলাই শেখকে
আমি দেখিনি। তবে, নাম
শুনেছি। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো সুয়াগি নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সুয়াগি নেসার বয়স ছিলো ৫০ বছর। ভোলাই দম্পতির ছেলে-মেয়ে ছিলো পাঁচজন। তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
হাকিমুদ্দিন, জিলিমন
নেসা, জলিমন নেসা, আকবর মল্লিক, তারাবানু এবং কছিমুদ্দিন। ভোলাই শেখের
বাড়ীর পাশে একটি হিজল গাছ ছিলো। সে গাছের গোঁড়ায় পূজো দিলে অর্থাৎ তেল-সেন্দুর, বাতাসা দিলে লোকের মনোবাসনা পূরণ হতো
বলে প্রবাদ প্রচলিত ছিলো। তাই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে সেই গাছের গোঁড়ায়
পূজো দিতো।
হাকিমুদ্দিন-
হাকিমুদ্দিন লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। নিরক্ষর ছিলেন। তবু
লোকের সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন হাজেরন নেসাকে। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে হাকিমুদ্দিনের বয়স ২৮ বছর এবং তাঁর স্ত্রী হাজেরন নেসার ২২
বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের নাম আফসের আলী এবং কাজুলি খাতুন। আফসের আলী কৃষিকাজে
নিয়োজিত। আকবর মল্লিক- আকবর মল্লিক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি খুবই
মেধাবী ছিলেন। মেধাবি বলে অঞ্চলটিতে তাঁর বিশেষ সুনাম ছিলো। হঠাৎ তাঁর মৃগি রোগ
হয় এবং তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তিনি লেখা-পড়া ছেড়ে দেন। একদিন
প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিলো। ফলে তাঁদের বাড়ী থেকে একটু দূরেই রাস্তার অপেক্ষাকৃত
নিচু জায়গায় জল জমেছিলো। মৃগি রোগ উঠে বিয়ে-থা করার আগেই ১৯৬০ সালে তিনি সেই
বৃষ্টির জলে পড়ে মারা গিয়েছিলো। তিনি বৃষ্টির জলে উপুড় হয়ে পড়েছিলেন।
অন্যান্যদের সাথে আমিও তাঁকে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিলাম।
তারাবানু-
তারাবানু মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলী গাঁয়ের
জহুরুদ্দিনের ছেলে হায়েত আলীর সাথে। আমি তাঁদের বিয়েতে উকিল হয়েছিলাম। আমি ছোট
ছিলাম বলে তিনি আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। জানিনা কি কারণে, বিয়ের কিছুদিন পরেই তিনি ফাঁসিতে ঝুলে
আত্মহত্যা করেছিলেন। জলিমন নেসা- জিলিমন নেসা লম্বা এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে
হয়েছিলো আলীগাঁয়ের জেহের আলীর ছেলে খইমুদ্দিনের সাথে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে খইমুদ্দিনের বয়স ৪৫ বছর এবং জিলিমনের ৩০ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন।
দুই ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে বসিরন নেসা, আছিরন নেসা, সূর্যবানু, শাজিরন নেসা, জলু মুদ্দিন এবং আব্দুস সামাদ। আব্দুস
সামাদ আমার ছাত্র ছিলো। সে বর্তমান দর্জিকাজ করে।
জলিমন নেসা-
জলিমন নেসা লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের দরবার আলীর ছেলে
মুলামদি শেখের সাথে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মুলামদি শেখের বয়স ৩৬ বছর
এবং জলিমন নেসার ২৫ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জবান
আলী, জয়ধর আলী, আমিরন নেসা, শাজামাল হক, নুর জামাল এবং শাইজুদ্দিন। আমার চাচাত
বোন মহেলা খাতুনের বিয়ে হয়েছে জবান আলীর সাথে। তারা এখন কৃষ্ণাই থাকে।
কছিমুদ্দিন-
লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি ব্যবসা করতেন। তিনি আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী
ব্যবসায়ী দানেজ মুন্সির ভাগনে ৷ তাঁর সাথেই ব্যবসা করতেন। খুবই সৎ এবং গম্ভীর
প্রকৃতির লোক ছিলেন তিনি। সবার সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম কদরজান
নেসা। কদরজান নেসা আলীগাঁয়ের কব্দুল আলীর মেয়ে। কছিমুদ্দিন দম্পতির ছেলে-মেয়ে
নয়জন। পাঁচ ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে নয়ন বানু, সোনা বানু, জরিনা
খাতুন, সামসুন নেহার, জিয়ারুল হক, জহুরুল ইসলাম, ফরিজুল হক, সফিকুল ইসলাম এবং আমজাদ আলী।
নয়ন বানুর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁও
নিবাসী দিদার মুন্সির ছেলে আলাল উদ্দিনের সাথে। নয়ন বানু অষ্টম শ্রেণী উত্তীর্ণ।
সোনা বানুর বিয়ে হয়েছে সত্রকনরা গাঁয়ের ইলাহি বক্সের ছেলে ইমান আলীর সাথে।
জরিনা খাতুনের বিয়ে হয়েছে বাঘবরের নুরু মিয়ার ছেলে ফজল হকের সাথে। চতুর্থ কন্যা
সামসুন নেহারের বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের হোসেন মল্লিকের ছেলে তালেবর রহমানের সাথে।
জিয়ারুল হক এবং এবং ফরিজুল হক গুয়াহাটিতে দর্জি কাজে নিয়োজিত। জহুরুল ইসলাম কৃষিজীবী।
সফিকুল ইসলাম এম, এ, বি,এড, ডিএলএড
উত্তীর্ণ। সে মিলিজুলির ব্যক্তিগত খন্ডের কলেজ ‘ইডেন গার্ডেন অ্যাকাডেমিতে অধ্যাপনা করে। সফিকুল ইসলাম কুজারপীঠের
আবু তাহেরের মেয়ে শাহমিন ফারজিনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।
যাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে
তোলে ধরলাম, তাঁদের
বাহিরেও আলীগাঁও এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে অনেক গণ্য-মান্য লোক ছিলো। যেমন ফজর আলী
মাস্টার, হাসেন আলী
মুন্সি, আব্দুল আজিজ
সরকার, আব্দুল হামিদ
ডাক্তার, গুতু দেওয়ানী, সোবাহান দেওয়ানী, জিগির মুন্সি, আব্দুল হালিম মাস্টার, এলাহি বক্স, আলম খান প্রভৃতি। সারগাঁয়ে ছিলো
বালাচান বেপারি, সদু
বেপারি। সুঁতিরপাড়ে হোসেন বয়াতী,
মনিরুদ্দিন মাস্টার। মাণিকপুড়ে ওমর আলি দেওয়ানী, আজাহার আলী, আক্কেস গাঁওবুড়া প্রভৃতি। সবার বিষয়ে
এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে লেখা সম্ভব হল না। গ্রন্থটি পাঠকের সমাদর পেলে পরবর্তী পর্যায়ে
তাঁদের বিষয়ে লেখার আশা রইল ।
সমাপ্ত
ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা
মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
সূচীপত্র
আমাদের পাড়াটা
আমাদের দক্ষিণের পাড়া
আমাদের উত্তর পাড়া (বগুড়া পাড়া)
চরপাড়া
আলীগাওঁ
নিবেদন
আমি কেন
ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিখলাম?
স্বনামধন্য বিখ্যাত মনীষীদের জীবনী
সবাই লেখে, কিন্তু যারা আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এই সমাজ
গঢ়েছে, যাদের কৃপাছায়ায় আমরা বড় হয়েছি, তাঁদের বিষয়ে
আমরা ছাড়া আর কেউ লিখবে না জানি। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, তাঁরাও
এই মাটির পৃথিবীর মানুষ-- সমাজের অংশ। তাঁরা আমাদের সমাজের জন্য অনেক কিছু করেছে।
তাঁরা সমাজ পরিচালনা করেছে—আইন শৃংখলা বর্তিয়ে রেখেছে।
ছেলে-মেয়েদের জ্ঞানার্জনের জন্য স্কুল-কলেজ স্থাপন করেছে। আমাদের অভাব পূরণের
জন্য তাঁরা হাজারটা প্রয়াস করেছে। তবে হ্যা, তাঁরা সারা বিশ্বের
নজর কাঢ়বার মতো কোনো কাজ করেনি। তাই তাঁদের জীবনী লেখবার তাগিদা কেউ অনুভব করেনি
এবং মনে হয়, ভবিষ্যতেও কেউ করবে না। ফলে এরাঁ কালে কালে
বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে-- সমাজের কাছ থেকে তো বটেই, নিজেদের
উত্তর পুরুষের কাছ থেকেও । নিজেদের বংশবৃক্ষের প্রয়োজন যে কত, সে
কথা ২০১৪ সালে এনআরসির ফর্ম পূরণ করার সময় নিশ্চয় সবাই অনুভব করেছে। তাই সমাজ
গঢ়ার অখ্যাত কারিগরদের স্মৃতি সজীব করে রাখার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। এই
ক্ষুদ্র বইয়ে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, অনেক স্বনামধন্য
ব্যক্তির পরিচয় লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হল না ৷ তাই তাঁদের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা
করছি। বইটি পাঠকের সমাদর পেলে পরবর্তীতে তাঁদের পরিচয় লেখার প্রয়াস করব। বইটি
প্রস্তুত করতে মজিবর রহমান, আবু বাক্কার সিদ্দিক, আমার
ছোট ভাই হোসেন আলী এবং অনেকের সহায়-সহযোগিতা পেয়েছি। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ
হয়ে রইলাম। বইটিতে রয়ে যাওয়া ভুল- ত্রুটি এবং তথ্য বিভ্রাটের জন্য সদাশয়
পাঠকের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ভুল-ত্রুটিগুলি আমার দৃষ্টিগোচর করলে আমি
কৃতার্থ হব।
বিনত আবুল হোসেইন
যতিগাঁও, বরপেটা, আসাম।
মোবাইল নম্বর- ৭০০২১-১২০১২
ছেলেবেলা সান্নিধ্যে আসা মুরব্বীদের
সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আমাদের পাড়াটা
আমাদের গ্রামের প্রকৃত নাম ছিল
জাহানাপাড়। কিন্তু বাইরের লোকেরা দেউলদি বলে জানত। দেউলদি মানে পূব দেউলদি।
আমাদের গ্রামটা বেকি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। বেকি নদীর দু'পাড়ে
দুটি গ্রাম ছিলো। আমাদের গ্রামটা বেকি নদীর পূব পাড়ে অবস্থিত ছিল। তাই নাম
হয়েছিল পূব দেউলদি। বেকি নদীর পশ্চিম পাড়ে আর একটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের নাম
ছিল পশ্চিম দেউলদি। আমাদের গ্রামের নাম পূর্বে পূব বালিকুরিও ছিল। পরে পূব দেউলদি
এবং পূব দেউলদির পরে জাহানারপাড় হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫৮ সালের ২৫
সেপ্টেম্বরে সরকার প্রথম জমি জরিপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। তখনই পর্যায়ক্রমে
অনেক নতুন গ্রাম সৃষ্টি করা হয়েছিলো। লাট মণ্ডলেরা তখন নতুন গ্রামগুলির নাম বিশেষ
পরিবেশ এবং বিশেষত্বের ওপড় নির্ভর করে নিজেদের সুবিধা মতো রেখেছিল। জাহানারপাড়ের
কাছেই ছিল জাহানা বিল। তাই সম্ভবতঃ আমাদের গ্রামের নতুন নামকরণ জাহানারপাড় করা
হয়েছিল। জাহানা বিলের পাড়ে অবস্থিত গ্রামটার নামকরণ করা হয়েছিল জাহানার ঘোলা।
নতুন নামগুলি অনেকে এখনও জানেনা। তাই বাইরের লোকেরাঁ সমগ্র অঞ্চলটাকে পূব দেউলদি
নামেই জানে। আমাদের গ্রামটা আসামের বরপেটা জেলার বাঘবর অঞ্চলে অবস্থিত।
জাহানারপাড় একটি হতদরিদ্র গ্রাম।
গ্রামের মানুষগুলো কৃষিজীবী। অশিক্ষিত। বাইরের বিশ্বের সাথে পরিচয় নাই বললেই চলে।
গ্রামের তিনদিকে জল। উত্তর দিকে বেকি নদী। দক্ষিণে জাহানা বিল। জাহানা বিল মাছের
জন্য খুবই বিখ্যাত ছিল। ইজারদাররা ডাকে নিয়ে মাছ ধরত। জাহানা বিলের দক্ষিণে
রামাপারা, দলাগাঁও পারি দিয়ে গেলে ব্রহ্মপুত্র নদ। ব্রহ্মপুত্র নদীকে লোকে
ব্রহ্মার পুত্র বলে জানে। তাই ব্রহ্মপুত্রকে নদী না বলে নদ বলে। জাহানারপাড় থেকে
জাহানা বিল এক মাইল দুরে অবস্থিত। জাহানা বিল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ এক সময় প্রায়
মাইল দু'য়েক দূরে অবস্থিত ছিলো। উত্তর দিকে বেকি নদী এক মাইল দূরে। গ্রামের
পূর্বদিকে বাঘবর পাহাড়। গ্রামথেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে। বাঘবর পাহাড় ৫২ খাদা
জমির উপড়ে বিস্তারিত বলে ছোট বেলা শুনেছি। (এক খাদায় ১৬ বিঘা।) বাঘবর পাহাড়ের
উত্তব-পূব প্রান্তে বাঘেশ্বরী থান। থানটা খুবই বিখ্যাত। থানটা কমতাপুড়ের রাজা
আরিমত্তই নির্মাণ করেছিলো বলে জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। গ্রামের পশ্চিম দিকে বেকি,
শেওরার পাথার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের সংগম স্থল। জাহানার পাড়ের চার
দিকে কয়েকটা গ্রাম আছে। দক্ষিণ দিকে জাহানার ঘোলা। ঠিক জাহানা বিলের পাড়ে। উত্তর
দিকে রৌমারী এবং বালাজান গ্রাম। জাহানারপাড়, জাহানার ঘোলা,
রৌমারী, বালাজান, মরাভাজ, বাঘবর
প্রভৃতি গ্রামগুলি নিন্ম জলাভূমি এবং বেকি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত। তাই
বৎসরের কয়েক মাস জলের তলে থাকত । প্রায় চার পাঁচ মাস। জ্যৈষ্ঠের শেষ দিক থেকে
কার্তিকের আগ পর্যন্ত। আমাদের লাগোয়া গ্রাম বাঘবর পাথারের জালাল উদ্দিন আহমেদ
১৯৬৭ এবং ১৯৭১ সালে বাঘবর বিধানসভা সমষ্টির বিধায়ক হয়েছিলেন। একবার বন্যা
সম্পর্কে বিধানসভায় কথা উঠায় তিনি বলেছিলেন- আমার সমষ্টির কথা আর কি বলব,
অধ্যক্ষ মহাশয় । সরভোগ,বরপেটা, জনীয়া, ছেঙা
এইসকল সমষ্টির সব জল আমার সমষ্টি দিয়ে গড়ায়। এখন আপনি নিজেই অনুমান করুন আমার
বাঘবর সমষ্টির বন্যার পরিস্থিতি সম্পর্কে।
জালাল উদ্দিন সাহেব কথাটা যথার্থই
বলেছিলেন। বর্ষায় আমাদের গ্রামের বাড়ীগুলি কচুরি পানার মত ভাসতো। হাঁসেরা সাঁতার
কাটতো মনের আনন্দে । হ্যাজাক লাইট দিয়ে মাছ ধরতো জল কমে গেলে। রাতের বেলা হ্যাজাক
লাইটগুলি শারী শারী জোনাকি পোকার মতন চলাফেরা করতো। হ্যাজাকের সংখ্যা বেশি হলে
ফুলের মালার মত দেখা যেতো। গ্রামের বৃদ্ধ বণিতা, জী-বৌয়েরা সেই
দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগ করত প্রাণ ভরে। আমাদের কাকা ভেলু মিয়াও হ্যাজাক লাইট
জ্বালিয়ে মাছ ধরত। আলীগাঁয়ের এলাহি বক্সেরও হ্যাজাক দিয়ে মাছ ধরার নেশা ছিল।
এলাহি বক্স আমার কাকীর মামাত ভাই। সে মাজে-মধ্যে আমাদের বাড়ীতে গিয়ে কাকার সাথে মাছ ধরতে
যেত। একদিন তারা অনেক মাছ ধরেছিল। বলতে পারেন নৌকার খোল ভর্তি ।
আমাদের বাবা মিঠু মিয়া হ্যাজাক দিয়ে
মাছ ধরত না। সে মাছ ধরত দোয়াড়ি দিয়ে। কাকা মাজে-মধ্যে দাঁওন দিয়েও মাছ ধরত।
দাঁওন দুই প্রকারের ছিল। একটাকে বলত উরা দাঁওন এবং আরেকটাকে বলত ডুবা দাঁওন। উরা
দাঁওন পানীর ওপরে রশি টানিয়ে সেই রশিতে বরশী বেধে বরশীর মুখে মাছ গেঁথে দিত এবং
ডুবা দাঁওনে রশীর সাথে বরশি বেধে বরশির মুখে কেঁচু বা মাছ গেঁথে পানীর তলে ডুবিয়ে
দিত। উরা দাঁওনে বোয়াল মাছই ধরত বেশি। ডুবা দাঁওনে নানা রকম মাছ ধরত। পানী কম
থাকলে আমিও বাড়ীর কাছে উরা এবং ডুবা দুই ধরণের দাঁওনই দিতাম। এই কাজে আমাদের দাদী
বাহারজান নেসা আমাকে সাহায্য করত। আমাদের বাড়ীর সামনে এবং পেছনে দুটি ডোবা ছিল।
সেখানে চুঙা পেতেও মাছ ধরতাম। সন্ধ্যে বেলা চুঙাজলে ডুবিয়ে দিয়ে আসতাম এবং সকাল
বেলা সেই চুঙা তুলে আনতাম। চুঙা ভর্তি হয়ে মাছ থাকত ৷ বিশেষ করে জিওল মাছ।
আমাদের পাড়ার বাড়ীগুলি ফাঁক ফাঁক
ছিল। ছামের মাথায় মাথায়। প্রায় বিশ পঁচিশটা পরিয়াল বাস করত আমাদের পাড়ায়।
একমাত্র যদু মুন্সি ও মাতাব আলী মুন্সির বাইরে সবাই নিরক্ষর ছিলো। পাড়ার সবার
সাথে সবার সৌহৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। আমোদ-প্রমোদের কোনো সাধন ছিলনা, তাই
সন্ধ্যেবেলা ভাত খেয়ে একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যেতো। অনেক রাত অবধি গল্প-গুজব
করতো। এতে সম্পর্ক আরও নিবিড় হতো। আগেই বলেছি আমাদের পাড়াটা বছরের বেশির ভাগ
সময় জলের তলে থাকতো, তাই বর্ষায় নৌকা ছাড়া চলার কোনো সাধন ছিল না।
সবার আবার নৌকাও ছিল না। নৌকা থাকলেও বাওয়ার সমস্যার জন্য সবাই নৌকা নিয়ে হাটে
যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই হাটবারগুলোতে যারা নৌকা নিয়ে আগে বেরোত তাঁরাই পাড়ার
লোকদের ডেকে ডেকে নৌকায় তুলে হাটে নিয়ে যেতো। ঝঞ্জা হলে ঘর-দুয়ার ঠিক আছে কিনা
ডেকে ডেকে একে অপরের খবর নিতো।
আমাদের বাড়ি থেকে বাঘবর পাহাড় পূব
দিকে ছিলো। বাঘবর বরপেটা জেলার একমাত্র পাহাড়। বাঘবর পাহাড়ের পাদদেশে বাঘবর
থানা। ১৯৫৭ সালে স্থাপিত। বিষ্ণুরাম মেধি গৃহমন্ত্রী থাকাকালীন থানাটা স্থাপন করা
হয়েছিল। আমি নিজে থানার ঘরগুলো বানাতে দেখেছি, মা অথবা দাদীর
সাথে মামাদের বাড়ী যাওয়ার সময়।
প্রথমে বুধবারে হাট বসত বাঘবর পাহাড়ের
পাদদেশে। থানার কাছে। সেখানে থানার পুলিসরা মাঝে- মধ্যে তরু-তরকারি কিনে পয়সা দিত
না। তাই একদিন সেই পয়সা নিয়ে গণ্ডগোল হয় এবং হাট থানার নিকট থেকে স্থানান্তর
করে পূর্বদিকে কিছুদূরে মাথাউরির দক্ষিণ পাশে বসায়। তখন কেশব চৌধুরী, উপেন
পাটোয়ারী এবং রামেশ্বর গাঁওবুড়ারাঁ বাঘবরের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।
এখন বাঘবর পাহাড়ের চার দিকে বসতি।
রামাপাড়া, ধলাগাঁও, জাহানারপাড়,
রৌমারি, সুতিরপাড়, আলীগাঁও প্রভৃতি
গ্রাম ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পরার ফলে লোকগুলো উঠে এসে বাঘবর পাহাড়ের
চারদিকে বসতি করেছে। আগে বাঘবর পাহাড়ের পূর্ব এবং দক্ষিণ দিকে অসমীয়া হিন্দু
প্রধান গ্রাম ছিলো এবং উত্তর দিকে কয়েক ঘর বড়ো লোক ছিলো। বাঘেশ্বরী থান থেকে
পূর্ব এবং উত্তর দিকে বিস্তৃত ছিলো গোবিন্দপুড় রিজার্ভ । গোবিন্দপুড় রিজার্ভে
বাঘ ছিলো। আলীরপামের তমছেরকে গোবিন্দপুর রিজার্ভে বাঘে মেরে ছিলো। একবার বাঘবরের
লেম্প কাছাড়ি বন্দুক দিয়ে গুলী করে একটি বাঘ মেরেছিলো। বাঘটা বাঘবর থানার সামনে
বিশেষ প্রকারে বেধে খাড়া করে রেখেছিলো। সেই বাঘটি আমিও দেখেছিলাম। বাঘবর পাহাড়ের
পশ্চিম দিকে তখন কোনো বসতি ছিল না। আমাদের বাড়ি থেকে বাঘবর যেতে হলে একটি সুনসান প্রান্তর
পাড়ি দিয়ে যেতে হত। একা যেতে গা ছমছম করতো। বাঘবর পাহাড়ে বাঘ ছিলো বলে গুজব
ছিলো। অবশ্য কেউ কোনোদিন বাঘ দেখেছে এ রকম কথা সুনিনি। তবে, একবার দাদীর
সাথে আলীগাঁও যাওয়ার সময় শিয়াল দেখেই বাঘ বলে ভেবে ভয়ে ভয়ে বাঘবর থানা
পর্যন্ত গিয়েছিলাম।
গোবিন্দপুর রিজার্ভ থেকে মাঝে-মধ্যে
জংলা মহিষ আমাদের গ্রামে গিয়ে ফসল খেয়ে অনেক ফসল অনিষ্ট করতো। তাই মহিষ তাড়ানোর
জন্য প্রায় সবার বাড়িতে ফালা থাকতো। মাঝে-মধ্যে দিনের বেলাতেই আমাদের গ্রামে
বাঘবর পাহাড় থেকে জংলী যেত। একদিন সকাল বেলা এক পাল জংলী গিয়েছিল আমাদের পাড়ায়।
আমি তখন খুবই ছোট। কোনোদিন জংলী দেখিনি তাই এন্দুর ভেবে দাদীকে ডেকে বলেছিলাম- দেখ
দেখ, দাদী, কত বড় বড় এন্দুর এসেছে। দাদী বাইরে বেড়িয়া
এসে বলেছিলো- ওগুলো এন্দুর নয়, জংলী। বাঘবর পাহাড় থেকে এসেছে।
গ্রামের প্রধান ফসল ছিলো চিনাধান এবং
রবিশস্য- গম, সরিষা, মাসকালাই, ধইনা, তিল,
তিসি প্রভৃতি । কৃষকরা ধান অবশ্যে বপন করত; তবে, একটু
আগ মরশুমে বর্ষা হলেই সেই ধান জলে তলিয়ে যেত। তাই কৃষকেরা ধানের থেকে রবিশস্যের
ওপড়েই অধিক নির্ভরশীল ছিল। যাদের মাটি-বৃত্তি কম তারা বর্ষার মরশুমে অন্য গ্রামে
গিয়ে কামলা বেচত। আর যাদের অৱস্থা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ছিল তারা বাড়িতেই থাকত এবং
ছেলে-পিলে নিয়ে হই হুল্লোড় করে দিন কাটাত।
আমাদের পাড়াটা কারিকর পাড়া নামে
পরিচিত ছিল। কারণ পাড়াটায় কারিকর সম্প্রদায়ের লোক বাস করত । দুই চারটি বাড়ীতে
কাপড় বুনত, বিশেষ করে বর্ষার মরশুমে— - কৃষিকর্ম
না থাকলে। সে জন্যে তাঁতের খট্ খট্ শব্দও শুনা যেত সেই হই-হুল্লোড়ের মধ্যে । আমার
বাবাও বর্ষার মরশুমে কাপড় বুনত। এম, ই স্কুলে পড়া অবস্থায় গ্রীষ্মের
ছুটিতে বাড়ি গেলে আমিও কাপড় বুনতাম বাবা বাড়ী নাথাকলে। খুবই ভাল লাগত কাপড়
বুনে।
আমাদের পাড়ার লোকগুলো সারা বর্ষাই
জলের মধ্যে বাস করত, অথচ তাদের খাবার জলের ব্যবস্থা ছিল না।
বর্ষাকালে বানের জল খেত এবং খরা মরশুমে মাটিতে কুয়া খুঁড়ে জল তুলত। জলের অভাব
দূর করার জন্য আমাদের নানা ধনাই হাজি ১৯৬০ সালে আমাদের বাড়ীতে একটি ইদারা গেঁথে
দিয়েছিল। আলীগাঁয়ের বিনোদ মুন্সী সেই ইদারা গেঁথে ছিল। আমাদের পাড়ায় ছনের ছোট
একটি মসজিদ গৃহ। মসজিদের বাইরে অন্য কোনো অনুষ্ঠান ছিলনা আমাদের পাড়ায়। ঈদের
নামাজ পড়ার জন্য আমাদের কোনো ঈদগাহ ছিল না। মসজিদের সামনে যে ছোট এক টুকরো ছোট
জমি ছিল সেখানেই ঈদের নামাজ পড়া হতো। বর্ষায় সেই জমি টুকু বন্যার জলে তলিয়ে
গেলে যদু জেঠার বাড়িতে ঈদের নামাজ পড়া হতো। অবশ্যে এক বছর আমাদের উত্তর পাড়ার
গুমান হাজি সাহেবদের মসজিদের মাঠেও ঈদের নামাজ পড়েছিলাম। পরে অবশ্যে আঞ্চলিক
মুরব্বীরা মিলে বাঘবর পাথারের উত্তর পূর্ব প্রান্তে দানেশ মুন্সির ভাতিজা ইয়াদ
আলীর বাড়ীর কাছে একটি ঈদগাহের ব্যবস্থা করেছিলো। সেখানেই পরে আমরা দুই ঈদের নামাজ
পড়েছি।
আমাদের পাড়াটার একটা রেকর্ড ছিলো।
বাঘবর থানার কাছে হলেও কোনোদিন কারো নামে কোনো কেস হয়নি। অর্থাৎ কেউ কোনো
অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়নি।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
জাহানারপাড় গ্রামে মোট পরিয়ালের সংখ্যা ছিলো ২৪৬ এবং ভোটার ছিলো ৭১১ জন। আমাদের
পাড়ায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিলো ৬১ জন।
আমি প্রথমে পাখির চোখে ভোটার তালিকা
অনুসারে আমাদের পাড়ার যারা আমাকে কোলে পিঠে নিয়েছে ও আদর-সোহাগ করেছে তেমন
মুরব্বীদের বিষয়ে এবং পরে গ্রামের অন্যান্য মুরব্বীদের বর্ণনা দেওয়ার প্রয়াস
করবো-
মকবুল শ্বেখঃ-
ভোটার তালিকা অনুসারে আমাদের পাড়ার প্রথম ভোটার ছিলো মকবুল শেখ। তিনি মাঝারি
গঠনের ছিলেন এবং গাত্রের রং কালো ছিলো। মকবুল শেখের বাবার নাম ছিলো মুছা শেখ।
মকবুল শ্বেখ আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা ছিলেন। আমার জেঠির নাম ছিলো শুভক্ষন নেছা।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মকবুল শ্বেখের বয়স ৪৯ বছর এবং জেঠির বয়স ৩৫ বছর
ছিলো। মকবুল শ্বেখ একটু গোয়ার প্রকৃতির লোক ছিলেন। কাউকে তেমন তোয়াক্কা করতেন
না। নিজের খেয়াল-খুশি মতে চলতেন। কারো সাথে তেমন মেলা-মেশাও করতেন না। বাড়িতে
গেলে অবশ্যে খাতির করতেন । তিনি কৌতুকপ্রিয় লোক ছিলেন।
বাঘবর থানাটা নদীর অববাহিকা অঞ্চলে
অবস্থিত ছিলো। তাই বর্ষার মরশুমে ভাড়ায় নৌকা নিতো। আমাদের একটি ৩২ হাত নৌকা
ছিলো। আমাদের নৌকাটা কোনো কোনো বছর থানা থেকে ভাড়ায় নিতো। মকবুল জেঠা কিছুদিন
সেই নৌকায় ছিলো। একদিন জেঠার কাছে গিয়ে বসতে তিনি বলছিলেন, কাছিমের
মাংস দেখতে খুবই সুন্দর- লাল টুকটুকে।
কোথায় দেখেছ, জেঠা? আমি
প্রশ্ন করেছিলাম।
জেঠা উত্তরে বলেছিলো- থানায় দেখেছি।
বাবুরা খায়।
বাবুরা কি নিজেরাই রান্না করে খায়
না-কি?
না, আমি রেধে দিই।
আমি কৌতুক করে বলেছিলাম- তাহলে একটু
চেখে দেখতে পারলে না।
মকবুল শ্বেখ বলেছিল- একেবারে চেখে
দেখিনি বলাটা ঠিক হবে না। তরকারির লবণ চাখার সময় জোল চেখে দেখেছি। জোল খুবই সুস্বাদু
হয়েছিলো। মাংসটা মনে হয় আরও সুস্বাদ লাগতো। ধর্মে বাধা আছেতো, তাই
মাংসটা খাইনি।
এমনই ছিলো আমাদের মকবুল জেঠা। কোনো
লুকটাক করে কথা বলতেন না ।
আমাদের জেঠি শুভক্ষন নেসা খুবই
শান্তিপ্রিয় এবং সরল সহজ ছিলো। জেঠির শরীরের রং কালো এবং একটু খাটো গঠনের ছিলেন।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। তিন ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল বারেক, ইয়াকুব আলী, খতেমন নেসা,
হাসেন আলী এবং রহম আলী।
আমাদের পাড়াটা ব্রহ্মপুত্র নদের
ভাঙনের কবলে পরেছিলো আশীর দশকের শেষ ভাগে। নদী ভাঙনের ফলে আমাদের পাড়ার বেশি
সংখ্যক পরিয়াল বাঘবর পাথারে স্থানান্তর হয়েছিলাম। মকবুল জেঠা মরাভাজ গ্রামে উঠে
গিয়েছিলেন। তাই পরে তেমন যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। তাই কে কখন মৃত্যু বরণ করেছে
সঠিক করে বলা সম্ভব হল না। অবশ্যে জেঠা-জেঠি উভয়ে অনেক দিন আগেই মৃত্যু বরণ
করেছে।
আব্দুল বারেক-
আব্দুল বারেক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি লম্বা ছিপছিপে এবং শরীরের রং কালো।
আমার থেকে তিন/চার বছরের বড়। আমারা কাদং হাইস্কুলে একসাথে লেখা-পড়া করেছি। তিনি
আমার থেকে তিন ক্লাস ওপড়ে ছিলো। তিনি ২০১০ সালে অবসর নিয়েছেন। ২০১২ সালে
হজ্বযাত্রা করেছিলেন। স্বভাব অমায়িক। শিক্ষক হলেও তেমন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত
নয়। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে। তাঁর স্ত্রীর নাম আম্বিয়া খাতুন। আলীগাঁয়ের
বিনোদ মুন্সির মেয়ে। খুবই নম্র স্বভাবের। তাঁদের চার ছেলে, দুই মেয়ে।
ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে আমজাদ আলী, ইমান আলী, বাহারুল ইসলাম,
নুরজাহান বেগম, রেহেনা খাতুন, আনোয়ার হোসেন,
এবং মহিবুল হক। আমজাদ আলী অধিবক্তা, বরপেটা কোর্টে
উকালতি ব্যবসায়ে নিয়োজিত। ইমান আলী বি, এ, পাস। ব্যবসায়ে
নিয়োজিত। বাহারুল ইসলাম বি, এ পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত। নুরজাহান
বেগম বি, এ পাস। বিয়ে হয়েছে নওকুসির শফিকুলের সাথে। শ্বফিকুল ইসলাম
হাইস্কুলের শিক্ষক। রেহেনা বেগম বি,এসসি। তার বিয়ে হয়েছে নিজ বাঘবরের
আব্বাস আলীর সাথে। আব্বাস আলী বিএসসি পাস। সে টেট উত্তীর্ণ শিক্ষক। রেহেনা খাতুন
প্রাইভেট স্কুলের বিএসসি শিক্ষক। আনোয়ার হোসেন হায়ার সেকেন্ডারি উত্তীর্ণ। সে
ভারতীয় সেনা বাহিনীতে কর্মরত। মহিবুল ইসলাম বি, এ পাস। সে আসাম পুলিশে
কর্মরত।
ইয়াকুব আলী-
মাজু ছেলে ইয়াকুব আলী মাঝারি গঠনের এবং গাত্রের রং কালো ছিলো। সে লেখাপড়া
শেখেনি। তাই বাড়িতেই চাষ-আবাদ করতো। সে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের হুটু মিয়ার
মেয়ে বাহারজান নেসাকে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে
রমজান আলী, হানিফ আলী, কাজুলি খাতুন
এবং কহিনুর খাতুন। রমজান আলী নিরক্ষর। হানিফ আলী, কাজুলি খাতুন
এবং কহিনুর খাতুন স্বাক্ষর। ইয়াকুব আলী ২০০৪ সালে প্রবল বন্যার সময়ে মৃত্যুবরণ
করেছে। বাহারজান নেসা এখনও জীবিত ।
খতেমন নেসা-
খতেমন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণা ছিলো। নিরক্ষর। স্বভাব নম্র ছিলো। তার বিয়ে
হয়েছিলো বাঘবর পাথারের মজিবরের সাথে। সন্তান-সন্ততি জন্মের আগেই সে মৃত্যু বরণ
করেছে।
হাসেন আলী-
হাসেন আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। ম্যাট্রিক পাস। সে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলো।
তার স্বভাব নম্র ছিলো। সমাজের সাথে খুব সদ্ভাব রেখে চলত না। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত
হয়ে থাকতো। সে বিয়ে করেছিলো সত্রকনরার আজগর আলীর মেয়ে সোনাবানুকে। তাদের দুই
ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হামিদা খাতুন, খালিদা
খাতুন, সাদ্দাম হোসেন এবং শ্বফিকুল ইসলাম। হামিদা খাতুন এবং খালিদা খাতুন
ম্যাট্রিক পাস। তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। সাদ্দাম হোসেন বি, এ পাস। সে
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। হাসিনা আকতার স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। হাসেন আলী
২০১৫ সালে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে।
রহম আলী-রহম
আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে ম্যাট্রিক পাস। ফরেস্ট গার্ড হিসাবে কর্মরত।
সে বিয়ে করেছে বুড়ীগাঁয়ের আক্কেল দর্জির মেয়ে রহিমা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে
চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আফজালুর
রহমান, জেসমিনা খাতুন, রোশেনারা খাতুন এবং রাশিদুল ইসলাম।
আফজালুর রহমান হায়ার সেকেন্ডারি পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত। জেসমিনা খাতুন
ম্যাট্রিক পাস। সে গৃহিনী। রোশেনারা খাতুন হায়ার সেকেন্ডারি পাস। তার বিয়ে হয়ে
গেছে। রাশিদুল ইসলাম স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী।
খেদিনাঃ- আমাদের পাড়ার
প্রথম বাড়িটা ছিলো খেদিনা শ্বেখের। তবে, ভোটার তালিকায় অজ্ঞাত কারণে তার গৃহ
নম্বর ছিলো দুই। আমাদের পাড়ার সবাই কারিগর সম্প্রদায়ের লোক ছিলো। আমাদের
তুচ্ছার্থে অনেকে জোলাও বলত। একমাত্র খেদিনা ছিলো গেরস্থ সম্প্রদায়ের লোক। তিনি
গেরস্থ হলেও আমাদের কারিগর সম্প্রদায়ের সমাজে বাস করতো। খেদিনার আর্থিক অবস্থা
ভালো ছিলো না। কামলা বেচে চলত। আমাদের অঞ্চলে তখন ছনের গৃহ ছাড়া কোনো গৃহ ছিল না।
অবশ্যে অন্যান্য অঞ্চলে দুই একটি টিনের গৃহ যে ছিল না তা নয়। তবে খুবই কম ছিল।
তখন একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিলো। টিনের ঘরে খড়ির বেড়া ঐটাই হলো শ্বেখ পাড়া।
খেদিনা ছনের গৃহ ভালো ছাইতে পারতো। তাই গৃহ ছাওয়ার মরশুমে তাঁর খুব কদর বাড়তো। আমাদের পাড়ার
গৃহ ছাওয়ার কাজ খেদিনাই করতো।
খেদিনা লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। গঠন
ছিপছিপে। দেখতে খুবই সুন্দর ছিলো। খেদিনার বউয়ের নাম ছিলো ফুল খাতুন নেসা। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে খেদিনার বয়স ছিলো ৬৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী ফুল খাতুন
নেসার বয়স ৩৫ বছর। ফুল খাতুন নেসা লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। তিনি মিশুক এবং মিস্ট
স্বভাবের ছিলেন। খেদিনা দম্পতির ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম ছিলো যথাক্রমে আব্দুল হক, ফজল হক, হাসেনা
বানু, খবির উদ্দিন এবং আয়নাল হক।
আব্দুল হক-
আব্দুল হক লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। সে বয়সে আমার থেকে কিছুটা বড় ছিলো। সে
লিখা-পড়া শেখেনি। সে তার বাবার সাথে কামলা বেচত। সে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে।
ফজল হক-
ফজল হক লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। সে আলীগাঁয়ের দানেশ মুন্সীর বাড়িতে অনেক বছর চাকর
ছিলো। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের নুজি খাঁর মেয়েকে। তাঁরা এখন গুয়াহাটিতে
বাড়ি-ঘর করেছে। ব্যবসা করে।
হাসেনা বানু-
হাসেনা বানু লম্বা এবং ফর্সা। সে দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলো। তার বিয়ে হয়েছিলো
আমাদের পাশের গ্রাম সেওরার পাথারের পঞ্চ ফকিরের ছেলে কছিম উদ্দিনের সাথে। তার
ছেলে-মেয়ের বিষয়ে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি।
খবির উদ্দিন-
খবির উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে আমাদের বাড়িতে কয়েক বছর চাকর ছিলো। তার
স্বভাব খুবই অমায়িক। কোনোদিন কাজে ফাঁকি দিত না। খুবই বিশ্বস্ত ছিলো সে। এখন সে
কৃষিকাজ করে। তাঁর ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীর বিষয়ে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে
পারিনি।
আয়নাল হক-
আয়নাল হক খাটো এবং ফর্সা। সে কিছুদিন স্কুলে গিয়েছিলো। তবে, অর্থনৈতিক
অবস্থা খারাপ ছিলো বলে লেখা-পড়া বেশিদূর এগুতে পারেনি। প্রাইমারি পাশের আগেই
লেখা-পড়া ছেড়ে দিয়েছিলো। তবে, তার আত্মসন্মানবোধ ছিলো। কোনোদিন কামলা
বেচেনি। গুয়াহাটিতে রিক্সা চালাতো। পরে কয়লার খনিতে কামলা যোগান দিয়ে সর্দারি
করতো।
নান্দু শ্বেখঃ- নান্দু শেখ
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে রোগা এবং দুর্বল ছিলো। সম্ভবতঃ
হাঁফানি ছিলো। নান্দু শ্বেখের বাবার নাম সাহাব আলী। নান্দু শ্বেখ কৃষিকাজ করতেন।
তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো শ্বরিফন নেছা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নান্দু
শ্বেখের বয়স ছিলো ৫০ বছর এবং তাঁর স্ত্রী সরিপন নেসার বয়স ৪০ বছর। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চারজন। তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম ছিলো, ইসমাইল
আলী, আব্দুল আলী, বুড়ী এবং শুকুর আলী। কেউ লেখা-পড়া
শেখেনি। বুড়ী নামটা কেমন জানি বেমানান লাগে। তার অন্য নাম থাকতে পারে, তবে
আমরা বুড়ী বলেই জানতাম ৷
ইসমাইল-
ইসমাইল লম্বা এবং কালো ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ২৫
বছর। কৃষিকাজ করতেন। তিনি সহজ-সরল এবং মিশুক প্রকৃতির লোক ছিলেন।
আব্দুল আলী-
আব্দুল আলী লম্বা এবং কালো ছিলো। সে ছিপছিপে গঠনের ছিলো। আব্দুলের বয়স ছিলো
অনুমান ১৮ বছর। আমার থেকে কিছুটা বড়। সে কৃষিকাজ করতো এবং কামলা বেচত।
বুড়ী-
বুড়ী লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। কম বয়সেই তার বিয়ে হয়েছিলো। তার বিয়ের
সময় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিলো। সেন্দুর নেয়নি বলে সেদিন রাতে বিয়েটা পড়ানো
হয়নি। পরের দিন আলীরপাম বাজার থেকে সেন্দুর আনার পরে বিয়ে পড়িয়েছিলো। আমি তখন
মামাদের বাড়িতে থেকে লেখা-পড়া করতাম। পূজার ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলোম। তখনই
ঘটেছিলো ঘটনাটি। নান্দুর বাড়িতে বাড়তি গৃহ ছিলনা বলে বরযাত্রীদের আমাদের গোয়াল
ঘরে বসতে দিয়েছিলো। সেদিন আমরা সারারাত জেগে বসেছিলাম। তাই কথাটা এখনও মনে আছে।
শুকুর আলী-একেবারে
ছোট ছেলের নাম ছিল শুকুর আলী। ডাক নাম ছিলো গুদু। সে ছোট বেলা আমার খেলার সাথী
ছিলো। বরপেটা জেলার ফেঙুয়াতে ওদের আর একটি বাড়ি ছিলো। মনে হয় ওরা ১৯৬৯ সালে
জমি-বাড়ি বিক্রী করে ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলো। ওদের জমি-বাড়ি আমাদের বাবা কিনে
নিয়েছিলো। নান্দু কেন জানিনা, আমাদের কাছে জমি বিক্রী না করে প্রথমে
আমাদের যদু মুন্সির কাছে বিক্রী করেছিলো। জমি বিক্রীর আগে নান্দু সব সময় আমাদের
বাড়ী আসতো। জমি বিক্রীর পরে নান্দু আমাদের এড়িয়ে চলতো। এই এড়িয়ে চলার কারণ কি
খোঁজতে গিয়ে আমাদের বাবা দেখে যে নান্দু মিয়া ইতিমধ্যে যদু মুন্সির কাছে জমি
বিক্রী করেছে।
নান্দুর জমির দুই পাশে আমাদের জমি
ছিলো। সেই সুবাদে আমরা প্রথমে জমি পাওয়ার দাবিদার ছিলাম, কিন্তু নান্দু শেখ
আমাদের না জানিয়ে যদু মুন্সির কাছে জমি বিক্রী করাতে বাবা আমাদের পাড়ার লোকদের
কথাটা অবগত করে। তবে পাড়ার লোকেরা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় বাবা
তদানীন্তন আমাদের লাটের মন্ডল গুণমণি দাসের কাছে গিয়ে এই বিষয়ে নালিশ করে। তখন
গুণমণি দাস এসে পাড়ার লোকদের ডেকে বলে যে, যেহেতু নান্দুর
জমির দুই পাশেই মিঠু মিয়ার জমি, তাই জমি মিঠু মিয়া পাবে। তবে হ্যা,
মিঠু মিয়া যদি জমি কিনতে অপারগ হয়, তখন অন্যে কিনতে
পারবে। গুণমণি মন্ডলের এই সিদ্ধান্তের পরে যদু মুন্সি জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য
হয়েছিলো এবং বাবা জমি কিনে নিয়েছিলো।
নান্দু মিয়া ফেঙুয়া যাওয়ার অনেক দিন
পরে শুকুর আলী আমাদের বাড়ি এসেছিলো, তবে, তাকে আমি চিনতে
পারিনি। এমনই পরিবর্তন হয়েছিলো তার চেহেরা।
নান্দু শ্বেখের গৃহিনী শরিপন নেছা
সম্ভবতঃ ১৯৬৮ সালে মারা গিয়েছিলো। নান্দু তখন ঝুমরের মাকে বিয়ে করেছিলো। নান্দুর
দ্বিতীয় স্ত্রীকে সবাই ঝুমরের মা বলেই ডাকতো, তাই আসল নাম
আমরা কখনো শুনিনি। ঝুমরের মার প্রথমে আগমন্দিয়ায় বিয়ে হয়েছিল। তাঁর প্রথম
স্বামী মৃত্যু বরণ করেছিলো। তাঁর আগের স্বামীর পক্ষে দুটি সন্তান ছিলো। একটি মেয়ে
এবং একটি ছেলে। ছেলের নাম ঝুমর। এই সুবাদেই সবাই তাঁকে ঝুমরের মা বলে ডাকতো।
মেয়ের নাম কি ছিল এখন মনে নেই। মেয়েটির বিয়ে দিয়েছিলো নান্দুর আগের পক্ষের
ছেলে আব্দুলের সাথে।
ফেঙুয়ার পরিয়াল-
ফেঙুয়ার একটি পরিয়াল আমাদের পাড়ায়
বাস করতো। ১৯৬৬ সালের আগেই তাঁরা আমাদের কাছে জমি বিক্রী করে আমাদের পাড়া ছেড়ে
ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলো। সেই জমি বিক্রী দলিল মতে তাঁরা ১৯৫৯ সালে আমাদের কাছে জমি
বিক্রী করেছিলো। সেই জমি বিক্রীর দলিল এখনও আমাদের কাছে আছে। তাঁদের বাড়িতে
মাঝে-মধ্যে ফেঙুয়ার যদু মিয়া কলের গান নিয়ে যেতো। তখন আমরা সবাই গোল হয়ে বসে
সেই কলের গান শুনতাম। সাধু মিয়ারাঁ তিন ভাই ছিলো। আলিমুদ্দিন, সাধু
মিয়া এবং নায়েব আলী।
আলিমুদ্দিন-
আলিমুদ্দিনকে আমি দেখিনি। শুনেছি, তিনি এবং তাঁর স্ত্রী কদবানু একটি ছেলে
সন্তান জন্মের পরেই মারা গিয়েছিলেন। সেই শিশু সন্তানের নাম ছিলো ইন্তাজ আলী।
ইন্তাজ আলীকে সাধু মিয়া এবং নায়েব আলী লালন-পালন করে মানুষ করেছিলেন। আমি ইন্তাজ
আলীকে দেখেছি। তিনি তখনও বিয়ে- থাওয়া করেননি। স্কুলে লিখা-পড়া শিখত। তাই সবাই
তাঁকে সরকার বলে ডাকতো। তিনি মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো।
শরীরের রং শ্যামলা হলেও তিনি সুদর্শন ছিলেন। ইন্তাজ আলীর স্ত্রীর নাম সূর্যবানু।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয় জন। পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
ময়নাল হক, মেহেরজান নেসা, বাহারজান নেসা,
মানিকজান নেসা, বেগম, বাছেদ আলী,
কাশেদ আলী, নাসের আলী এবং ইমরান আলী ।
২০২০ সালে আমি ফেঙুয়া গিয়েছিলাম। তখন
ইন্তাজ আলীকে আমি শয্যাগত দেখে এসেছিলাম। পরে খবর শুনেছি, তিনি উক্ত
সালেরই জুন মাসে মারা গিয়াছেন।
সাধু মিয়া-
সাধু মিয়া লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। খুবই মিস্টভাষী এবং মিশুক
প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি বালাজানের বিখ্যাত দেওয়ানী আব্বেছ আলী দেওয়ানীর মেয়ের
জামাই ছিলো। ওনার স্ত্রীর নাম ছিলো ফুলমতী নেসা। ফুলমতী খুবই সুন্দরী ছিলেন।
ফুলমতী লম্বা, ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
সাতজন। ছয় মেয়ে, এক ছেলে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে উজালা খাতুন,
সমেজ উদ্দিন, সখিনা খাতুন, জরুনা খাতুন,
সুরমা খাতুন, আসমা খাতুন এবং নূরজাহান বেগম। উজালা
খাতুন আমার সমবয়সী ছিলো। সমেজ উদ্দিন আমার থেকে কিছু ছোট ছিলো। তারা মাঝারি গঠনের
এবং ফর্সা ছিলো। অন্যান্য মেয়েদের আমি দেখিনি। সামেজ উদ্দিনের ছেলে আয়ূব আলী।
আয়ূব আলী স্নাতক। আয়ুবের স্ত্রীর নাম সুলতানা রেজিয়া। সুলতানা রেজিয়া বি,
এ-বি,টি। হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষয়িত্রী। তাঁদের
একমাত্র ছেলের নাম ঋদেন আহমেদ।
সাধু মিয়া ১৯৮৯ সালে এবং তাঁর স্ত্রী
ফুলমতী ২০১৩ সালে মারা গেছে।
নায়েব আলী-নায়েব
আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলেন। তিনি দেখতে সুদর্শন ছিলেন। তিনি
মিস্টভাষী এবং সামাজিক ছিলেন। সবার সাথে হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম
নবিরন নেসা। তিনি মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে সাত জন। পাঁচ
মেয়ে, দুই ছেলে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আউসী নেসা, সুরা খাতুন,
বাদশাহ মিয়া, ফতে খাতুন, ময়না খাতুন,
রমজান মিয়া এবং নমিসা খাতুন । আউসী নেসা বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোট
ছিলো। সে দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলো। মাঝারি গঠনের ছিপেছিপে এবং ফর্সা ছিলো।
ছেলেবেলা আমরা একসাথে খেলা-ধূলা করতাম। অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের দেখলেও তাদের কথা
আমার মনে নেই।
মিঠু মিয়াঃ- মিঠু মিয়া
আমাদের বাবা। তাঁর বাবার নাম বুদ্ধ মল্লিক। বাবারা দুই ভাই ছিলো। মিঠু মিয়া
এবং ভেলু মিয়া । আমাদের নিজা কোনো ফুফু ছিল না। বাবার বয়স যখন ১৪ বছর এবং কাকার
৪ বছর, তখন গাছ কাটতে গিয়ে গাছের তলায় চাপা পড়ে দাদু মারা গিয়েছিলেন।
তখন দাদী অনেক কষ্টে কাপড় বুনে বাবা এবং কাকাকে মানুষ করেছিলেন। দাদী দেখতে খুবই
সুন্দরী ছিলেন। বৃদ্ধা বয়সেও কাঁচা হলুদের মতো ছিলো তাঁর শরীরের রং। বাবা এবং
কাকা উভয়ে দাদীর খুবই ভক্ত ছিলো। দাদীর কথার বাইরে তাঁরা কোনো কাজ করতেন না। ১৯৭৪
সালে বার্ধক্যজনিত কারণে দাদী মৃত্যু বরণ করেছে।
মিঠু মিয়া মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল
শ্যামবর্ণ ছিলো। স্বাস্থ্য মোটা-মুটি ভালো ছিলো। সচরাচর কৃষিকাজ করতেন। তবে,
বর্ষার মরশুমে কোনো কাজ থাকতো না বলে কাপড় বুনত। থেঁতা(টানা) জাল,
গামছা, লুঙি, চাদর প্রভৃতি। আগেই বলেছি, আমাদের
একটি বড় নৌকা ছিলো। কাকা বর্ষায় সেই নৌকা নিয়ে দলগোমা অঞ্চলে খেজুর পাতা কাটতে
যেতেন এবং সেগুলো কাদং অঞ্চলের রূপাকুছির কারিগর পাড়ায় বিক্রী করতেন। বাবা এবং
কাকার সম্পর্ক খুবই ভালো ছিলো। কোনোদিন কোনো বিষয় নিয়ে তাঁদের মতানৈক্য হতে
দেখিনি। বাবার আদেশ কাকা কোনো রকম দ্বিধা না করেই পালন করতেন। কাকা ১৯৮৩ সালের জুন
মাসে হঠাৎ মারা গিয়েছিলো। তখন আমাদের কাকাতো ভাই-বোনেরা সবাই ছোট ছোট ছিলো। কাকী
খুবই কষ্ট করে তাদের মানুষ করেছে, ঠিক আমার দাদী যেভাবে মানুষ করেছিলো
আমাদের বাবা এবং কাকাকে। আমাদের বাবার ১৯৮৪ সালে অর্দ্ধাংগ বেমার হয়েছিলো। বাবা
মারা গিয়াছে ১৯৯৫ সালের ৭ জানুয়ারিতে। সেদিন সোমবার ছিলো।
আমাদের বাবা বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের
সবচেয়ে ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ধনাই হাজির মেয়ে আমার মা আয়শা খাতুনকে এবং
কাকা বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়েরই আর এক ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি দানেশ মুন্সীর
মেয়ে অছিরন নেচাকে। কাকা কখন বিয়ে করেছিলো মনে নেই, তবে, একদিন
আমাদের সমন্ধীয় জেঠাতো ভাই শিরাজ ভাইর সাথে চাচীকে বাপের বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলাম
। আলীগাঁও জাহানার পাড় থেকে পাঁচ মাইল দূরে। আসার সময় চাচীর সাথে একটি মাটির
কলশে মুড়ি এবং মোয়া দিয়েছিলো । কলশটা চূণ দিয়ে রং করে সুন্দরভাবে সাজিয়ে
দিয়েছিলো। কলশটা শিরাজ ভাই-ই মাথায় করে আনছিলো। এক সময় কলশটা আমার মাথায় দিয়ে
বলেছিলো- তুই কিছুদূর নিয়ে চল, আমি একটু জিরিয়ে নিই। আমি তখন খুবই
ছোট। তাই কিছুদূর আসার পর কলশটা আমার মাথা থেকে পরে গিয়ে ভেঙে গিয়েছিলো।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে বাবার
বয়স ৪২ বছর এবং মার ২৮ বছর। মা এবং কাকীর সাথে খুবই সদ্ভাব ছিলো। কোনোদিন কোনো
বিষয় নিয়ে তর্ক করতে দেখিনি। মা ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারিতে মারা গিয়াছে।
আমরা পাঁচ ভাই এবং দুই বোন ছিলাম।
ভাই-বোনদের নাম যথাক্রমে আবুল হোসেইন, হোসেন আলী, খোদেজা খাতুন,
জহুরুল হক, জেলেকা খাতুন, সামচুল হক এবং
ওমর আলী।
আবুল হোসেইন-
আবুল হোসেই অর্থাৎ আমি সবার বড়। আমি মোটা-মুটি লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। আমার জন্ম
১৯৫১ সালের ১২ নভেম্বর। আমি-ই আমাদের পাড়ায় প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান
করেছিলাম । আমি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে অবসর
নিয়েছি। আমার দুটি পক্ষ। প্রথম পক্ষ ভেরাগাঁয়ের হাকিমুদ্দিনের মেয়ে সফুরা
খাতুন। আমাদের বিয়ে হয়েছিলো ১৯৭৩ সালে। দ্বিতীয় পক্ষ কয়াকুছি অঞ্চলের খরমার
ছয়ফল মিয়ার মেয়ে তারাভানু। বিয়ে হয়েছিলো ১৯৮৫ সালে। প্রথম পক্ষের দুই ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সোহরাব আলী আহমেদ, আমিনা
খাতুন, আবিদা খাতুন, সাহিদা খাতুন,সোলেমান কবির
এবং খালিদা পারবিন ।
বড় ছেলে সোহরাব আলী আহমেদের জন্ম ১৯৭৭
সালে। সে বিজ্ঞানের স্নাতক। ধুবুড়ি জেলার চাপড় শিক্ষাখন্ডে প্রাইমারি স্কুলের
শিক্ষক এবং হাট শিঙিমারিতে সিআরসিসি হিসাবে কর্মরত। দ্বিতীয় সন্তান আমিনা খাতুন।
সে বিজ্ঞানের স্নাতক। জন্ম ১৯৮০ সালে। বঙ্গাইগাঁও জেলার বইটামারি শিক্ষাখন্ডের
অন্তর্গত ঔডুবি এম, ই মাদ্রাসায় বিজ্ঞান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত।
আবিদা খাতুন স্নাতক এবং এএনএম নার্স। জন্ম ১৯৮২ সালে। হাট শিঙিমারিতে নার্স হিসাবে
কর্মরত। সোলেমান কবির বিএইসএমসিটি(হোটেল ম্যানেজমেন্ট) উত্তীর্ণ। জন্ম ১৯৮৬ সালে।
অস্ট্রেলিয়ায় পি এন্ড ও জাহাজ কোম্পানীতে কর্মরত। খালিদা পারবিন বিএসসি নার্স।
জন্ম ১৯৯৩ সালে। সে ধুবড়িতে নার্স হিসাবে কর্মরত।
দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে। সাহজাহান
আলী আহমেদ এবং রাহুল আমিন। সাহজাহান আলী আহমেদ এম, কম। জন্ম ১৯৯২
সালে। সাহজাহান আলী আহমেদ হাউলীর ন্যাশনাল সায়েন্স কলেজে কৰ্মরত। সে জিএসটি এবং
ইনকান ট্যাক্সে কাজ করে।একেবারে ছোট ছেলে রাহুল আমিন বিফার্ম উত্তীর্ণ। জন্ম ১৯৯৭
সালে। সে আহমেদাবাদের
টরেণ্ট ঔষধ কোম্পানীতে কর্মরত।
হোসেন আলী-
আমার ছোট ভাই হুসেন আলী আমার থেকে চার বছরের ছোট। সে মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ।
সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের রখমত মিস্ত্রীর মেয়ে হাজেরন নেছাকে। হুসেন আলী
লিখা-পড়া শেখেনি, মানে লিখা-পড়া করার সুযোগ পায়নি। হুসেন আলী
বলতে গেলে আমার থেকেও অনেক বেশি বুদ্ধিমান। তবে, কোনো কাজ সে মন
দিয়ে করতে পারেনি। কৃষিকাজ, কাপড় বুনা থেকে শুরু করে সে ফেরি করে
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চুড়িও বিক্রী করেছে, আন্ডা কিনেছে।
অনেক কিছুই সে করেছে। তবে, কোনোটাই ধরে রাখতে পারেনি।
হুসেন আলী অভিনয়ে খুবই ভালো। আমিও
নাটকে অভিনয় করেছি। তবে, হুসেন আলী অভিনয় করেছে যাত্রা- মানে
গীতিনাট্য দলে। হুসেন আলী যাত্রাদলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেনাপতির অভিনয় করতো।
তাই অনেকে তাকে আদর করে ‘সেনাপতি’ বলে ডাকে। এখন
হুসেন আলী পুতুল নাচের সাথে জড়িত। পুতুল নাচে সে খুবই ভালো ডায়লগ গায়। পুতুল নাচে কে ডায়লগ প্রক্ষেপ করে দেখা যায়
না। শুনেছি, পরের দিন সকালে কে ডায়লগ প্রক্ষেপ করেছে তাকে
দেখার জন্য অনেকেই কৌতুহল প্রকাশ করে। হুসেন আলী দেখতে একটু রোগা । তাই অনেকে এই
রোগা মতো লোকটা এতো সুন্দর ডায়লগ বলে এ কথা বিশ্বাস করতে টান পায়। আসলে হুসেন
আলী সরকারের কাছ থেকে শিল্পী পেন্সন পাওয়ার যোগ্য। হুসেন আলীর চার ছেলে, তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাসেনা বানু, আকলিমা খাতুন,
রোশেনারা খাতুন, হুসিয়ার আলী, ওয়াশিদ আলী,
সাদ্দাম হোসেন এবং মৃদুল আকতার। কেউ তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। হুসিয়ার
আলী বিভিন্ন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। ওয়াশিদ আলী দর্জি। সাদ্দাম আলী কৃষিকাজে
নিয়োজিত । মৃদুল আকতার শিক্ষার্থী। ক্লাস নাইনে পড়ে। মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে
গেছে।
খোদেজা খাতুন-
খোদেজা খাতুনের শরীরের রং শ্যামলা এবং একটু রোগা। গঠন মাঝারি। সে লিখা- পড়া
শেখেনি। খোদেজার বিয়ে হয়েছে আগমন্দিয়ার ওয়াজ আলীর সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন।
তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে নূরজাহান বেগম, মল্লিক
খোরশেদ আলম, আলাল উদ্দিন এবং জালাল উদ্দিন। নূরজাহানের
বিয়ে হয়েছে গোবিন্দপুড়ের খইমুদ্দিনের ছেলে জামাল উদ্দিনের সাথে। তাদের দুই ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে শাহরুখ ইসলাম, সরিফুল
ইসলাম এবং জেরিফা খাতুন। মল্লিক খোরশেদ আলমের দুই ছেলে। রিহান মল্লিক এবং রিকিত
মল্লিক। আলাল উদ্দিনের দুই ছেলে । ফারহান মল্লিক এবং ইরফান মল্লিক। খোরশেদ আলম এবং
আলাল উদ্দিন বেশি লেখা-পড়া শেখেনি। তারা সোনারু কর্মকার। উভয়ে বিবাহিত। জালাল
উদ্দিন বি, এ পাশ করেছে। সে এখন ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
জহুরুল হক-
জহুরুল হক মাঝারি গঠনের হৃষ্ট-পুষ্ট এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। সে হা-ডু-ডু
খেলায় খুব ভালো ছিলো। আমি হা-ডু-ডু খেলা পসন্দ করতাম না। তাই সে আমাদের ফাঁকি
দিয়ে হায়ারে হা-ডু-ডু খেলতে যেত। তার লিখা-পড়ায় তেমন মন ছিল না। তাই আমাদের
অগোচরে এটা ওটা ব্যবসা করতো। ১৯৮৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর মেলেরিয়া জ্বর
হয়ে সে গোয়ালপাড়া সিভিল হাসপাতালে মারা গেছে। জহুরুল মারা যাওয়ার ছয় মাস পরে
কাকা ভেলু মিয়া মারা গিয়েছিলেন। একই বছর দুটি মৃত্যুতে আমরা খুবই মর্মাহত হয়ে
পরেছিলাম।
জালেকা খাতুন-
জালেকা খাতুন ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের। সে কিছু লিখা-পড়া করেছিলো। অবশ্যে
প্রাইমারি পাশ করতে পারেনি। একটু কম বয়সেই তাঁর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের সুলতান
মিয়ার একমাত্র ছেলে বাহারুল ইসলামের সাথে। বাহারুল ইসলাম এমনিতেও আমাদের খালাতো
ভাই। তাদের তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুল হাই
খালিদ, মঞ্জুয়ারা খাতুন, রঞ্জিত আলী এবং ছিদ্দিক আলী।।
মঞ্জুয়ারার বিয়ে হয়েছে মিলিজুলির জমির হোসেনের সাথে। আব্দুল হাই বিবাহিত। সে
হায়ার সেকেন্ডারি উত্তীর্ণ। সে কাদিয়ানি সমাজের অন্তর্ভূক্ত। তাই তার সাথে
বর্তমান আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। রঞ্জিত আলী এবং সিদ্দিক আলীও বিবাহিত। এরা কেউ
তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। রঞ্জিত আলী এম্বুলেন্স চালক এবং সিদ্দিক আলী ব্যবসায়ী।
সামসুল হক-
জালেকা খাতুনের ছোট সামসুল হক। সামসুল হকের জন্ম ১৯৭১ সালে। মাঝারি গঠনের এবং
শ্যামবর্ণ। সে বি, এসসি উত্তীর্ণ। ম্যাট্রিকে গণিতে লেটার মার্ক
নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সে এখন বরপেটা রোডের
একটি এম, ই, স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। সে বিয়ে করেছে
নিচুকার জিন্নত আলীর মেয়ে আবিদা খাতুনকে। আবিদা খাতুন স্নাতক। সে একটি ব্যক্তিগত
খন্ডের স্কুলে শিক্ষকতা করে। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে
সানিয়ারা মল্লিক বড় এবং ছেলে আশানূর মল্লিক ছোট। উভয়ে শিক্ষার্থী।
ওমর ফারুক
কিবরিয়া- ওমর ফারুক মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে হিন্দী
মেজর নিয়ে বি, এ পাস করেছে। সে নলবারি জেলার ডকোহা এম,
ই, স্কুলের হিন্দী শিক্ষক। শিক্ষকতার আগে সে
সাংবাদিকতা করতো। শিক্ষক হিসাবে কাজে যোগদান করার পরে আসাম সরকারের নির্দেশনা
অনুসারে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়েছে। সে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ
আদি লেখে। সে একটি কবিতার বই প্রকাশ করেছে। সে বিয়ে করেছে রামপুরের চতলার শিক্ষক
দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে রেহেনা পারবিনকে। তাঁদের দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। বড়
মেয়ের নাম ফারহানা কিবরিয়া। ফারহানার পরে রেজাউল তারিক কিবরিয়া। রেজাউলের ছোট
ফাহিমা কিবরিয়া। সবাই শিক্ষার্থী।
ভেলু মিয়াঃ- ভেলু মিয়া
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলেন। সে কৃষিকাজ করতেন। সে বিয়ে করেছিলেন
আলীগাঁয়ের দানেশ মুন্সির মেয়ে অছিরন নেসাকে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
তাঁর বয়স ৩২ বছর এবং চাচী অছিরন নেছার ২৪ বছর। তাঁদের তিন ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে রেজিয়া খাতুন, আয়নাল হক,
সালেহা খাতুন, মহেলা খাতুন, জয়গন নেসা,
আক্কাস আলী, আফসার আলী এবং সোনাবানু।
রেজিয়া খাতুন-
রেজিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলো। তার বিয়ে হয়েছিলো
আলীগাঁয়ের রজব আলীর ছেলে ওয়াজেদ আলীর সাথে। সে অনেক দিন আগেই মারা গেছে। তার দুই
মেয়ে। বড় মেয়ের নাম অজুপা খাতুন এবং ছোট মেয়ের নাম রাজুবালা খাতুন ৷
আয়নাল হক-
আয়নাল হক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কিছু লেখা-পড়া শিখেছে। কৃষিকাজ করে। সে
বিয়ে করেছে কাদঙের সোহরাব আলীর মেয়ে হাফিজা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন।
দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাবিজুল ইসলাম, আসমা
খাতুন, সাইফুল ইসলাম এবং আর্জিনা খাতুন। কেউ লেখা-পড়া শেখেনি।
সালেহা খাতুন-
সালেহা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে বাঘবর পাথারের মামুদ
আলীর ছেলে আবু বাক্কারের সাথে। তাঁদের দুই ছেলে এবং চার মেয়ে। সন্তানদের নাম
যথাক্রমে মিনুয়ারা খাতুন, আলতাব হোসেন, নিলীমা খাতুন,
জাহানারা খাতুন এবং আলী আহমেদ। মিনুয়ারা খাতুন আসাম পুলিশ-এ কর্মরত।
আলতাব হোসেন ব্যবসায়ী।
মহেলা খাতুন-
মহেলা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে সত্রকনরার
মুলামদির ছেলে জবান আলীর সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিন জন। এক ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মুক্তার আলী, জয়নব খাতুন এবং
সানিয়ারা খাতুন। তারা এখন গোয়ালপাড়ার কৃষ্ণাইয়ে বসবাস করে।মুক্তার আলী পেশায় অধিবক্তা।
জয়গন নেসা-
জয়গন নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে ছনপুরার হুটু মিয়ার
ছেলে জাকির হোসেনের সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। এক ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে জাহিদুল ইসলাম, মামনি খাতুন এবং সানিয়ারা খাতুন ।
আক্কাস আলী-
আক্কাস আলী লম্বা এবং ফর্সা। সে ব্যবসায়ী। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের বালাচানের
মেয়ে ফুল খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
শ্বাহ আলম, সাহিনারা খাতুন, সাইজুদ্দিন এবং
নাজমা খাতুন। শ্বাহ আলম এবং সাইজুদ্দিন ব্যবসায়ী। সাহিনারা ম্যাট্রিক উত্তীর্ণ।
তার বিয়ে হয়ে গেছে। নাজমা খাতুন শিক্ষার্থী।
সোনাবানু-লম্বা
এবং ফর্সা। সে কিছু লেখা-পড়া শিখেছে। তার বিয়ে হয়েছে নওকুসির লালচানের ছেলে
রুস্তম আলীর সাথে। তাঁদের দুই মেয়ে। সুলতানা পারবিন এবং রুমনা পারবিন। রুমানা
পারবিন জিএনএম নার্স পাঠ্যক্রমে অধ্যয়নরত। সুলতানা পারবিনের বিয়ে হয়ে গেছে।
আফসার আলী-আফসার
আলী ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের
নুরমহম্মদের মেয়ে ফরিদা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। দুই ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফাইজুল ইসলাম, জয়নব খাতুন এবং
রুমি আকতার। সবাই ছোট ছোট।
আব্দুল খালেকঃ-
আব্দুল খালেক লম্বা ছিপছিপে এবং ফর্সা ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। জমি-জমা তেমন ছিল
না। তাই কৃষিকাজের সমান্তরালভাবে কামলাও বেচতেন। পূব দেউলদির ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকায় তাঁর নাম নেই। সম্ভবতঃ ১৯৬৬ সালের আগেই ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলেন। তার বয়স
১৯৬৬ সালে অনুমান ৫৫ বছর ছিলো। মনে হয় মকবুল জেঠার সমবয়সী ছিলো। খালেককে আমি
জেঠা বলে ডাকতাম। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় খালেকের স্ত্রীর নাম লিখতে পারলাম
না। খালেকের স্ত্রী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামলা ছিলো। তিনি খুবই ধীর-স্থির প্রকৃতির
স্ত্রীলোক ছিলেন। মৃদুভাষীও ছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। দুই ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কমলজান নেছা,
বিমলা খাতুন, ফুলজান নেসা(ফুলি), ভুলিমন
নেসা(ভুলি), হাসমত আলী এবং হাসেন আলী। কমলজান নেসার বিয়ে
হয়েছিলো আমাদের পাড়ার ওয়াজুদ্দিনের সাথে। আব্দুল খালেকের চার বিঘা একসনা জমি
ছিলো। সেই জমি এক হাজার টাকায় বিক্রী করে তিনি ফেঙুয়া চলে গিয়েছিলেন। সেই জমি
আমাদের বাবা আমাদের ফুফাতো ভাই আশুত আলীকে কিনে দিয়েছিলো। আব্দুল খালেক তাঁদের
জমি আমাদের
কাছেই বিক্রী করতে চেয়েছিলো। তবে, বাবার অত টাকা ছিল না বলে আশুত আলীকে
কিনে দিয়েছিলো। তখনকার এক হাজার টাকা এখনকার ৫ লক্ষের কম হবেনা। তখন ধানের মোন
ছিলো পাঁচ টাকা, ছয় টাকা। সালটা সম্ভবতঃ ১৯৬৪ ছিলো। সেই বছর
একদিন বাবা হাট থেকে এসে কাকাকে ডেকে বলেছিলো- ভেলা, ধানের দাম খুব
বেড়েছে। সাত টাকা, আট টাকা মোন। আমার মনে আছে আমি যখন প্রাইমারিতে
পড়ি তখন এক সের চালের মূল্য ছিলো আট আনা। এখনকার ত্রিশ চল্লিশ টাকা। গুড় ছিলো আট
আনা সের।
যদু মুন্সিঃ- যদু মুন্সি
একটু বেঁটে ধরণের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা। তাঁর বাবার
নাম ছিলো জিগির শ্বেখ। গ্রামের মধ্যে একমাত্র তিনি এবং মাতাব আলী মুন্সি স্বাক্ষর
ছিলেন। কারো কোনো চিঠিপত্র অথবা দলিল পত্র দেখতে হলে তাঁদের কাছেই যেতে হতো। যদু
জেঠা আমাদের দাদীকে মামী বলে ডাকতেন।
যদু মুন্সি খুবই সহজ সরল লোক ছিলেন।
কোনো কাজিয়া পেচালে ছিল না। কৃষিকাজের সমান্তরালভাবে তিনি সমাজের ইমামতিও করতেন।
গ্রামের জমি সম্পর্কিত কোনো কাজ করতে হলে সবাই তাঁর শরণাপন্ন হতো এবং তিনিই অফিস
আদালতে যেতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম আমিরন নেসা। তিনি লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। খুবই
সহজ-সরল ছিলেন তিনি। আমরা তাঁকে জেঠি বলে ডাকতাম। আমাদের ভাই-বোনদের খুবই আদর-
সোহাগ করতেন। লেখা-পড়ার জন্য আমি ছোট থেকেই বেশিরভাগ সময়ই বাহিরে থাকতাম। তাই
আমি বাড়িতে এসে দেখা করতে গেলে চিড়া-মুরি যা ঘরে থাকতো বের করে খেতে দিতো। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে যদু মুন্সির বয়স ৬২ বছর এবং জেঠি আমিরন নেসার ৫৫ বছর।
তাঁদের ছেলে- মেয়ে ৮ জন। ছয় ছেলে, দুই মেয়ে। তাঁদের নাম যথাক্রমে শিরাজ
উদ্দিন, আফাজ উদ্দিন, রহিমন নেসা, হাবেজ
উদ্দিন(হাবু), জয়তন নেসা, হানিফ আলী,আজগর
আলী এবং ময়সের আলী।
শিরাজ উদ্দিন-
শিরাজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তাঁর হাঁফানি বেমার ছিলো, তাই
একটু পরিশ্রম করলেই হাঁফিয়ে উঠতেন। তার স্ত্রীর নাম রাবিয়া খাতুন। আলীগঁয়ের রজব
আলীর মেয়ে। রাবিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। কালো হলেও দেখতে সুন্দরী
ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে শিরাজ উদ্দিনের বয়স ২৫ এবং রাবিয়া
খাতুনের ২১ বছর ছিলো। শিরাজ উদ্দিন হাটে হাটে চুন বিক্রী করতেন। তাঁর শশুড় রজব
আলীও চুন বিক্রী করতেন। শশুড়কে দেখেই সম্ভবতঃ শিরাজ ভাই চুনের ব্যবসা করতে
উৎসাহিত হয়েছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। চার ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে বিল্লাল হোসেন, ইজ্জত আলী, নিয়েত আলী,
সাহেরা বানু, মমতাজ খাতুন এবং রমজান আলী।
ছেলে-মেয়েদের কেউ লিখা-পড়া শেখেনি।
বড় ছেলে বিল্লাল হোসেন গুয়াহাটিতে অটো চালায়। অন্যান্যরা বিভিন্ন কাজে নিযোজিত।
মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। শিরাজ উদ্দিন এবং রাবিয়া খাতুন
অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
আফাজ উদ্দিন-
আফাজ উদ্দিন একটু বেঁটে ধরণের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি বাঘবর থানার
নৌকায় থাকতেন। বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের শরিফন নেছাকে। শরিফন নেসা মাঝারি গঠনের
এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা ছিলো। খুবই সহজ-সরল ছিলো। মুখে বসন্তের দাগ ছিলো যদিও
দেখতে অসুন্দর ছিলো না । বলা যায় সুন্দরিই ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
আফাজ উদ্দিনের বয়স ২৩ এবং শরিফন নেসার ২২ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে আঠ জন। চার ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সরবেশ আলী, কুলছুন নেছা,
নূর জাহান বেগম, পরশ আলী, আছাতন নেছা,
সহর আলী, মানিকজান নেসা এবং শফিকুল ইসলাম।
ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত। ছেলেরা
বিভিন্ন ব্যবসায়ে নিয়োজিত এবং মেয়েরা গৃহিনী। কেউ লেখা- পড়া শেখেনি। আফাজ
উদ্দিন এবং শরিফন নেসা কয়েক বছর আগে মারা গেছে।
রহিমন নেছা-
রহিমন নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণা। আমার থেকে বয়সে কিছু বড়। তাঁর বিয়ে
হয়েছে আমাদের গ্রামের পন্ডিত আলীর ছেলে শুকুর আলীর সাথে। আমাদের পাড়ায় দু'জন
পন্ডিত আলী ছিলো।
শুকুর আলীর বাবা পন্ডিত আলীর একটা হাত কনুই পর্যন্ত ছিলো। তাই তাঁকে সবাই ‘টুইন্ডা’
পন্ডিত বলতো। রহিমনের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। তিন ছেলে, দুই
মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে নায়েব আলী,বছিরন নেসা, ময়নাল হক,
জয়গন নেসা এবং হুরমুজ আলী। ময়নাল হক কিছুদিন আগে মারা গেছে।
জয়তন নেসা-
জয়তন নেসা লম্বা এবং ফর্সা। মুখমন্ডল একটু চেপটা ধরণের। আমার থেকে বয়সে কিছু
ছোট। তার বিয়ে হয়েছে ভেড়াগাঁয়ের মুংলা মুন্সির ছেলে ছিদ্দিক আলীর সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
আঠজন। তিন ছেলে, পাঁচ মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে জয়নাল আবদিন,
মনোয়ারা খাতুন, জয়নুদ্দিন, আনোয়ারা খাতুন,
আইনুদ্দিন, মেঘজান নেসা, আমেলা খাতুন এবং
তারাবানু। ছেলে-মেয়ে সবাই বিবাহিত। জয়নুদ্দিন এবং আইনুদ্দিন গুয়াহাটীতে অটো
চালায় ।
হাবেজ উদ্দিন-
হাবেজ উদ্দিন একটু বেঁটে ধরণের এবং শ্যামবর্ণ। সে আমার থেকে দুই বছরের বড়।
ছেলেবেলা আমরা একসাথে খেলা-ধূলা করেছি। সে খুবই সহজ-সরল লোক। নদী ভাঙার আগে সে
কৃষিকাজ করতো। নদী ভাঙার পরে গুয়াহাটিতে হাজিরা করতো। সে বিয়ে করেছে তাঁর মামাত
বোন কমলা খাতুনকে । কমলা খাতুন আমাদের পাড়ার আব্দুল রখমানের মেয়ে। কমলা খাতুন
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। সে খুবই সহজ-সরল। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন।
তিন ছেলে, এক মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে একাব্বর আলী, করম আলী,
সাহানূর আলী এবং বায়লা খাতুন । একাব্বর আলী অনেক দিন আগে মারা গেছে।
তাঁরা এখন গোয়ালপাড়া জেলার কৃষ্ণাইতে বসবাস করে।
হানিফ আলী-
হানিফ আলী মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে হালুইকর। হাটে হাটে মিস্টি, দৈ,
মুরি বিক্রী করে। সে আগমন্দিয়ার আমার ভগ্নীপতি ওয়াজ আলীর বোন
মালেকা খাতুনকে বিয়ে করেছে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম মানিক আলী, হামিদা খাতুন, এলিজা খাতুন এবং
মান্নান আলী। মানিক আলী বেঁটে ছিলো। হাটে হাটে পান-সুপারি বিক্রী করতো। সে খুবই
কৌতুকপ্রিয় ছিলো। সে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে। জীবিতরা সবাই বিবাহিত।
মজিবর রহমান-মজিবর
রহমান মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। বিয়ে করেছে মরাভাজের
নবুরুদ্দিনের মেয়ে তছিরন নেসাকে। তাদের ছেলে-মেয়ে চারজন। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
তৈয়ব আলী, ডালিমন নেসা, মজিরন নেসা এবং
মফিদা খাতুন। ছেলে-মেয়ে সবাই বিবাহিত। তৈয়ব আলী ব্যবসায় করে । মজিবর রহমান
কিছুদিন আগে পর্যন্ত গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। তার কন্ঠস্বর খুবই সুরেলা
ছিলো। গীতিনাট্যে মেয়ের রোল করতো। মাজিবর রহমান এখন ভেরাগাঁয়ে বসবাস করে।
আজগর আলী-
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। সে কৃষিকাজ করতো। সে বিয়ে
করেছিলো বাঘবর পাথারের খইমুদ্দিনের মেয়ে আয়মনা খাতুনকে । আজগর লেখা-পড়া শেখেনি।
সে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে। তার ছেলে-মেয়ে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই ।
ময়সের আলী-
ময়সের আলী সবার ছোট। সে মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং কালো। সে বিয়ে করেছে বাঘবরের
ইয়াসিনের মেয়ে কমলা খাতুনকে। সে লেখা-পড়া শেখেনি। সে কৃষিকাজে নিয়োজিত। ছেলে-
মেয়ের তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি।
নিয়ামত আলী বেপারীঃ-
নিয়ামত আলী বেপারীকে আমি বৃদ্ধ অবস্থায় দেখেছি। তিনি তখন কুঁজা হয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি গৌর বর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিলো পুচাই শেখ। তিনি যদু জেঠার শশুড় ছিলেন।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৮৫ বছর। তাঁর স্ত্রীকে আমি
দেখিনি। দেখলেও মনে নেই। সে জন্য তাঁর স্ত্রীর নাম আমার জানা নেই। সম্ভবতঃ আমি ছোট থাকতেই মারা
গিয়েছিলো। নিয়ামত দম্পতির ছেলে-মেয়ে চারজন। তিন ছেলে, এক
মেয়ে। তাঁদের নাম যথাক্রমে আমিরন নেসা, আব্দুল রকমান, নবুর উদ্দিন এবং
আব্দুল হক।
আমিরন নেসা-
আমিরন নেসার বিবরণ যদু মুন্সির পরিয়ালের সাথে আগেই দেওয়া হয়েছে।
আব্দুল রকমান-
আব্দুল রকমান মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম
ছিলো আমিরন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আব্দুল রকমানের বয়স ৫৩ এবং
তাঁর স্ত্রী আমিরন নেসার ৪২ বছর। তাঁদের দুই ছেলে, চার মেয়ে। বড় ছেলের নাম
ছিদ্দিক আলী এবং ছোট ছেলের নাম আব্দুল বারেক। মেয়েদের নাম সহরজান
নেসা, কমলা খাতুন, সোনাবানু(পাতা) এবং রহমজান নেসা। কেউ
লিখা-পড়া শেখেনি।
নবুর উদ্দিন-
নবুর উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। মুখমন্ডলে হালকা বসন্তের দাগ ছিলো। মাথার
চুলগুলো ছিলো কোঁকড়ানো। তিনি কবিরাজি করতেন। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ফিট-ফাট হয়ে
থাকতে পসন্দ করতেন। তিনি তেল মাখানো একটি ছোট লাঠি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। কৃষিকাজ
করতেন। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা কেফাতুল্লাহর মেয়ে সূর্যবানুকে বিয়ে
করেছিলেন। সেই সম্পর্কে তিনি আমাদের বোনের জামাই ছিলো । আমরা তাঁকে মিয়াভাই বলে
ডাকতাম। তিনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন। সূর্যবানুর মুখমন্ডলে হালকা বসন্তের দাগ
ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নবুর উদ্দিনের বয়েস ছিলো ৪৩ বছর। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকায় সূর্য্যবানুর নাম নেই। তাই তাঁর বয়স দেওয়া সম্ভব হল না।
১৯৬৬ সালে তাঁর বয়স মনে হয় ২০ বছর ছিলো। তাই সম্ভবতঃ ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি।
কারণ তখন ২১ বছর না হলে ভোটার তালিকায় নাম উঠত না। তাঁদের দুই ছেলে, জিন্নত
আলী এবং ইন্নাস আলী। চার মেয়ে যথাক্রমে রূপজান নেসা, লালবানু,
হামেলা খাতুন এবং চম্পা খাতুন। কেউ লিখা-পড়া শেখেনি।
আব্দুল হক-
আব্দুল হক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি নিরক্ষর ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন।
সে বিয়ে করেছিলো মরাভাজের তমেজ আলীর মেয়ে জিলিমন নেসাকে। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে আব্দুল হকের বয়স ৩৬ বছর এবং তাঁর স্ত্রী জিলিমনের ৩২ বছর। জিলিমন
স্বাক্ষর ছিলো। সে কোরান পড়তে পারত। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। সন্তানদের নাম
যথাক্রমে সমেজ উদ্দিন (বেপারী), শুকুরজান নেসা, আমিরজান নেসা,
আনার আলী এবং আয়নাল হক। এরা কেউ লেখা-পড়া শেখেনি। সবাই কৃষিকাজ
করে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
আব্দুল হক ২০০৪ সালে এবং জিলিমন নেসা
২০১৫ সালে মারা গেছে।
কছিম উদ্দিন মল্লিকঃ-
কছিমুদ্দিন মল্লিক খুবই লম্বা ছিলেন। প্রায় ছয় ফুটের মতো। তাঁর শরীরের রং
শ্যামলা ছিলো। আমি যখন দেখেছি তখন কছিমুদ্দিন বৃদ্ধ। তবুও তাঁর শরীরের গঠন দেখে
বুজতে অসুবিধা হত না, যে যৌবনকালে তিনি খুবই বলশালী ছিলেন। তাঁর
স্ত্রীর নাম বাহারজান নেসা। তাঁর নাকের মাঝ বরাবর একটি বড় আকারের তিল ছিলো,
সেজন্য লোকে লোক সমাজে তিনি তিল্লুকি নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে কছিম উদ্দিনের বয়স ৭২ বছর এবং বাহারজান নেসার ৫৫ বছর ছিলো।
তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি ছিলনা, সেজন্য বৃদ্ধ অবস্থাও কছিমুদ্দিন নিজে
চাষ- আবাদ করতেন। পরে অবশ্যে সাহেদ আলী নামের একটি কিশোর ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন।
সাহেদ আলীর বাবা-মার কলেরায় মৃত্যু হয়েছিলো।
তখনকার দিনে কলেরা এবং বসন্ত রোগে অনেক
লোকজনের মৃত্যু হতো। কোনো কোনো বাড়ী একেবারে উজাড় হয়ে যেতো। ১৯৬৮ সালে বসন্ত রোগে
আমাদের মামাতো বোন জিন্নতমালার এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচজন মেয়ের মৃত্যু
হয়েছিলো। সে একেবারে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলো। তখন কলেরা রোগেও অনেক লোজকজন
মারা যেতো। পরিয়াল উজাড় হয়ে যেতো। সাহেদ আলীর পরিয়াল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সাহেদ আলী বড় হওয়ার পরে বিয়ে-থা করে সংসারের হাল ধরেছিলো। সাহেদ আলী বয়সে আমার
থেকে কিছুটা ছোট।
বাহারজান নেসা কবিরাজি চিকিৎসা করতেন।
ধাই হিসাবে তাঁর খুবই নাম-ডাক ছিলো। জটিল কেসে বাইরের গ্রাম থেকেও তাঁর ডাক আসতো।
তিনি উপযেচে গিয়ে সন্তান সম্ভাবা বউ-জীদের তদারকি করতেন, শলা-পরামর্শ দিতেন।
যেচে গিয়ে বৌ-জীদের হাতের কাজ করতেন। কারো অসুখ-বিসুখ হলে তিনি সবার আগে গিয়ে
তার সেবা-যত্ন করতেন। মাথায় জলপটি দিতেন। তাই সবাই তাঁকে স্নেহ ও সন্মান করতো।
আমি একবার তাঁর অভিনব চিকিৎসায়
পাঁচড়া থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। সেবার আমার পাঁচড়া হয়েছিলো। সম্ভবতঃ ১৯৬৮ সাল।
আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম- খালা, আমার পাঁচড়া হয়েছে। সারতেছে না। ঔষধ
দাও।
তখন বর্ষা মাস। আমাদের পাড়ায় সবার
উচো উচো ভিটা ছিলো। তাই বাড়ীর ভিটার নিচেই জল। তিনি বললেন- যাও, লেংটা হয়ে জলের
মাঝে দাঁড়িয়ে থাকো।
আমি বললাম- জলের মাঝে লেংটা হয়ে ?
কেন ?
তিনি বললেন- চেলা মাছে খেলে পাঁচড়ার
বাপও বাপ বাপ করে ভেগে যাবে।
আমি তাঁর পরামর্শ অনুসারে লেংটা হয়ে
জলের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং চেলা মাছ আমার পাঁচড়ায় ঠোকর মেরে মেরে ঘাঁ থেকে
রক্ত বের করে দিয়েছিলো। তবে, আমার পাঁচড়া সেরে গিয়েছিলো।
আর একটি মজার কথা আছে তিল্লুকি খালাকে
নিয়ে। একদিন সন্ধ্যেবেলা আমি তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। বেলা তখন ডুবু ডুবু
অবস্থা। অল্প পরেই ডুববে আর কি! তখন রমজানের রোজা চলছিলো। ইফতারের সময় হতে খুব
দেরি নেই। দেখি তিনি ভাত খাচ্ছেন। তাই আমি বললাম- খালা, তুমি এখন ভাত
খাচ্ছ? ইফতারের সময় হতে এখনও অনেক বাকী। রোজা ছিলে না?
রোজা ছিলাম। এখন সেহেরি খাচ্ছি।
এখন সেহেরি খাচ্ছ মানে? একটু
পরেইতো ইফতার করতে হবে। কখন রোজা ছিলে?
আমি রাতের বেলা রোজা থাকি। দিনে রোজা
থাকি না।
আমি অবাক! এ আবার কেমন রোজা! তাই
বললাম- রাতে রোজা থাকলে রোজা হবে?
কেন হবে না। রাতও আল্লাহর, দিনওতো
আল্লাহরই, না-কি?
আমি আর কি বলব! তখন আমার উপদেশ দেবার
মতো বয়স ছিল না। তাই মনে মনে চলে এসেছিলাম। বাহারজান নেসা সুফি পীরের শিষ্যা
ছিলেন। সুফি পীরের শিষ্য-শিষ্যাদের অনেকে তখন এ রকম আজগুবি আচরণ করতেন, এখনও
সম্ভবতঃ অনেকে করে।
পন্ডিত আলীঃ- পন্ডিত আলী
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি রোগা এবং দুর্বল ছিলেন। আমি যখন তাঁকে
দেখেছি তখন তিনি বৃদ্ধ। কাজ-কাম করতেন না। বসে বসে হোকা টানতেন। আমিও অনেক দিন
তাঁর কাছে গিয়ে হোকা টেনেছি, যদিও তখন আমি ধূমপান করতাম না। আমি
গেলেই হোকা জ্বালিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলতেন- ধুয়া বের কর।
তাঁর হুকুম মতো হোকায় মুখ লাগিয়ে
টেনে ধুয়া বের করতাম। এমনি কয়েকদিন করার পর আমার প্রায় হোকার নেশায় পেয়ে
বসেছিলো। বাড়িতে থাকলেই সময়-সুযোগ বুজে তাঁদের বাড়ী গিয়ে তাঁর সাথে হোকা
টানতাম ৷
পন্ডিত আলী আমাদের সম্পর্কীয় ফুফা ছিলেন।
আগেই বলেছি আমাদের কোনো ফুফু ছিল না। তাই পন্ডিত আলীকেই আপন ফুফা এবং তাঁর স্ত্রী
হালিমন নেসাকে আপন ফুফু বলে ভাবতাম। তাঁরা আমাদের আপন ফুফা-ফুফু নয় একথা কখনো
মনেই আসতো না। ফুফু নিজের ভাইপো-ভাইজীর মতোই আদর সোহাগ করতেন। তাঁদের বাড়ী গেলে
ঘরে যা কিছু থাকতো বের করে খেতে দিতেন। তাঁদের সেই আদর- সোহাগের কথা জীবনেও ভুলতে
পারব না।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
পন্ডিত আলীর বয়স ৬২ বছর এবং ফুফু হালিমনের বয়স ৫৯ বছর ছিলো। তাঁদের তিন ছেলে,
কোনো মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে আশুদ আলী, ফজল
হক এবং খোরশেদ আলী।
আশুদ আলী-
আশুদ আলী লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। সে কৃষিকাজ করতেন। লম্বার জন্য শেষ বয়সে তাঁর
শরীর কিছু বেঁকে গিয়েছিলো। একটু কুঁজা হয়ে হাটতেন। তিনি রোগা এবং দুর্বল ছিলেন।
সম্ভবতঃ হাঁফানি বেমার ছিলো। সে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের তহের আলীর মেয়ে সখিনা
খাতুনকে। সখিনা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তিনি হেলা-ভোলা ছিলেন। সাজিয়ে
কথা বলতে পারতেন না। কেউ কথা বললে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে শুনতো। অবশ্যে মনটা খুবই
উদার ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আশুদ আলীর বয়স ২৯ বছর এবং সখিনার ২১
বছর। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ভোটার তালিকায় নাম ভুল উঠেছিলো। আশুদ আলীর নাম
উঠেছিলো আরহুদ আলী এবং সখিনা খাতুনের চকুরান। এই নামের ভুলের জন্য তাঁদের এক ছেলে
সহর আলী বিদেশী ঘোষিত হয়েছে। আশুদ আলীর দুই ছেলে- ইমান আলী, সহ
আলী এবং একমাত্র মেয়ে বুড়ী। ইমান আলী কয়েক বছর আগে মারা গেছে।
ফয়জল হক-
ফয়জল হক লম্বা এবং শ্যামলা ছিলো। বয়স কম থাকার জন্য ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায়
তাঁর নাম নেই। আমার থেকে তিনি সম্ভবতঃ দুই বছরের বড় ছিলেন। তিনি ব্যবসা করতেন।
সামাজিক লোক ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের সমাজের মাতবরও ছিলেন। তিনি বিয়ে
করেছিলেন আমাদের পাড়ারই জোনাব আলীর মেয়ে রংমালাকে। রংমালা অনেক দিন আগে মারা
গেছে। রংমালা মারা যাওয়ার পরে বিয়ে করেছিলো ভক্তের ডোবার একটি মেয়েকে। তাঁর নাম
আমার জানা নেই। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফজিরন নেছা, মজিরন নেছা এবং হুকুম আলী। হুকুম আলীকে
লোকে পাগলা বলে ডাকতো। এরা কেউ লিখা-পড়া শেখেনি। দ্বিতীয় পক্ষের তিন ছেলে,
মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে আমির হামজা, শহিদুল ইসলাম
এবং জহুরুল ইসলাম।
জহুরুল ইসলাম বি, এ
পাস। বাকীরা তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। তবে, সবাই স্বাক্ষর।
খোরশেদ আলী-
খোরশেদ আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তার নাম নেই।
সে আগে কৃষিকাজ করতো। নদী ভাঙার পরে বাঘবর এসেও কৃষিকাজ করতো। পরে চাহ- দোকান
করেছে। এখন ছেলেরা
রোজগার করে। তাই সে এখন কৃষিকাজ থেকে অবসর নিয়েছে। বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের জুরান
বেপারীর মেয়ে জরিমন নেসাকে। জরিমন একটু খাটো ধরণের এবং শ্যামবর্ণা। খুবই অমায়িক।
তাদের তিন ছেলে। মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম হলো- জরিপ আলী,
ওমর আলী এবং জাহিদুল ইসলাম। জাহিদুল ইসলাম বি, এ পাস। সবাই
ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
দুখী শ্বেখঃ- দুখী শ্বেখ
আমাদের পাড়ার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ
ছিলেন। তাঁর লম্বা লম্বা দাড়ি ছিলো। খুবই সৌম্য দেখা যেতো তাঁকে। দুখী শ্বেখের
দুটি বাড়ী ছিলো। একটি বাড়ী ছিলো জাহানারপাড়ে এবং আরেকটি ছিলো কাদং অঞ্চলের
রূপাকুছি। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা ছিলেন। বাবাদের ফুফাতো ভাই। তিনি আমাদের
দাদীকে মামী বলে ডাকতেন। তাঁর বাবার নাম ছিলো ইলিমুদ্দিন দেওয়ানী। তিনি
রূপাকুছিতেই থাকতেন। তাই ইলিমুদ্দিন দেওয়ানীকে আমি কোনোদিন দেখিনি। এমনও হতে পারে
হয়তোবা তিনি আমার জন্মের আগেই মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
দুখী শ্বেখও মাঝে-মধ্যে রূপাকুছি গিয়ে
থাকতেন, তবে বেশির ভাগ সময় আমাদের পাড়াই থাকতেন । দুখী শ্বেখের স্ত্রীর নাম
ফুলবানু খাতুন। তিনি খুব সুন্দরী ছিলেন। মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। ধীর-স্থির
এবং হেঁসে হেঁসে, মেপে কথা বলতেন। তাঁদের পাঁচ ছেলে এবং এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সবুর উদ্দিন, ইয়ার উদ্দিন,
মফিজ উদ্দিন, আফাজ উদ্দিন খফিস উদ্দিন এবং রাজুবালা
খাতুন।
সবুর উদ্দিন-
সবুর উদ্দিন লম্বা ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। তিনি কৃষিকাজ করতেন। খুবই অমায়িক
ছিলেন। ছোট ছোট করে কথা বলতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম তুষ্টবানু। তাঁদের পাঁচ ছেলে,
পাঁচ মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সখিনা খাতুন, ইন্নস
আলী, জহুরা খাতুন, সফুরা খাতুন(মৃত), জিন্নত
আলী, নিয়ামত আলী, হাসেন আলী, আবুল হোসেন,
সরবানু, মমতাজ খাতুন ।
সবুর উদ্দিন পনের বছর এবং তুষ্টবানু
চার বছর আগে মারা গেছে। মেয়ে সরবানুও তিন বছর আগে মারা গেছে।
কফিল উদ্দিন-
কফিল উদ্দিন বয়সে আমার থেকে কিছুটা বড় ছিলো। তিনি কাদং হাইস্কুলে পড়তেন। লোক
সমাজে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। নাটকে ভালো অভিনয় করতেন। একবার সে ডাকাতি কেসে
ধরা পরে জেল খেটেছিলো। জেলখানায় তিনি ‘বন্দির ছেলে’ নাটক করে খুবই
নাম করেছিলেন। পরে জেনেছি কেসটা মিথ্যা ছিলো । কেস থেকে খালাস পেয়েছিলো। সে বিয়ে
করেছিলো মরাভাজের লতিফ মুন্সির মেয়ে সুফিয়া খাতুনকে। তাঁদের দুই ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কহিনুর বেগম, সামিনা আকতার,
সানিয়ারা আকতার, শ্বফিকুল ইসলাম আব্দুল মান্নান এবং
হেলমিনা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত। কহিনুর আকতার অংগনবাদী কর্মী।
দুখী শ্বেখের সন্তাদের মধ্যে আমাদের
পাড়ায় থাকতেন ইয়ার উদ্দিন, মফিজ উদ্দিন এবং আফাজ উদ্দিন।
ইয়ার উদ্দিন-
ইয়ার উদ্দিন লম্বা ছিপছিপে গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি খুবই শান্ত এবং
ধীর-স্থির স্বভাবের ছিলেন।। আমাদের সমাজের মাতব্বর ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রীর নাম
আয়মনা খাতুন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে ইয়ার উদ্দিনের
বয়স ৩৭ বছর এবং আয়মনা খাতুনের ২৯ বছর। তাঁদের দুটি মাত্র মেয়ে ছিলো। ছেলে নেই।
মেয়েদের নাম হনুফা খাতুন এবং রহিমা খাতুন। হনুফার বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই
বুদ্ধু মিয়ার সাথে। বুদ্ধ অনেক দিন আগেই মারা গেছে। অর্দ্ধাংগ রোগ হয়ে হনুফা
খাতুন বর্তমান শয্যাশায়ী। ইয়ার উদ্দিন এবং আয়মনা খাতুন নদীতে ভাঙার আগেই মারা
গিয়েছিলো।
মফিজ উদ্দিন-
মফিজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের বলিষ্ঠ এবং তাঁর শরীরের রং ফর্সা ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকায় আমাদের গ্রামে তাঁর নাম নেই। সম্ভবতঃ তাঁর ভোট রূপাকুছিতে হয়েছিলো ৷
তিনি প্রথমে বিয়ে করেছিলেন আমাদের পাড়ারই পন্ডিত আলীর মেয়ে হাজেরা খাতুনকে। একটি সন্তান
হওয়ার পরে হাজেরা খাতুন মারা গিয়েছিলো। হাজেরা খাতুন মারা যাওয়ার পরে তিনি
বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের মুন্তাজ আলী দেওয়ানীর মেয়ে জেলেকা খাতুনকে। নদী ভাঙার
পরে তাঁরা রূপাকুছি উঠে গিয়েছিলো। তাই তাঁদের ছেলে মেয়ের বিষয়ে বলতে পারব না। অবশ্যে পরে
তাঁরা শেওরার পাথারে জমি কিনে ঘর-বাড়ী বানিয়ে ছিলো। মফিজ উদ্দিন অল্প কয়েকদিন
আগে শেওরার পাথারেই মারা গেছে।
আফাজ উদ্দিন-
আফাজ উদ্দিন লম্বা, বলিষ্ঠ এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ
করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বয়স ছিলো ২৬ বছর। সে বিয়ে করেছিলো
বালাজানের মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে জহুরন নেসাকে। মোসলেম উদ্দিন বাবাদের চাচাতো ভাই
ছিলো। সেই সুবাদে জহুরন নেসা আমাদের চাচাতো বোন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায়
জহুরনের বয়স ছিলো ২১ বছর। জহুরন নেসা অনেক দিন আগে মারা গেছে। জহুরনের মৃত্যুর
পরে আফাজ উদ্দিন কয়াকুছির ভৌকামারিতে আবার বিয়ে করে সংসার বেঁধেছিলেন। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর কয়েকজন ছেলে-মেয়ে আছে বলে শুনেছি, তবে, তাঁদের
বিষয়ে আমি বলতে পারব না।
আফাজ উদ্দিন অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
রাজুবালা-
রাজুবালা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণা ছিলো। সে মানসিকভাবে কিছু বাধাগ্রস্ত ছিলো।
তাঁর বিয়ে হয়েছিলো রূপাকুছির কালু মিয়ার সাথে। তাঁদের একটি মাত্র ছেলে। নাম
জাকির হোসেন। রাজুবালা মারা গেছে।
এবাদুল্যা শ্বেখঃ-
এবাদুল্যা লম্বা, বলিষ্ঠ এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার নাম
পলান শেখ। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৫৫ বছর। তাঁর স্ত্রীকে
আমি দেখেছিলাম যদিও তাঁর চেহেরা মনে নেই। তিনি যে মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ
ছিলেন শুধু এইটুকুই মনে আছে।। তিনি ১৯৬৬ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন। যার জন্য
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তাঁদের একমাত্র ছেলে নালু মিয়া। মেয়ে
নেই।
নালু মিয়া-
নালু মিয়া ছোট-খাটো এবং শ্যামবর্ণের ছিলেন। তিনি কৃষি কাজ করতেন। তিনি মাছ ধরায়
খুব ওস্তাদ ছিলেন। হাত বরশী এবং দাঁওন দিয়ে তিনি অনেক মাছ মারতেন। এমনও প্রবাদ
ছিলো যে, জলে মাছ নাথাকেলও নালু মিয়ার বরশীতে মাছ ধরে। নানা রকম ঘুড্ডি
বানাতেও ওস্তাদ ছিলেন তিনি। চং, পত্তিঙা, চিলা প্রভৃতি।
তাঁর ঘুড্ডিগুলো দেখতে খুবই সুন্দর হতো। তিনি খুব ভালো অভিনয় করতেন। তাঁর
কণ্ঠস্বর খুবই বলিষ্ঠ ছিলো। অন্যান্য পাড়ার লোকদের নিয়ে আমাদের পাড়ায় একটি
যাত্রাদল গঠন করেছিলো। তাঁরা অভয়-দুলাল যাত্রাপালা অভিনয় করতো। সেখানে নালু
মিয়া ধর্মের অভিনয় করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নালু মিয়ার বয়স
ছিলো ২১ বছর।
নালু মিয়া বিয়ে করেছিলো মহম্মদ পুরের
তারাবানুকে। আমাদের কাকা ভেলু মিয়া তাঁদের বিয়েয় উকিল হয়েছিলো। তখন উকিল
মেয়েকে নিজের মেয়ের মতোই আদর করতো উকিল বাবারা। সেই সুবাদে নালু মিয়া আমাদের
ভগ্নীপতি ছিলেন। আমরা তাঁকে ‘মিয়াভাই বলে ডাকতাম। আমাদের উকিল বোন
তারাবানু মাঝে-মধ্যেই আমাদের বাড়ীতে নাইওর যেতো। আমরা তাঁকে আপন বড় বোনের মতই
শ্রদ্ধা করতাম। তাঁরাবানু দেখতে খুবই উচা-লম্বা এবং হৃষ্ট-পুষ্ট ছিলো। একেবারে
পালোয়ানের মতো। পাঞ্জাব অথবা হারিয়ানায় জন্ম হলে নিশ্চয় সে পালোয়ানই হতো।
তাঁদের দুই ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম সমেজ উদ্দিন ও মিনাজ
উদ্দিন এবং মেয়ের নাম মজিরন নেসা।
নালু মিয়া এবং তারাবানু অনেক দিন আগেই
মারা গেছে।
জহুরুদ্দিনঃ- জহুরুদ্দিন
লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মেহের শ্বেখ। তিনি আমাদের গ্রামের
বয়োবৃদ্ধ লোকদের একজন ছিলেন। তাঁদের দু'টি বাড়ী ছিলো। একটি ছিলো জাহানারপাড়ে
এবং অপরটি আলীগাঁয়ে। তাঁর দু'টি পক্ষ ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর
নাম মজিরন নেসা। জহুরুদ্দিনের পরিয়াল আগে আলীগাঁয় বাস করতেন। ১৯৬০ সালে তাঁর
ছেলেরা আমাদের পাড়ায় স্থানান্তর হয়েছিলো। তখন জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে
জহুরুদ্দিন কয়েক বছর তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আলীগাঁয় তাঁর ছোট ভাই কাঞ্চু শ্বেখের
পরিয়ালে ছিলেন। সেজন্য তাঁর ছেলেদের ভোট ১৯৬৬ সালে পূব দেউলদি হয়েছিলো যদিও ১৯৬৬
সালে জহুরুদ্দিন এবং মজিরন নেসার ভোট আলীগাঁয় হয়েছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে জহুরুদ্দিনের বয়স ৭৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী মজিরন নেসার ৬০ বছর।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম বেলি
খাতুন। তিনি আমাদের পাড়ারই নান্দু শ্বেখের মেয়ে।
বেলি খাতুন বোবা ছিলেন। মোটেই কথা বলতে
পারতেন না। শুধু আ- আ- করতেন। তাই সবাই তাঁকে বোবী বলে ডাকত। তিনি দেখতে খুবই
সুন্দরী ছিলেন। লম্বা-চওড়া এবং গাত্রের রং কাচা হলুদের মতো ছিলো। কথা বলতে না
পারলেও সবার সাথে সৎ ব্যবহার করতেন এবং সকল কাজ সুন্দরভাবে করতে পারতেন।
ইস্টি-কুটুম্ব গেলে তাঁদের যথাযথ সমাদর করতেন।
জহুরুদ্দিনের প্রথম পক্ষের স্ত্রী
মজিরন নেসার তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হিকমত আলী,
হায়াত আলী, ফুলমালা খাতুন এবং ওয়াজুদ্দিন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী বেলি খাতুনের
এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের নাম পলান আলী এবং মেয়ের নাম হামেলা খাতুন।
হিকমত আলী-
হিকমত আলী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। তিনি ধীর-স্থির স্বভাবের ছিলেন। হিকমত
আলীর স্ত্রীর নাম বেলিমন নেসা। আমাদের পাড়ারই মাতাব আলী মুন্সির মেয়ে। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হিকমত আলীর বয়স ৪২ বছর এবং তার স্ত্রী বেলিমনের ২৮
বছর। আমি বয়সে হিকমত আলীর চেয়ে অনেক ছোট হলেও আমাকে যথেষ্ট সন্মান করতেন। অনেক
কাজে আমার পরামর্শ নিতেন। বাঘবর থানা নদীপ্রবণ এলেকায় হওয়ার জন্য থানায় সব সময়
দু'টি নৌকা মজুত থাকতো। হিকমত আলীদের একটি বড় নৌকা ছিলো। সেই নৌকা
নিয়ে তিনি বাঘবর থানায় থাকতেন ।
হিকমত আলীর দু'টি পক্ষ ছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী বেলিমনের গর্ভে রূপবানু এবং সহরবানু নামের দুটি মেয়ে জন্মের
পরে আর কোনো সন্তান হয়নি। তাই ছেলে সন্তানের আশায় আমাদের পাড়ার নবুরুদ্দিনের
মেয়ে হামেলা খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন। তবে, তাঁর ছেলে
সন্তানের আশা পূরণ হয়নি। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে চারটি মেয়ে সন্তান জন্ম
লাভ করেছে। মেয়েদের নাম যথাক্রমে নয়ন বানু, ফুলবানু,
জ্যোৎস্না বানু এবং চন্দ্ৰবানু।
হিকমত আলী ১৯৯৫ এবং বেলিমন নেসা ২০১৮
সালে মারা গেছেন।
হায়েত আলী-
হায়েত আলী লম্বা-চওড়া এবং বলিষ্ঠ। তাঁর শরীরের রং ফর্সা। তিনি চাষ-আবাদের সমান্তরালভাবে
ধান-চালের ব্যবসা করতেন। এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে এবং ছেলে-পেলে কাজের উপযুক্ত
হয়েছে, তাই এখন আর ব্যবসা করেন না। তিনি বিয়ে করেছেন চারটি। প্রতিটা
বিয়েতেই আমি উকিল হয়েছি। তিনি প্রথম বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের হাকিমুদ্দিনের
বোন তারাবানুকে। তারাবানুকে বিয়ে করার সময় আমি খুবই ছোট ছিলাম এবং তখন আমরা
আলীগাঁয়ে ছিলাম। তারাবানুকে কখন বিয়ে করেছিলো সেকথা আমি বলতে পারব না। তবে,
সে যে আমার উকিল মেয়ে ছিলো এ কথা জানা ছিলো। সে আমাকে কোলে নিয়ে
ঘুরে বেড়াতো। কি জন্য জানিনা, তারাবানু ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিলো।
তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। তারাবানুর মৃত্যুর পরে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের
তহের আলীর মেয়ে জবেদা খাতুনকে। তখন আমি ছোট ছিলাম যদিও বিয়ের কথা আমার মনে আছে।
তাহের আলীর ওঠোনে সামিয়ানা টানিয়ে সেখানে বরযাত্রীদের বসতে দিয়েছিলো। আমি বাবার
কোলে বসে একটি চাদরের এক প্রান্তে ধরেছিলাম এবং হায়াত আলী অন্য প্রান্তে
ধরেছিলেন। মুন্সি সাহেব কেমনে বিয়ে পড়িয়েছিলো, সে কথা আমার মনে নেই।
অজ্ঞাত কারণে জবেদা খাতুনের নাম
তারাবানুই রেখেছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হায়াত আলীর বয়স ৩৯ বছর এবং
জবেদা খাতুনের ২৯ বছর। জবেদা খাতুন শান্ত-শিষ্ট এবং ধীর-স্থির স্বভাবের ছিলো।
জবেদা খাতুনের গর্ভে এক মেয়ে, চার ছেলে। মেয়ের নাম কদবানু। মেয়ে
সবার বড়। বিয়ে হয়েছে শালবারী অঞ্চলের চেংলীমারীর আব্দুল হামিদের ছেলে আরফান
আলীর সাথে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে মহম্মদ আলী, ইয়াদ আলী,
নিয়েত আলী এবং রহম আলী। নিয়েত আলী হায়ার সেকেন্ডারী পাস করেছিলো।
সে ২০১৭ সালে মারা গেছে। মহম্মদ আলী স্নাতক। সে পোষ্ট মাস্টর। ইয়াদ আলী বাঘবর
বাজারে মুদির দোকান করে। রহম আলীও ব্যবসায়ী।
জবেদা খাতুনের মৃত্যুর পরে বিয়ে
করেছিলো আলীগাঁয়ের আশ্রব আলীর মেয়ে খোদেজা খাতুনকে। সে বিয়ে বেশিদিন টেকেনি।
বছরখানেক পরেই উভয়ের সন্মতিতে তালাক হয়ে গিয়েছিলো। খোদেজা খাতুনের কোনো
সন্তান-সন্ততি হয়নি।
খোদেজা খাতুনের সাথে তালাকের পরে বিয়ে
করেছে শালবারীর নবুরুদ্দিনের মেয়ে তারাবানুকে। তারাবানুর গর্ভে এক ছেলে, এক
মেয়ে। ছেলের নাম তরপ আলী এবং মেয়ের নাম হাসেনা বানু।
হায়েত আলী আলী ২০২২ সালে মারা গেছেন। তারাবানু
এখনও জীবিত।
ওয়াজুদ্দিন-
ওয়াজুদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। ছোট বেলা তাঁর বসন্ত রোগ হয়েছিলো । তাই
মুখে বসন্তের দাগ বিদ্যমান ছিলো। তিনি কৃষিকাজের সমান্তরালভাবে ব্যবসায় করতেন।
তিনি বিয়ে করেছিলেন আমাদের পাড়ারই আব্দুল খালেকের মেয়ে কমলজান নেসাকে। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে ওয়াজুদ্দিনের বয়স ২৯ বছর এবং কমলজান নেসার ২৩ বছর।
কমলজানের শরীরের রং শ্যামলা। স্বভাব শান্ত-শিষ্ট। তবে, একটু খাটো এবং
স্বাস্থ্যবান। তাঁদের ছেলে-মেয়ে তিন জন। দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে বিশ্বা মিয়া, লালবানু এবং আব্দুর রহিম। বিশ্বা
লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ। বাঘবর পঞ্চায়েত নির্বাচনে সে একবার বাঘবর পাথারের
ওয়ার্ড মেম্বার হয়েছিলো। আব্দুর রহিম দর্জি কাজ করে। সে মার মতোই একটু খাটো। তবে
শরীরের রং ফর্সা এবং স্বাস্থ্যবান। কমলজান নেসা এখনও জীবিত।
পলান মিয়া-পলান
মিয়া জহুরুদ্দিনের দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে। সে লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা। আমার থেকে
কিছুটা ছোট। যৌবনকালে তাঁর শরীরে প্রচুর শক্তি ছিলো এবং নৌকার দাঁড় বৈঠা টানায়
খুব ওস্তাদ ছিলো। তাঁর দাঁতগুলো একটু ফাঁক ফাঁক। সে ধীর-স্থির স্বভাবের। সে
চাষ-বাসের সমান্তরালভাবে ব্যবসা করে। সে বিয়ে করেছে আমাদের পাড়ারই আসরুদ্দিনের
মেয়ে আউসীমন নেসাকে। তাঁদের ছয় ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম আসান আলী,
পাশান আলী, সাহজাহান আলী, ময়েজ উদ্দিন,
আতর আলী এবং গোলাপ হোসেন। মেয়েদের নাম উজালা খাতুন এবং হালিমন নেসা।
ছেলেরা ব্যবসায় করে।
পলান এবং তাঁর স্ত্রী এখনও জীবিত আছে।তবে
পলান আলী কেন্সার রোগে আক্ৰান্ত।
হামেলা খাতুন-
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে হামেলা খাতুন । সে লম্বা-চওড়া এবং শরীরের
রং কাচা হলুদের মতো। ছোট বেলা সন্নিপাত জ্বর হয়ে সে চোখের দৃষ্টি শক্তি
হারিয়েছিলো। অন্ধ হলেও সে সকল কাজ-কাম নির্ভুলভাবে করতে পারতো। তবুও অন্ধ কারণে
কেউ বিয়ে করতে এগিয়ে আসেনি। তাই অন্ধত্ব থেকে পরিত্রাণের জন্য অনেক চিকিৎসা করা
হয়েছিলো। আমি নিজেই একবার তার ভাইদের সহযোগিতায় কোচবিহার নিয়ে গিয়েছিলাম।
ডাক্তর পরীক্ষা করে বলেছিলেন- আমি পরীক্ষা করে দেখলাম, আলো অনুভব করতে
পারে। উন্নত চিকিৎসা করালে ভালো হতে পারে। তবে, কোচবিহারে এর
চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না। পাটনা গিয়ে দেখতে পারেন।
পাটনা নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো যদিও পরে
আর নিয়ে যাওয়া হয়নি। তাই তাকে চিরজীবন অন্ধকারেই কাটাতে হচ্ছে। একটু বেশি বয়সে
তাকে বিয়ে করেছে মরাভাজের শুকুর আলীর ছেলে আয়নাল হক। তাদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে
হয়েছিলো। তারা শিশু অবস্থাই মারা গেছে। হামেলা খাতুনও ২০০৮ সালে মারা গেছে।
জয়ধর আলীঃ- জয়ধর আলী
আমাদের সম্পর্কীয় জেঠা। বাবাদের খালাত ভাই। তিনি লম্বা-চওড়া হৃষ্ট-পুষ্ট এবং
শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর স্বভাব শান্ত-শিষ্ট ছিলো। তিনি আমাদের মসজিদের জন্য আধা
বিঘা জমি দান করেছিলেন। তিনি কৃষিকাজ করতেন। জয়ধর জেঠার দুটি পক্ষ ছিলো। প্রথম
পক্ষের স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে মৃতু বরণ করেছিলো। প্রথম পক্ষের
স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে তিনি ছেঙা অঞ্চলের রৌমারি গ্রামের শামেলা খাতুনকে বিয়ে
করেছিলেন। প্রথম পক্ষের স্বামী মারা যাওয়ার পরে সামেলা খাতুন হুটু নামের একটি
ছেলে সহ জয়ধর আলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলো। সেই সুবাদে জয়ধর আলীর তিন
ছেলে এবং দুই মেয়ে। প্রথম পক্ষের ছেলের নাম ছিলো মেসের আলী। মেসের আলী অনেকদিন
আগে মারা গেছে। অবশ্যে তার ছেলে-মেয়েরা জীবিত আছে।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী সামেলা খাতুনের
দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হুটু মিয়া, জমেলা
খাতুন, হরিন বানু এবং আমির আলী। হরিন বানুকে লোকে হর বলে ডাকতো। আমি তামাসা
করে হর গোবিন্দ বলে ডাকতাম। ছেলেরা সবাই মারা গেছে। এখন জীবিত আছে জমেলা খাতুন এবং
হরিন বানু। ওদের বালিকুরিতে বিয়ে হয়েছে। কারণ আমাদের পাড়াটা নদী ভাঙনের কবলে
পরার পরে জেঠী ছেলে- মেয়েদের নিয়ে বালিকুরি অঞ্চলের টেবিল-এ উঠে গিয়েছিলো।
জেঠি সামেলা খাতুন প্রথমে গিয়ে এলাহি
বক্সের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলো। এলাহি বক্স আমাদের ফুফু হালেমন নেসার ধর্মবাবা
ছিলো। সেই সুবাদেই এলাহি বক্সের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক ছিলো। এলাহি বক্সের ছেলের
বিয়েতে আমি ফুফুর সাথে একবার তাঁদের বাড়ী গিয়েছিলাম। সেই বিয়েতে কাদঙের ‘শ্বহীদ
কারবালা' গীতিনাট্য অভিনীত হয়েছিলো।
তালু মিয়াঃ- তালু মিয়া
মাঝারি গঠনের হৃষ্ট-পুষ্ট এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি ১৯৬৬ সালের আগেই
আমাদের পাড়ার ওয়াজুদ্দিনের কাছে জমি বিক্রী করে কাদং অঞ্চলের রূপাকুছি চলে
গিয়েছিলেন। তাই ১৯৬৬ সালের পূব দেউলদির ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তালু মিয়া
বলশালী, সাহসী এবং গোয়ার প্রকৃতির লোক ছিলেন। আগেই বলেছি আমাদের পাড়াটা ছিলো
বন্যাপ্রবণ এলেকায়। বছরের প্রায় পাঁচ ছয় মাস জলের তলায় ডুবে থাকতো। আউশ,
আমন বা শালিধান তেমন হতো না। তাই গরু ছাগলের খাবার জন্য ঘাস থাকতো
না। বর্ষা মাসে ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চর থেকে কাইশা বন কেটে এনে গরু ছাগলদের
খাওয়াতে হতো। ব্রহ্মপুত্র নদ তখন খুবই ভয়ংকর ছিলো। স্রোত ছিলো প্রচন্ড তীব্র।
বড় বড় ঘূর্ণিপাক পড়তো। এক মাইল দূর থেকেই জলের গর্জন শুনা যেতো। তাই কেউ ছোট
নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে সাহস করতো না। বড় বড় নৌকা নিয়ে কাইশা বন কাটতে যেতো।
তালু মিয়ার চৌধ্য পনের হাত একটি নৌকা ছিলো। সে একাই সেই নৌকা নিয়ে ঘাস কাটতে
যেতো। একবার ঘূর্ণি পাকে পরে তাঁর নৌকা ডুবে গিয়েছিলো। নৌকায় কাইশা থাকার জন্য
নৌকাটা কিছু পরেই জলের উপরে ভেসে উঠেছিলো। তখন বড় নৌকা গিয়ে তাঁকে নৌকা সহ
উদ্ধার করেছিলো।
একবার তালু মিয়া কাদং বাজার থেকে দেড়
মোন ধান কিনেছিলো। কাদং আমাদের গ্রাম থেকে কমেও আঠ মাইল দূরে। তখনকার দিনে কাদং
আসা-যাওয়ার জন্য খরা মরশুমে হাঁটা পথ এবং বর্ষার মরশুমে নৌকাই ছিলো একমাত্র ভরসা।
তালু মিয়া একবার উন্না মাসে কাদং হাটে গিয়ে দেড় মোন ধান কিনেছিলো। সেই ধান
মাথায় নিয়ে মুড়ি চিবোতে চিবোতে তিনি বাড়ী এসেছিলেন। এমনকি গুদারা নৌকায়ও তিনি
ধানের বস্তা মাথায় নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলো। এমনই বলশালী ছিলো তালু মিয়া। তালু
মিয়া কাদং অঞ্চলের মহম্মদ পুর গ্রামে ২০ বছর আগে মারা গেছে।
তালু মিয়ার স্ত্রীর বাম চাপার মাংস
ছিল না। তাই বাম চাপার দাঁতগুলো বের হয়ে থাকতো। সেও অনেকদিন আগে মারা গেছে।
তালু মিয়ার ছেলে-মেয়ে চারজন। বড়
মেয়ের নাম ছিলো রংমালা। পরের দুই মেয়ের নাম সূর্য্যবানু এবং চন্দ্রবানু। ছেলের
নাম মহম্মদ আলী। রংমালার বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের মহম্মদ আলীর ছেলে আসান
উদ্দিনের সাথে। আসান ১৫ বছর ও রংমালা ১২ বছর আগে মারা গেছে। তাঁদের ছেলে-মেয়েরা
জীবিত আছে।
ছেলে মহম্মদ আলী ২০১৮ সালে মৃত্যু বরণ
করেছে।
আসরুদ্দিনঃ- আসরুদ্দিন
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শামবর্ণ ছিলো। তাঁর বাবার নাম মাজম আলী। তিনি আমাদের
কাকা ভেলু মিয়ার ভায়রা ছিলেন। তাঁর সাথে আমাদের কাকার খুবই সদ্ভাব ছিলো ।
আসরুদ্দিন প্রায়ই ভাটিবেলা আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতেন এবং রন্ধন গৃহে চৌকার
পাশে বসে চাচীর সাথে গল্প করতেন ৷ ভাত না খেয়ে প্রায় যেতেনই না। তাই আমাদের কাকা
একদিন ভাত খেতে ডাকার পরে আসরুদ্দিন বলেছিলো- কি দিয়ে ভাত?
তখন কাকা ঠাট্টা করে বলেছিলো- না,
আজ তরকারি নেই। মরিচ বাটা দিয়েই খেতে হবে।
তখন আসরুদ্দিন বলেছিলেন- রেজিয়ার মার
হাতের মরিচ বাটাও অনেকদিন খাইনি। বাড়তে বল। রেজিয়া আমাদের কাকার বড় মেয়ে। তাই
আসরুদ্দিন চাচীকে রেজিয়ার মা বলে ডাকতেন। এমনই সুসম্পর্ক ছিলো আমাদের কাকার সাথে
আসরুদ্দিনের। তাঁকে আমরা খালু বলে ডাকতাম। আসরুদ্দিন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। তাঁর কাজ
খুব পরিপাটি ছিলো। তবে, কাজ খুব আস্তে-ধীরে করতেন, কাজ
টিপে টিপে করতেন বলে সবাই তাঁকে ‘টিপা’ মিস্ত্রী বলতো।
তাঁদের একটি পাতি লেবুর গাছ ছিলো। গাছটি আমাদের পাড়ায় খুবই বিখ্যাত ছিলো। পাড়ার
সবাই জানতো গাছটির কথা। লেবু খুবই সুস্বাদু ছিলো। মুখে রুচি না থাকলে সেই লেবু
দিয়ে ভাত খাওয়া যেতো। তখনকার দিনেই একটি লেবু চার আনা করে বিক্রী করতো।
আসরুদ্দিনের স্ত্রীর নাম সুরিয়া খাতুন। সুরিয়া খাতুন
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি খুবই অমায়িক এবং মৃদুভাষী ছিলেন।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
আসরুদ্দিনের বয়স ৫২ বছর এবং তাঁর স্ত্রী সুরিয়া খাতুনের বয়স ৪০ বছর ছিলো।
তাঁদের তিন ছেলে এবং চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আমিরন নেসা, আউসীমন নেসা, খুশিমন নেসা,
সবুরুদ্দিন, হাবেজ উদ্দিন, ময়নাল হক এবং
ফিরোজা খাতুন।
ছেলে-মেয়ে কেউ লিখা-পড়া শেখেনি।
মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ব্যবসা করে ছেলেগুলো সবাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ছোট ছেলে
ময়নাল হক ব্যবসায়ে খুবই উন্নতি করেছে। তাকে বাঘবর অঞ্চলে সবাই মারোয়ারি বলে
সম্বোধন করে।
সুরিয়া খাতুন ১৯৮৯ এবং আসরুদ্দিন ১৯৯১
সালে মৃত্যু বরণ করেছে। ছেলে-মেয়েরা সবাই জীবিত আছে।
জোনাব আলীঃ- জোনাব আলী
অপেক্ষাকৃত খাটো এবং স্বাস্থ্যবান ছিলো। মুখে চাপ দাড়ি এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর
বাবার নাম লালচান মিয়া। প্রথম জীবনে তিনি কৃষিকাজ করতেন। পরে সুফি পীর হয়েছিলেন।
তাঁর কিছু মুরিদান আছে। তিনি সবার সাথে মিশতে পারতেন। সহজ-সরল লোক ছিলো। তাঁর
স্ত্রী ওয়াকজান নেসা সুন্দরী ছিলেন। তিনি মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। মৃদুভাষী
এবং সহজ-সরল ছিলেন। আমাদের ফুফাত ভাই ফজল হক তাঁদের মেয়ে রংমালাকে বিয়ে করেছিলো।
সেজন্য জোনাব আলীকে তাওই এবং ওয়াকজান নেসাকে আমরা মাউই বলে সম্বোধন করতাম। তাঁরা
আমাদের খুবই আদর-সোহাগ করতো।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে জোনাব
আলীর বয়স ৪২ এবং ওয়াকজান নেসার ৩২ বছর ছিলো। নদী ভাঙনের পরে জোনাব আলী বালাজান
উঠে গিয়েছিলো। বালাজানও ১৯৮৭ সালে বেকি নদীর ভাঙনের কবলে পরাতে ছেলেগুলো কেউ কেউ
গোয়ালপাড়া উঠে গিয়াছে এবং কেউ কেউ বাঘবর অঞ্চলেই রয়ে গেছে।
জোনাব আলী ১৯৯৭ সালে এবং ওয়াজান নেসা
২০১৫ সালে গোয়ালপাড়াতে মারা গেছে।
জোনাব আলী দম্পতির চার ছেলে এবং তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রংমালা খাতুন, দির গজ আলী,
হজরত আলী, রহম আলী, হোসেন আলী,
জয়মালা খাতুন এবং খইমালা খাতুন। রংমালা খাতুন- রংমালা দেখতে খুবই
সুন্দরী ছিলো। মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং কাচা হলুদের মতো ছিলো। তার বিয়ে
হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই পন্ডিত আলীর ছেলে ফয়জল হকের সাথে। তাঁদের দুই
মেয়ে ফজিরন নেসা এবং মজিরন নেসা। রংমালা অনেকদিন আগে মারা গেছে।
দিরগজ আলী-দিরগজ
আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে ছেলেবেলা চঞ্চল স্বভাবের
ছিলো। খুব কথা বলতো। কারো সাথে কাইজা-পেচাল করতো না। হেঁসে হেঁসে কথা বলতো। কিছুটা
কৌতুকপ্রিয়ও ছিলো।
দিরগজ আলী খোলা-ধুলায় ভালো ছিলো।
ব্রহ্মপুত্র নদ তখন একেবারে আমাদের বাড়ীর সামনে। তাই নদী থেকে বালু উঠে আমাদের
পাড়ায় বালুর পুরো আস্তরণ পরেছিলো। সেই বালুর মাঝে যদু জেঠার বাড়ীর সামনে আমরা
বিকেল বেলা হা-ডুডু খেলতাম। হা-ডুডু খেলার মাঝে হাই-জাম্প এবং লং-জাম্পেরও
প্রেকটিস্ করতাম। তখন দিরগজ আলী হাইজাম্পে পাঁচ ফুট এবং লংজাম্পে ১৭ ফুট পর্যন্ত
যেতে পারতো।
দিরগজ আলী বর্তমান গোয়ালপাড়াতে থাকে।
সে বিয়ে করেছে বালাজানের জবেদ আলীর মেয়ে তাজিরন নেসাকে। দিরগজ আলী এখন সুফি
সাধক। মুর্শিদি গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে। বাড়ীতে ঢোল-খোল- তাল-দোতারা
আছে। তাঁদের তিন মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়েদের নাম জেলেকা খাতুন, এলেসা
খাতুন ও সালেহা খাতুন এবং ছেলেদের নাম তাইজুদ্দিন ও সাইজুদ্দিন। ছেলে-মেয়েরা কেউ
তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। ছেলেরা ব্যবসায়ে নিয়োজিত। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। দিরগজ
আলীর স্ত্ৰী ২০২২ সালে মারা গেছে।
হজরত আলী-
হজরত আলী লম্বা ছিপছিপে গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে মৃদুভাষী। সে বিয়ে করেছে
কাদঙের আব্দুল কাদেরের মেয়ে অজুপা খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাফিজা খাতুন, বাবুল আকতার এবং
রুবুল আকতার।
রহম আলী-রহম
আলী মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা। সে বিয়ে করেছে গোয়ালপাড়ার কদবানুকে ।
তাদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মহিবুল
ইসলাম, আরিফ আলী, রহিমা খাতুন এবং তালেব আলী। রহম আলী ব্যবসায়ী।
হোসেন আলী-
হোসেন আলী মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা। সে মৃদুভাষী। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের
মিয়াচানের মেয়ে মিশ্রন নেসাকে। তাদের এক ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে হোসনা বানু, সাহিদা খাতুন, সিলিমা খাতুন
এবং মেহের আলী। হোসেন আলী ব্যবসায়ী।
সালাম উদ্দিনঃ-
জোনাব আলীর ছোট ভাই সালাম উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। কারো
সাথে তেমন মেলা-মেশা করতো না। সহজ-সরল স্বভাবের ছিলো। তাঁর স্ত্রী ফুলজান নেসাও
সহজ-সরল স্বভাবের ছিলো। সে মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে সালাম উদ্দিনের বয়স ৪০ বছর এবং ফুলজান নেসার ২৮ বছর। সালাম
উদ্দিন ১৯৮৩ সালে বাঘবর পাথারে মারা গেছে।
সালাম উদ্দিনের দুটি পক্ষ ছিলো। প্রথম
পক্ষের স্ত্রী ফুলজান নেসার মৃত্যুর পর বালাজানের ইয়াকুব আলীর মেয়ে ফালানী
খাতুনকে বিয়ে করেছিলো।
সালাম উদ্দিনের প্রথম পক্ষের তিন ছেলে
যথাক্রমে শিরজন আলী, কুজরত আলী এবং দরবেশ আলী। দ্বিতীয় পক্ষের
একমাত্র মেয়ের নাম জহুরা খাতুন। ছেলেগুলো মাঝারি গঠনের এবং শ্যামলা রঙের । কেউ
লিখা-পড়া শেখেনি। মেয়ে জহুরা খাতুন ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। বিয়ে হয়ে গেছে।
ঘর-গৃহস্থালি করে।
মাতাব আলী মুন্সি-মাতাব
আলী মুন্সি ছোট-খাটো গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলেন। তিনি
আমাদের মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। আরবী এবং বাংলা সাবলীলভাবে
পড়তে পারতেন। তিনি মাঝে সময়ে প্রয়োজনে ভিক্ষাও করতেন। তবে, গ্রামে
না, হাটে হাটে। খুবই অমায়িক স্বভাবের লোক ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৭৫ বছর। মাতাব আলী মুন্সির দুটি পক্ষ ছিলো । প্রথম
পক্ষের স্ত্রীকে আমি দেখিনি। নামও জানিনা। আমি ছোট থাকতেই সম্ভবতঃ মারা গিয়েছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বেলিমন নেসা নামের একটি মেয়ে এবং ডাওরী নামের একজন ছেলে
সন্তান ছিলো। বেলিমন নেসার বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই জহুরুদ্দিনের ছেলে হিকমত
আলীর সাথে। আমরা যখন দেখেছি তখন ডাওরী মাতাব আলী মুন্সির সাথে থাকতো না। বিয়ে করে
আমাদের গ্রামেই অন্য পাড়ায় বসবাস করতো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে
মাতাব আলী মুন্সি সরিফন নেসাকে বিয়ে করেছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সরিফন নেসার বয়স ছিলো ৪৮ বছর। তিনি আমাদের সম্পর্কীয় বোন ছিলো। আমি বুবু বলে
ডাকতাম। খুবই জনপ্রিয় মহিলা ছিলেন। শরীরের রং কালো ছিলো। হৃষ্ট-পুষ্ট, স্বাস্থ্যবান
ছিলেন। তিনি ধাই হিসাবেও বিখ্যাত ছিলেন। হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। প্রচুর পাণ খেতেন।
পাণ খেলেও দাঁতগুলো পরিস্কার করে রাখতেন। ছোট-খাট রোগের চিকিৎসাও করতেন। আমার এক
সময় মাঝে সময়ে মাথা ব্যথা করতো। তখন তিনিই আমার মাথা ব্যথার চিকিৎসা করতেন। টাকা
পয়সা কিছু দিতে হতোনা, হাজত হিসাবে এক গোছা করে পাণ দিতে হতো। চোখের
ওপড় এবং তলের কোলের ভেতর সেই পাণের ডাঁটি ঢুকিয়ে চোখ থেকে এক ধরণের বিজল বের করে
জলের মাঝে ছেড়ে দিতো। তখন জলের মাঝে সেই বিজল ভাসতো । এই রকম কয়েক দফা বিজল বের
করে দিলেই মাথাব্যথা কমে যেতো। পরে আমি নিজেই এ-কাজ করতাম এবং বেদনা থেকে উপশম পেতাম। কারও মাথা ব্যথা
হলে আমি তাকে এ-কাজ করার জন্য পরামর্শ দিতাম। আসলে চোখের মাঝে
এক ধরণের বিজল জমা হলে মাথা ব্যথা করে, বিজল বের করে দিলেই ব্যথা উপশম হয়।
এখানে অন্য কোনো কেরামতি নেই।
মাতাব আলীর দুই ছেলে। মেয়ে নেই। বড়
ছেলের নাম ছিলো বুদ্ধু মিয়া এবং ছোট ছেলের নাম বোরহান আলী। বুদ্ধু মিয়া- বুদ্ধু
মিয়া মাঝারি গঠনের এবং দেখতে মায়ের মতই হৃষ্ট-পুষ্ট ছিলো। তাঁর শরীরের রং কালো
ছিলো। সে কাঠমিস্ত্রী ছিলো। তাঁর কাজ খুব পরিপাটি ছিলো। আমাদের বাড়ীর অনেক কাজ
করিয়েছি তাঁকে দিয়ে। আমার পরামর্শ মতে সে আমাকে একটি তিন পায়া টেবিল বানিয়ে
দিয়েছিলো। টেবিলটা অবশ্যে নেই, তবে তার একটি পায়া এখনও আছে আমাদের
বাড়ীতে। সে দোতরা বাজাতে পাড়তো। আমি কয়েকদিন তাঁর কাছে দোতরা বাজনা শিখেছিলাম।
দোতরাটাও বুদ্ধই যোগাড় করে দিয়েছিলো। অবশ্যে শিক্ষা শেষ করতে পারিনি।
বুদ্ধু মিয়া সাহসী এবং একটু গোয়ার
প্রকৃতির ছিলো। সে যে গোয়ার এবং সাহসী ছিলো একটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।
১৯৭৮ সালের কথা। আমরা একবার গোয়ালপাড়ার শিমলতলা খগেন মেধির কাঠ-মিলে নৌকা নিয়ে
কাঠ কিনতে গিয়েছিলাম। সেদিন আমার সাথে ছিলো ওয়াজুদ্দিন, ফয়জল হক, পলান মিয়া এবং
বুদ্ধু মিয়া। আরও কয়েকজন ছিলো যদিও এখন তাঁদের নাম মনে নেই।
বর্ষার মরশুম ছিলো। জলজলি নদীর একটি
খাল দিয়ে এগিয়ে গিয়ে নৌকাটা একেবারে খগেন মেধি বাড়ীর ঘাটে ভিরিয়ে ছিলাম। আমরা
কাঠ দেখে এসে খগেন মেধির বাড়ীতে বসে খগেন মেধির ছেলে উৎসব মেধির সাথে কথা
বলছিলাম। উৎসব মেধি লোকটি খুবই ভদ্র এবং অমায়িক ছিলো। তাঁর সাথে কথা বলে খুবই
ভালো লাগছিলো।
আমরা বসেছিলাম কয়েকটি রোম বিশিষ্ট
একটি পাকা ঘরে। আমরা যে রোমে বসেছিলাম সেই রোম সংলগ্ন একটি রোম তালাবদ্ধ ছিলো।
তালায় মরচে ধরে গিয়েছিলো। তাই তালার অবস্থা দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে
রোমটা অনেক দিন যাবত তালাবদ্ধ হয়ে আছে। উৎসব মেধির ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে আমাদের কে
একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলো- রোমটা তালা দিয়ে রেখেছেন কেন?
তখন উৎসব মেধি আক্ষেপ করে বলেছিলো-
রোমটা প্রায় ছয় মাস যাবত তালাবদ্ধ করে রেখেছি। রোমে আইড়া বল্লায় বাসা বেঁধেছে।
প্রথমে চাকটা ছোট ছিলো। এখন মস্ত বড় হয়েছে। কেউ এখন রোমে থাকতে চায় না। তাই
তালাবদ্ধ করে রেখেছি।
তখন বুদ্ধু মিয়া বলল- আমি চাকটা ভাঙতে
পারব।
উৎসব মেধি বলল- যদি কেউ চাকটা ভাঙতে
পারে, আমি তাঁকে পুরস্কৃত করব।
সেদিন রাতেই বুদ্ধু মিয়া একটি বস্তায়
ভরে চাকটা ভেঙে দিয়েছিলো এবং উৎসব মেধি তাঁকে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার দিয়েছিলো।
তখন পঞ্চাশ টাকার মূল্য কি ছিলো সেই
বিষয়ে একটু অনুমান করা যাক। তখন এক কেবি (কিউবিক)শালকাঠের মূল্য ছিলো সাড়ে তিন
টাকা। নদীপ্রবণ এলেকায় তখন দোতালা ঘর দেওয়ার এক প্রবণতা ছিলো । দোতলা ঘরের খুঁটির
জন্য ২১/২২ ফুট খুঁটির প্রয়োজন হতো। সেই খুঁটির মূল্য ছিলো যোরা ৬০
টাকা। ১২/১৩ ফুট কাঠের খুঁটির মূল্য ছিলো যোরা ১০/১২ টাকা। আমি ৩ টাকার কাঠ কিনে
একটি খাট বানিয়ে ছিলাম। খাটটি এখনও আমরা ব্যবহার করছি। এই কাঠগুলো আমরা খগেন
মেধির কাঠমিল থেকে কিনেছিলাম । তাই একেবারে প্রামাণ্য মূল্য।
বুদ্ধু আমার থেকে বয়সে কিছুটা বড়
ছিলো। সে চৌধ্য পনের বছর আগে বাঘবর পাথারে মারা গেছে। সে আমাদের পাড়ারই ইয়ার
উদ্দিনের মেয়ে হনুফা খাতুনকে বিয়ে করেছিলো। হনুফা অর্দ্ধাংগ রোগ হয়ে বর্তমান
শয্যাশায়ী। তাঁদের তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে হানিফ আলী, ইমান আলী ও
ওয়াজেদ আলী। মেয়েদের নাম সুন্দরী নেসা ও সুরমা খাতুন ।
বোরহান আলী-
বুদ্ধু মিয়ার ছোট ভাইয়ের নাম বোরহান আলী। বোরহান আলী আমার থেকে কিছুটা ছোট।
বোরহান লম্বা এবং ছিপছিপে গঠনের। শরীরের রং শ্যামলা। সে বিয়ে করেছে কয়াকুছির
ভোগামারির গাজী মামুদের মেয়ে সাহেরা খাতুনকে। নদী ভাঙনের পরে সে কিছুদিন
ভোগামারিতে ছিলো। এখন ভক্তেরডোবা অঞ্চলের হরিক্ষেত্রীতে ঘর-বাড়ী করে আছে। তার চার
মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে ফুলমালা খাতুন, আয়সা
খাতুন, সবেদ আলী(ছাবেদ আলী), ফালানী খাতুন এবং তাসমিনা খাতুন।
তাসমিনা খাতুন ম্যাট্রিক পাশ করেছে।
অন্যরা কেউ তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। প্রাইমারি পর্যন্ত পড়েছে। ছেলেরা দোকানপাট
করে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বোরহান আলী কৃষিকাজ করে।
জংসের আলীঃ- মাতাব আলী
মুন্সির পরের বাড়ীটা ছিলো জংসের আলী দেওয়ানীর। তাঁর স্ত্রীর নাম সাহাতন নেসা।
১৯৬৬ সালে তিনারা বালিকুরিতে ছিলেন। ১৯৭০ সালের পরে জাহানারপাড়ে উঠে এসেছিলেন।
জংসের আলী বৃদ্ধ ছিলেন। শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামলা ছিলো। তাঁর স্ত্রী সাহাতন
নেসাকে আমি যখন দেখেছি তখন কুঁজা হয়ে গিয়েছিলো। তাঁদের তিন ছেলে, আফাজ
উদ্দিন, মফিজ উদ্দিন এবং বসির উদ্দিন। মেয়ে তিনজন। মেয়েদের নাম আমার অজানা
।
আফাজ উদ্দিন-আফাজ
উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা ছিলো। আমার থেকে বয়সে কিছুটা বড় ছিলো।
তিনি মাতব্বরীও করতেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন বালিকুরির পরাণ দালালের মেয়ে ফুলজান
নেসাকে। তাঁদের তিন ছেলে,
ফখরুদ্দিন, আজিমুদ্দিন ও বাদশাহ মিয়া। চার মেয়ে,
সামেলা খাতুন, কমলা খাতুন, করিমন নেসা এবং
রহিমন নেসা। ছেলেদের মধ্যে একমাত্র আজিমুদ্দিন হায়ার সেকেন্ডারী উত্তীর্ণ। আফাজ
উদ্দিন অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
মফিজ উদ্দিন-
মফিজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা ছিলো। সে আমার থেকে কিছু ছোট ছিলো।
সে মৃদুভাষী ছিলো। ধীরে ধীরে সাজিয়ে ছোট ছোট করে কথা বলতো। গল্প করতে ভালো বাসতো।
সে বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের ফজর আলীর মেয়ে জহুরা খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে,
নয়ান আলী এবং আয়ান আলী ।
নয়ান আলী শান্ত স্বভাবের ছিলো। তাকে
অজ্ঞাত কারণে দুস্কৃতিকারীরা হত্যা করেছে। মফিজ উদ্দিন অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
বছির উদ্দিন-
বছির উদ্দিনের শরীরের রং শ্যামলা এবং মাঝারি গঠনের। সে মৃদুভাষী এবং সাজিয়ে কথা
বলতে পারে। গল্প করতে ভালোবাসে। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের বিনোদ আলী মুন্সির
মেয়ে জুরিয়া খাতুনকে। জুরিয়া খাতুন আমার ছাত্রী ছিলো। তাদের দুই ছেলে, সাইজুদ্দিন
ও তাইজুদ্দিন। তিন মেয়ে, বাসিরন নেসা, এসনূর খাতুন এবং
আসমিনা খাতুন। বছির উদ্দিন কৃষিকাজে নিয়োজিত ।
পন্ডিত আলীঃ- পন্ডিত আলীর
বাবার নাম ছিলো আলিমুদ্দিন। তিনি লম্বা-চওড়া এবং শ্যামলা ছিলেন। তিনি প্রতিবন্ধী
ছিলেন। তাঁর ডান হাত কনুই পর্যন্ত ছিল না। তাই তাঁকে লোকে ‘টুইন্ডা’
পন্ডিত বলতো। মৃদুভাষী ছিলো। কারো সাথে কোনো কাজিয়া-পেচাল ছিল না।
শান্ত-শিষ্ট ছিলো। হাত নেই বলে তিনি কৃষিকাজ করতে পারতেন না। ছেলেরা কাজের উপযুক্ত না হওয়া
পর্যন্ত তিনি হাটে হাটে গিয়ে ভিক্ষা করতেন। ছেলেরা কাজের উপযুক্ত হওয়ার পরে
ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছিলো। পন্ডিত আলীর স্ত্রীর নাম ছিলো ভুলিমন নেসা। তিনি
উচা-লম্বা ছিলেন। তাঁর শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ
ছিলেন। কোনো কোনো সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ী থেকে চলে যেতেন। তখন তাঁকে
খোঁজে খোঁজে বাড়ীতে
ফিরিয়ে আনতে হতো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে পন্ডিত আলীর বয়স ৫১ বছর এবং
ভুলিমন নেসার ৩৮ বছর ছিলো।
তাঁদের তিন ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলেদের
নাম শুকুর আলী, আলিমুদ্দিন এবং জেলহক আলী। মেয়ের নাম হাজেরা খাতুন । হাজেরা খাতুনের
বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই দুখী মিয়ার ছেলে মফিজ উদ্দিনের সাথে। সে অনেক দিন
আগেই মারা গেছে।
শুকুর আলী-
শুকুর আলী চম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ। সে মৃদু ভাষী এবং হেঁসে হেঁসে কথা বলে। খুবই
অমায়িক এবং মিশুক প্রকৃতির। কৃষিকাজ করেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর
বয়স ২৬ বছর। তিনি বিয়ে করেছেন আমাদের পাড়ারই যদু মুন্সির মেয়ে রহিমন নেসাকে।
রহিমন নেসার রং শ্যামলা এবং মাঝারি গঠনের। মৃদুভাষী। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম, নায়েব আলী,বছিরন নেসা,
ময়নাল হক, জয়গন নেসা এবং হুরমুজ আলী।। ময়নাল হক
২০১৯ সালে মারা গেছে। জয়গন খাতুনও কয়েক বছর আগে নাগালেন্ডে মারা গেছে। ছেলেদের
মাঝে একমাত্র হুরমুজ আলী কিছু লিখা-পড়া শিখেছে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলো যদিও
পাস করতে পারেনি।
আলিমুদ্দিন-
আলিমুদ্দিন লম্বা গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। হেসে হেঁসে কথা বলে। মৃদুভাষী। কৃষিকাজ
করে। সামনের দাঁত বের হয়ে থাকে। আলিমুদ্দিনের বয়স ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে ২৩ বছর। সে বিয়ে করেছিলো আমাদের পাড়ারই নবুরুদ্দিনের মেয়ে রূপজান
নেসাকে। রূপজান নেসা আমাদের সম্পর্কীয় ভাগনি। রূপজান নেসার শরীরের রং শ্যামলা এবং
লম্বা-চওড়া। তাঁদের দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে। ছেলেদের নাম নোয়াব আলী ও নওশাদ আলী।
মেয়েদের নাম নূরবানু, জয়মালা, তারাবানু এবং
ফিরোজা খাতুন। কেউ তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। ছেলেদের মধ্যে একমাত্র নওসাদ ক্লাস এইট
পর্যন্ত লেখা-পড়া শিখেছে এবং মেয়ের মধ্যে ফিরোজা খাতুন ম্যাট্রিক ফেল।
আলিমুদ্দিন ২০১৪ সালে মারা গেছে।
জেল হক আলী-
জেলহক আলী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা। সে আমার সমবয়সী। ছোটবেলা একসাথে খেলা-ধুলা
করেছি। মৃদুভাষী এবং হেঁসে হেঁসে কথা বলে। অবশ্যে কথা কম বলে। তার আত্মসন্মানবোধ
প্রবল। কেউ তাকে গুরুত্ব না দিলে সে তাকে গুরুত্ব দেয় না। জেলহক আলী কৃষিকাজের
পাশাপাশি ব্যবসা করে। তার পক্ষ দুটি। সে প্রথম বিয়ে করেছিলো শালবাড়ীর পানপাড়ার
ফটিক আলীর মেয়ে পরিস্কার বেগমকে। পরিস্কার বেগম মারা যাওয়ার পরে বিয়ে করেছে
বালাজানের হায়াত আলীর মেয়ে লতিফা খাতুনকে। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর দুই ছেলে,
এক মেয়ে। ছেলেদের নাম পরশ আলী এবং সুলতান আলী। মেয়ের নাম জেলেমন
খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর তিন মেয়ে। আলিয়া খাতুন, সাজেদা খাতুন
এবং তাজমিনা খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের মেয়েগুলো ছোট ছোট। সবাই স্কুলে পড়ে।
নান্দু শ্বেখঃ-
নান্দু শ্বেখকে আমি দেখিনি। নাম শুনেছি। তাঁর ছেলে-মেয়েদের দেখেছি। নান্দু
শ্বেখের চার ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে দারোগালী, বেলি
খাতুন, গোপাল শ্বেখ, ছত্তর আলী এবং নোয়াই পাগলা। তাঁরা সবাই
লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। তবে, সবারই দাঁত ফাঁক ফাঁক ছিলো।
দারোগালী-
দারোগালী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স
৫৫ বছর। তিনি বিয়ে-থা করেননি। সংসার বিরাগী ছিলো। কৃষি কাজ করতো। খুবই সহজ-সরল ও
মৃদুভাষী ছিলো। সবার সাথে মিশতে পারত। তবে, মানুষের সংগ
এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। তিনি অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
বেলি খাতুন-
বেলি খাতুন লম্বা-চওড়া এবং শরীরের রং কাচা হলুদের মতো ছিলো। তিনি বোবা ছিলেন ।
কথা বলতে পারত না, শুধু আ-আ- করতো। তাঁর আসল নাম কেউ জানত না,
সবাই বোবী বলে ডাকতো । বেলি খাতুন দেখতে খুবই সুন্দরী ছিলো যদিও
গলায় ছোট মতো একটি গেগ ছিলো। বিয়ে হয়েছিলো আমাদের পাড়ারই জহুরুদ্দিনের সাথে।
তাঁদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে বড়। নাম পলান। মেয়ের নাম হামেলা খাতুন।
হামেলা খাতুন অন্ধ ছিলো। হামেলা খাতুনের বিষয়ে জহুরুদ্দিনের পরিয়ালে বর্ণনা করা
হয়েছে। তাই বাহুল্য হবে বলে এখানে বর্ণনা করলাম না।
গোপাল শ্বেখ-
গোপাল শ্বেখ লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে গোপাল
শ্বেখের বয়স ৫৫ এবং তাঁর স্ত্রী আজিলা খাতুনের ২৭ বছর। গোপাল শ্বেখ কৃষিকাজ
করতেন। তিনি সহজ-সরল ও মৃদুভাষী ছিলেন। মানুষের সংগ এড়িয়ে চলতেন। শান্তিপ্রিয়
ছিলেন। কারো এলে-মেলে থাকতেন না। তাঁদের এক মেয়ে। নাম ছিলো হরিনা খাতুন। গোপাল
শ্বেখ এবং আজিলা খাতুন উভয়ে অনেকদিন আগে মারা গেছে।
ছত্তর আলী-
ছত্তর আলী লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় ছত্তর আলীর নাম
নেই। কেন নাম উঠেনি সে কথা অজ্ঞাত। তবে, তিনি যে ১৯৬৬ সালে আমাদের পাড়ায়
ছিলেন এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই।
ছত্তর আলীর মতো অনেকেরই নাম তখন ভোটার
তালিকা থেকে বাদ পড়তো। কারণ তখন ইনমারেটর হিসাবে বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার যুবকদের
নিয়োগ করা হতো। তারা বেশির ভাগই বরপেটার বাসিন্দা ছিলো । তারা গ্রামে তারা গ্রামে
এসে এক বাড়ীতে বসে সবার নাম লিখে নিতো। তাই অনেকের নাম বাদ পরে যেতো। ১৯৭৭ সালে
আমাদের পাড়ার সবারই নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পরে গিয়েছিলো। তখন আমাদের পাড়াটা
একেবারে নদীর পাড়ে পড়েছে। নদীর বান এসে বালির পূরো আস্তরণ পরে গ্রামটা একেবারে
মরুভূমির মতো হয়ে গিয়েছিলো। ইনুমারেটর বাঘবর এসে আমাদের তখনকার পঞ্চায়ত সভাপতি
বিল্লাল হোসেনকে গ্রামের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি অনুসন্ধান না করেই বলে
দিয়েছিলেন, গ্রামটা নেই। নদী ভাঙনের ফলে সবাই অন্যত্র চলে
গেছে।সভাপতির মুখে গ্রাম নেই বলে জেনে আমাদের গ্রামে লোক নেই বলে ইনুমারেটর
নির্বাচন পঞ্জীয়ন পদাধিকারীকে রিপোর্ট দিয়েছিলো। ঘটনাটা জানতে পেরে হিকমত আলী,
হায়েত আলী, আমি নিজে এবং অন্যান্য কয়েকজন মিলে
বরপেটা গিয়ে ইনুমারেটরের সাথে সাক্ষাৎ করে ভোটার তালিকার ড্রাফ্টে নাম লিখিয়ে
দিয়েছিলাম। সে ড্রাফ্টের কপি দুই একজনের কাছে সম্ভবতঃ এখনো আছে। তবে, জানিনা
কি কারণে, সে বছর আমাদের নাম ভোটার তালিকায় উঠেনি। এমনিভাবেই হয়তো ছত্তর আলীর
নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলো। স্মরণযোগ্য যে, আমাদের গ্রামের
সবার ১৯৫১ সালের এনআরসিতে নাম ছিলো। জমিয়ত উলেমা থেকে ১৯৬৫ সালে এনআরসির কপি
দিচ্ছিলেন। তখন সেখান থেকে
অনেকেই এনআরসির কপি সংগ্রহ করেছিলো। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, আমাদের
গ্রামের ১৯৫১ সালের এনআরসি ছিলো। তবে, সেই এনআরসির কপি সরকারের কাছে মজুত না
থাকাতে সবাই ২০১৪ সালে ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা দিয়ে এনআরসির ফর্ম পূরণ করতে
হয়েছে। সরকারের এই
দায়িত্বহীন কর্মকান্ডকে ধিক্কার জানানোর বাইরে অন্য কিছু করার উপায় নেই।
ছত্তর আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো।
তাঁর গলায় মস্তবড় একটি গেগ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। মৃদুভাষী ছিলো। তবে,
তেমন কথা-বার্তা বলতেন না। তিনি বিয়ে করেছিলেন বালাজানের
কিয়ামুদ্দিনের মেয়ে চম্পা খাতুনকে । তাঁদের তিন ছেলে, এক মেয়ে।
ছেলেদের নাম শুকুর আলী, মহম্মদ আলী ও ফয়জল হক এবং মেয়ের নাম কমলা
খাতুন। ছত্তর আলী অনেক দিন আগেই মারা গেছে। তাঁর স্ত্রী এবং ছেলে- মেয়েরা এখনও
জীবিত।
নোয়াই শ্বেখ-
নোয়াই শ্বেখও লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। নোয়াই শ্বেখের নামো ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকায় নেই। তিনি সংসার বিরাগী ছিলেন। সন্যাসীদের মতো জীবন যাপন করেতেন।
কারো এলে-মেলে যেতেন না। বেশি কথা বলতেন না। একাই মনে মনে বসে থাকতেন। তিনি টং
বেঁধে সুনসান কৃষিক্ষেত্রেও রাত্রি যাপন করতেন। তিনি অনেক দিন আগেই মারা গেছেন।
আমাদের পাড়ায় যে কয়টি পরিয়াল ছিলো
তাঁদের বিষয়ে পাখির চোখে তখন যা দেখেছি তাই লিখলাম । কিছু তথ্য আমি আমার সহোদর
হোসেন আলীর কাছে শুনেও লিখেছি। দুই চারটি পরিয়ালের সাথে যোগাযোগ করেও লিখেছি। তবু
যদি আমার অজানিতে কোনো তথ্য বিভ্রাট হয়ে থাকে তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
আমাদের দক্ষিণের পাড়া
আমাদের পাড়ার বাহিরেও আমাদের গ্রাম
এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের অন্য দুই-চারজন ব্যক্তির বিষয়ে কিছু কথা না
লিখলে অন্যায় হবে।
জাহানারপাড়েরই আমাদের দক্ষিণের
পাড়ায় ছিলো হোসেন আলী মুন্সির পরিয়াল । আমাদের বাড়ী থেকে দক্ষিণ পূবে ছিলো
তাঁদের বাড়ী। আমাদের বাড়ী থেকে হোসেন মুন্সিদের বাড়ী দেখা যেতো।
হোসেন আলী মুন্সিঃ- হোসেন
মুন্সি মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার নাম ছিলো পবন মুন্সি। তিনি আমাদের অঞ্চলের একজন
বিশিষ্ট মুরব্বী ছিলেন। আমাদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিলো।
তাঁর মুখে চাপ দাড়ি ছিলো। তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। আরবী ও বাংলা সাবালীলভাবে পড়তে
পারতেন। আরবী আয়াত দিয়ে তিনি চিকিৎসাও করতেন। তাঁর ব্যাগে সবসময় গঞ্জল আরশ
নামের একটি পুস্তিকা থাকতো। সেই গঞ্জল আরশ দিয়ে তিনি অনেক রোগের চিকিৎসা করতেন।
তখনকার দিনে দোস্ত পাতাটা আমাদের
বাঙালী মুসলমান সমাজে এক প্রকার পরম্পরার মতো ছিলো। দোস্ত ছিলনা এমন পরিয়াল তখন
খুবই কম ছিলো। এই পরম্পরা অনুসারেই আমাদের বাবা জনীয়া অঞ্চলের বাংলীপাড়ার কফিল
উদ্দিনের সাথে দোস্ত পেতেছিলেন। তাঁদের এই দোস্তির সম্পর্ক খুবই নিবিড় ছিলো। মাসে
একবার হলেও একজন আরেকজনের সাথে বাড়ীতে গিয়ে দেখা করতেন। রাত্রি যাপন করতেন। সুখ-
দুঃখের খবর নিতেন। একজনের বিপদ-আপদে আরেকজন ঝাঁপিয়ে পরতেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত
তাঁদের এই সুসম্পর্ক অটুট ছিলো।
হোসেন আলী মুন্সির ভাগনে ছিলেন কফিল
উদ্দিন। সেই সুবাদেই হয়তো বা হোসেন আলী মুন্সি আমাদের পরিয়ালের সাথে সুসম্পর্ক
রেখে চলতেন। হোসেন মুন্সি মাসে একবার হলেও আমাদের বাড়ীতে যেতেন এবং আমাদের
সুখ-দুঃখের খবর নিতেন।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হোসেন
মুন্সির বয়স ছিলো ৪৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী শুভক্ষন নেসার ৩৪ বছর। ভোটার তালিকায়
শুভক্ষন নেসার নাম উঠেছিলো হবক্ষন নেসা। শুভক্ষন নেসা ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণা
ছিলেন। তাঁদের পাঁচ ছেলে এবং দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সুবল উদ্দিন,
আজমত আলী, মুন্তাজ আলী, জমিরুদ্দিন,
হাজেরা খাতুন, জহুরন নেসা এবং আব্দুর রহমান।
সুবল উদ্দিন-
সুবল উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শ্যমবর্ণ ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সুবল উদ্দিনের বয়স ছিলো ২৮ বছর। তিনি কৃষিকাজ করতেন। ভোটার তালিকায় তাঁর নাম
উঠেছিলো মবিল উদ্দিন। তাঁর বয়সও ভুল উঠেছিলো। মার বয়স ৩৪ এবং ছেলের বয়স ২৮ বছর।
হাস্যকর ব্যাপার। তখন মনে হয় শুভক্ষন নেসার বয়স ছিলো ৩৮ বছর এবং সুবল উদ্দিনের
২৩ বছর।
আজমত আলী-
আজমত আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আজমত
আলীর বয়স ছিলো ২৫ বছর। আজমত আলীর নাম ভোটার তালিকায় উঠেছিলো হাসমত আলী। আসলে
আজমত আলীর নাম এবং বয়স দুটোই ভুল ছিলো। তখন এ রকম নামের ভুল সচারচরই দেখা যেতো।
এর জন্য পরবর্তী সময়ে অনেক অসুবধিার সন্মুখীন হতে হয়েছে অনেকে। আজমত আলীর ছোট
মোন্তাজ আলী। মোন্তাজ আলীর ছোট জমিরুদ্দিন এবং আব্দুর রহমান। ভাই- বোনেরা কেউ
লেখা-পড়া শেখেনি। একমাত্র আব্দুর রহমান প্রাইমারী পাস করেছিলো।
সলিমুদিন মুন্সি-
হোসেন মুন্সিদের বাড়ীর কিছু পশ্চিম দিকে ছিলো সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ী। আমাদের
বাড়ীর ঠিক দক্ষিণ দিকে। আমাদের বাড়ীর পশ্চিম দিক দিয়ে একটি গো-হালট দক্ষিণ দিকে
প্রসারিত ছিলো। সেই হালটেরই পশ্চিম পাশে ছিলো সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ী। তিনি কিছু
শিক্ষিত ছিলেন। লম্বা-চওড়া এবং শ্যামলা বর্ণের ছিলেন তিনি। তাঁর বাবার নাম ছিলো
ছেফাতুল্যা। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো বাচাতন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সলিমুদ্দিন মুন্সির বয়স ছিলো ৩৯ এবং তাঁর স্ত্রীর ২৫ বছর।
সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ীতে মুদির
দোকান ছিলো। তেল, মরিচ, সাবান, ছোড়ার পাশাপাশি
তিনি প্রাইমারী স্কুলের কিছু পাঠ্যপুস্তকও বিক্রী করতেন। প্রাইমারীতে পড়ার সময়
বাবার সাথে গিয়ে সেখান থেকে আমি পাঠ্যপুস্তক, কাগজ, কালির
দোয়াত, ময়ূরের পাখি কিনে আনতাম। তখন প্রাইমারী স্কুলে কলম ব্যবহার করার
অনুমতি ছিল না। ময়ূরের পাখি কলমের নিবের মতো করে চুকিয়ে কালির দোয়াতে চুবিয়ে
লিখতে হতো।
সলিমুদ্দিন মুন্সির দোকান থেকে আমি প্রথম পুস্তকটি কিনেছিলাম ‘নবপাঠ'। সলিমুদ্দিন
মুন্সি অনেকদিন আগেই মারা গেছে।
ইউসুফ
সেক্রেটারীঃ-ইউসুফ আলী (সেক্রেটারী)দের বাড়ীও ছিলো উক্ত
পাড়ায় । সলিমুদ্দিন মুন্সির বাড়ীর কিছু পশ্চিম দিকে। ইউসুফ আলীর
বাবার নাম ওয়াজুদ্দিন এবং মার নাম আসমা বিবি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
ওয়াজুদ্দিনের বয়স ৭৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী আসমা বিবির বয়স ৫০ বছর। ইউসূফ আলীরা
চার ভাই ছিলো। মুজাফর আলী, নাগরালী, ইন্নস আলী এবং ইউসূফ
আলী। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মুজফরের বয়স ৩৮, নাগর আলীর ৩১
এবং ইন্নস আলীর ২৯ বছর ছিলো। ইউসূফ আলীর নাম সেই ভোটার তালিকায় নেই।
ইউসূফ আলীর সাথে আমি কাদং হাইস্কুলে
একসাথে পড়তাম। তিনি আমার থেকে দুই ক্লাস উপড়ে ছিলো। তিনি মাঝারি গঠনেব এবং
শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি সুস্বাস্থের অধিকারী ছিলেন। তিনি কাদঙের শ্বহীদ কারবালা
যাত্রাদলে মারোয়ানের চরিত্রে অভিনয় করতেন। তাই অনেকে তাঁকে মারোয়ান নামেও
সম্বোধন করতো। পরবর্তী জীবনে আমরা একসাথে অনেক নাটক করেছি। তিনি হা-ডুডু খেলায়ও
ভালো ছিলেন। তিনি হা-ডুডু খেলার রেফারিও করতেন। ইউসূফ আলী ধীর-স্থির এবং ভালো
বিচারক ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক মরাভাজের বিশিষ্ট সমাজকর্মী আব্বাস আলী দর্জির সাথে
তাঁর সুসম্পর্ক ছিলো। বালাজান এমই, স্কুল এবং তাজুদ্দিন হাইস্কুল স্থাপনের
ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। ইউসূফ আলী বাঘবর গাঁও পঞ্চায়েতের সেক্রেটারী
ছিলেন। আফজালুর রহমান এবং আবুল কালাম তাঁর সুযোগ্য সন্তান। আফজালুর রহমান বিএসসি
উত্তীর্ণ এবং বাঘবর হাইস্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। কালাম বাঘবর সমবায় সমিতির সভাপতি
ছিলেন এবং সম্প্রতি উক্ত সমিতির সেক্রেটারী। ইউসূফ আলী ২০২১ সালে মারা গেছেন।
গেদু বেপারী:-
গেদু বেপারী বয়োবৃদ্ধ লোক ছিলেন। তিনি সম্ভবতঃ ১৯৬৬ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন।
তাই ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম উঠেনি। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো পিয়ারজান
নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৬৩ বছর। গেদু বেপারীদের বাড়ীর
কাছেই ছিলো পূব দেউলদি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি কয়েকদিন সেই স্কুলে পড়তে
গিয়েছিলাম। স্কুলে যাওয়ার সময় গেদু বেপারীদের বাড়ীর সামনে দিয়ে যেতো হতো। আমি
তখন তাঁকে কয়েক দিন বারান্ডায় কুঁজা হয়ে বসে থাকতে দেখেছি। গেদু বেপারীর চার
ছেলে, বসির উদ্দিন, হজরত আলী, আব্দুল গফুর এবং
আব্দুল লতিফ আহমেদ। মেয়েদের কথা বলতে পারব না।
বসির উদ্দিন-
বসির উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর স্ত্রীর নাম মেহেরজান নেসা।
১৯৬৬ সালের ভোটার অলিকা অনুসারে বসির উদ্দিনের বয়স ৪৪ এবং তাঁর স্ত্রীর বয়স ২৬
বছর ছিলো। বসির উদ্দিন একজন মার্জিত এবং গম্ভীর স্বভাবের লোক ছিলেন। নিন্মস্বরে
কথা বলতেন। তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। বাংলা ভালোভাবে পড়তে পারতেন। তিনি একজন ভালো
সমাজকর্মীও ছিলেন। সমাজ উন্নয়নের জন্য তিনি যথাসাধ্য কাজ করেছেন। তিনি আমাদের
গ্রামের ভোটার তালিকাগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। তিনি অনেকদিন আগে মারা গেছেন।
তাঁর বড় ছেলে আবু বক্কার আমার সমবয়সী। সে পোস্ট অফিসের পিয়ন ছিলো। কিছুদিন আগে
মারা গেছে। আবু বক্কারের ছোট ভাই আক্কাস আলী সম্ভবতঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্নাতক। সে
পশু চিকিৎসক।
হজরত আলী- হজরত
আলী মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। ১৯৬৬সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৩৯ বছর
এবং তাঁর স্ত্রী সহরজান বেগমের বয়স ২৫ বছর। হজরত আলী ‘হট টেম্পারে’র
লোক ছিলেন । সাধারণ কথা নিয়েই মানুষের সাথে কলহ করতেন। তাই লোকে তাঁকে হজা পাগলা
বলতেন ৷ তাঁর ছেলে হুরমুজ আলী হা-ডুডু খেলায় ভালো ছিলো। হুরমুজ আলী আমার সমবয়সী
ছিলো। তাঁর শরীরের রং ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের হাঁট্টাগোট্টা ছিলো। সে দেখতে প্রায়
পালোয়ানের মতো ছিলো। সে
হা-ডু-ডু খেলায় ভালো ছিলো।
আব্দুল গফুর-
আব্দুল গফুর অনেক লম্বা এবং শ্যামলা বর্ণের ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো লালবানু।
১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আব্দুল গফুরের বয়স ৩৭ এবং তাঁর স্ত্রী লালবানুর
২২ বছর। আব্দুল
গফুর সহজ-সরল এবং স্পষ্টবাদী ছিলেন। গলগল করে কথা বলতেন। কোনো কথা পসন্দ নাহলে
মুখের উপড়েই প্রতিবাদ করতেন। তাঁর ছেলে-মেয়ের বিষয়ে আমার জানা নেই।
আব্দুল লতিফ
আমহমেদ- আব্দুল লতিফ স্নাতক এবং এডভোকেট ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর
নাম বেগম হাসিনা আহমেদ। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে আব্দুল লতিফের বয়স ৩৪
বছর এবং তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগমের বয়স ২৫ বছর। আব্দুল লতিফ লম্বা এবং শরীরের রং
কালো ছিলো। খুব পাণ চিবোতেন। তিনি বরপেটা সেসন কোর্টে উকালতি করতেন। উকালতির আগে
তিনি কাদং হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ইংরাজি এবং অসমিয়া পড়াতেন । কাদং
হাইস্কুলে শিক্ষকতা করাকালীন তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। সম্ভবতঃ ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা
ছেড়ে তিনি উকালতি শুরু করেছিলেন। উকালতি করা অবস্থায়ই তিনি মনে হয় ১৯৭৪ সালে
একবারের জন্য বাঘবর গাঁও পঞ্চায়েতের আঞ্চলিক সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন
পঞ্চায়ত খুব বড় ছিলো। তিনি এখন বরপেটার বাসিন্দা। ছয় সাত বছর আগে মারা গেছে।
ফজর আলী(গাঁওবুড়া)- ফজর আলী মাঝারি
গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন । লম্বা লম্বা দাড়ি ছিলো। ছেলেবেলা আমি তাঁকে দেখেছি।
তাঁদের বাড়ীটা আমাদের দক্ষিণ পাড়ার একেবারে পশ্চিম প্রান্তে ছিলো। তিনি
গাঁওবুড়া ছিলেন। তাই সবাই তাঁকে ফজু গাঁওবুড়া বলে জানত। তিনি সামাজিক কাজের সাথে
জড়িত ছিলেন। বিচারক হিসাবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষ
স্ত্রীর নাম হনুফা বিবি এবং দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রীর নাম তারাবানু। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে ফজর আলীর বয়স ৭০ বছর এবং স্ত্রী হনুফা বিবির বয়স ৫৪ বছর।
দ্বিতীয় পক্ষ স্ত্রী তারাবানুর বয়স ৩০ বছর ছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী হনুফা বিবির
ছেলে-মেয়ে নয় জন। পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল জলিল, আব্দুল ফাজিল, রফিক আলী,
আমজাদ আলী এবং সদর আলী। মেয়েদের নাম, জরিমন নেসা,
করিমন নেসা, মরিয়ম খাতুন এবং অজুপা খাতুন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী তারাবানুর ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। তাঁদের নাম, বধুদর আলী, হানিফ আলী,
জংসের আলী, সাজাহান আলী এবং আজাহার আলী। একমাত্র
মেয়ের নাম জাহানারা খাতুন।
আব্দুল জলিল-
আব্দুল জলিল ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি ব্যবসায়ের পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন।
তিনি সামাজিক কাজের সাথেও জড়িত ছিলো। তিনি সমাজের মাতাব্বরিও করতেন। তিনি আমার
চেয়ে বয়সে চার/পাঁচ বছরের বড় ছিলো। তাঁর ছেলে-মেয়ে ছয়জন। চার ছেলে, দুই
মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে বাহারুল ইসলাম, শুকুর আলী,
ফরহাদ আলী এবং আতোয়ার রহমান। মেয়েদের নাম যথাক্রমে মনোয়ারা খাতুন,
জায়েদা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত। আব্দুল জলিল কয়েক বছর
আগে নিজ বাঘবর গ্রামে মারা গেছে।
আব্দুল ফাজিল-
আব্দুল ফাজিল মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। তিনিও আমার চেয়ে বয়সে বড়। ইউসূফ
আলী সেক্রেটারির সমবয়সী। আমরা এক সাথে পূব দেউলদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন
করতাম। আমি যখন ক-শ্রেণীতে পড়তাম তখন ফাজিল উদ্দিন এবং ইউসূফ আলী তৃতীয় শ্রেণীতে
পড়তেন। তিনি টাইগার প্রজেক্টের কেরাণি ছিলেন। এখন অবসর নিয়েছে। তাঁর ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে দিলোয়ার হোসেন,
আতোয়ার হোসেন, ইব্রাহীম আলী, রুজু মিয়া এবং
রাহুল আমিন। একমাত্র মেয়ের নাম রুমি খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত।
রফিক আলী-রফিক
আলী ছোট-খাট এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসা করে । তাঁর
ছেলে-মেয়ে ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম, রুস্তম
আলী, হুমায়ূন আলী, হাশেম আলী, কাশেম আলী এবং
মিজুমাল আলী। একমাত্র মেয়ের নাম কুলছুম নেসা ৷
আমজাদ আলী-
আমজাদ আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। তাঁর ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
চার ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে ঠান্ডু মিয়া, তৈবুল আলী,
রাসেল আলী এবং বুল হোসেন। একমাত্র মেয়ের নাম মাজেদা খাতুন ।
বধুদর আলী-
বধুদর আলী মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়
করে। তার ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম যথাক্রমে আরান
আলী এবং সানিদুল আলী। মেয়েদের নাম, রূপসি খাতুন এবং
জরুনা খাতুন।
হানিফ আলী-হানিফ
আলী লম্বা ছিপছিপে এবং ফর্সা। সে শিক্ষিত। সে একবার বাঘবর গাঁও পঞ্চায়েতের
আঞ্চলিক সদস্য হয়েছিলেন। সে ব্যবসায়ে নিয়োজিত এবং সামাজিক কাজের সাথে জড়িত।
তার দুই ছেলে। মহিবুল ইসলাম এবং ইনজামুল হক।
সদর আলী-
সদর আলী ছোট-খাট এবং শ্যামবর্ণ। সে ব্যবসায়ের পাশাপাশি কৃষিকাজে নিয়োজিত। তার
দুই ছেলে। বাদশা মিয়া এবং গোলাপ হোসেন ।
জংশের আলী-
জংসের আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সে সমাজের
মাতব্বরিও করে। তার ছেলে-মেয়ে ছয়জন। তিন ছেলে, তিন মেয়ে।
ছেলেদের নাম, দিলবর আলী, আজমল আলী এবং
কালাম আলী। মেয়েদের নাম, নারজিনা খাতুন, নিলীমা খাতুন
এবং সিলিমা খাতুন ।
সাজাহান আলী-
সাজাহান আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সাথে
জড়িত। তার চার ছেলে। সন্তানদের নাম ছাপু মিয়া, নুর ইসলাম,
নজরুল আলী এবং মকিম মিয়া ৷ আজাহার আলী-আজাহার আলী মাঝারি গঠনের এবং
ফর্সা। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। তার একমাত্র ছেলের নাম রুবুল
আলী।
দক্ষিণ পাড়ায় আমার জানা আরও কয়েকটি
পরিয়াল ছিলো যদিও তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হইনি বলে তাদের বিষয়ে লেখা সম্ভব
হল না। তারজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
আমাদের
উত্তর পাড়া (বগুড়া পাড়া)
আমাদের গ্রামের উত্তর দিকে লাগোয়া
গ্রাম ছিলো রৌমারী গাঁও। রৌমারী গ্রামটা আমাদের পাড়ার পেছন থেকেই শুরু হয়েছিলো।
আমাদের পাড়ার বাড়ীগুলো জাহানারপাড়ে হলেও জমিগুলো ছিলো রৌমারী গ্রামে।
রৌমারী গ্রামে পূর্ববঙের বগুড়া জেলার
লোক বাস করতো। তাঁদের কথা-বার্তা এবং চাল-চলন আমাদের থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিলো।
বগুড়া জেলার লোক বাস করতো বলে আমরা পাড়াটাকে বগুড়া পাড়া বলতাম । পাড়ার প্রায়
সবাই বেপার করতো। পাট, সরিষা, কলাই প্রভৃতির । হাটে প্রবেশের রাস্তার
মাথায় দাঁড়িয়ে পাট- শরিষা শস্যাদি কিনতো এবং বড় বেপারির কাছে সেই হাটেই বিক্রী
করতো। তাই তাঁদের লোকে ‘ফইড়া’ বলতো। তাঁরা পাটগুলো খুব সুন্দরভাবে
পাইট করতে পারতেন। ‘বটম’ পাট তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় ‘টপ’
হয়ে উঠত। সেই পাড়ায় সোভাহান বেপারী, আয়াজ বেপারী,
ইয়াকুব মুন্সি, মবেদ মিস্ত্রী, গুমান হাজি,
মোকাম আলী, মুগর আলী, জাহের মন্ডল
প্রভৃতি লোকেরা বাস করতো।
সোভাহান বেপারী-বগুড়া
পাড়ার সবার সাথেই সম্পর্ক ভালো ছিলো যদিও সোভাহান বেপারীর সাথে আমাদের সম্পর্ক
অধিক ঘনিষ্ট ছিলো। সোভাহান বেপারী লম্বা-চওড়া এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ
ছিলেন। ছোভাহান বেপারী বয়সে আমাদের বাবার থেকে কিছু বড় ছিলো। তিনি ভুষি মালের
বেপার করতেন। শবিষা, কলাই, ধনিয়া প্রভৃতির। বানের তান্ডবের জন্য
আমাদের অঞ্চলে ধানের আবাদ তেমন ভালো হত না। তাই সবাই ধনিয়া, শরিষা,
কলাইর আবাদ করতেন। আমাদের পাড়ার উৎপাদিত শস্যাদি ছোভাহান বেপারী
কিনে নিয়ে গোয়ালপাড়া সহরে বিক্রী করতেন। আমাদের যত শস্য হতো সবই সোভাহান বেপারী
বাকীতে কিনে নিতেন এবং বাবার তলব মতো টাকা আদায় দিতেন।
বন্ধুত্বের সম্পর্ক অধিক সুদৃঢ় করার
জন্য সোভাহান বেপারীর ছেলে গোলাপ হেসেনের সাথে আমাদের বাবা আমার দোস্ত পাতিয়ে
দিয়েছিলেন। সোভাহান বেপারী আমাকে সার্ট, জোতা প্রভৃতি উপহার দিতেন। আমি কলেজে
পড়ার সময় বাবার হাতে টাকা ছিল না বলে তিনি আমাকে একটি সাইকেলও কিনে দিয়েছিলেন।
বাবা পরে অবশ্যে সেই টাকা পরিশোধ করে দিয়েছিলেন। গোলাপ হোসেন লিখা-পড়া শেখেনি,
তাই আমার সাথে তাঁর কোনোদিন ঘনিষ্ট সম্পর্ক গঢ়ে উঠেনি। আমাদের চেয়ে
উভয়ের বাবার সম্পর্কই অধিক ঘনিষ্ট ছিলো।
সোভাহান বেপারীর স্ত্রীর নাম ছিলো
গোলাপী খাতুন। তাঁদের দুই ছেলে, ছয় মেয়ে। ছেলেদের নাম গোলাপ
হোসেন ও জেলহক আলী। মেয়েদের নাম রেজিয়া খাতুন, হালিমা খাতুন,
আসমা খাতুন, সূৰ্য্যবানু, আনোয়ারা খাতুন
এবং শান্তবানু।
গোলাপ হোসেন-
গোলাপ হোসেন লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে খুবই শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের ছিলো।
কারো সাথে তেমন কথা-বার্তা বলত না। কৃষিকাজের পাশাপাশি সে তাঁর বাবাকে ব্যবসায়ে
সহযোগিতা করতো। অনেকদিন আগেই সে মৃত্যু বরণ করেছে।
জেলহক আলী-
জেলহক আলী লম্বা এবং শরীরের রং শ্যামলা ছিলো। সে একটু গোয়ার প্রকৃতির এবং চঞ্চল
স্বভাবের ছিলো। সে কিছু লিখা-পড়া শিখেছিলো এবং রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। সে
আজীবন অসম গণ পরিষদ দলের সদস্য ছিলো। সে এক বছর বাঘবর হাটের লেসিও ছিলো। গলার
কেন্সার হয়ে সে অনেক দিন আগে মারা গেছে। আমার দোস্তের চেয়ে জেলহকের সাথেই আমার
সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ট ছিলো।
মুগর আলী-মুগর আলী আমাদের
অঞ্চলের বয়োবৃদ্ধ এবং জ্ঞানী ব্যক্তি গুমান হাজি সাহেবের বড় ছেলে। মুগর আলী
লম্বা-চওড়া এবং শরীরের রং ফর্সা ছিলো। তিনি খুই বলশালী ছিলেন। তিনি আমাদের বাবার
চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট ছিলেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি তিনি কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন।
তাঁর কাজ-কাম খুবই পরিপাটি ছিলো এবং দ্রুত কাজ করতে পারতেন। একদিনেই তিনি একটি
সাধারণ খাট বানিয়ে ফেলতে পারতেন। লোকের বিপদে-আপদে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এই
সম্পর্কে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে- আমাদের পাড়ার সব জমি বরপেটার মহাজনেরা
পাট্টা করেছিলো। সেই জমি আমাদের কিনে নিতে হয়েছিলো। একবার আমাদের জমি রামাপাড়ার
কয়েকজন লোকে কিনে নিয়েছিলো। তাঁরা সেই জমি দখল করতে আসলে মুগর আলী লাঠি নিয়ে
তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখিয়ে বলেছিলো, এরা জংঘল সাফা
করে এই জমি অতদিন ধরে ভোগ-দখল করে আসছে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে সেই জমি বরপেটীয়া মহাজনেরা
পাট্টা করে নিয়েছ। এই জমি কিনতে হলে এরাই কিনবে, তোমরা কিনতে
পারবেনা। তোমরা যে টাকায় জমি কিনেছ সেই টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবুও যদি জমি দখল
করতে আস, তাহলে আমার লাশের ওপড় দিয়ে এসে এই জমি দখল নিতে হবে।
মুগর আলীর এই কথায় ভয় পেয়ে
রামাপাড়ার লোকেরা আমাদের জমি ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিলো এবং আমরা তাঁদের টাকা ফেরত
দিয়ে সেই জমি কিনে নিয়েছিলাম। আ-মৃত্যু মুগর আলীর এই উপকারের কথা আমাদের মনে
থাকবে।
মুগর আলীর পক্ষ দু'টি
ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম রহিতন নেসা এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম
আয়মনা খাতুন। প্রথম পক্ষ স্ত্রী রহিতন নেসার তিন ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে হালিমা খাতুন, মরিয়ম নেসা, আনোয়ারা বেগম,
তোফাজ্জল আলী, সাইফুল আলী এবং রহিমুদ্দিন। দ্বিতীয়
পক্ষের আয়মনা খাতুনের স্ত্রীর চার ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
তফিজুদ্দিন, ফাতেমা খাতুন, রহিজুদ্দিন,
ময়নাল হক, সাবিয়া খাতুন, ময়জান নেসা এবং
জয়নাল আবদিন।
হালিমা খাতুন-
হালিমা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে খাজারটারির মনজুল হকের ছেলে
শমসের আলীর সাথে। তাঁদের ছয় মেয়ে, ছেলে নেই। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
খোদেজা খাতুন, কুলচুম বেগম, মালেকা বেগম,
আকলিমা খাতুন, সফুরা খাতুন এবং মফিদা খাতুন।
ছেলে-মেয়ে সবাই বিবাহিত । মরিয়ম খাতুন- মরিয়ম খাতুন লম্বা এবং শ্যামবর্ণা। তাঁর
বিয়ে হয়েছে খাজারটারির হানিফ আলীর সাথে। তাঁদের তিন ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে মহিরুদ্দিন, জহিরুদ্দিন, হামিদা খাতুন,
হাসেনা বানু, রফিকুল ইসলাম এবং আসমা খাতুন। রফিকুল
ইসলাম পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।
আনোয়ারা খাতুন-
আনোয়ারা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। আনোয়ারা খাতুনের বিয়ে হয়েছে বাঘবরের রৌমারির
সাবান বেপারির ছেলে গণি মিয়ার সাথে। তাঁদের সাত ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আলা উদ্দিন, কালাম আলী, গুলবানু,
সুন্দরি খাতুন, হবিবর রহমান, আজিবর রহমান,
আতাবর আলী, কিতাব আলী, আজগর আলী এবং
জাহানারা খাতুন ।
তোফাজ্জল আলী-
তোফাজ্জল আলী লম্বা ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। কৃষিকাজ করে। সে বিয়ে করেছে
ধর্মপুড়ের আব্দুল হকের মেয়ে হনুফা খাতুনকে। তাদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। চার ছেলে,
দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হোসেন আলী, মনোয়ারা বেগম,
আঞ্জোয়ারা খাতুন, আসাদ আলী, ইব্রাহীম আলী
এবং ইউসুফ আলী।
সাইজুল আলী-
সাইজুল আলী লম্বা এবং ফর্সা । কৃষিকাজ করে। তার পক্ষ দু'টি। সে প্রথম
বিয়ে করেছে নলবারী জেলার শিয়ালমারির রূপচান শ্বেখের মেয়ে সাকিনা খাতুনকে।
দ্বিতীয় বিয়ে করেছে শিয়ালমারির সাহিদা খাতুনকে। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর দুই ছেলে,
তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাসেন আলী, শ্বাহজাহান আলী,
আবিরন নেসা, সাজেদা খাতুন এবং মাজেদা খাতুন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
জাহিদুল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম, সানিদুল আলী
এবং..... ।
রহিমুদ্দিন-
রহিমুদ্দিন লম্বা এবং ফর্সা। কৃষিকাজ করে। সে বিয়ে করেছে, লাংলার বনগুগির
আমির আলীর মেয়ে আন্না খাতুনকে। তাদের চার ছলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে করিম আলী, কুরবান আলী, সুরমান আলী,
আরফান আলী এবং রমিনা খাতুন ।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছেলে-মেয়ে
নিয়ে শিয়ালমারি থাকে। তাই তাঁদের ছেলে-মেয়ে সম্পর্কে কিছু লিখতে পারলাম
না।
নদী ভাঙার পরে মুগর আলী নলবারী জেলার
শিয়ালমারি চরে উঠে গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন ।
চরপাড়া ।
আমাদের পাড়াটা ১৯৮০ সালে ব্রহ্মপুত্র
নদীর ভাঙনের কবলে পরেছিলো। তখন আমাদের পাড়ার প্রায় সব কয়টি পরিয়ালই বাঘবর
পাথারে স্থানান্তর হয়েছিলো। বাঘবর পাথার গ্রামটা আমাদের গ্রামের পূর্বপ্রান্ত
থেকে একেবারে বাঘবর পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আমরা বাঘবর পাথারের
একেবারে শেষ প্রান্তে বাঘবর পাহারের পাদদেশে বসতি স্থাপন করেছিলাম। আমরা যেখানে
বসতি করেছিলাম সেখানে সর জমিনে বালু পরে একেবারে চরের মতো হয়েছিলো। তাই আমাদের
পাড়াটাকে সবাই চর পাড়া বলত। চর পাড়াটা বাঘবর থানা থেকে আধা মাইল উত্তর দিকে
ছিলো। সেই চর পাড়ায় কিছু সংখ্যক অন্য গ্রাম মানে বাঘবর পাথার, রৌমারি,
শেওরার পাথার প্রভৃতি গ্রামের পরিয়ালো স্থানান্তরিত হয়ে এসেছিলো।
আমি সেই পরিয়ালগুলোর বিষয়ে কিছু কথা লেখার প্রয়াস করব-
কাশেম আলী:- আমাদের
সম্পর্কীয় তাউই। তিনি খাটো গঠনের বলিষ্ঠ চেহেরার এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তাঁর বাবার
নাম সবের মল্লিক। কাশেম আলী কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সরিফন নেসা। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে কাশেম আলীর বয়স ৫০ বছর এবং সরিফন নেসার বয়স ৪১ বছর।
তাঁদের চার ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কদবানু,
সুরত আলী, সরবানু, জাজিয়ার হোসেন,
রাজন আলী, লালবানু, নীলবানু এবং
শ্বাহজাহান আলী।
কদবানু-
কদবানু সবার বড়। তিনি মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে আগমন্দিয়ার
নসের বেপারীর ছেলে ইন্নসের সাথে। তাঁর ছেলে-মেয়ের বিষয়ে আমার জানা নেই। তিনি
গৃহিনী। তাঁদের ছেলে- মেয়ে পাঁচজন। দুই ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম সামসুল হক, নুরজাহান, শিরাজুল হক,
হাজেরা খাতুন, মিনুয়ারা খাতুন ।
সুরত আলী-
আমার থেকে বয়সে কিছুটা ছোট। তিনি মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা। তিনি
স্বল্প শিক্ষিত। এখন নিজ বাঘবর গ্রামের গাঁওবুড়া। তিনি বিয়ে করেছেন আগ মন্দিয়ার
রহিমুদ্দিনের মেয়ে সালেহা খাতুনকে। সালেহা খাতুন স্বাস্থ্যবান এবং একটু খাটো
গঠনের। সালেহা খাতুন আমাদের মামাতো বোন এবং আমাদের বাবা তাঁদের বিয়েতে উকিল
হয়েছিলো। তাঁদের ছয় ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল খালেক, হানিফ আলী, জাহিদুল ইসলাম,
ইসমাইল হোসেন, শ্বাহানূর আলী আহমেদ, সানিয়ারা
খাতুন এবং মিজানূর রহমান।
আব্দুল খালেক বাঘবর সমবায় সমিতির
সভাপতি। সে তেমন লেখা-পড়া করেনি। শুধু স্বাক্ষর । হানিফ আলী ব্যবসা করে। জাহিদুল
ইসলাম ম্যাট্রিক পাস। ইসমাইল হোসেন ম্যাট্রিক ফেল। শ্বাহানূর ইসলাম, সানিয়ারা
খাতুন এবং মিজানুর রহমান বি, এ পাশ। সানিয়ারা খাতুনের বিয়ে হয়ে
গেছে। ছেলেরা সবাই ব্যবসায় করে।
সরবানু-
সরবানু মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। যৌবনকালে তাঁকে পুতুলের মতো দেখা যেতো। তাঁর বিয়ে
হয়েছে আলীগাঁয়ের আব্বেশ আলীর ছেলে তমসের আলীর সাথে। ১৯৭০ সালে আলীগাঁয়ে তাঁর
ভোট হয়েছে। সেই ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২২ বছর। তাঁদের তিন মেয়ে। ছেলে
সন্তান নেই। মেয়েদের নাম নুরজাহান বেগম, সবিয়া খাতুন এবং মেহেরজান নেসা। তমছের
আলীর দু'টি পক্ষ ছিলো । দ্বিতীয় পক্ষের একটি ছেলে। সরবানু সতীনের সেই ছেলেকে
নিয়ে বাঘবর অঞ্চলের মিলিজুলি ঘর-বাড়ী করে আছে। তমসের আলী অনেক দিন আগে মারা
গেছে।
জাজিয়ার হোসেন-
জাজিয়ার হোসেন কাঠমিস্ত্রিী। দেখতে ছোট-খাটো এবং শ্যামবর্ণ। সে বিয়ে করেছে
আলীগাঁয়ের বিনোদ মুন্সির মেয়ে বিন্দু নেসাকে। তাদের তিন ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে বিল্লাল হোসেন, রূপজান নেসা,
বাবুল হোসেন এবং শ্বাহ আলম। বাবুল হোসেন স্নাতক এবং এলআইসি এজেন্ট।
রূপজান নেসা স্বাক্ষর। তার বিয়ে হয়ে গেছে। বাবুল হোসেন স্নাতক। ফার্মাসিষ্ট। একেবারে ছোট ছেলে
ম্যাট্রিক পাস। বাবুল হোসেনের সাথে ফার্মাসিতে থাকে।
রাজন আলী-রাজন
আলী হলুইকর । আগে হাটে হাটে দৈ, মিষ্টি, মুরি বিক্রী
করতো। ছেলেরা রোজগারের উপযুক্ত হওয়ার পরে উক্ত কাজ থেকে অবসর নিয়েছে। সে বিয়ে করেছে
বাঘবর পাথারের হাবেজ ফকিরের মেয়ে হালিমা খাতুনকে। তাঁদের তিন ছেলে, ছয়
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রংমালা খাতুন, আব্দুল হামিদ,
নূরবানু, জোৎস্না বানু, রহিমা খাতুন,
আন্না খাতুন, রেজাক আলী, আব্দুল হালিম
এবং আমিরুল ইসলাম। এদের মধ্যে রেজাক আলী এবং আব্দুল হামিদ ম্যাট্রিক পাস। অন্যরা
শুধু স্বাক্ষর।
হানিফ আলী-
হানিফ আলী কাঠমিস্ত্রী। তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। শুধু স্বাক্ষর। সে বিয়ে করেছে
বালাজানের আব্দুল হাকিমের মেয়ে জয়গন নেসাকে। জয়গন নেসা আমাদের চাচাতো বোন। সে
গৃহিনী। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
ইনজামুল হক, হাজমিনারা খাতুন, রুজিনা পারবিন
এবং ইমরান হোসেন। সবাই স্কুলে পড়ে। ইনজামূল হক ২০২০ সালে চারটা বিষয়ে লেটার
মার্ক নিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছে।
লালবানু- লালবানুর বিয়ে
হয়েছে মহম্মদ পুরের মহিরুদ্দিনের ছেলে হাবেজ উদ্দিনের সাথে। সে এখন গৃহিনী।
নীলবানু-নীলবানুর
বিয়ে হয়েছে বাঘবর পাথারের খোদারমের ছেলে হানিফ আলীর সাথে। সে গৃহিনী ।
শ্বাহজাহান আলী- শ্বাহজাহান আলী মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে বি,এ,
পাস। সে দিগজানির একটি ভেন্সার হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে। সে বালিকুরির
আমির হোসেন মাস্টারের মেয়ে তাহমিনাকে বিয়ে করেছে। তাদের এক ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জাকারিয়া আহমেদ, সেবিনা খাতুন
এবং আজমিনা খাতুন। জাকারিয়া আহমেদ স্নাতক। সেবিনা এবং রুজিনা পারবিন হায়ার
সেকেন্ডারি পাস।
বিদেশী মিয়াঃ- বিদেশী মিয়া
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি একটু রোগা ধরণের ছিলেন। মনে হয় হাঁফানি ছিলো। তাঁর
স্ত্রীর নাম সবিরন নেসা। তিনিও রোগা ধরণের ছিলেন। তাঁদের তিন ছেলে, মেয়ে
নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে খোদাবক্স, রহিম বক্স, আব্দুল করিম এবং
নুরু মিয়া ৷
খোদাবক্স-
খোদাবক্স আমার থেকে বয়সে কিছু ছোট। সে মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। বাবার
মতোই সে একটু রোগা ধরণের ছিলো। তাঁর স্ত্রীর নাম জিলিমন নেসা। বাঘবর পাথারের খৈমুদ্দিনের
মেয়ে। তাঁদের তিন ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে সবার বড়। নাম আদুরি
নেসা। ছেলেদের নাম, জুলহাস উদ্দিন, জয়নাল আবদিন
এবং ইসমাইল হোসেন। ছেলেদের সবাই স্বাক্ষর। অবশ্যে কেউ ম্যাট্রিক পাস করেনি।
খোদাবক্স ছোট-খাট ব্যবসায় করতো। কয়েক বছর আগে মারা গেছে।
রহিম বক্স-রহিম
বক্স একটু খাটো ধরণের এবং ফর্সা। সে বিয়ে করেছে খরমার সাধু মিয়ার মেয়ে আজিরন
নেসাকে। রহিম বক্স হালুইকর। হাটে হাটে মিষ্টি, দৈ, মুরি
বিক্রী করে। তাঁদের একমাত্র ছেলের নাম আফসের আলী। লেখা-পড়া শেখেনি।
করিম বক্স-
করিম বক্স একটু খাটো ধরণের এবং ফর্সা। সে বিয়ে করেছে নিজ বাঘবরের মামুদ আলীর
মেয়ে হামিদা খাতুনকে। করিম বক্সও হালুইকর। হাটে হাটে মিষ্টি, দৈ,
মুরি বিক্রী করে। তাদের এক ছেলে, হাবিজুল ইসলাম।
তিন মেয়ে, কহিনূর বেগম, আকলিমা আনসারি
এবং পারবীন সুলতানা। হাবিজুল ইসলাম ম্যাট্রিক ফেল। কহিনূর বেগম ম্যাট্রিক পাশ,
আকলিমা আনসারি এম, এ পাস। পারবীন সুলতনা বি, এ,
পড়তেছে।
নুরু মিয়া-
নুরু মিয়াও একটু খাটো ধরণের এবং শ্যামবর্ণ। নুরু মিয়ার পক্ষ দুটি। সে প্রথম
বিয়ে করেছিল খরমার আজিমুদ্দিনের মেয়ে ময়না খাতুনকে। একমাত্র মেয়ে নূরবানুর
জন্মের পরে ময়না খাতুনকে তালাক দিয়ে পরে ভাতনাপাইতির জহুরুদ্দিনের মেয়ে হালিমন
নেসাকে বিয়ে করেছে। সে বর্তমান বরপেটা রোডের বাসিন্দা। মারোয়ারিদের গোদামে কুলির
কাজ করে। দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম
যথাক্রমে শুকুরি নেসা, চন্দ্রবানু, কামাল উদ্দিন,
চায়না বানু, সাদ্দাম হোসেন, সূর্যবানু এবং
রাবিয়া খাতুন । ছেলে-মেয়েরা কেউ তেমন লেখা-পড়া শেখেনি। তবে, সবাই
স্বাক্ষর।
খোদারম মিয়াঃ-
খোদারম মিয়া মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। স্বাস্থ্য ভালো ছিলো। মুখে
চাপদাড়ি ছিলো। হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। খুব পাণ চিবোতেন। মুখে সর্বদা পাণের পিক
লেগেই থাকতো। তিনি মৃদুভাষী ছিলেন। তাঁর বাবার নাম আলিমুদ্দিন। স্ত্রীর নাম হালিমা
খাতুন। তিনি কৃষিকাজ করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে খোদারমের বয়স ৪৫ এবং
হালিমা খাতুনের ৪০ বছর। তাঁদের চার ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
হানিফ আলী, শুকুর আলী, হাকিম আলী,
সামেজ উদ্দিন এবং কুলসুম খাতুন।
হানিফ আলী-
হানিফ আলী কৃষিকাজ করার সমান্তরালভাবে ধর্মীয় কাজ-কাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে।
হানিফ আলী আমার থেকে মনে হয় বয়সে কিছু বড় হবে। সে বিয়ে করেছে বাঘবর পাথারের
কাশেম আলীর মেয়ে নীলবানুকে। তাঁদের তিন ছেলে এবং তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম
যথাক্রমে নুরুল ইসলাম, নাজিবুল হক, সানিদুল ইসলাম,
হাজেরা খাতুন, সেলিমা আকতার এবং জেসমিনা আকতার। নুরুল
ইসলাম ও নাজিবুল হক ম্যাট্রিক পাস। হাজেরা খাতুন হায়ার সেকেন্ডারি পাস। সানিদুল
ইসলাম ও সেলিমা আকতার বি, এ, পাস। জেসমিনা
আকতার সায়েন্স নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করেছে।
শুকুর আলী-
শুকুর আলী মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তেমন লিখা-পড়া শেখেনি। আগে
গুয়াহাটীতে ডিমের কারবার করতো। এখন কৃষিকাজ করে। সে মিস্টভাষী। সবার সাথে মিশতে
পারে। সে বিয়ে করেছে কাদং অঞ্চলের রূপাকুছির কুরবান আলীর মেয়ে ফুলমালা খাতুনকে।
তাদের চার ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ময়নাল হক,
সাইজুদ্দিন, আবু বক্কার সিদ্দিক, রফিকুল
ইসলাম, চন্দ্রবানু, খোদেজা খাতুন, জেসমিনা আকতার
এবং সামিনা আকতার। ময়নাল হক, আবু বক্কার সিদ্দিক এবং রফিকুল ইসলাম
বি, এ পাস। সাইজুদ্দিন ম্যাট্রিক পাস। চন্দ্রবানু এবং খোদেজা খাতুন
হায়ার সেকেন্ডারী পাস। জেসমিনা আকতার এবং সামিনা আকতার শিক্ষার্থী। ছেলেরা সবাই
বিভিন্ন ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
হাকিম আলী-
হাকিম আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সেও এক সময় গুয়াহাটীতে ডিমের ব্যবসায় করতো। এখন
কৃষিকাজ করে। সে মিস্টভাষী। সাজিয়ে কথা বলতে পারে এবং গল্প করতে ভালোবাসে। সে
বিয়ে করেছে জাহানারপাড়ের নবুরুদ্দিনের মেয়ে চম্পা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সবুরি খাতুন, সানিদুল
ইসলাম, সুফিয়া খাতুন, রুজিনা আকতার এবং রেনুকা আকতার। সবুরি
খাতুন এবং সুফিয়া খাতুন হায়ার সেকেন্ডারী পাস। সানিদুল ইসলাম ম্যাট্রিক পাশ।
রুজিনা আকতার এবং রেনুকা আকতার শিক্ষার্থী।
সামেজ উদ্দিন-
সামেজ উদ্দিন মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে হায়ার সেকেন্ডারী পাস।
মৃদুভাষী এবং সমাজকর্মী। ব্যবসায় করে। সে বিয়ে করেছে বালাজানের নুরুল ইসলামের
মেয়ে নূরজাহান বেগমকে। নূরজাহান বেগম আমাদের মামাতো বোন রুকিয়া বেগমের মেয়ে।
সেই সম্পর্কে সে আমাদের ভাগনী। তাদের দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে কুলচুম খাতুন, মিজানূর রহমান এবং আমিনুল ইসলাম।
মিজানুর রহমান আয়ুর্বেদিক(বিএএমএস)-এর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। আমিনুল ইসলাম হাইস্কুলের
শিক্ষার্থী। কুলচুম খাতুন ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। তার অনেক আগেই বিয়ে হয়েছে।
পনের / ষোল বছর আগে তার স্বামী মারা গেছে। তাঁর তিন ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম, সাদুল্যা আহমেদ, নাসির উদ্দিন,
নূরজাহান বেগম এবং মামণি আকতার। সাদুল্যা, নূরজাহান এবং
মামণি আকতার ম্যাট্রিক পাস। নাসির উদ্দিন বি,এ, পাস।
জবেদ আলীঃ-জবেদ আলী
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। বসে থাকলে একটু কুঁজা হয়ে বসতো। খুবই মিশুক
প্রকৃতির লোক ছিলেন। সবার সাথে মিশতে পারতো। নিন্মস্বরে কথা বলতো। ছোট-বড় সবাইকে
সন্মান দিয়ে চলতো। সে কৃষিকাজ করতো। তাঁর স্ত্রীর নাম সূর্য্যবানু। সূর্য্যবানুর
শরীরের রং ঈষৎ কালো এবং মাঝারি গঠনের ছিলো। মিশুক প্রকৃতির মহিলা ছিলো। অতিথি
সৎকার করতে ভালো বাসতো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে জবেদ আলীর বয়স ৪১ এবং
সূর্য্যবানুর ২৮ বছর। তাঁদের ছেলে- .মেয়ে ১১ জন। তিন ছেলে, আঠ মেয়ে।
ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে হালিমন নেসা, আকমত আলী, রখমত আলী,
নবিরন নেসা, হিকমত আলী, তাহেরন নেসা,
সাহেরা খাতুন, ছবিয়া খাতুন, সোনাবানু,
তারাবানু এবং বাছাতন নেসা।
আকমত আলী-
আকমত আলী লম্বা এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। মিশুক প্রকৃতির। সবার সাথে মিশতে
পারে। নিন্মস্বরে কথা বলে। সে আগে গুয়াহাটীতে ডিমের ব্যবসায় করতো। এখন ভুটভুটি
নৌকা চালায়। সে বিয়ে করেছে তিনটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম জহিরন নেসা।
মন্দিয়া অঞ্চলের বামুনবাড়ীর ওহাব আলীর মেয়ে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম
বাতাসী নেসা। নিজ বাঘবরের ইয়াসিনের মেয়ে। একটি সন্তান জন্মের পরেই বনিবনা না
হওয়ায় তালাক দিয়েছে। তৃতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম উজালা খাতুন। বাঘবর পাথারের রহু
বেপারীর মেয়ে।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছেলে-মেয়ে
চারজন। তাদের নাম যথাক্রমে জহুরুদ্দিন, মহিরুদ্দিন, করিমন নেসা এবং
আমিরুদ্দিন। ছেলেরা ভূটভূটি নৌকা চালায়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর একটি মাত্র মেয়ে ৷ নাম আকলিমা খাতুন। বিয়ে হয়ে গেছে। তৃতীয়
পক্ষের স্ত্রীর তিন ছেলে। মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম, জহর আলী,
মহর আলী এবং ওমর আলী। জহর আলী রাজমিস্ত্রী। মহর আলী হায়ার সেকেন্ডারিতে
এবং ওমর আলী হাইস্কুলে অধ্যয়নরত।
রখমত আলী-
রখমত আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে সহজ-সরল লোক। বাহিরা জগত সম্পর্কে
উদাসীন। সর্বদা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কৃষিকাজ করে। তার স্ত্রীর নাম সালেহা
খাতুন। বাঘবরের মাজম মিস্ত্রীর মেয়ে। তাদের ছেলে মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জালিমুদ্দিন, রহিমা খাতুন,
আলিমুদ্দিন, আশ্রব আলী এবং হাসমত আলী। জালিমুদ্দিন
বাবার সাথে কৃষিকাজ করে। রহিমা খাতুনের বিয়ে হয়ে গেছে। আলিমুদ্দিন এবং আশ্রব আলী
রাজমিস্ত্রী। আশ্রব আলী ম্যাট্রিক পাস। হাসমত আলী রাজমিস্ত্রীর যোগাড়ি।
হিকমত আলীঃ-
লম্বা ছিপছিপে এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। মিশুক প্রকৃতির। সবার সাথে মিশতে পারে।
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চলে। তার স্ত্রীর নাম তহিরন নেসা। বাঘবর
অঞ্চলের শিলোশি পাথারের তোতা মিয়ার মেয়ে। আমার ছোট ভাই হোসেন আলী তাদের বিয়েতে
উকিল হয়েছে। তাদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে।
ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে তাইজুদ্দিন, সাইজুদ্দিন, সাজেদা খাতুন,
রাইজুদ্দিন, ইয়ার বাদশাহ এবং তাজিবুল ইসলাম।
তাইজুদ্দিন বাবার সাথে কৃষিকাজ করে। সাইজুদ্দিন ম্যাট্রিক পাস। রাজমিস্ত্রী।
রাইজুদ্দিন কলেজে পড়ে। ইয়ার বাদশাহ ভূটভূটি নৌকা চালায়। সাজেদা খাতুনের বিয়ে
হয়ে গেছে পশ্চিম ময়নবরির আব্দুল কাদেরের ছেলে জহুরুল ইসলামের সাথে।
মামুদ আলী- মামুদ আলী
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর বাবার নাম বিলাত আলী। মামুদ আলী
কৃষিকাজের পাশাপাশি কাপড় বুনতেন । তিনি সামাজিক কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। সবার সাথে
হেঁসে হেঁসে কথা বলতেন। মামুদ আলীর দুটি পক্ষ ছিলো। তাঁর স্ত্রীদ্বয়ের নাম
আকিতারা খাতুন এবং নেসা খাতুন। আকিতারা খাতুনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পরে নেসা
খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মামুদ আলীর বয়স ৫০ বছর
এবং নেসা খাতুনের বয়স ৩১ বছর। সম্ভবতঃ ১৯৬৬ সালের আগেই আকিতারা
খাতুনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিলো। সেজন্য আকিতারা খাতুনের নাম ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকায় নেই। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম
ময়ূরি খাতুন, আব্দুল আলিম এবং ফালানী নেসা। এদের বিষয়ে আমি
বিশেষ কিছু জানিনা। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে এবং আব্দুল আলিম হাজো সমষ্টির
বরম্বৈয়ে বসবাস করতেছে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর ছয় ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুল মান্নাফ, আবু শামা, মরিয়ম খাতুন,
বান হাশেম, আবু বাক্কার সিদ্দিক, আবুল
কাশেম, আবু হানিফা আনসারি, হামিদা খাতুন এবং হনুফা খাতুন।
আব্দুল মান্নাফ-আব্দুল
মান্নাফ মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ে নিয়োজিত ।
সে বাঘবর বাজারের সাথে জড়িত। বাজারে গোদাম গৃহ আছে। আমার থেকে বয়সে কিছু ছোট। সে
বিয়ে করেছে খরমার অটার ছয়ফল আলীর মেয়ে ময়ফল খাতুনকে। তাঁদের দুই ছেলে, তিন
মেয়ে । সন্তানদের নাম যথাক্রমে আদহাম আলী, আবিদা খাতুন,
আনোয়ারা খাতুন, তালহা আলী এবং মফিদা খাতুন । তালহা আলী
ব্যবসায়ী। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। আদহাম আলীকে ২০০১ সালে দুষ্কৃতিকারীরা হত্যা
করেছে।
আবু শামা-
আবু শামা লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ। সে হায়ার সেকেন্ডারি পাস। ফটোগ্রাফির সাথে
জড়িত ছিলো। বর্তমান মুদির দোকান করে। সে মৃদুভাষী এবং মিশুক প্রকৃতির। সে বিয়ে
করেছে হেলচাপামের মুকতার আলী মুন্সির মেয়ে সুফিয়া খাতুনকে। সুফিয়া খাতুন লম্বা
এবং ছিপছিপে গঠনের। তাঁর শরীরের রং শ্যামলা। তাদের দুই ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে শাকেত আলী, তাসিন আলী এবং শামিমা খাতুন।
মরিয়ম খাতুন-
মাঝারি গঠনের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মানসিকভাবে অসুস্থ। কথা বলতে পারেনা। শুধু
হাঁসে। ভাইদের সাথে খুব মিলে মিশে থাকে। তার বিয়ে হয়নি।
বান হাশেম-বান
হাসেম মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে কথা কম বলে এবং হেঁসে হেঁসে বলে।
পাণ খেয়ে ঠোঁট লাল করে রাখে। সে হালুইকর। হাটে হাটে মিস্টি, দৈ,
মুড়ি বিক্রী করে। সে বিয়ে করেছে কাদঙের দাগু মিয়ার মেয়ে নবিরন
নেসাকে। তাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
মিরকাল আলী, সুরমাল আলী, আসমিনা খাতুন
এবং গোলাপজান নেসা।
আবু বাক্কার-
আবু বাক্কার মাঝারি ছিপছিপে হালকা গঠনের। তাঁর শরীরের রং শ্যামবর্ণ। এখন মাথায়
লম্বা লম্বা চুল রেখেছে। বাবরি চুল। সে ব্যবসায়ী। সে একবার বিস্কুটের ফেক্টরিও
খুলেছিলো। ফেক্টরিতে সে সফলো হয়েছিলো। তবে, কর্মচারির অভাবে
ফেক্টরি বাদ দিয়েছে। বাঘবর বাজারে গোদাম গৃহ আছে। গোদাম ভাড়া দেয়। সে এক সময়
রাজনীতির সাথেও জড়িত ছিলো। সে ১৯৯৭ সালে বাঘবর সমবায় সমিতির সভাপতি পদে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এক ভোটে পরাজয় বরণ করেছিলো। ২০০১ সালে আবার বাঘবর পঞ্চায়তের
পঞ্চায়ত নির্বাচনে আঞ্চলিক কাউন্সিলার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজয় বরণ করেছে। সে জাহানারপাড়ের
ভেলু মিয়ার মেয়ে সালেহা খাতুনকে বিয়ে করেছে। সালেহা খাতুন আমাদের চাচাতো বোন।
সালেহা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তাঁদের দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে মিনুয়ারা খাতুন, আলতাব হোসেন, নিলীমা খাতুন,
জাহানারা খাতুন এবং আলী আহমেদ। মিনুয়ারা খাতুন আসাম পুলিশ-এ কর্মরত।
আলতাব হোসেন ব্যবসায়ী।
আবুল কাশেম-
আবুল কাশেম মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে সুদর্শন। ছোট ছোট করে হেঁসে
হেঁসে কথা বলে ৷ সে ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। ম্যাট্রিক পাস। সে বিয়ে করেছে চাচরার
হজরত আলীর মেয়ে আরজিনা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম লুলু আনসারি এবং রিনা আনসারি ।
আবু হানিফা
আনসারি- আবু হানিফা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে
মদুভাষী। হেঁসে হেঁসে কথা বলে। সে এখন কাশ্মীরে থেকে ব্যবসায় করে। সে বিয়ে করেছে
মিলিজুলির হামিদ আলীর মেয়ে সূর্যবানুকে। তাদের চার মেয়ে, এক ছেলে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফরিদা খাতুন, হালিদা খাতুন, আসমানা খাতুন,
জিনিপা খাতুন এবং হাসানূর আনসারি।
হামিদা খাতুন-
হামিদা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। মৃদুভাষী। তার বিয়ে হয়েছে নিজ বাঘবরের বিদেশীর
ছেলে করিম বক্সের সাথে। তাদের এক ছেলে, হাবিজুল ইসলাম। তিন মেয়ে, কহিনূর
বেগম, আকলিমা আনসারি এবং পারবীন সুলতানা। হাবিজুল ম্যাট্রিক ফেল। কহিনূর
বেগম ম্যাট্রিক পাশ, আকলিমা আনসারি এম, এ পাস। পারবীন
সুলতানা বি, এ, পড়তেছে।
হনুফা খাতুন-
হনুফা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। মিশুক প্রকৃতির এবং মৃদুভাষী। তার বিয়ে হয়েছে
বরপেটা জেলার কাপাসতুলির মোসা মুল্যার ছেলে আবু শামার সাথে। তাদের তিন ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম, সাদ্দাম হোসেন, সাদেক আলী,
সাহানূর আলী এবং মাজেদা খাতুন ।
চড় পাড়ায় অন্য দু'টি
পরিয়াল ছিলো যদিও তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হইনি। সেজন্য তাদের বিষয়ে লেখা
সম্ভব হল না ।
আলীগাওঁ
বাড়ী আমাদের জাহানারপাড়ে হলেও এক
সময়ে আলীগাঁয়েও ছিলো। আমার জন্ম আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ধনাই হাজির বাসগৃহে।
ধনাই হাজি আমাদের মাতামহ। আমার শৈশব এবং যৌবন বলতে গেলে আলীগাঁয়েই কেটেছে। তাই
আলীগাঁয়ের সাথে আমার নাড়ীর সম্পর্ক ছিলো।
আলীগাঁও গ্রামটা মন্দিয়া থেকে পাঁচ
মাইল পশ্চিমে এবং বাঘবর পাহার থেকে তিন মাইল পূবে। গ্রামের চারপাশে কয়েকটি গ্রাম
আছে। উত্তরে রাণির পাম, পূবে আলীগাঁও পাথার দক্ষিণে আলিরপাম এবং
পশ্চিমে পালারপাম, সুতির পাড় এবং সারগাওঁ। আলিরপামের দক্ষিণেই
ছিলো মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র নদ। গ্রামের সবাই কৃষিজীবী ছিলো। চাকরিজীবী কেউ ছিল না।
তবুও মানুষের মাঝে সুখ-শান্তি বিরাজমান ছিলো। ধনে-ধানে পরিপূর্ণ ছিলো গ্রামটা।
১৯৫৯ সালে তারাবারিতে প্রথম
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের তান্ডব শুরু হয়। এর কিছুদিন পরে অর্থাৎ ১৯৬০ সালে
আলীরপাম এবং ১৯৬১ সালে আলীগাঁও ভাঙনের কবলে পরে। ফলে মানুষ অন্তহীন দুঃখ-দুর্দশার
সন্মুখীন হয়। মানুষগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরে। যাদের একশ বিঘা জমি ছিলো তারাও পথের
ভিক্ষারিতে পরিণত হয়। একটি উদাহরণ দিলে কথাটা স্পষ্ট হবে- আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী
ব্যক্তি ছিলেন সদু বেপারি। এমন প্রবাদ আছে যে, সদু বেপারিদের
কয়টা গরু ছিলো তার হিসাব ছিল না। গোয়াল ঘরে গরুর পাঘা দেখে গরুর হিসাব রাখতো।
অর্থাৎ পাঘা খালি থাকলে, পাঘা খালি কেন? গরু কি হল?
তখন গরুর খবর করা হতো। শুনেছি, রাখালরা একবার
তাঁদের গরু চুরি করে বিক্রী করেছিলো। তখন পাঘা খালী দেখে সেই গরুর সন্ধান করতে
গিয়ে রাখালরা যে চুরি করে গরু বিক্রী করেছে সে কথা বের হয়েছিলো। নদী ভাঙার পরে
সদু বেপারির ছেলেরা মাছের ব্যবসায় করে।
পুচাই দেওয়ানী, ধনাই হাজি,
দানেশ মুন্সি, রমজান দেওয়ানী, কয়েদ আলী
ফকিররা আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী লোক ছিলো। শুনেছি,এদেঁর একশ ডেরশ
বিঘা করে জমি ছিলো। দানেশ মুন্সিদেরতো শুনেছি আড়াইশ বিঘা জমি ছিলো । জমিই কৃষকের
সম্বল। জমি না থাকলে কৃষকের কোনো মূল্য
থাকেনা। জমি নদীর পেটে যাওয়ার পরে তাঁদের ছেলে-পিলেরা অভাব-অনাটনের মাঝে দিন
অতিবাহিত করছে। কেউ দিন হাজিরা করছে, কেউ আবার ব্যবসায় করে কোনো রকমে
পরিয়াল ভরণ-পোষণ করছে। নদী ভাঙার পরে কিছু সংখ্যক পরিয়াল বিভিন্ন জায়গায়
স্থানান্তর হয়েছিলো। অনেকে আবার কিছু উত্তর দিকে এসে আলীগায়ের উত্তর প্রান্তে,
পালার পাম, সুতিরপাড়, রাণিরপাম
প্রভৃতি গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলো।
আলীগাঁয়ে অনেক গণ্য-মান্য লোক ছিলো।
সবার বিষয়ে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে লেখা সম্ভব হবে না। তাই সেই লোকগুলোর মাঝে আমি
ছেলেবেলা যাদের ওতঃপ্রোত সান্নিধ্যে এসেছিলাম তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়ার
প্রয়াস করব। যাদের পরিচয় এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে দেওয়া সম্ভব হলনা তাঁদের কাছে আমি
ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
মতিয়ার রহমানঃ-
মতিয়ার রহমান আলীগাঁয়ের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মহেজ
উদ্দিন। তাঁর শরীরের রং ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর
স্ত্রীর নাম ভায়েলা খাতুন। ভায়েলা খাতুন আলীগাঁও অঞ্চলের বিখ্যাত ব্যক্তি কয়েদ
আলী ফকিরের মেয়ে। বলতে কয়েদ আলী ফকিরই আলীগাঁও গ্রামের পত্তন করেছিলেন। কয়েদ
আলী ফকির সুফি সাধক ও গুণীলোক ছিলেন। তিনি আয়ুর্বেদিক উপায়ে অনেক রোগের চিকিৎসা
করতেন। বিয়ের পরে মতিয়ার দম্পত্তির অনেক দিন কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি। তখন
কয়েদ আলী ফকির সন্তান লাভের জন্য চিকিৎসা করেছিলেন এবং সেই চিকিৎসার পরেই
মজিবর রহমানের জন্ম হয়েছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মতিয়ার রহমানের
বয়স ৪৫ এবং ভায়েলা খাতুনের ৩০ বছর। তাঁদের একমাত্র ছেলে মজিবর রহমান ।
মতিয়ার রহমান শিক্ষিত ছিলেন। তিনি
খুবই সামাজিক লোক ছিলেন। তিনি আলীগাঁও অঞ্চলের তথ্যাদি সংগ্রহ করে রাখতেন। ১৯৫২
সাল থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সকল প্রকার ভোটার তালিকা তাঁর কাছে সংরক্ষিত ছিলো।
এখন সেগুলো তাঁর সুযোগ্য ছেলে মজিবর রহমানের কাছে সংরক্ষিত আছে। আমাদের এক সময়
আলীগাঁয়েও বাড়ী ছিলো। মতিয়ার রহমান আমার সম্পর্কীয় তাউই। আলীগঁয়ের বাড়ীটা
মতিয়ার রহমান তাউইর বাড়ীর সাথে লাগোয়া বাড়ী ছিলো। বাড়ীগুলো একটু দ জায়গায়
ছিলো। বর্ষায় জল হতো। তাই ভিটাগুলো উচু উচু ছিলো। দুটি উঁচু ভিটা বাঁধতে গেলে
মাঝখানে যে একটু ব্যবধান সৃষ্টি হয়, সেটুকু ব্যবধানই ছিলো আমাদের দুই
বাড়ীর মাঝখানে।
আমাদের বাবার সাথে মতিয়ার রহমানের
খুবই সুসম্পর্ক ছিলো। বাবা কোনো কাজ করতে গেলে মতিয়ার রহমানের সাথে পরামর্শ করে
করতেন। তাঁদের এই সম্পর্ক অটুট রাখার জন্য আমার ছোট ভাই হোসেন আলী এবং মতিয়ার
রহমানের একমাত্র সন্তান মজিবরের জন্মের আগেই উভয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, যদি
তাঁদের ছেলে সন্তান হয় তবে দোস্ত পাতাবে এবং মেয়ে সন্তান হলে সই পাতাবে। আমার
ছোট ভাই হোসেনের জন্ম আগে হয় এবং মজিবর রহমানের জন্ম হোসেেেনর জন্মের কিছুদিন পরে
হয়। আগের প্রতিজ্ঞা অনুসারে মজিবর রহমানের জন্মের পরেই তাঁদের দোস্ত পাতিয়ে
ছিলেন। তখন উভয়ে কোলে ছিলো। খুব ধুমধাম করে দোস্ত পাতিয়েছিলেন উভয়ের বাবা-মায়েরাঁ।
মজিবর রহমানের মামা কলিমুদ্দিন ‘সয়ফর
মুল্লুক বদিউজ্জামান' নামের একটি যাত্রাপালা গঠন করেছিলো। হোসেন এবং
মজিবরের দোস্তী পাতা উপলক্ষ্যে মজিবরদের বাড়ীতে সেই যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত করেছিলো।
তখন আমার বয়স চার পাঁচ বছর হবে। আমি বাবার কোলে বসে সেই যাত্রাপালা উপভোগ
করছিলাম। যাত্রাপালায় রাক্ষসের ভুমিকা ছিলো। মুখা ব্যবহার করে রাক্ষসের অভিনয়
করছিলো। হাউ-মাউ করে রাক্ষসগুলো এসে সয়ফর মুল্লুকের পক্ষের লোকদের ধরে নিয়ে
যাচ্ছিল। আমি সেই দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠেছিলাম। মজিবরদের উঠানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেই
যাত্রাপালা। খুব লোকজন ছিল না। তাই আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কিছু সময়ের জন্য
যাত্রাপালা স্থগিত রেখে সবাই আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো। যারা রাক্ষসের অভিনয়
করছিলো তাঁরা মুখা খোলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছিলো । আমি শান্ত
হওয়ার পরে আবার অভিনয় শুরু করেছিলো। সেই দৃশ্য আমার মানসপটে এখনও উজ্জ্বল হয়ে
আছে।
নদী ভাঙার কিছু বছর পরেই মজিবরের মাতৃ
ভায়েলা খাতুনের মৃত্যু হয়েছিলো।
ভায়েলা খাতুনের মৃত্যুর অনেকদিন পরে
মতিয়ার রহমান মন্দিয়া পাথারের হাকিম আলীর মেয়ে কুতুবজান নেসাকে বিয়ে করেছিলেন।
সেই স্ত্রীর পক্ষে তিন ছেলে, মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম মহিদুর রহমান,
মৃদুল রহমান এবং মিরজুল রহমান।
মজিবর রহমান-
মজিবর রহমানের জন্ম ১৯৫৫ সালে। শরীরের রং ফর্সা এবং মাঝারি গঠনের। সে বিশেষ
লিখা-পড়া শেখেনি। তবে, অভিজ্ঞতা থেকে সে অনেক কিছু শিখেছে। সে ভালো
বক্তা। একজন ভালো সমাজকর্মীও। ভ্রমণ পিপাসী। ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। সে মিশুক
প্রকৃতির। সবার সাথে মিশতে পারে। সে সাহসী এবং পরোপকার করতে ভালোবাসে। সে
ব্যবসায়ে নিযোজিত। পরিস্কার-পরিচ্চন্নতা খুব পসন্দ করে। সে পাণ-সাদা এবং ধূমপানের
তীব্র বিরোধী। দাঁতের খুব যত্ন করে। সাদা ঝকঝকে দাঁত পসন্দ করে। পোশাক- পরিচ্ছদ
সম্পর্কেও সে খুব মনোযোগী।
মজিবর রহমানের পক্ষ দু'টি।
সে প্রথম বিয়ে করেছিলো সারগাঁয়ের মিজানুর রহমানের মেয়ে বাতাসী নেসাকে । সেই ঘরে
এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে মঞ্জু আকতার, মনোজ
রহমান। প্রথমা স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় সে দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছে
মনিরুদ্দিন সরকারের মেয়ে রাজিয়া সুলতানাকে। রাজিয়া সুলতান কয়েদ আলী ফকিরের
নাতনি। সেই ঘরে এক ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম, ময়না
আকতার এবং মিলন রহমান।
মঞ্জু এবং ময়নার বিয়ে হয়ে গেছে।
মঞ্জু আকতারের দুই মেয়ে এবং একছেলে। তার সন্তানদের নাম যথাক্রমে মিথিলা আকতার,
মোহনা আকতার এবং মাহির শিকদার। ময়নার এখন পর্যন্ত কোনো
সন্তান-সন্ততি হয়নি।
মনোজ রহমান মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ
(এম,আর)। সে বিয়ে করেছে সত্র কনরার কেরামত আলীর মেয়ে পরীমালা আহমেদকে।
তাদের দুই ছেলে। মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে মিসর রহমান এবং মিমর রহমান। মিলন
রহমান এম, কম পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত।
মতিয়ার রহমানের অন্য তিন ছেলে মহিদুর
রহমান, মৃদুল রহমান এবং মিরজুল রহমান ব্যবসায়ের সাথে জড়িত।
ধনাই হাজিঃ- আলীগাঁও
অঞ্চলের নক্ষত্র স্বরূপ জনাই হাজির জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষের বংগদেশের ঢাকা জেলার
অরগজ নামের একটি নদীপ্রবণ গ্রামে ১৮৮৬ সালে। তাঁর পিতৃর নাম নাজির মল্লিক এবং
মাতৃর নাম ময়না খাতুন। সাতজন ভাই-বোনের মধ্যে ধনাই হাজি ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন। তাঁর
ভাই-বোনদের নাম যথাক্রমে মহারাজ মল্লিক, গাদু মল্লিক, কোরপান বেপারী,
কামাল বেপারী, রূপাই মাতবর, ধনাই হাজি এবং
জাহের আলী। তাঁদের একমাত্র বোনের নাম ছিলো রূপজান মল্লিক। মাত্র চার বছর বয়সে
রূপজান মল্লিক নিউমোনিয়া হয়ে অকালে মারা গিয়েছিলো।
ধনাই হাজির কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলেন
না। তিনি নিজের প্রচেষ্টায় ঘরুয়া শিক্ষকের কাছে বাল্যশিক্ষা এবং কোরান শ্বরিফ
পড়তে শিখেছিলো। ১৯১৭ সালে তিনি ঢাকা জেলার দিগলীয়া গ্রামের টেনু মল্লিকের
একমাত্র মেয়ে মজিরন নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে মজিরন নেসার বয়স ৬৫ বছর ছিলো।
টেনু মল্লিকের কোনো পুত্র সন্তান
ছিলনা। তবে, অনেক জমি-জমা ছিলো। শশুড়ের মৃত্যুর পরে ধনাই
হাজি শশুড়ের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শশুড় বাড়ীতে থাকতে শুরু করেছিলেন।
তবে, টেনু মল্লিকের কোনো পুত্র সন্তান না থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁর আত্মীয়
স্বজনেরা সেই সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। ধনাই হাজি
শান্তিপূর্ণ স্বভাবের লোক ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনের মনোভাব লক্ষ্য করে তিনি বংগদেশ
ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং জমি-জমা বিক্রী করে ১৯১৯ সালে আসাম চলে আসেন। আসাম
এসে তিনি বরপেটা সহর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিম এবং জনীয়া থেকে দুই কিলোমিটার
দক্ষিণে অবস্থিত মহম্মদপুড় গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। মহম্মদপুড় গ্রামেই প্রথম
সন্তান মোসলেম উদ্দিনের জন্ম হয়। এর পরে ক্রমে মহম্মদ আলী এবং হারেশ আলীর জন্ম
হয়, কিন্তু মহম্মদ আলী এবং হারেশ আলীর অকাল বিয়োগ হয়। অবশ্যে কিছুদিন
বিরতির পরে জয়নাল আবদিন, জুলহাস উদ্দিন, বাহারজান নেসা,
আয়সা খাতুন, শিরাজুল হক এবং ফয়জল হক জন্ম গ্রহণ
করে।
ধনাই হাজি ১৯৩৭ সালে মহম্মদ পুড়ের
জমি-জমা বিক্রী করে বরপেটা জেলার মন্দিয়া মৌজার অন্তর্গত আলীগাঁও গ্রামে উঠে আসে।
আলীগাঁও আসার পরে তাঁর প্রচেষ্টাতে ১৯৩৯ সালে আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন
করা হয়। বিদ্যালয় গৃহটি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই বিঘা জমি তিনি দান
করেছিলেন। বিদ্যালয় গৃহটি স্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে সহযোগ করেছিলেন, পাক্কু
বেপারি, কয়েদ আলী ফকির, বাজু মল্লিক, জহুর উদ্দিন,
নজর দেওয়ানী, বসির খান, নিজাম খান,
বিনোদ দেওয়ানী, মোকসেদ আলী, আশ্রফ আলী,
মাজম গাঁওবুড়া, ইমারত খান, সমসের বয়াতী,
ঘুতু দেওয়ানী, জলিল হাজি, মানিক দেওয়ানী,
আরিফ মুন্সি, নায়েব আলী মুল্যা, ফিকির
দেওয়ানী, আলম খান, কালু খান, ফালু দেওয়ানী,
নালু দেওয়ানী, মেসের আলী প্রভৃতি তখনকার স্বনামধন্য
ব্যক্তিগণে ।
বিদ্যালয়টি স্থাপন হওয়ার পরে আলীগাঁও
এবং আশেপাশের গ্রামগুলিতে শিক্ষার ক্ষেত্রে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয়টিতে
আলীগাঁও, আলীগাঁও পাথার, আলীর পাম, পালার পাম,
বরলি, সারগাঁও প্রভৃতি গ্রামের ছাত্রদের বাহিরেও অন্য
গ্রাম থেকে ছাত্র এসে লজিং থেকে অধ্যয়ন করতেন। বিদ্যালয়টি ১৯৪২ সালে লোকেল
বোর্ডদ্বারা মঞ্জুরিপ্রাপ্ত হয় ৷
ধনাই হাজি নারী শিক্ষার পোষকতা করতেন।
যাঠের দশকেই আলীগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তারাবানু, সাজেদা খাতুন,
সামর্ত বানু প্রভৃতি ছাত্রীরা অধ্যয়ন করতেন। এম, ই
স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যেও তিনি চিন্তা-চর্চা করছিলেন, তবে শিক্ষকের
অভাবে তাঁর সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬০ সাল থেকে মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন
শুরু হয়। ১৯৬২ সালে তাঁদের বাড়ি ভাঙনের কবলে পরে। ফলতঃ তিনি দুই কিলোমিটার
উত্তর-পশ্চিম দিকে এসে বসতি স্থাপন করেন। নিজের গৃহের সাথে তিনি
বিদ্যালয় গৃহটিও স্থানান্তর করে নিজের বাড়ীর পাশেই স্থাপন করেছিলেন।
বিদ্যালয়টিকে এখনও অনেকে ধনাই হাজির স্কুল বলে পরিচয় দেয়।
ধনাই একজন ধর্মভীরু ব্যক্তি ছিলেন।
তিনি দুবার হজ্ব যাত্রা করেছিলেন। প্রথমবার ১৯৩৯ এবং দ্বিতীয়বার ১৯৫৩ সালে। তাঁর
প্রচেষ্টাতে আলীগাঁয় গ্রামসেবক কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিলো। গ্রামসেবক
কোয়ার্টারের জন্য প্রয়োজনীয় এক বিঘা জমি তিনি দান করেছিলেন। তাঁর গৃহটি হাজি
সাহেবের গৃহ হিসাবে অঞ্চলের লোকে জানত। সামাজিক কাজের পাশাপাশি তিনি রাজনীতির
সাথেও জড়িত ছিলেন। ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ, তাজ উদ্দিন আহমেদ, ধনীরাম
তালুকদার, রেনুকা বরকটকীর মতো স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে তাঁর
সুসম্পর্ক ছিলো। নির্বাচনের সময়ে এইসকল নেতারা ধনাই হাজির গৃহে আশ্রয় নিয়ে
নির্বাচনী প্রচার চালাতেন।
১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আজীবন সমাজ
সেবক, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ধনাই হাজি মৃত্যু বরণ করেন।
ধনাই হাজির ছেলে-মেয়ে নয় জন। মোসলেম
উদ্দিন, মহম্মদ আলী, হারেস আলী, জয়নাল আবদিন,
জুলহাস উদ্দিন, বাহারজান নেসা, আয়সা খাতুন,
শিরাজুল হক এবং ফয়জল হক।
মোসলেম উদ্দিন-
মোসলেম উদ্দিনকে আমি দেখিনি। আমার জন্মের আগেই তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
নানা-নানীর মুখে শুনা মতে তিনি একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। মসজিদের ইমামতি
করতেন। ১৯৪৬ সালে একমাত্র সন্তান রুকিয়া খাতুনের জন্মের পরে তিনি মৃত্যু বরণ
করেছিলেন। রুকিয়া খাতুন এখনও জীবিত। মহম্মদ আলী এবং হারেস আলী-হারেস আলী এবং
মহম্মদ আলীর অকালে মৃত্যু হয়েছিলো। তাই তাদের বিষয়ে লেখা সম্ভব হল না ।
জয়নাল আবদিন-
জয়নাল আবদিন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি
ব্যবসায় করতেন। তিনি মৃদুভাষী এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। সামাজিক কাজের সাথেও
জড়িত ছিলেন তিনি। তাঁর দুটি পক্ষ ছিলো। তিনি প্রথম বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের
কান্দু মিয়ার মেয়ে রহমজান নেসাকে। দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন শিতুলির আবুলির বোন
সালেহা খাতুনকে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে জয়নাল আবদিনের বয়স ৪৫ বছর,
রহমজানের বয়স ৩৪ বছর এবং সালেহা খাতুনের বয়স ২২ বছর। প্রথম পক্ষের
স্ত্রীর তিন ছেলে এবং চার মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে সামত বানু, আব্দুর
রহমান, দুবুলা খাতুন, আকমালা খাতুন, আনোয়ার হোসেন,
শ্বহিদুল ইসলাম এবং রাশিদা খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে,
তিন মেয়ে। তাদের নাম যথাক্রমে সাজেদা খাতুন, আনোয়ারা খাতুন,
ময়নাল হক এবং মঞ্জোয়ারা খাতুন। আব্দুর রহমান কাঠমিস্ত্রী। শ্বহিদুল
ইসলাম ম্যাট্রিক পাশ। দর্জি কাজে নিয়োজিত। আনোয়ার হোসেন ব্যবসায়ী। ময়নাল হক
অনেক বছর ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে আছে।
সামৰ্ত বানু ১৯৬৮ সালে বসন্ত রোগে
আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যু বরণ করেছে।
জুলহাস উদ্দিন-
জুলহাস উদ্দিনকে আমি দেখিনি। নানা-নানীর মুখে শুনা মতে, তিনি বরপেটার
সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতেন। তিনি শ্রেণীতে সব সময় প্রথম
হতেন। সেজন্য তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে তিন বছর পশমীর চাদর
উপহার পেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার কয়েকদিন
আগে ম্যালেরিয়া জ্বর হয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
বাহারজান নেসা-
বাহারজান নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি অতিথিপরায়ণ ধর্মপ্রাণ
মহিলা ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ছিলো ৩০ বছর। তাঁর বিয়ে
হয়েছিলো আলীগঁয়ের জব্বর আলীর ছেলে সুলতান মিয়ার সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে সাতজন।
এক ছেলে, ছয় মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাজেরা খাতুন, নবিয়া
খাতুন, রুকিয়া খাতুন, বাহারুল ইসলাম, দুলন নেসা,
রূপজান নেসা এবং সাহেরা খাতুন।
নবিয়া খাতুন কৈশোর অবস্থায় এবং
রূপজান নেসা কয়েক বছর আগে মৃত্যু বরণ করেছে।
আয়সা খাতুন-
আয়সা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলেন। আয়সা খাতুন আমাদের মাতৃ । তিনি সহজ-
সরল মহিলা ছিলেন। সবার সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের আদর-সোহাগ
করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২৮ বছর। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো
আমাদের বাবা মিঠু মিয়ার সাথে। তাঁদের পাঁচ ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আবুল হোসেইন, হোসেন আলী, খোদেজা খাতুন,
জহুরুল হক, জালেকা খাতুন, সামসুল হক এবং
ওমর ফারুক কিবরিয়া।
জহুরুল হক ১৯৮৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর-এ
ম্যালেরিয়া জ্বর হয়ে মারা গেছে। আয়সা খাতুন ২০০১ সালে মৃত্যু বরণ করেছেন ।
শিরাজুল হক-
শিরাজুল হক মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। তিনি পঞ্চায়েত সেক্রেটারি ছিলেন।
২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেছেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৩০ বছর।
অবসরের আগে এবং পরে তিনি সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। এখন শয্যাশায়ী। তিনি
বিয়ে করেছেন গোবিন্দপুড়ের উমেদ আলী হাজির মেয়ে বাসিয়া বেগমকে। তাদের চার ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সিরিয়া খাতুন, আব্দুল
বাসেদ, আব্দুল বারেক, মহিদুল ইসলাম এবং আরিফুল ইসলাম। ছেলেরা
সবাই ব্যবসায়ী। তবে, মহিদুল ইসলাম কাদিয়ান সম্প্রদায় ভূক্ত। সে
বলতে গেলে ধনাই হাজির বংশের কলংক। তাঁকে তার বাবা শিরাজুল ইসলাম ত্যাজ্যপুত্র
করেছে কাদিয়ান সম্প্রদায় ভূক্ত হওয়ার জন্য। মহিদুল উগ্র স্বভাবের। লোকের সাথে
তেমন সদ্ভাব রেখে চলে না । শিরাজুল ইসলাম ২০২১ সােলর ৩১ জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেছেন।
ফয়জল হক-
ফয়জল হক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি সামাজিক কাজের সাথে জড়িত থাকার
পাশাপাশি অভিনয়ের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর অভিনয় খুবই বলিষ্ঠ ছিলো। তিনি অনেক
নাটক এবং গীতিনাট্যে অভিনয় করেছেন। সুযোগ পেলে তিনি সিনেমায়ো অভিনয় করতে
পারতেন। তাঁকে সবাই সন্মান করে ‘হক সাহেব’ বলে সম্বোধন
করতো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২৫ বছর। তিনি বিয়ে করেছিলে
রূপাকুছির ইয়াদ আলীর মেয়ে খোদেজা খাতুনকে। খোজেদা খাতুন কিছু শিক্ষিত এবং খুবই
অমায়িক মহিলা ছিলেন। আমি তাঁদের বিয়েতে উকিল হয়েছিলাম। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
সাতজন। তিন ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে খোরশিদ আলম,
মমতাজ খাতুন, ফরিদা খাতুন, মফিদা খাতুন,
মাজিবুল ইসলাম, সুফিয়া খাতুন এবং রাখিফুল ইসলাম।
খোরশিদ আলম অটোচালক। ফরিদা খাতুন ম্যাট্রিক পাস। অংগনবাদী কর্মী। মাজিদুল ইসলাম
ম্যাট্রিক পাস। ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। অন্যরা সবাই কম-বেশি পরিমাণে স্বাক্ষর।
হোসেন মল্লিকঃ-হোসেন
মল্লিক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি ছিপছিপে গঠনের ছিলেন। সহজ-সরল
ছিলেন এবং কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সরবেশ নেসা। সরবেশ নেসা একটু স্থূল,
মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামবর্ণ ছিলো। খুবই সহজ-সরল মহিলা
ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হোসেন মল্লিকের বয়স ৫২ বছর এবং
সরবেশ নেসার ৪৭ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে দশজন। চার ছেলে, ছয় মেয়ে।
ছেলেদের নাম সরবেশ আলী, আলী হোসেন, একাব্বর আলী,
তালেবর রহমান। মেয়েদের নাম, রংমালা খাতুন, জয়গন নেসা,
তুষ্ট বানু, রাবিয়া খাতুন, সবিয়া খাতুন
এবং সুফিয়া খাতুন।
সরবেশ আলী-
সরবেশ আলী মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং ফর্সা। তিনি সহজ-সরল এবং সাজিয়ে কথা বলতে
পারে। খইয়ের মতো কথা বেরোয় তাঁর মুখ থেকে। তিনি আলীগাঁও লাটের গাঁওবুড়া। তিনি
বিয়ে করেছেন আলীগাঁয়ের রখমত আলীর মেয়ে নবিরন নেসাকে। নবিরন নেসা মাঝরি গঠনের
এবং শরীরের রং ফর্সা। দেখতে সুন্দরী। সহজ-সরল স্বভাবের মহিলা। আমার থেকে বয়সে
কিছু ছোট। তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
নবির উদ্দিন, সাহেরা খাতুন, বিমলা খাতুন,
মহির উদ্দিন এবং শহিদুল ইসলাম। শহিদুল ইসলাম হায়ার সেকেন্ডারি পাস।
অন্যরা স্বাক্ষর। ছেলে-মেয়ে সবার বিয়ে হয়ে গেছে । নবির উদ্দিন বাদে
ছেলে-মেয়েরা সবাই আমার ছাত্র ছিলো।
আলী হোসেন-
আলী হোসেন লম্বা এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে এখন বরপেটা রোডের নিচুকা গ্রামের
বাসিন্দা। কৃষিকাজ করে। তিনি বয়সে আমার থেকে কিছুটা বড়। খুবই সহজ-সরল। কম কথা
বলে। তিনি স্বাক্ষর। তিনি বিয়ে করেছেন আলীগাঁয়ের খৈমুদ্দিনের মেয়ে আসাতন
নেসাকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে তিন জন। এক ছেলে, দুই মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে জরিমন নেসা, কমলা খাতুন এবং আজাহার আলী। জরিমন নেসা
স্বাক্ষর। আমার ছাত্রী ছিলো । কমলা খাতুন ২০১২ সালে মারা গেছে।
একাব্বর আলী-
একাব্বর আলী লম্বা এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে স্বাক্ষর। আগে কৃষিকাজ করতো, নদী ভাঙার
পরে ব্যবসায় করে। সে সহজ-সরল। কম কথা বলে। সে বিয়ে করেছে পিঠাদির কাশেম মুন্সির
মেয়ে পিয়ারজান নেসাকে। তাদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে রফিকুল ইসলাম, জেহেরুল ইসলাম এবং মফিদা খাতুন। রফিকুল
ইসলাম হায়ার সেকেন্ডারি পাস। মফিদা খাতুনকে বিয়ে দিয়েছে গোবিন্দপুড় অঞ্চলের
বিখ্যাত সমাজ সেবক মোসলেম উদ্দিন সরকারের নাতি মহির উদ্দিনের সাথে।
তালেবর রহমান-
তালেবর রহমান লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সে আগে গুয়াহাটীতে অটো চালাতো, বর্তমান
ব্যবসায় করে। সে মৃদুভাষী, নম্র। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের কছিম
উদ্দিনের মেয়ে সামচুন নেহারকে। সামচুন নেহার আমার ছাত্রী ছিলো। সামচুন নেহার
লম্বা এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। খুবই নম্র এবং মৃদুভাষী। তাদের ছেলে
দুইজন। মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম, সানোয়ার রহমান এবং আনোয়ার রহমান।
সানোয়ার রহমান হায়ারসেকেন্ডারি পাস।
রংমালা-
রংমালা মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী, সহজ-সরল।
তাঁর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের মাতবর আলীর ছেলে পিয়ার আলীর সাথে। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আব্দুর রহমান, সাদেক আলী, নূরজাহান বেগম
এবং রেজিয়া খাতুন ।
জয়গন নেছা-
মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার বিয়ে
হয়েছে আলীগাঁয়ের খৈমুদ্দিনের ছেলে জলিমুদ্দিনের সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম তুষ্টবানু, আয়সা খাতুন,
খোরশেদ আলী, মুক্তার আলী, কাশেম আলী এবং
লোকমান আলী। তুষ্টবানু- তুষ্টবানু মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং কালো। মুখমন্ডলে
বসন্তের দাগ বিদ্যমান। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার বিয়ে হয়েছে গোবিন্দপুড়ের
খইমুদ্দিনের সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম জালাল উদ্দিন, জামাল
উদ্দিন, বিল্লাল হোসেন, আব্দুল করিম, আবুল হোসেন এবং
ময়ূরজান নেসা।
রাবিয়া খাতুন-
রাবিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শরীরের রং শ্যামলা। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার
বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের নসের আলীর সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে,
দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জ্যোৎস্না বানু, বাদশাহ
মিয়া, আক্কেস আলী এবং রাশিদা খাতুন ।
সাবিয়া খাতুন-
সাবিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছে আগমন্দিয়ার আলী
হোসেনের ছেলে রমজান আলীর সাথে। তাঁদের এক ছেলে। নাম ফালু মিয়া। সাবিয়া খাতুন
কিছুদিন আগে মারা গেছে। সুফিয়া খাতুন- সুফিয়া খাতুন মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল
শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী এবং নম্র। তার বিয়ে হয়েছে হেলচাপামের আজিবর রহমানের ছেলে
লিয়াকত আলীর সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে।
তাঁদের নাম মোন্নাফ আলী, সানিদুল ইসলাম, নূরজাহান বেগম
এবং পরীমালা খাতুন ।
বাজু মল্লিক- বাজু মল্লিককে
আমি দেখিনি। তাই তাঁর বিষয়ে
বিশেষ কিছু উল্লেখ করা সম্ভব হবে না। তবে, লোক মুখে শুনেছি, তিনি
ভালো বিচারক এবং সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। বাজু মল্লিকের স্ত্রীর নাম ছিলো
কমলা খাতুন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে কমলা খাতুনের বয়স ছিলো ৭০ বছর।
তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে কুরজত আলী,
বিন্দু নেসা, মুন্তাজ আলী এবং ইন্তাজ আলী।
কুরজত আলী- কুরজত
আলী লম্বা ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। তাঁর দুটি পক্ষ ছিলো।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম ছিলো তসিরন নেসা। তসিরন নেসা ইদারা থেকে জল তুলতে গিয়ে
ইদারায় পরে মারা গিয়েছিলো। তসিরন নেসা মারা যাওয়ার পরে সরিপন নেসাকে বিয়ে
করেছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে কুরজত আলীর বয়স ৪৮ বছর এবং সরিফন নেসার
২৮ বছর। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নেই। মনে হয়,
তিনি ১৯৬৬ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর তিন
ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে তাইজুদ্দিন, কালাচান,
মনুরুদ্দিন এবং মালেকা খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে,
তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মজিবর রহমান, জমেলা
খাতুন, বাসিরন নেসা, আসিরন নেসা এবং সাহেরা খাতুন।
ভাই-বোনদের মধ্যে একমাত্র কালাচানই বি, এ, পাস। অন্যান্যরা
স্বাক্ষর।
বিন্দু নেসা-
বিন্দু নেসা লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। বিন্দু নেসাকে আমি নানী বলে ডাকতাম। তিনি খুবই
স্নেহশীল মহিলা ছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের নালু মল্লিকের সাথে। শুনেছি,খাজনা
না দেওয়ার জন্য নালু মল্লিকের ৮০ বিঘা জমি সরকার খাস করেছিলো। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
ছয়জন। দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফালু মিয়া,
আদরজান নেসা, নুরুল ইসলাম, জয়নব খাতুন.
জিন্নতমালা, ময়ূরি খাতুন এবং আঞ্জোয়ারা খাতুন। ফালু
মিয়াৰ একটি চোখ কানা ছিলো। ছোটবেলা বসন্ত রোগ হয়ে তাঁর চোখ কান হয়ে গিয়েছিলো। নুরুল
ইসলাম আমার সমবয়সী ছিলো। তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব ছিলো। সে ভারতীয়
মার্ক্সবাদী কমিউনিষ্ট দলের সদস্য ছিলো। সে এম, ই স্কুলের
শিক্ষক ছিলো। ২০১৫ সালে সে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলো। সে হার্টের অপারেশ্বন
করিয়ে ছিলো। অপারেশ্বনের কয়েক মাস পরে সে ২০২১ সালের ২ আগষ্টে মারা গেছে। বড় মেয়ে
আদরজান নেসা অনেকদিন আগে এবং ফালু মিয়া ২০০৭ সালে মারা গেছে। নালু মিয়া এবং
বিন্দু নেসাও অনেকদনি আগে মারা গেছে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নালু
মল্লিকের বয়স ৫৩ এবং বিন্দু নেসার ৪০ বছর ছিলো। জীবিত মেয়েরা সবাই গৃহিনী।
মুন্তাজ আলী-
মুন্তাজ আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি
কাপড়ের দোকান করতেন। পরবর্তী জীবনে তিনি বিচারক হিসাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে খুবই
সুনাম অর্জন করেছিলেন। তাঁকে সবাই মুন্তাজ দেওয়ানী হিসাবে জানত। আমার সাথেও তাঁর
সুসম্পর্ক ছিলো। তাঁর সাথে দুই একটি বিচারে আমিও অংশ গ্রহণ করতাম। তাঁর পক্ষ দুটি।
প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম আমিরন নেসা এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম লক্ষী নেসা।
লক্ষী নেসা আমার সমবয়সী এবং আলীগাঁয়ের আমেজ উদ্দিনের মেয়ে। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে মুন্তাজ আলীর বয়স ২৮ বছর এবং আমিরন নেসার বয়স ২৩ বছর। প্রথম
পক্ষের স্ত্রীর দুই ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
জেলেকা খাতুন, ওমর আলী এবং আহসান আলী। দ্বিতীয় পক্ষের
স্ত্রীর তিন ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রতন আলী(কালু
মিয়া), ফজর আলী, জুলমত আলী এবং জাহানারা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা
সবাই বিবাহিত।
ইন্তাজ আলী-
ইন্তাজ আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি কাপড়ের
ব্যবসায় করতেন। তিনি সামাজিক কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। তাঁর পক্ষ দুটি। প্রথম
পক্ষের স্ত্রীর নাম বসিরন নেসা। আগমন্দিয়ার রহিমুদ্দিন হাজির মেয়ে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর নাম হরিন নেসা। হরিন নেসা ভক্তেরডোবার মেয়ে। তাঁর বাবার নাম আমার
জানা নেই। প্রথম পক্ষ স্ত্রীর চার ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আব্দুল লতিফ (বসিরুদ্দিন), কছিম উদ্দিন, জমির আলী,
জয়নাল আবদিন, ডালিমন নেসা, কদবানু এবং
সরবানু। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
হুরমুজ আলী, মরিয়ম নেসা, ফিরোজা খাতুন
এবং রাশিদা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত।
আব্দুর রশিদঃ-আব্দুর
রশিদ লম্বা-চওড়া ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি সমাজিক কাজের সাথে
জড়িত ছিলেন। সাজিয়ে কথা বলতে পারতেন। একবার গল্প বলা শুরু করলে তাঁর কাছ থেকে
উঠে আসা সম্ভব হতো না। এমনকি প্রসাব করতে যাওয়াও সম্ভব হতো না। তিন-চার ঘন্টা
বিরামহীনভাবে গল্প বলতে পারতেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প। একটা গল্প শেষ হতে
না হতেই আর একটি গল্প শুরু করতেন। আমি দু-চারবার তাঁর গল্প শুনেছি। মানুষের সাথে
তাঁর খুবই সদ্ভাব ছিলো। তিনি খুবই সাহসী ছিলেন। নিজের ক্ষতি হলেও পরের উপকার করতে
ভালোবাসতেন। প্রথম জীবনে তিনি ধূমপান করতেন যদিও শেষ জীবনে ধূমপান ছেড়ে
দিয়েছিলেন এবং অন্যরা যাতে ধূমপান না করে তার জন্য উপদেশ দিতেন। তিনি ১৯৬৩ সালে
মানিকপুড় পঞ্চায়তের সভাপতি এবং ১৯৮৫ সালে পশ্চিম মন্দিয়া সমবায় সমিতির সভাপতি
নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি আলীগাঁও এম, ই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাপক সভাপতি ছিলেন।
অব্দুর রশিদের দু'টি
পক্ষ ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম ছিলো কমলা খাতুন। কমলা খাতুন নিঃসন্তান
ছিলেন। তাই তিনি করিমন নেসাকে দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে আব্দুর রশিদের ৫০ বছর, প্রথমা স্ত্রী কমলা খাতুনের ৩৫ বছর এবং
দ্বিতীয় স্ত্রী করিমন নেসার ২২ বছর বয়স ছিলো। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর কোনো
সন্তান-সন্ততি নেই। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সাত ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে কালু মিয়া(খেপু), ছমিরন নেসা, আমিরন নেসা,
জংসের আলী, সোহরাব আলী, রাশিদা বেগম(জামিরননেসা),
আব্দুল বারেক আলী, সামসুল হক আজিজুল হক এবং জাকির হোসেন।
আব্দুর রশিদ ১৯৯৮ সালে জুলাই মাসের ১৫
তারিখে এবং কমলা খাতুন ১৯৯৯ সালে নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে মারা গেছে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রী করিমন নেসা এখনও জীবিত।
কালু মিয়া-
কালুমিয়া লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ।ছিপছিপে। আমার থেকে বয়সে কিছুটা ছোট। সে
কাঠ মিস্ত্রী। সে বাবার মতো সাজিয়ে কথা বলতে পারে। মৃদুভাষী। মানুষের সাথে সদ্ভাব
রেখে চলে। সে বিয়ে করেছে বালিকুরির জহুরুদ্দিনের মেয়ে জহুরা খাতুনকে। তাঁদের দুই
ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রুকিয়া খাতুন, জেহেরুল
ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, রেজিয়া খাতুন এবং ডালিমন নেসা ।
ছমিরন নেসা-
জমিরন নেসা লম্বা এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে শিতুলির হজরত আলীর ছেলে আবুল
কাশেমের সাথে। তাঁদের দুই ছেলে। আকবর আলী এবং আতোয়ার রহমান(আব্দুল আলিম।)
আমিরন নেসা-
আমিরন নেসা লম্বা-চওড়া ছিপেছিপে গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে মিশুক প্রকৃতির এবং
নরম মেজাজের মহিলা ছিলো। তার বিয়ে হয়েছিলো বঙ্গাইগাঁও জেলার ডালকাটার সামসুল
হকের ছেলে আব্দুল কাদেরের সাথে। তাদের এক ছেলে, তিন মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আনোয়ার হোসেন, সানিয়ারা খাতুন, রাজিমা
খাতুন এবং সিলিমা খাতুন।
আমিরন নেসা ২০০৯ সালে মারা গেছে। মেয়ে
রাজিমা খাতুন ২০০২ সালে অকালে মারা গেছে।
জংসের আলী-
জংসের আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সে কাঠমিস্ত্রী। মিশুক প্রকৃতির, কম কথা বলে। সে
বিয়ে করেছে কনরা গ্রামের আবু মিয়ার মেয়ে হাসিনা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম, জেসমিনা খাতুন এবং সানিদুল ইসলাম।
উভয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পাস।
সোহরাব আলী-
সোহরাব আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজে নিয়োজিত। মিশুক প্রকৃতির ছোট ছোট
করে কথা বলে। সে বিয়ে করেছে মরাভাজের আশ্রব আলীর মেয়ে নুরজাহান বেগমকে। তাদের এক
ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সুরিয়া খাতুন, জান্নাতুল
ফিরদৌসি, ফাতিমা খাতুন এবং মাসুদ জোবায়ের। জান্নাতুল ফিরদৌসি ম্যাট্রিক এবং
হায়ার সেকেন্ডারি (বিজ্ঞান)তে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে এখন ম্যাডিকেল
এন্ট্রান্সের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছে।
রাশিদা খাতুন-
লম্বা এবং ফর্সা। মৃদুভাষী। সবার সাথে মিশতে পারে। তার বিয়ে হয়েছে সত্র কনরার
শংসের বয়াতীর ছেলে আবু বাক্কার সিদ্দিকের সাথে। তাদের এক ছেলে, চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাজিদা খাতুন, রাশিদুল ইসলাম, সুলেমা খাতুন,
তাহমিনা খাতুন এবং রুনা লায়লা।
আব্দুল বারেক-
আব্দুল বারেক মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী। মিশুক
প্রকৃতির। প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করে। সে বিয়ে করেছে সত্র কনরার আব্দুল
মান্নাফের মেয়ে আনোয়ারা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম আনাস আলী এবং আঞ্জুমা খাতুন।
সামসুল হক-
মাঝারি গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে মিশুক প্রকৃতির। হাফিজিও পড়েছিলো। তবে,
সম্পূর্ণ করতে পারেনি। এখন সে একটি প্রাইভেট স্কুলের কেরানি। সে
দ্বীনি তালিমের বরপেটা জেলার সেক্রেটারি। সে বিয়ে করেছে আগমন্দিয়ার নাজিম
উদ্দিনের মেয়ে রাশিদা খাতুনকে। তাদের দুই ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে আরিফুল হক, সাদিকা আফ্রিন এবং মিসবাহুল হক।
ছেলে-মেয়েরা সবাই শিক্ষার্থী।
আজিজুল হক-
মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। সে রাজমিস্ত্রী। তার পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষের
স্ত্রীর নাম আনোয়ারা খাতুন। সে কয়াকুছি পাথারের রহিম বাদশাহর মেয়ে। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর নাম আসমিনা খাতুন। গোয়ালপাড়া জেলার বরপাহারের মোকসেদ আলীর মেয়ে।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী আনোয়ারা খাতুনের একমাত্র মেয়ের নাম আয়সা সিদ্দিকা।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর এক ছেলে এক মেয়ে। সন্তানদের নাম ইমামূল হক এবং আতিকা
খাতুন।
জাকির হোসেন-
জাকির হোসেন মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ। সে মৃদুভাষী। ব্যবসায়ী। সে
বিয়ে করেছে ১ নং চাচরার রফিকুল ইসলামের মেয়ে নারজিনা খাতুনকে। তাদের এক ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম জুবাইদা খাতুন এবং খালিদ হোসেন।
পুচাই দেওয়ানী-
পুচাই দেওয়ানী লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। আলীগাঁও
প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিলো । তিনি ভালো
বিচারক ছিলেন এবং সমাজের মাতব্বরি করতেন। ব্রিটিশের আমলে তিনি জুরির হাকিম
নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম সুরতজান নেসা।
তিনি মারা যাওয়ার পরে বাছাতন নেসাকে বিয়ে করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে পুচাই দেওয়ানীর বয়স ৮৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী বাছাতন নেসার বয়স ৭০ বছর।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী সুরতজান নেসা ১৯৬৬ সালের অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাই ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী সুরতজান নেসার চার
ছেলে। মেয়ে নেই। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুর রশিদ, ওয়াজুদ্দিন,
রখমত আলী এবং হাকিমুদ্দিন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী বাছাতন নেসার
ছেলে-মেয়ে সাতজন। তিন ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফজল
হক(হজরত আলী), জয়তন নেসা, কাশেম আলী,
জায়েদা খাতুন, মানিকজান নেসা, মোবারক আলী এবং
চন্দ্ৰবানু।
আব্দুর রশিদ-
আব্দুর রশিদের বর্ণনা আগেই দেওয়া হয়েছে। আবার বর্ণনা দেওয়া বাহুল্য হবে বলে
এখানে বর্ণনা দিলাম না।
ওয়াজুদ্দিন-
ওয়াজুদ্দিন লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিলেন।
শেষ বয়সে তিনি সুফিপীর হয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম মজিরন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে ওয়াজুদ্দিনের বয়স ৪৮ বছর এবং মজিরন নেসার বয়স ৪৫ বছর। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে আঠজন। সাত ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে নুর হোসেন, মৈজুদ্দিন,
খোদেজা খাতুন, মহুরুদ্দিন, বসিরুদ্দিন,
ইউনূস আলী আহমেদ, সিদ্দিক আলী এবং কদ্দুস আলী। এদের
মধ্যে নুর হোসেন, মৈজুদ্দিন এবং মহুর উদ্দিন স্বাক্ষর।
বসিরুদ্দিন বি,এ পাস, ইউনূস আলী বিএসসি পাস। সিদ্দিক আলী ও
কদ্দুস আলী হায়ার সেকেন্ডারি পাস। ইউনূস আলী মানিকপুড় জনকল্যাণ হাইস্কুলের
বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলো। সে ২০০৯ সালে হজ্ব যাত্রা করেছিলো । ২০১০ সালে হার্ট অ্যাটাক
করে সে হঠাৎ মারা হেছে। ইউনূস আলীর মৃত্যুর কিছুদিন পরে মৈজুদ্দিনো হার্ট অ্যাটাক
হয়ে মারা গেছে।
রখমত আলী-রখমত
আলী লম্বা, ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি আমার ছোট
ভাই হোসেন আলীর শশুড়। তিনি প্রথমে কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিলেন এবং পরে
কাঠমিস্ত্রী হিসাবে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। তিন ছেলে,
তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সূর্যবানু, ফজর আলী,
হাজিরন নেসা, সাদেক আলী, মুনসের আলী,
সাজিরন নেসা এবং রহিমা খাতুন। সূর্যবানু অনেক আগে বার বছর বয়সে মারা
গেছে। মহিষে গলার মাঝে শিং হেনে তাকে হত্যা করেছিলো। ফজর আলী ২০০৮ সালে এবং সাদেক
আলী অবিবাহিত অবস্থায় বার বছর বয়সে ম্যালেরিয়া হয়ে মারা গেছে।
আগে বসন্ত, কলেরা এবং
ম্যালেরিয়া হয়ে অনেক লোকের জীবন হানি হত।
হাকিমুদ্দিন-
হাকিমুদ্দিন লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর বাম
চোখ বগে ঠোকর দিয়ে কানা করেছিলো। হাকিমুদ্দিনের দুটি পক্ষ ছিলো। প্রথম পক্ষের
স্ত্রীর নাম শুকুরজান নেসা এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম রূপবানু নেসা। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হাকিমুদ্দিনের বয়স ৩৮ বছর, শুকুরজান নেসার
৩১ বছর এবং রূপবানু নেসার ২৯ বছর। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর একমাত্র মেয়ে বায়লা
খাতুন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর রূপবানু নেসার ছেলে-মেয়ে চার জন। দুই ছেলে,
দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে হাসমত আলী, হাসেন আলী,
মনোয়ারা খাতুন এবং আনোয়ারা খাতুন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত এবং
জীবিত আছে। রূপবানু নেসাও জীবিত।
ফজল হক-
ফজল হক লম্বা ছিপছিপে গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলো। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ৩৫ বছর। তার পক্ষ দুটি। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর
নাম আদরজান নেসা। আদরজান নেসা চিররোগী ছিলেন। তাই তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেছিলেন।
দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম সোনাবানু। তিনি রূপাকুছির নুরবক্সের মেয়ে। প্রথম
পক্ষ স্ত্রীর ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম, হনুফা
খাতুন, মেহেরুন নেসা, হানিফ আলী এবং হাসেনা বানু। দ্বিতীয়
পক্ষের স্ত্রীর ছেলে- মেয়ে নয়জন। দুই ছেলে, সাত মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে বানু নেসা, আসমা খাতুন, সমেলা বেগম,
নোমাজ আলী, রমেলা খাতুন, নিলীমা খাতুন,
মেঘজান নেসা, হালিদা খাতুন এবং হোসেন আলী।
ফয়জল হক ২০১৭ সালে মারা গেছে।
জয়তন নেসা-লম্বা-চওড়া
এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের কবির আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের সাথে।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
আকবর আলী, সাহেলা খাতুন, মুননুজান, নেসা এবং জবেদ
আলী।
কাশেম আলী-কাশেম
আলী লম্বা, বলিষ্ঠ এবং শ্যামবর্ণ। তিনি কৃষিকাজে নিয়োজিত।
এখন ছেলেরা কাজের উপযুক্ত হয়েছে। তাই তিনি এখন কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি
বর্তমান ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। তিনি বিয়ে করেছেন সত্র কনরার মহম্মদ আলীর মেয়ে
কদবানুকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয়জন। পাঁচ ছেলে, চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে মেসের আলী, সাহজাহান আলী, আজাহার আলী,
জাহানারা খাতুন, রফিদা খাতুন, মঞ্জোয়ারা
খাতুন, সারিফুল ইসলাম। জাহাঙ্গীর আলম, মিনুয়ারা
পারবিন। ছেলে-মেয়েরা সবাই আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিলো।
মেসের আলী ম্যাট্রিক পাস। মেসের আলী
এবং আজাহার আলী ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সাহজাহান আলী কৃষিকাজে নিয়োজিত।
সারিফুল ইসলাম বি, এ পাশ। সে এখন ‘জমাটো' কোম্পানীতে
কর্মরত। জাহাঙ্গীর আলম হাফিজি বিভাগে অধ্যয়ন করেছিলো, তবে অধ্যয়ন
সম্পূর্ণ করতে পারেনি। সে এখন মাধ্যমিক স্কুলে ক্লাস এইটে অধ্যয়রত। মেয়েদের সবার
বিয়ে হয়ে গেছে।
জায়েদা খাতুন-
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তার বিয়ে হয়েছিলো আশ্রব আলীর ছেলে শুকুর আলীর সাথে।
তাঁদের কোনো সন্তান-সন্ততি নেই। এখন সে কাশেম আলীর সংসারে জীবন যাপন করছে।
মোবারক আলী-
মোবারক আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। ম্যাটিক পাস। সে প্রথমে দর্জি কাজ
করতো পরে কাঠমিস্ত্রী কাজে নিয়োজিত হয়েছিলো। সে মৃদুভাষী এবং গম্ভীর প্রকৃতির
ছিলো। সে বিয়ে করেছে আলীগঁয়ের সুলতান মিয়ার মেয়ে সাহেরা খাতুনকে। তাদের
ছেলে-মেয়ে ছয়জন। তিন ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
সহিদুল ইসলাম, সফিকুল ইসলাম, মাজেদা খাতুন,
ফরিদা খাতুন, ইকবাল হোসেন এবং এসমিনা খাতুন । সহিদুল
ইসলাম রাজমিস্ত্রী, সফিকুল ইসলাম ম্যাডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ,
ইকবাল হোসেন বি, এ পাস। ঔষধ ব্যবসায়ে নিয়োজিত।
মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। মোবারক আলী ২০১৯ সালে মারা গেছে।
চন্দ্রবানু-
চন্দ্রবানু লম্বা এবং ফর্সা। মৃদুভাষী। বিয়ে হয়েছে সত্রকনরার তুফান আলীর ছেলে
খোরশেদ আলীর সাথে। তাদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। এক ছেলে, চার মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে সূর্যবানু, সাহিদা বেগম, রাশিদা খাতুন,
সাহানূর আলী এবং ইলিমা খাতুন ।
দানেশ মুন্সি- দানেশ
মুন্সি মাঝারি গঠনের স্বাস্থ্যবান এবং কালো ছিলেন। তাঁর বাবার নাম পাকু বেপারি।
আমি পাক্কু বেপারিকে একেবারে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখেছি। তখন তিনি কুঁজা হয়ে
গিয়েছিলেন। লাঠি নিয়ে কুঁজা হয়ে চলা-ফেরা করতেন। চোখে চশমা লাগাতেন। দানেশ
মুন্সি আমাদের কাকা ভেলুমিয়ার শশুড়, আমাদের সম্পর্কীয় নানা। আলীগাঁয়ের
মাঝে দানেশ মুন্সি সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। শুনেছি, তাঁদের আড়াইশ
বিঘা জমি ছিলো। তিনি ব্যবসায়ে নিয়োজিত ছিলেন। মরশুমে পাট, সরিষা, কালাই
প্রভৃতি কিনে ‘স্টক’ করে রাখতেন এবং দাম উঠলে বিক্রী করতেন।
তাঁদের ভেতর বাড়ীর উঠানে সব সময় পাটের একটি পুঁজি থাকতো। সেই পুঁজিতে শেওলা পরে
থাকতো। তাঁরা নতুন ধানের ভাত খুব কমই খেতেন। তিন চার বছরের পুরানা ধানের চালের ভাত
খেতেন। আমি মাঝে মধ্যে তাঁদের বাড়ী গিয়ে পুরানা ধানের ভাত খেতাম। মাস কলাইর ডাল
এবং পুরানা চালের ভাত খেতে ভালই লাগতো। রাখাল চাকর দিয়ে বাড়ী সব সময় সরগরম হয়ে
থাকতো। তাঁদের একটি মহিষের গাড়ী ছিলো। মহিষ দুটি খুবই বড় ছিলো। একটির রং সাদা
এবং একটি কালো ছিলো। মহিষের শিংগুলো খুবই বড় বড় ছিলো। সেই অঞ্চলের মাঝে তাঁদের
মহিষই সবচেয়ে বড় এবং দেখতে সুন্দর ছিলো। নদী ভাঙনের পরে অবস্থা অনেকটা দুর্বল
হয়ে গিয়েছিলো। তবে, তেমন নয়। কথায় আছেনা, নদী মরলেও নদীর
রেখ থাকে !
শুনেছি, দানেশ মুন্সি
হেঁটেই বহরি বাজারে যাওয়া আসা করতেন। বহরি আলীগাঁও থেকে কমেও দশ/বার মাইলের
রাস্তা। কথাটা ভাবতে অবাক লাগে! সাইকেল অবশ্যে ছিলো, তবে দানেশ
মুন্সি সাইকেল খুব কম চালাতেন। সাইকেল থাকতে সাইকেল কেন চালায় না,
এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে বলতেন- হাঁটলে শরীর সুস্থ থাকে। যেখানে
হেঁটেই পারা যায়, সেখানে সাইকেল চালানোর কি দর্কার? পায়ের
চাপেই যে খুঁটি গাড়া যায়, সেখানে ঢেঁকির দর্কার কি !
দানেশ মুন্সি আমাকে ভালই স্নেহ করতেন।
আমি মাঝে-মধ্যে তাঁর কাছে গিয়ে বসতাম। তিনি একদিন বলেছিলেন- ‘আবুল,
যার সমালোচনা বেশি, সে তত বিখ্যাত লোক। একমাত্র পাথরের
সমালোচনা নেই। আল্লাহই যাকে চুল ধরে ওপড়ের দিকে টানে, মানুষ বাল ধরে
টেনে তাকে তল মুখে নামাতে পারে না । এই কথা সব সময় মনে রাখবে।'
দানেশ মুন্সির স্ত্রীর নাম ছিলো সুহাগী
নেসা। তিনি মাঝারি গঠনের স্বাস্থ্যবান এবং ফর্সা ছিলেন। খুবই অমায়িক মহিলা ছিলেন।
ধনী বলে কোনোদিন অহংকার করতে দেখিনি। আমরা তাঁদের বাড়ী গেলে নিজের নাতি- পুতির
মতোই স্নেহ আদর করতেন। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে দানেশ মুন্সির বয়স ৬০ এবং
সুহাগী নেসার ৪৫ বছর ছিলো। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। দুই ছেলে, তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আয়সা খাতুন, জমেলা খাতুন,
জুরান আলী, জাকির হোসেন এবং হামেলা খাতুন ।
অসিরন নেসা-
অসিরন নেসা মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো জাহানারপাড়ের বুদ্ধু
মিয়ার ছেলে ভেলু মিয়ার সাথে। ভেলু মিয়া আমাদের কাকা। সেই সুবাদে তিনি আমাদের
কাকী। তিনি খুবই অমায়িক এবং মৃদুভাষী মহিলা। তাঁদের তিন ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে রেজিয়া খাতুন, আয়নাল হক, সালেহা খাতুন,
মহেলা খাতুন, জয়গন নেসা, আক্কাস আলী,
আফসার আলী এবং সোনাবানু। রেজিয়া খাতুনের বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের
রজব আলীর ছেলে ওয়াজেদ আলীর সাথে। রেজিয়া খাতুন অনেকদিন আগে মারা গেছে।
জমেলা খাতুন-
জমেলা খাতুন মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। দানেশ মুন্সির ছেলে-মেয়ের মধ্যে ধনী
হিসাবে কেউ তেমন অহংকারী নয়। বলতে খারাপ লাগলেও বলতে হয় যে, জমেলা
খাতুন একটু অহংকারী বলে ধারণা হয়। তবে, তেমন নয়। সবার সাথেই মিশতে পারে।
জমেলা খাতুনের বিয়ে হয়েছিলো বাঘবর পাথারের জবান আলী ফকিরের ছেলে জহুরুদ্দিনের
সাথে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে আঠজন। সাত ভাই, এক বোন। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফয়জল
হক, নুরুল ইসলাম. হাসেন আলী, মোনসের আলী, হানিফ আলী,
রখমত আলী, আকমত আলী এবং হাসেনা বানু।
ফয়জল হক আগে চাহ দোকান করতো, ছেলেরা
কাজের উপযুক্ত হওয়াতে এখন অবসর নিয়েছে। নুরুল ইসলাম এম, এ, বি,
এড। সে ভেঞ্চার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। হাসেন আলী একটু
অন্যপ্রকৃতির। সে কবিরাজি করে। সাধু সন্যাসীদের মতো জীবন যাপন করে। হানিফ আলী এবং
রকমত আলী চাহ দোকানী। ছোট ছেলে আকমত আলী সুপারির ব্যবসায় করে। একমাত্র মেয়ে
হাসেনা খাতুনের বিয়ে হয়ে গেছে।
জুরান আলী-
জুরান আলী মাঝারি গঠনের স্বাস্থ্যবান এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। সে হায়ার সেকেন্ডারি
পাস। ব্যবসায়ে নিয়োজিত। সে বাঘবর হাটের লেসিও ছিলো। সে বিয়ে করেছে বাঘবর
পাথারের ছবিল উদ্দিন ডাক্তারের মেয়ে রেজিয়া খাতুনকে। রেজিয়া খাতুন শিক্ষিতা,
সরবরাহি মহিলা এবং সামাজিক কাজের সাথে জড়িত। তাঁদের ছেলে-মেয়ে
চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে, রুজিনা
পারবিন (জুরিয়া খাতুন), রফিকুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম
এবং রুমানা পারবিন ।
রুজিনা পারবিন মাঝারি গঠনের এবং
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। ম্যাট্রিক পাস। সে আমার ছাত্রী ছিলো। তার বিয়ে হয়েছে
সত্রকনরার ইজ্জত আলী মাস্টারের ছেলে পিয়ার আলীর সাথে। রফিকুল ও শফিকুল কম্পিউটার
ইঞ্জিনিয়ার ৷এখন বাঘবর বাজারে কম্পিউটার ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। রুমানা পারবিন বি,
এ পাস। তার বিয়ে হয়ে গেছে।
জাকির হোসেন-
জাকির হোসেন লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সে হায়ার সেকেন্ডারি পাস। সে
খেলা-ধুলায় ভালো ছিলো। এখন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। সে বাঘবর হাটের লেসি। সে বিয়ে
করেছে নওকুসির রমজান আলীর মেয়ে আমিনা খাতুনকে। আমিনা খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। খুবই
অমায়িক মহিলা। অতিথি পরায়ন। তাদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আমির হামজাহ, আমিনুল হক,
হোসনিয়ারা পারবিন, মহিবুল ইসলাম এবং মনিরুল ইসলাম।আমির
হামজাহ এবং আমিনুল ইসলাম ম্যাট্রিক পাস। উভয়ে কম্পিউটার অপারেটর। হোসনিয়ারা
পারবিন ম্যাট্রিক ফেল। বিয়ে হয়ে গেছে। মহিবুল ইসলাম বি, এ পাস। মনিরুল ইসলাম স্নাতক পর্যায়ের
শিক্ষার্থী।
হামেলা খাতুন-হামেলা
খাতুন একটু ছোট-খাট ধরণের এবং ফর্সা। সে অমায়িক। তার বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের
জয়নুদ্দিনের ছেলে নুরুল ইসলামের সাথে। তাদের মেয়ে তিনজন। ছেলে নেই। মেয়েদের নাম
যথাক্রমে নূরজাহান বেগম, আলেকজান
নেসা এবং নারজিনা পারবিন। আলেকজান নেসা কিছুদিন আগে মারা গেছে।
ভুবন মুন্সি- ভুবন মুন্সি
মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তিনি কিছু শিক্ষিত ছিলেন। বাংলা এবং আরবী পড়তে
পারতেন। মসজিদের ইমামতি করতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর খুবই সুমধুর ছিলো। কেরাত করে সুরা
পাঠ করলে খুবই সুমধুর লাগতো। তিনি সুমধুর কণ্ঠে মৌলুদ পড়াতেন। আমি ছেলেবেলা তাঁর
মৌলুদ পড়ানো শুনেছি। সেই মৌলুদের সুর এখনও আমার কাণে বাজে।..ইয়া নবি সালাম আলাই
কা, ইয়া হাবিব
সালাম আলাই কা.....। ভূবন মুন্সির স্ত্রীর নাম সন্দেশ নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার
তালিকা অনুসারে ভূবন মুন্সির বয়স ৪৫ বছর এবং সন্দেশ নেসার ৩৮ বছর ছিলো। তাঁদের
ছেলে দুইজন। মেয়ে নেই। ছেলেদের নাম যথাক্রমে সামেজ উদ্দিন এবং সহর আলী।
সামেজ উদ্দিন-
সামেজ উদ্দিন লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। মুখে হালকা বসন্তের দাগ বিদ্যমান। সে
আমার থেকে কিছুটা ছোট। সে প্রথমে কাপড় বুনত। এখন কাঠমিস্ত্রীর কাজে নিয়োজিত। সে
সিপিআই(এম) দলের সাথে জড়িত। সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের আমেজ আলীর মেয়ে
চন্দ্রবানুকে। তাঁদের পাঁচ ছেলে,
এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সবিরন নেসা, চান মাহমুদ, মান্নাফ আলী, ফকরুল আলম, মোস্তাফিজুর রহমান এবং কামরুল আলম। এরা
প্রায় সবাই আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিলো। সবিরন নেসার বিয়ে হয়েছে রুভির রাইজুদ্দিনের
ছেলে ময়নাল হকের সাথে। চানমাহমুদ এবং মোস্তাফিজুর হায়ার সেকেন্ডারি পাস। মান্নাফ
আলী এবং ফকরুল আলম বি, এ
পাস। কামরুল আলম ‘ক্লাস
টেনে' পড়ে। চানমাহমুদ
সামাজিক কাজের সাথে জড়িত।
সহর আলী-
সহর আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে বিভিন্ন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। প্রথমে
কাপড় বুনত। কিছুদিন কর্মকারের কাজও করেছে। তার পক্ষ দু'টি। সে প্রথম বিয়ে করেছিলো আলীগঁয়ের
তহের আলীর মেয়ে সূর্যবানুকে এবং দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলো আলীগাঁয়ের ইমান আলীর
মেয়ে ময়ূরজান নেসাকে। প্রথম পক্ষের চার ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাজিয়া খাতুন, সাগর বানু, সরিফন নেসা, মোনসের আলী, মোসলেম উদ্দিন এবং সবদের আলী। কেউ তেমন
লেখা-পড়া করেনি। দ্বিতীয় পক্ষের তিন ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাহেরা খাতুন, ময়নাল হক, আয়নাল হক, মাজেদা খাতুন এবং মহিবুল হক। মাজেদা
খাতুন বি, এ
পাস। সাজিয়া খাতুন আমার ছাত্রী ছিলো।
ভূবন মুন্সিরা তিন ভাই এবং এক বোন
ছিলো। ভাই-বোনদের নাম যথাক্রমে ভূবন মুন্সি, ইন্তাজ আলী, আহ্লাদি
খাতুন এবং সুলতান আলী। ভূবন মুন্সি এবং ইন্তাজ আলীকে নিয়ে একটি মুখরুচক প্রবাদ
প্রচলিত ছিলো আলীগাঁও অঞ্চলে। ভূবন মুন্সি বলেছিলো, কলা খায় ইন্তাজ এবং কৃমি পরে আমার মার্গ দিয়ে। কথাটা তিনি যথার্থই
বলেছিলেন। ছেলে-মেয়ে, ছোট
ভাইয়েরা দোষ করলে অভিভাবকদেরইতো জবাবদিহি করতে হয় । ইন্তাজ আলী- মাঝারি
গঠনের এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম জমেলা খাতুন। ১৯৬৬
সালের ভোটার তালিকা অনুসারে ইন্তাজ আলীর বয়স ৩৬ বছর এবং জমেলা খাতুনের ২৮ বছর।
জমেলা খাতুন আলীগাঁয়ের কান্দু মিয়ার মেয়ে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। দুই ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
রূপজান নেসা, জামাল
উদ্দিন, ইনসন নেসা, কাঞ্চনমালা, হামিদা খাতুন এবং জাকির হোসেন। কেউ
তেমন লেখা-পড়া শেখেনি।
আহ্লাদি খাতুন-
মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের আজগর আলীর সাথে।
আজগর আলী চাহ দোকানী ছিলো। তাঁকে আমরা ভাই বলে ডাকতাম। তাঁদের ছেলে-মেয়ে সাতজন।
তিন ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সোনাবানু, সরবানু, আজিরন
নেসা, বাতাসী নেসা, মজিবর রহমান, আজিমুদ্দিন এবং কাজিমুদ্দিন। মজিবর
রহমান ঔষধ ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। কাজিমুদ্দিন ভেঞ্চার এম, ই স্কুলের শিক্ষক।
সুলতান আলী-সুলতান
আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম শান্ত নেসা
৷১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে সুলতান আলীর বয়স ২৮ বছর এবং পান্ত নেসার ২২
বছর। তাঁদের এক ছেলে, এক
মেয়ে। সন্তানদের নাম ফিরোজা খাতুন এবং হেলাল উদ্দিন ৷
সন্তান দু'টি জন্মের পরে তাঁরা বাংলাদেশে চলে
গেছে।
মাতবর আলী- মাতবর আলী
লম্বা এবং কালো ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালের আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাঁকে আমি দেখিনি।
তাঁর ছেলেদের কাছ থেকে তাঁর বিষয়ে জেনেছি। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো মমিরন নেসা।
মমিরন নেসাকে আমি দেখেছি। তেনি লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলেন। কুকুরে
কামড়ানোর ফলে ক্ষেপে দিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে মারা গেছেন। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন।
চার ছেলে, দুই
মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে লালচান আলী, রয়তন নেসা, ময়জান
নেসা, নিলু
মিয়া(নিলীম উদ্দিন), মেঘু
মিয়া, পিয়ার আলী এবং
রাবিয়া খাতুন।
লালচান আলী-
লালচান আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। তিনি কৌতুকপ্রিয় ছিলেন।
লাঠিবাড়ি খেলায় ভালো ছিলেন। নাটকেও কৌতুক অভিনয় করতেন। ১৯৫১ সালের এনআরসি
অনুসারে তাঁর বয়স ১৫ বছর। তাঁর স্ত্রীর নাম জামেলা খাতুন। তাঁদের তিন ছেলে. এক
মেয়ে। ছেলে-মেয়েদের নাম যথাক্রমে সামেজ উদ্দিন, সামত বানু, জবেদ
আলী এবং আব্দুস সালাম। ছেলেরা কৃষিকাজ করে। মেয়েরা গৃহিনী। সামা বানু ২০১০ সালে
মারা গেছে।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের পরে লালচান
আলী বরপেটা রোডের মণিপুর-এ উঠে গিয়েছিলেন। ছেলেরা এখন মণিপুরেই বসবাস করে।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে অনেকদিন আগে মণিপুর গ্রামে মারা গেছে।
রয়তন নেসা-
রয়তন নেসা লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের নজা
মল্লিকের সাথে। রয়তনের মা মমিরন নেসাকে কুকুরে কামড়ে ছিলো এবং সে জন্যই ক্ষেপে
গিয়ে মারা গিয়েছিলো । মৃত্যুর একদিন আগে মমিরন নেসা রয়তন নেসাকে খামচে ছিলো।
খামচানোর ফলে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সেও ক্ষেপে গিয়ে ১৯৮৪ সালে তাঁর মার
মৃত্যুর এক মাস পরে মারা গিয়েছিলো। তাঁদের ছেলে-মেয়ে তিনজন। তিন জনই ছেলে। মেয়ে
নেই। সন্তানদের নাম যথাক্রমে মফিজ আলী, নুরমহম্মদ এবং রতন আলী। মফিজ উদ্দিন ১৯৯৪ সালে এবং নুরমহম্মদ ২০১৮
সালে মারা গেছে। রতন আলী এখনও জীবিত জীবিত । কৃষিকাজে নিয়োজিত।
ময়জান নেসা-ময়জান
নেসা লম্বা এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আগমন্দিয়ার আসান
আলীর সাথে। সে বার্ধক্যজনিত কারণে ২০১০ সালে মারা গেছে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন।
দুই ছেলে, তিন
মেয়ে। সন্তানদের নাম বেগম নেসা,
ইমান আলী, আনোয়ারা
খাতুন, আশক আলী এবং
সামতন নেসা। ছেলেরা কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। মেয়েরা গৃহিনী।
নিলু মিয়া-
নিলু মিয়া লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি কাপড় বুনার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন। তিনি
ভালো দোতারা বাজাতে পারতেন। নম্র স্বভাবের এবং হিসেবী ছিলেন। নিরক্ষর হলেও
দেশ-বিদেশের খবর রাখতেন। না জানা বিষয় জানার চেষ্টা করতেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন
আলীগাঁয়ের সুলতান মিয়ার মেয়ে হাজেরা খাতুনকে। তিনি একটু খাটো এবং শ্যামবর্ণ।
হাজেরা খাতুন আমাদের খালতো বোন। সেই হিসাবে নিলু মিয়াকে আমরা মিয়া ভাই বলে
ডাকতাম। তিনি আমাদের খুব
স্নেহ করতেন। তাঁর পেটের ব্যথা ছিলো। সেজন্য তিনি দু'বার পেট অপারেশ্বন করিয়েছিলেন। ১৯৫১
সালের এনআরসি অনুসারে নিলু মিয়ার বয়স ১২ বছর এবং হাজেরা খাতুনের বয়স ৪ বছর।
তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। দুই ছেলে,
চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জহুরা খাতুন, সামেনা খাতুন, হাসেনা বানু, মর্জিয়ানা খাতুন, গোলাপ হোসেন এবং আলতাব হোসেন। নিলু
মিয়া ১৯৯৩ সালে মারা গেছে। হাজেরা খাতুন এখনও জীবিত। তিনি ছেলেদের নিয়ে এখন
যতিগাঁও বসবাস করে। মর্জিয়ানা খাতুন ২০০০ সালে মারা গেছে।
মেয়েরা গৃহিনী। গোলাপ হোসেন হায়ার
সেকেন্ডারী পাস। বিল্ডিং নির্মাণের ঠিকাকাজ করে। আলতাব হোসেন ম্যাট্রিক ফেল। সে
রাজমিস্ত্রী এবং বড় ভাইয়ের মতোই বিল্ডিং নির্মাণের ঠিকাকাজ করে। মেয়েরা গৃহিনী।
মেঘু মিয়া-
মেঘু মিয়া একটু খাটো এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ছিলেন। কৃষিকাজ করতেন। তাঁর
আত্মসন্মানবোধপ্রবল ছিলো। তিনি বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের নুরবক্সের মেয়ে
কাঞ্চনমালাকে। কাঞ্চনমালারা দুই বোন ছিলো । কাঞ্চনমালা এবং সরসী নেসা। কাঞ্চনমালার
মাতৃর নাম সরবেশ নেসা। দুই বোনের জন্মের পরে নুরবক্স মারা গিয়েছিলেন এবং মাতৃ
সরবেশ বিধবাই তাঁদের লালন-পালন করে বড় করেছিলেন। ১৯৬০ সালে আলীগাঁয়ে একটি
লটারি(ভাগ্য পরীক্ষা)খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেখানে কাঞ্চনমালা একটি বেঞ্জু
পেয়েছিলো। তাই তখন কাঞ্চনমালা নামটা আলীগাঁও অঞ্চলে খুবই বিখ্যাত হয়েছিলো। ১৯৫১
সালের এনআরসি অনুসারে মেঘু মিয়ার বয়স ৯ বছর এবং কাঞ্চনমালার ৩ বছর। এনআরসি
লিপিবদ্ধের সময় মেঘু মিয়া বালিকুরি এবং কাঞ্চনমালা নলিরপাম গ্রামে ছিলো।
মেঘু দম্পতির ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার
ছেলে, এক মেয়ে।
সন্তানদের নাম যথাক্রমে কাদের আলী,
মালেকা খাতুন আনসের আলী, তমসের আলী এবং মুনসের আলী। মেঘু মিয়া সংসার সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন।
কাজ- কামে তেমন মন ছিল না। তাই কাঞ্চনমালা লোকের বাড়ীতে কাজ করে ছেলে-মেয়েদের
মানুষ করেছে। কাদের আলী এবং আনসের আলী রাজমিস্ত্রী। তমসের আলী এবং মুনসের আলী
টাইলস মিস্ত্রী। মেয়ে গৃহিনী। মেঘু মিয়া ২০১২ সালে এবং কাঞ্চনমালা ২০১৮ সালে
মারা গেছে।
পিয়ার আলী-
পিয়ার আলী মাঝারি গঠনের ছিপছিপে এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি
কাপড় বুনতেন। তাঁর হাতের কাজ খুউব পরিপাটি ছিলো। তিনি বিয়ে করেছিলেন আলীগাঁয়ের
হোসেন মল্লিকের মেয়ে রংমালাকে। নদী ভাঙনের পরে তাঁরা বরপেটা রোডের নিচুকা গ্রামে
বসতি স্থাপন করেছে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে আব্দুর রহমান, নুরজাহান বেগম, সাদেক আলী এবং রেজিয়া খাতুন। আব্দুর
রহমান ব্যবসায়ী। সাদেক আলী এম,
এ পাস। সত্র কনরা জুনিয়র কলেজের প্ৰবক্তা। মেয়েরা গৃহিনী।
পিয়ার আলী পনের বছর আগে মারা গেছে।
রংমালা এখনও জীবিত।
রাবিয়া খাতুন-
রাবিয়া খাতুন লম্বা এবং ফর্সা। মিস্টভাষী। তাঁর বিয়ে হয়েছিল আলীগাঁয়ের জুরান
আলীর সাথে। জুরান আলী ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৯৫ সালে মারা গেছে। তাঁদের তিন ছেলে, চার মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
রব্বেন আলী, জরিমন
নেসা, করিমন নেসা, নিয়েত আলী, মোন্নাফ আলী এবং রোশেনারা খাতুন।
রব্বেন আলী ব্যবসায়ী। নিয়েত আলী বি, এ পাস। নিচুকা হাইস্কুলের শিক্ষক। মোন্নাফ আলী বিএসসি। প্রাইভেট
স্কুলের শিক্ষক। রোশেনারা খাতুন বি,এ
পাস। প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষিকা। জরিমন নেসা এবং করিমন নেসা গৃহিনী ।
নজর আলী দেওয়ানী-নজর
দেওয়ানী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। আমি তাঁকে একেবারে বৃদ্ধ অবস্থায়
দেখেছি। নজর দেওয়ানী, কয়েদ
আলী ফকিররাই আলীগাঁও গ্রামের পত্তন করেছিলো বললে অত্যুক্তি করা হবে না। নজর আলীর
স্ত্রীর নাম নসিমন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে নজর আলীর বয়স ৯৫ বছর
এবং তাঁর স্ত্রী নসিমন নেসার ৭০ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। চার ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম রমজান আলী, রুস্তম আলী, তোতা মিয়া, হামিদ আলী এবং মালঞ্চ খাতুন। রমজান
আলী-রমজান আলী মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন । তিনি কিছু
কিছু ক্ষেত্রে কবিরাজি চিকিৎসাও করতেন। বিশেষ করে আমাদের অঞ্চলে কাউকে কুকুরে
কামড়ালে তিনিই চিকিৎসা করতেন। সমাজের মাতবরও ছিলেন তিনি। তিনি খুবই অমায়িক
ছিলেন। তাঁর একটি সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুক ছিলো। সেই বন্দুক নিয়ে একটি মুখরুচক
প্রবাদ প্রচলিত আছে। তিনি একদিন পাখী শিকার করতে গিয়েছিলেন। তবে, পাখী শিকার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন
কে একজন জিজ্ঞাসা করেছিলো- দেওয়ানী সাহেব, কোথায় গিয়েছিলেন?
তখন তিনি বলেছিলেন- পাখী শিকার করতে।
তখন লোকটি বলেছিলো- পাখী কই? পাখী পাননি ?
তখন রমজান দেওয়ানী বলেছিলো- পাখী
পেয়েছিলাম। গুলিও করেছিলাম। তবে,
তিন হাতের জন্য পাখীর গায় লাগেনি।
তাঁদের এই কথোপকথন আলীগাঁও অঞ্চলে অনেক
দিন মুখরুচক হিসাবে ব্যবহার হতো। কেউ কোনো কাজকরতে ব্যর্থ হলে বলতো- অল্পের জন্য
হয়নি, মাত্র তিন হাতের
জন্য।
রমজান দেওয়ানীর স্ত্রীর নাম খিরমন
নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে রমজান আলীর বয়স ৫২ এবং খিরমন নেসার ৪০
বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয়জন। চার ছেলে, পাঁচ মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রংমালা(তারাবানু), নয়নবানু, ফুলমতী, লালচান আলী, সদাগর
আলী, আয়সা খাতুন, মহর আলী, রজব আলী আহমেদ এবং রহিমা খাতুন। মেয়েরা গৃহিনী। মহর আলী দর্জি এবং
রজব আলী শিক্ষক। অন্যান্য ছেলেরা কৃষিকাজে নিয়োজিত ।
রুস্তম আলী-
রুস্তম আলী লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। কিছু কবিরাজি চিকিৎসার
সাথেও জড়িত ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রীর নাম নবিরন নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে রুস্তম আলীর বয়স ৪০ বছর এবং তাঁর স্ত্রী নবিরন নেসার ৩০ বছর। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চার জন। দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে সাধু মিয়া, আদরজান নেসা, কদরজান
নেসা এবং জিন্নত আলী। ছেলেরা কৃষিকাজে নিয়োজিত । সাধু মিয়া আমার সমবয়সী, আমার থেকে কিছুটা ছোট। তার সাথে আমার
সদ্ভাব ছিলো । তোতা মিয়া- তোতা মিয়া ছোট-খাটো এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। কৃষিকাজ
করতেন। তিনি সামাজিক লোক ছিলেন। সবার সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। আমার সাথে তাঁর
সদ্ভাব ছিলো। আমি তাঁকে মামা বলে ডাকতাম। তাঁর স্ত্রীর নাম রেজিয়া খাতুন। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে তোতা মিয়ার বয়স ৩৫ বছর এবং তাঁর স্ত্রী রেজিয়া খাতুনের ২২
বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে রাবিয়া খাতুন, আফসের আলী, ওমর আলী এবং বাক্কার আলী।
কুকুরে কামড়ানোর ফলে আফসের আলী খেপে গিয়ে
১৯৯০ সালে অল্প বয়সেই মারা গিয়েছে।
কুকুরে কামড়ানো নিয়ে কিছু মন্তব্য
করা যেতে পারে। সেই কুকুরটি আফসেরের সাথে আরও কয়েকজনকে কামড়ে ছিলো । জইটার ভাগনে
এবং রথীন্দ্র রায়ের মেয়ে বুলবুলি এবং দানেশ মুন্সির একটি মহিষকেও কামড়ে ছিলো।
আমাদের অঞ্চলটা সহর থেকে অনেক দূরে ছিলো এবং যাতায়তের খুবই অসুবিধা ছিলো। তদুপরি
আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে লোক সচেতন ছিল না। তাই অনেক রোগে বিশেষ করে কুকুরে
কামড়ালে লোক কবিরাজি চিকিৎসার ওপড়েই নির্ভরশীল ছিলো। তখন কুকুরে কামড়ালে রমজান
দেওয়ানীই চিকিৎসা করতেন। এদের চিকিৎসাও রমজান দেওয়ানী করেছিলো। এমনকি মহিষটির
চিকিৎসাও রমাজন দেওয়ানী চিকিৎসা করেছিলো। তাঁর চিকিৎসার পরেও আফসের আলী, জইটার ভাগনে এবং দানেশ মুন্সির মহিষটি
মারা গিয়েছিলো। একমাত্র বুলবুলি বেঁচে গিয়েছিলো। তখন আমরা গবেষণা করে সিদ্ধান্তে
এসেছিলাম যে, কুকুরে
কামড়ানোর পরে বুলবুলিকে মাছ-মাংস,
শিম খেতে দেয়নি। এমনকি শিম গাছের তল দিয়েও যেতে দেয়নি। সেজন্যই
সম্ভবতঃ বুলবুলি বেচে গিয়েছিলো। বুলবুলি এখনও জীবিত।
আফসের এবং জইটার ভাগনে মাছ-মাংস
বাচ-বিচার করে খায়নি সেজন্যই সম্ভবতঃ তারা মারা গিয়েছিলো। তাই কুকুরে কামড়ালে
চিকিৎসার পাশাপাশি মাছ-মাংস এবং শিম বেচে খেতে হয়, তখন আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছিলাম। সম্ভবতঃ আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক
ছিলো।
হামেদ আলী-হামেদ
আলী মাঝারি গঠনের এবং কালো ছিলো। সে কিছু লেখা-পড়া শিখেছিলো। সে একটু কৌতুকপ্রিয়
ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে তাঁর বয়স ২১ বছর। সে বিয়ে করেছিলো
আলীগাঁয়ের ছেদুদের বোন আমেলা খাতুনকে। তাঁদের ছেলে-মেয়ে নয়জন। দুই ছেলে, সাত মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
রহিম বাদশ্বাহ, মমতাজ
বেগম, মর্জিনা খাতুন, জামাল উদ্দিন, হালিমন নেসা, বেলিয়া খাতুন, আলিয়া খাতুন, এলিজা খাতুন এবং আসিয়া খাতুন ।
মালঞ্চ নেসা-
মালঞ্চ নেসা মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। তাঁর বিয়ে হয়েছে সারগাঁয়ের আসান আলীর
সাথে। তাঁদের সন্তানদের নাম যথাক্রমে বাদশাহ মিয়া, আনোয়ারা খাতুন, ময়না
খাতুন, জেহের আলী এবং
আশক আলী । আশক আলী ম্যাট্রিক পাস।
সৈয়দ গোলাম মোস্তফা-
গোলাম মোস্তফা লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। লম্বা সাদা দাড়ি ছিলো। খুবই সৌমা
দেখা যেত তাঁকে। তাঁর চেহেরা ঠিক নবাবদের মতো ছিলো। দেখলেই ভক্তিভাব উদয় হতো।
তিনি স্বাক্ষর ছিলেন। বাংলা এবং আরবী খুব সাবলীলভাবে পড়তে পারতেন। তখনকার দিনে
শিক্ষিতলোকের খুবই অভাব ছিলো। চিঠি লেখা বা পড়ার জন্য লোক তালাশ করতে হতো। তখন
গোলাম মোস্তাফাই ছিলো একমাত্র ভরসা। তিনি মাঝে-মধ্যে মসজিদের ইমামতিও করতেন। তিনি
খুবই নম্র এবং ভদ্র ছিলেন। নিম্নস্বরে কথা বলতেন। সবার সাথে ভদ্র ব্যবহার করতেন।
তিনি বাড়ীতে ছেলে-মেয়েদের আরবী পড়াতেন।
আমি যে স্কুলে শিক্ষকতা করতাম, সেই স্কুলটি গোলাম মোস্তফার বাড়ীর
লাগোয়া ছিল। গোলাম মোস্তফার বাড়ীতে একটি জলফাই এবং কয়েকটা পিয়ারা গাছ ছিলো।
অবসরে(লেইজারে)র সময় ছাত্র-ছাত্রীরা সেই গাছের জলফাই এবং পিয়ারা পেরে খেত। এ
নিয়ে তাঁকে বা তাঁর পরিবারকে কোনোদিন কোনো ধরণের অভিযোগ করতে দেখিনি। বাড়ীতে কোনোদিন
উচ্চস্বরে কথাও বলতে শুনিনি।
গোলাম মোস্তফার স্ত্রীর নাম ছিল জিন্নত
বেগম। জিন্নত বেগম সারগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী সদু বেপারির বোন ছিলো। জিন্নত বেগমো
স্বাক্ষর ছিলেন। বাংলা এবং আরবী পড়তে পারতেন। তিনি খুবই নম্র এবং ভদ্র ছিলেন।
বাইরে বেরোলে বোর্খা পিন্ধে বেরোতেন। বাড়ীতে বোর্খা পরতেন না যদিও পর পুরুষে যাতে
মুখ না দেখে তার জন্য সদা সতর্ক হয়ে চলতেন। আমি অনেক দিন তাঁদের বাড়ীর কাছে
শিক্ষকতা করেছি, তবে, কোনোদিন তাঁর মুখ দেখিনি। তাঁদের
ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে, তিন
মেয়ে। ছেলের নাম নাসির উদ্দিন এবং ছোট মেয়ের নাম রহিমা খাতুন। বড় দুই মেয়ে
বয়সে আমার থেকে অনেক বড় ছিলো। তাঁদের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। তাই
তাঁদের তথ্য আমি সংগ্রহ করতে পারিনি।
নাসির উদ্দিন এবং রহিমা খাতুন বাবার
মতোই লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। তারা খুব নম্র এবং ভদ্র ছিলো। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে গোলাম মোস্তফার বয়স ৫৫ বছর এবং তার স্ত্রী জিন্নত বেগমের বয়স ৪৫ বছর
ছিলো।
গোলাম মোস্তফা এবং তাঁর স্ত্রী অনেকদিন
আগে মারা গেছেন।
কয়েদ আলী ফকিরঃ-
কয়েদ আলী ফকির লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। মুখমন্ডলে সাদা লম্বা দাড়ি ছিলো।
চুলগুলি লম্বা লম্বা ছিলো। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে সুন্নত বাবরি চুল। তাঁর বাবার
নাম নিমাই সরকার। একবার নজর আলী দেওয়ানীদের বাড়ীতে লটারি (ভাগ্য পরীক্ষা)খেলা
অনুষ্ঠিত হয়েছিলো । নজর দেওয়ানীর বাড়ী এবং কয়েদ আলী ফকিরের বাড়ী পাশাপাশি
ছিলো। তখন সেই খেলায় কয়েদ আলী ফকির পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তখন তাঁকে আমি দেখেছিলাম। (প্রকাশ থাকে যে, সেই লটারি খেলায় আলীগাঁয়ের মেঘু মিয়ার স্ত্রী কাঞ্চনমালা একটি
বেঞ্জু পেয়েছিলো। বেঞ্জু পাওয়ার সুবাদে কাঞ্চনমালা নামটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখন
খুবই বিখ্যাত হয়েছিলো। কাঞ্চনমালা আমাদের ভগ্নীপতি নিলু মিয়ার ছোট ভাইয়ের বউ
ছিলো। আমি তাঁদের বাড়ী গিয়ে বেঞ্জুটা কিছুক্ষণের জন্য বাজিয়ে ছিলাম। খুবই
সুমধুর ছিলো সেই বেঞ্জুর সুর। একটি লটারি টিকেটের মূল্য ২৫ পয়সা করে ছিলো। সালটা
মনে হয় ১৯৬০ ছিলো।)
কয়েদ আলী ফকির খুবই গুণী লোক ছিলেন।
সমাজের মাতব্বরি করার পাশাপাশি তিনি কবিরাজিও করতেন। সন্তানহীনদের জন্য তিনি
ধন্বন্তরি স্বরূপ ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার ফলে অনেক সন্তানহীন দম্পতি সন্তান লাভ করতে
সক্ষম হয়েছিলো। তাঁর বড় মেয়ে ভায়েলা খাতুন বিয়ের অনেক বছর পরেও নিঃসন্তান
ছিলো। কয়েদ আলী ফকিরের চিকিৎসার ফলেই সে সন্তান লাভে সক্ষম হয়েছিলো।
কয়েদ আলী ফকিরের ছেলে-মেয়ে চারজন।
দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে ফৈজুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, ভায়েলা
খাতুন এবং জয়তন নেসা ।
ফৈজুদ্দিন-
ফৈজুদ্দিন লম্বা-চওড়া এবং ফর্সা ছিলেন। তাঁর ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। এক ছেলে, চার মেয়ে। ছেলের নাম আইনুদ্দিন এবং
মেয়েদের নাম যথাক্রমে উজালা খাতুন,
রমিসা খাতুন, ফুলমালা
খাতুন এবং বাতাসী নেসা। ছেলে-মেয়ের জন্মের পরে ১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্থান
চলে গেছেন। পূর্ব পাকিস্থানে তাঁদের জমি ছিলো। সে জমি রক্ষণাবেক্ষনের জন্যই তিনি
পূর্ব পাকিস্থান চলে গিয়েছিলেন। সে অনেকদিন আগে মারা গেছে। তাঁর ছেলে-মেয়েরা
এখনও জীবিত।
কলিমুদ্দিন-
কলিমুদ্দিন লম্বা-চওড়া এবং শ্যামবর্ণ ছিলেন। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি সমাজের মাতব্বরি
করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সিবারন নেসা। ১৯৫১ সালের এনআরসি অনুসারে কলিমুদ্দিনের
বয়স ৪৩ এবং সিবারন নেসার ২৮ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে পাঁচজন। দুই ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়েদের নাম যথাক্রমে কুলসুন নেসা, ভোলার মা এবং হামিদা খাতুন। ছেলেদের
নাম, হানিফ আলী এবং
সিদ্দিক আলী। বড় তিন মেয়ে ছোট থাকতে মারা গিয়েছিলো। তিন মেয়ে মারা যাওয়ার পরে
হানিফ আসীকে দত্তক নিয়েছিলেন। হানিফ আলী প্রাইমারীতে আমার সহপাঠী ছিলো।
হানিফ আলী-
মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ। সে কৃষিকাজ করে। তাঁর স্ত্রীর নাম কদবানু। মনিকপুড়ের
কানু মিয়ার মেয়ে। তাঁদের দুই ছেলে, দুই
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে করম আলী, আবুল হোসেন, হালিমন
নেসা এবং হামেলা খাতুন। করম আলী কৃষিকাজে নিয়োজিত। আবুল হোসেন ঔষধ ব্যবসায়ের
সাথে জড়িত। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
সিদ্দিক আলী-
সিদ্দিক আলী মাঝারি গঠনের এবং ফর্সা। সে কৃষিকাজের পাশাপাশি মসজিদের ইমামতি করে।
সে বিয়ে করেছে আলীগাঁয়ের নেওয়াজ আলীর মেয়ে জরিনা খাতুনকে। তাঁদের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে চান
মিয়া, রাকিবুল ইসলাম, সানিদুল ইসলাম, বাসিরন নেসা এবং আসিয়া খাতুন । চান
মিয়া এবং সানিদুল ইসলাম গডরেজ নির্মাণ কারখানার সাথে জড়িত। রাকিবুল ইসলাম দর্জি।
মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।
ভায়েলা খাতুন-
ভায়েলা খাতুনের বিবরণ মতিয়ার রহমানের পরিয়ালে দেওয়া হয়েছে।
জয়তন নেসা- জয়তন নেসা লম্বা এবং
ফর্সা। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের মৈজুদ্দিনের ছেলে হাসেন আলী মুন্সির সাথে। জয়তন
নেসা খুবই অমায়িক এবং মিস্টভাষী ছিলেন। হাসেন মুন্সি মসজিদের ইমামতি করতেন। তিনি
লম্বা এবং ফর্সা ছিলেন। ছোট ছোট করে কথা বলতেন এবং খুবই অমায়িক ছিলেন। তাঁর
ইমামতিতে অনেক দিন নামাজ পড়েছি। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে হাসেন মুন্সির
বয়স ৫৫ বছর এবং জয়তন নেসার ৪০ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে আঠজন। পাঁচ ছেলে, তিন মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
সাকায়েত হোসেন, হাজেরা
খাতুন, মোজাম্মেল হক, আনোয়ার হোসেন, দলার মা, আমিনা খাতুন, জমির
হোসেন এবং জয়নাল আবদিন। সাকায়েত হোসেন আমার সহপাঠী ছিলো। সে শিক্ষকতা বৃত্তির
সাথে জড়িত ছিলো। ২০১৫ সালে অবসর নিয়েছে। মোজাম্মেল হক কৃষিকাজের সাথে জড়িত।
আনোয়ার হোসেন দর্জি। জমির হোসেন টিভি মেকানিক। জয়নাল আবদিন ব্যবসায়ী।
হাসেন মুন্সি ২০০৯ সালে এবং জয়তন নেসা
২০২১ সালে মারা গেছে।
ভোলাই সেখ- ভোলাই শেখকে
আমি দেখিনি। তবে, নাম
শুনেছি। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিলো সুয়াগি নেসা। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে
সুয়াগি নেসার বয়স ছিলো ৫০ বছর। ভোলাই দম্পতির ছেলে-মেয়ে ছিলো পাঁচজন। তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে
হাকিমুদ্দিন, জিলিমন
নেসা, জলিমন নেসা, আকবর মল্লিক, তারাবানু এবং কছিমুদ্দিন। ভোলাই শেখের
বাড়ীর পাশে একটি হিজল গাছ ছিলো। সে গাছের গোঁড়ায় পূজো দিলে অর্থাৎ তেল-সেন্দুর, বাতাসা দিলে লোকের মনোবাসনা পূরণ হতো
বলে প্রবাদ প্রচলিত ছিলো। তাই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে সেই গাছের গোঁড়ায়
পূজো দিতো।
হাকিমুদ্দিন-
হাকিমুদ্দিন লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি কৃষিকাজ করতেন। নিরক্ষর ছিলেন। তবু
লোকের সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন হাজেরন নেসাকে। ১৯৬৬ সালের
ভোটার তালিকা অনুসারে হাকিমুদ্দিনের বয়স ২৮ বছর এবং তাঁর স্ত্রী হাজেরন নেসার ২২
বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে চারজন। এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলের নাম আফসের আলী এবং কাজুলি খাতুন। আফসের আলী কৃষিকাজে
নিয়োজিত। আকবর মল্লিক- আকবর মল্লিক মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি খুবই
মেধাবী ছিলেন। মেধাবি বলে অঞ্চলটিতে তাঁর বিশেষ সুনাম ছিলো। হঠাৎ তাঁর মৃগি রোগ
হয় এবং তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তিনি লেখা-পড়া ছেড়ে দেন। একদিন
প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিলো। ফলে তাঁদের বাড়ী থেকে একটু দূরেই রাস্তার অপেক্ষাকৃত
নিচু জায়গায় জল জমেছিলো। মৃগি রোগ উঠে বিয়ে-থা করার আগেই ১৯৬০ সালে তিনি সেই
বৃষ্টির জলে পড়ে মারা গিয়েছিলো। তিনি বৃষ্টির জলে উপুড় হয়ে পড়েছিলেন।
অন্যান্যদের সাথে আমিও তাঁকে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিলাম।
তারাবানু-
তারাবানু মাঝারি গঠনের এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলী গাঁয়ের
জহুরুদ্দিনের ছেলে হায়েত আলীর সাথে। আমি তাঁদের বিয়েতে উকিল হয়েছিলাম। আমি ছোট
ছিলাম বলে তিনি আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। জানিনা কি কারণে, বিয়ের কিছুদিন পরেই তিনি ফাঁসিতে ঝুলে
আত্মহত্যা করেছিলেন। জলিমন নেসা- জিলিমন নেসা লম্বা এবং ফর্সা। তাঁর বিয়ে
হয়েছিলো আলীগাঁয়ের জেহের আলীর ছেলে খইমুদ্দিনের সাথে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা
অনুসারে খইমুদ্দিনের বয়স ৪৫ বছর এবং জিলিমনের ৩০ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন।
দুই ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে বসিরন নেসা, আছিরন নেসা, সূর্যবানু, শাজিরন নেসা, জলু মুদ্দিন এবং আব্দুস সামাদ। আব্দুস
সামাদ আমার ছাত্র ছিলো। সে বর্তমান দর্জিকাজ করে।
জলিমন নেসা-
জলিমন নেসা লম্বা এবং ফর্সা ছিলো। তাঁর বিয়ে হয়েছিলো আলীগাঁয়ের দরবার আলীর ছেলে
মুলামদি শেখের সাথে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা অনুসারে মুলামদি শেখের বয়স ৩৬ বছর
এবং জলিমন নেসার ২৫ বছর। তাঁদের ছেলে-মেয়ে ছয়জন। পাঁচ ছেলে, এক মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে জবান
আলী, জয়ধর আলী, আমিরন নেসা, শাজামাল হক, নুর জামাল এবং শাইজুদ্দিন। আমার চাচাত
বোন মহেলা খাতুনের বিয়ে হয়েছে জবান আলীর সাথে। তারা এখন কৃষ্ণাই থাকে।
কছিমুদ্দিন-
লম্বা এবং শ্যামবর্ণ ছিলো। তিনি ব্যবসা করতেন। তিনি আলীগাঁয়ের বিখ্যাত ধনী
ব্যবসায়ী দানেজ মুন্সির ভাগনে ৷ তাঁর সাথেই ব্যবসা করতেন। খুবই সৎ এবং গম্ভীর
প্রকৃতির লোক ছিলেন তিনি। সবার সাথে সদ্ভাব রেখে চলতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম কদরজান
নেসা। কদরজান নেসা আলীগাঁয়ের কব্দুল আলীর মেয়ে। কছিমুদ্দিন দম্পতির ছেলে-মেয়ে
নয়জন। পাঁচ ছেলে, চার
মেয়ে। সন্তানদের নাম যথাক্রমে নয়ন বানু, সোনা বানু, জরিনা
খাতুন, সামসুন নেহার, জিয়ারুল হক, জহুরুল ইসলাম, ফরিজুল হক, সফিকুল ইসলাম এবং আমজাদ আলী।
নয়ন বানুর বিয়ে হয়েছে আলীগাঁও
নিবাসী দিদার মুন্সির ছেলে আলাল উদ্দিনের সাথে। নয়ন বানু অষ্টম শ্রেণী উত্তীর্ণ।
সোনা বানুর বিয়ে হয়েছে সত্রকনরা গাঁয়ের ইলাহি বক্সের ছেলে ইমান আলীর সাথে।
জরিনা খাতুনের বিয়ে হয়েছে বাঘবরের নুরু মিয়ার ছেলে ফজল হকের সাথে। চতুর্থ কন্যা
সামসুন নেহারের বিয়ে হয়েছে আলীগাঁয়ের হোসেন মল্লিকের ছেলে তালেবর রহমানের সাথে।
জিয়ারুল হক এবং এবং ফরিজুল হক গুয়াহাটিতে দর্জি কাজে নিয়োজিত। জহুরুল ইসলাম কৃষিজীবী।
সফিকুল ইসলাম এম, এ, বি,এড, ডিএলএড
উত্তীর্ণ। সে মিলিজুলির ব্যক্তিগত খন্ডের কলেজ ‘ইডেন গার্ডেন অ্যাকাডেমিতে অধ্যাপনা করে। সফিকুল ইসলাম কুজারপীঠের
আবু তাহেরের মেয়ে শাহমিন ফারজিনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।
যাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে
তোলে ধরলাম, তাঁদের
বাহিরেও আলীগাঁও এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে অনেক গণ্য-মান্য লোক ছিলো। যেমন ফজর আলী
মাস্টার, হাসেন আলী
মুন্সি, আব্দুল আজিজ
সরকার, আব্দুল হামিদ
ডাক্তার, গুতু দেওয়ানী, সোবাহান দেওয়ানী, জিগির মুন্সি, আব্দুল হালিম মাস্টার, এলাহি বক্স, আলম খান প্রভৃতি। সারগাঁয়ে ছিলো
বালাচান বেপারি, সদু
বেপারি। সুঁতিরপাড়ে হোসেন বয়াতী,
মনিরুদ্দিন মাস্টার। মাণিকপুড়ে ওমর আলি দেওয়ানী, আজাহার আলী, আক্কেস গাঁওবুড়া প্রভৃতি। সবার বিষয়ে
এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে লেখা সম্ভব হল না। গ্রন্থটি পাঠকের সমাদর পেলে পরবর্তী পর্যায়ে
তাঁদের বিষয়ে লেখার আশা রইল ।
সমাপ্ত

Comments
Post a Comment